what image shows

বিজ্ঞান

অষ্টম শ্রেণি


নবম অধ্যায় : বর্তনী ও চলবিদ্যুৎ

বিদ্যুৎ প্রবাহ হলো মূলত ইলেকট্রনের প্রবাহ। এ প্রবাহ আবার দু’রকম- এসি এবং ডিসি প্রবাহ। কোনো বর্তনীতে তড়িৎ প্রবাহের জন্য দরকার এর দু’প্রান্তের বিভব পার্থক্য। এই বর্তনীতে তড়িৎযন্ত্র ও উপকরণসমূহকে শ্রেণি ও সমান্তরাল সংযোগ যুক্ত করা যায়। এছাড়া বর্তনীতে তড়িৎ প্রবাহ মাপার জন্য অ্যামিটার বা যেকোনো দু’প্রান্তের বিভব পার্থক্য মাপার জন্য দরকার ভোল্টমিটার। এই অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা- • এসি এবং ডিসি প্রবাহের ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব। • তড়িৎ বর্তনীতে রোধ, ফিউজ এবং চাবির প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে পারব। • তড়িৎ প্রবাহ এবং বিভব পার্থক্যের মধ্যেকার সম্পর্ক লেখচিত্রের সাহায্যে ব্যাখ্যা করতে পারব। • শ্রেণি ও সমান্তরাল বর্তনীতে তড়িৎ প্রবাহ এবং বিভব পার্থক্যের ভিন্নতা প্রদর্শন করত পারব। • তড়িতের কার্যকর ব্যবহার এবং অপচয় রোধে নিজে সচেতন হব এবং অন্যদের সচেতন করব। • তড়িৎ প্রবাহ এবং বিভব পার্থক্য পরিমাপে অ্যামিটার ও ভোল্টমিটারের সঠিক ব্যবহারে সক্ষম হব। পাঠ ১ : তড়িৎ প্রবাহ দুটি ভিন্ন বিভবের পরিবাহককে যখন ধাতব তার দ্বারা যুক্ত করা হয় তখন তারের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। আধুনিক ইলেকট্রন তত্ত্ব থেকে আমরা জানি প্রত্যেক ধাতব পদার্থে কিছু মুক্ত ইলেকট্রন থাকে, যারা ঐ পদার্থের মধ্যে মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে। যখন দুটি ভিন্ন বিভবের পরিবাহককে সংযুক্ত করা হয়, তখন নিম্ন বিভবসম্পন্ন পরিবাহক থেকে ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রন উচ্চ বিভবসম্পন্ন পরিবাহকের দিকে প্রবাহিত হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত পরিবাহকদ্বয়ের মধ্যে বিভব পার্থক্য বর্তমান থাকে ঋণাত্মক আধানের এই প্রবাহ ততক্ষণ পর্যন্ত চলে। কোনোভাবে যদি পরিবাহকদ্বয়ের মধ্যবর্তী বিভব পার্থক্য বজায় রাখা যায় তখন এই প্রবাহ নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। ঋণাত্মক আধান বা ইলেকট্রনের এই প্রবাহের জন্যই তড়িৎ প্রবাহিত হয়। মূলত কোনো পরিবাহকের যেকোনো প্রস্তচ্ছেদের মধ্য দিয়ে একক সময়ে যে পরিমাণ আধান প্রবাহিত হয় তাই হলো তড়িৎ প্রবাহ। তড়িৎ প্রবাহের একক : তড়িৎ প্রবাহের একক হলো অ্যাম্পিয়ার। একে সাধারণত অ দ্বারা প্রকাশ করা হয়। তড়িৎ বিভব পার্থক্য প্রতি একক আধানকে তড়িৎক্ষেত্রের এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে স্থানান্তর করতে সম্পন্ন কাজের পরিমাণ হলো ঐ বিন্দুর তড়িৎ বিভব পার্থক্য। দুটি বিন্দুর মধ্যে বিভব পার্থক্য না থাকলে তড়িৎ প্রবাহিত হবে না। ফলে কোনো আধান প্রবাহিত হবে না এবং কোনো কাজও সম্পন্ন হবে না। পাঠ ২ ও ৩ : তড়িৎ প্রবাহের প্রকারভেদ তড়িৎ প্রবাহ দুই প্রকার-(ক) অপর্যাবৃত্ত প্রবাহ বা সমপ্রবাহ বা একমুখী প্রবাহ (খ) পর্যাবৃত্ত প্রবাহ বা পরিবর্তী প্রবাহ। (ক) অপর্যাবৃত্ত প্রবাহ বা একমুখী প্রবাহ যখন সময়ের সাথে সাধারণত তড়িৎ প্রবাহের দিকের কোনো পরিবর্তন ঘটে না, অর্থাৎ যে তড়িৎ প্রবাহ সবসময় একই দিকে প্রবাহিত হয়, সেই প্রবাহকে অপর্যাবৃত্ত প্রবাহ বলে। তড়িৎ কোষ বা ব্যাটারি থেকে অপর্যাবৃত্ত প্রবাহ পাওয়া যায় (চিত্র ৯.২)। আবার ডিসি জেনারেটরের সাহায্যেও এই প্রকার তড়িৎ প্রবাহ উৎপন্ন করা যায়। আগেকার দিনে এর ব্যবহার থাকলেও বর্তমানে এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। (খ) পর্যাবৃত্ত প্রবাহ যখন নির্দিষ্ট সময় পরপর তড়িৎ প্রবাহের দিক পরিবর্তিত হয়, সেই তড়িৎ প্রবাহকে পর্যাবৃত্ত প্রবাহ বলে। বর্তমান বিশ্বের সকল দেশের তড়িৎ প্রবাহই পর্যাবৃত্ত প্রবাহ। এর কারণ তুলনামূলকভাবে এটি উৎপন্ন ও সরবরাহ করা সহজ এবং সাশ্রয়ী। পর্যাবৃত্ত প্রবাহের উৎস জেনারেটর বা ডায়নামো। দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে জেনারেটরের সাহায্যে পর্যাবৃত্ত প্রবাহ উৎপন্ন করা হয়। পর্যাবৃত্ত প্রবাহের দিক পরিবর্তন দেশভেদে বিভিন্ন হয়। যেমন- বাংলাদেশে পর্যাবৃত্ত প্রবাহ প্রতি সেকেন্ডে পঞ্চাশবার এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি সেকেন্ডে ষাটবার দিক পরিবর্তন করে। পাঠ ৪ ও ৫ : রোধ বিদ্যুৎ প্রবাহ তৈরি হয় ইলেকট্রনের প্রবাহের জন্য। কোনো পরিবাহির দুই প্রান্তে বিভব পার্থক্য থাকলে এই প্রবাহ শুরু হয়। এক্ষেত্রে ইলেকট্রন নিম্ন বিভব থেকে উচ্চ বিভবের দিকে প্রবাহিত হয়। এই ইলেকট্রন স্রোত পরিবাহীর মধ্য দিয়ে চলার সময় পরিবাহির অভ্যন্তরস্থ অণু-পরমাণুর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ফলে এর গতি বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে বিদ্যুৎ প্রবাহও বিঘিœত হয়। পরিবাহির এই বাধাদানের ধর্ম হলো রোধ। মূলত পরিবাহির যে ধর্মের জন্য এর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় তাই হলো রোধ। ওহমের সূত্র কোনো পরিবাহকের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হবে কিনা তা নির্ভর করছে ঐ পরিবাহকের দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্যের উপর। এছাড়াও পরিবাহকের আকৃতি ও উপাদান এমনকি পরিবাহকটির তাপমাত্রার উপরও এর তড়িৎ প্রবাহের মাত্রা নির্ভর করে। তাপমাত্রা যদি স্থির রাখা যায় তবে নির্দিষ্ট পরিবাহকের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ শুধুমাত্র এর দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্যের উপর নির্ভর করে। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় কোনো পরিবাহির দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য ও এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ প্রবাহের অনুপাত থেকে ঐ তাপমাত্রায় ঐ পরিবাহির রোধ পরিমাপ করা হয়। এছাড়া নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় নির্দিষ্ট আকৃতির একটি পরিবাহির মধ্য দিয়ে তড়িৎপ্রবাহ এর দুই প্রান্তের সাথে বিভব পার্থক্য একটি নিয়ম মেনে চলে। এই নিয়মটির জন্য জর্জ সাইমন ওহম (১৭৮৩-১৮৫৪) একটি সূত্র প্রণয়ন করেন, যা ওহমের সূত্র নামে পরিচিত। ওহমের সূত্র : তাপমাত্রা স্থির থাকলে কোনো নির্দিষ্ট পরিবাহকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ প্রবাহের মান পরিবাহকের দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্যের মানের সমানুপাতিক। ওহমের সূত্র থেকে এটা সহজেই বলা যায় যে, পরিবাহকে দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য বেশি থাকলে তড়িৎ প্রবাহের মাত্রা বেশি হবে। আবার এই বিভব পার্থক্য কম থাকলে তড়িৎ প্রবাহ কম হবে (চিত্র ৯.৪ )। কোনো পরিবাহকের দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য V, এর রোধ R এবং তড়িৎ প্রবাহ I হলে তড়িৎ প্রবাহ I= VR সুতরাং কোনো নির্দিষ্ট পরিবাহকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বিদ্যুৎ প্রবাহ পরিবাহকের নিজস্ব রোধের ব্যস্তানুপাতিক। রোধের একক রোধের এস আই একক হলো ওহম। কোনো পরিবাহির দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য 1 ভোল্ট এবং এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ প্রবাহ 1 আম্পপিয়ার হলে, ঐ পরিবাহির রোধ হবে 1 ওহম। পাঠ ৬-৮ : তড়িৎ বর্তনী মানুষের চলার জন্য যেমন পথের প্রয়োজন, তড়িৎ প্রবাহের জন্যও প্রয়োজন নির্দিষ্ট পথ। তড়িৎ প্রবাহ চলার এই সম্পূর্ণ পথকেই তড়িৎ বর্তনী বলে। যখন তড়িৎ উৎসের দুই প্রান্তকে এক বা একাধিক রোধ, তড়িৎ যন্ত্র বা উপকরণের সাথে যক্ত করা হয়, তখন একটি তড়িৎ বর্তনী তৈরি হয়। একটি চাবি বা সুইচের সাহায্যে বর্তনী বন্ধ করা বা খোলা যায়। বর্তনী বন্ধ থাকলে তড়িৎ প্রবাহিত হবে, খোলা থাকলে তড়িৎ প্রবাহিত হবে না। সাধারণত বর্তনীতে তড়িৎযন্ত্র ও উপকরণসমূহ দু’ভাবে সংযুক্ত করা হয়। এগুলো হলো : (ক) শ্রেণিসংযোগ বর্তনী (খ) সমান্তরাল সংযোগ বর্তনী (ক) শ্রেণিসংযোগ বর্তনী কোনো বর্তনীতে যদি রোধ, তড়িৎযন্ত্র বা উপকরণসমূহ এমনভাবে সংযুক্ত হয় যেন প্রথমটির এক প্রান্তের সাথে দ্বিতীয়টির অন্য প্রান্ত, দ্বিতীয়টির অপর প্রান্তের সাথে তৃতীয়টির এক প্রান্ত এবং এরূপে সব কয়টি পর্যায়ক্রমে সাজানো থাকে, তবে সেই সংযোগকে অনুক্রম বা শ্রেণিসংযোগ বলে। চিত্রে রোধ R1, R2 অ্যামিটার A এবং চাবি K-কে অনুক্রমে সংযুক্ত করা হয়েছে। বিদ্যুৎ প্রবাহ পরিমাপের জন্য অ্যামিটার ব্যবহৃত হয় এবং একে বর্তনীতে অন্যান্য উপকরণের সাথে অনুক্রমে যুক্ত করা হয়। অ্যামিটারের প্রান্তদ্বয়ে + এবং - চিহ্ন থাকলে + চিহ্নিত প্রান্তকে অবশ্যই কোষের ধনাত্মক প্রান্তের সাথে যুক্ত করতে হবে। এ সংযোগের ক্ষেত্রে বর্তনী সকল অংশে সর্বদা একই পরিমাণ তড়িৎ প্রবাহ হয়। কিন্তু বিভিন্ন অংশে বিভব পার্থক্য ভিন্ন হতে পারে। (খ) সমান্তরাল বর্তনী কোনো বর্তনীতে দুই বা ততোধিক রোধ, তড়িৎ উপকরণ বা যন্ত্র যদি এমনভাবে সংযুক্ত থাকে যে সব কয়টির এক প্রান্ত একটি সাধারণ বিন্দুতে এবং অপর প্রান্তগুলো অপর একটি সাধারণ বিন্দুতে সংযুক্ত হয় তবে সেই সংযোগকে সমান্তরাল সংযোগ বলে। সমান্তরাল সংযোগে প্রত্যেকটির মধ্য দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তড়িৎ প্রবাহ চলে কিন্তু প্রত্যেকটির দুই সাধারণ বিন্দুর বিভব পার্থক্য একই থাকে। চিত্রে রোধ R1 ও R2 সমান্তরালভাবে এবং রোধ R2 ও ভোল্টমিটার Va সমান্তরালভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে। কোনো রোধকের দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য পরিমাপের জন্য ভোল্টমিটার ব্যবহৃত হয় এবং এ কারণে একে রোধকের দুই প্রান্তের সাথে সমান্তরালে যুক্ত করতে হয়। ভোল্টমিটারে + প্রান্তকেও অবশ্যই কোষের ধনাত্মক প্রান্তের সাথে যুক্ত করতে হয়, অন্যথায় যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কোনো একটি বর্তনীতে যদি বাল্ব সংযোগ করা হয় তাহলে কি বাল্ব দুটি একইভাবে জ্বলবে ? সিরিজ সংযোগে একই তড়িৎ প্রবাহ দুটি বাল্বের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। একটি বাল্প যত উজ্জ্বলভাবে জ্বলতো দুটি বাল্ব সিরিজ সংযোজনের ফলে তার চেয়ে কম উজ্জ্বলভাবে জ্বলবে। আবার কোনো একটি বাল্ব যদি নষ্ট হয়ে যায় তবে সমস্ত বর্তনীর মধ্য দিয়েই তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে অপর বাল্বটিও জ্বলবে না। সমান্তরাল সংযোগের প্রত্যেকটি বাল্বের মধ্য দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পথে তড়িৎ প্রবাহিত হয়। তাই একটি বাল্ব নষ্ট হলেও অন্যটি জ্বলবে। প্রতিটি বাল্বই পৃথক পৃথকভাবে জ্বালানো বা নেভানো যাবে। প্রতিটি বাল্বের প্রান্তদ্বয়ের বিভব পার্থক্য একই থাকবে। অর্থাৎ প্রতিটি বাল্বই তড়িৎ কোষের পূর্ণ বিদ্যুৎ চালক শক্তি পাবে। ফলে দুটি বাল্বই উজ্জ্বলভাবে জ্বলবে। বাল্ব দুটি যদি এক এক করে তড়িৎ কোষের সাথে সংযুক্ত করা হতো তখন যত উজ্জ্বলভাবে জ্বলতো বাল্ব দুটি সমান্তরালভাবে সংযুক্ত করলেও একই উজ্জ্বলতা থাকবে। গৃহে বিদ্যুতায়নের জন্য সমান্তরাল বর্তনীই সুবিধাজনক। কাজ : বড় সাদা কাগজে শ্রেণিসংযোগ ও সমান্তরাল বর্তনীর চিত্র অংকন করে বিদ্যুৎ প্রবাহ চিহ্নিত কর। পাঠ ৯ ও ১০ : অ্যামিটার অ্যামিটার একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র। এর সাহায্যে বর্তনীর তড়িৎ প্রবাহ সরাসরি অ্যাম্পিয়ার এককে পরিমাপ করা যায়। অ্যামিটারকে বর্তনীর সাথে শ্রেণি সংযোগ যুক্ত থাকে। এই যন্ত্রে একটি চলকুন্ডলী জাতীয় গ্যালভানোমিটার থাকে। গ্যালভানোমিটার হচ্ছে সেই যন্ত্র যার সাহায্যে বর্তনীতে তড়িৎ প্রবাহের অস্তিত্ব ও পরিমাণ নির্ণয় করা যায়। গ্যালভানোমিটার সম্পর্কে তোমরা পরে বিস্তারিত জানবে। এই গ্যালভানোমিটারের কুন্ডলীর বিক্ষেপ নির্ণয়ের জন্য একটি সূচক বা কাঁটা লাগানো থাকে। সূচকটি অ্যাম্পিয়ার, মিলিঅ্যাম্পিয়ার বা মাইক্রোঅ্যাম্পিয়ার এককে দাগকাটা একটি স্কেলের উপর ঘুরতে পারে। বিদ্যুৎ কোষের মতো অ্যামিটারেও দুটি সংযোগ প্রান্ত থাকে, একটি ধনাত্মক ও একটি ঋণাত্মক প্রান্ত। সাধারণত ধনাত্মক প্রান্ত লাল এবং ঋণাত্মক প্রান্ত কালো রঙের। ভোল্টমিটার যে যন্ত্রের সাহায্যে বর্তনীর যে কোনো দুই বিন্দুর মধ্যকার বিভব পার্থক্য সরাসরি ভোল্ট এককে পরিমাপ করা যায় তাকে ভোল্টমিটার বলে। বর্তনীর যে দুই বিন্দুর বিভব পার্থক্য পরিমাপ করতে হবে ভোল্টমিটারকে সেই দুই বিন্দুর সাথে সমান্তরালে সংযুক্ত করতে হয়। এই যন্ত্রে একটি চলকুন্ডলী জাতীয় গ্যালভানোমিটার থাকে। এর বিক্ষেপ নির্ণয়ের জন্য একটি সূচক বা কাঁটা লাগানো থাকে। সূচকটি ভোল্ট এককে দাগাঙ্কিত একটি স্কেলের উপর ঘুরতে পারে। বর্তনীর যে দুই বিন্দুর বিভব পার্থক্য পরিমাপ করতে হয় ভোল্টমিটারটিকে সেই দুই বিন্দুর সাথে সমান্তরালে সংযুক্ত করতে হয়। তড়িৎ কোষ বা অ্যামিটারের মতো ভোল্টমিটারেও দুটি সংযোগ প্রান্ত থাকে, একটি ধনাত্মক ও একটি ঋণাত্মক প্রান্ত। সাধারণত ধনাত্মক প্রান্ত লাল এবং ঋণাত্মক প্রান্ত কালো রঙের। পাঠ ১১ : ফিউজ আমরা দৈনন্দিন জীবনে যেসব তড়িৎ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করি সেগুলোর মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে বেশি তড়িৎ প্রবাহিত হলে তা নষ্ট হয়ে যায়। বাড়ির তড়িৎ বর্তনীতে কোনো কারণে অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহিত হলে অনেক সময় তার থেকে বাড়িতে আগুন পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। এ ধরনের বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা এড়াবার জন্য বর্তনীতে এক ধরনের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই বিশেষ ব্যবস্থা হলো ফিউজ তার ব্যবহার করা। ফিউজ সাধারণত টিন ও সীসার একটি সংকর ধাতুর তৈরি ছোট সরু তার। এটি একটি চিনামাটির কাঠামোর উপর দিয়ে আটকানো থাকে। তারটি সরু এবং গলনাঙ্ক কম। এর মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহিত হলে এটি অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে গলে যায়। ফলে তড়িৎ বর্তনী বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এভাবে তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে ফিউজ যন্ত্রপাতিকে রক্ষা করে। বর্তনীতে ফিউজ সিরিজ সংযোগ করতে হয়। ফিউজ তারের মান বিভিন্ন হয়ে থাকে। সাধারণত আমরা ৫ অ্যাম্পিয়ার, ১৫ অ্যাম্পিয়ার, ৩০ অ্যাম্পিয়ার এবং ৬০ অ্যাম্পিয়ার ফিউজ তার ব্যবহার করে থাকি। ১০ অ্যাম্পিয়ার ফিউজ মানে এর মধ্য দিয়ে ১০ অ্যাম্পিয়ারের বেশি বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে এটি গলে যাবে। বিভিন্ন যন্ত্রপাতির জন্য বিভিন্ন মানের ফিউজ ব্যবহার করতে হয়। বাতি, পাখা, টিভি ইত্যাদির জন্য ৫ অ্যাম্পিয়ার ফিউজ এবং ইলেকট্রিক কেটলি বা ইস্ত্রির জন্য ১৫ অ্যাম্পিয়ার ফিউজ ব্যবহার করতে হয়। বাড়ির মেইন ফিউজ ৩০ বা ৬০ অ্যাম্পিয়ারের হয়ে থাকে। ব্যাপারটা আর একটু বোঝার চেষ্টা কর। টেলিভিশন ৫ অ্যাম্পিয়ারের বেশি বিদ্যুৎ প্রবাহের জন্য পুড়ে যায়। এখন যদি টেলিভিশনের সাথে ৩০ অ্যাম্পিয়ারের ফিউজ লাগাও তাহলে কী হবে? এ ফিউজ কোনো কাজে আসবে না। ইলেকট্রিক কেটলির সাথে ৫ অ্যাম্পিয়ার ফিউজ লাগালে কী হবে? সুইচ অন করলেই ফিউজটি গলে যাবে। কারণ ইলেকট্রিক কেটলিতে ৫ অ্যাম্পিয়ারের বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। যেখানে যা প্রয়োজন সেখানে তেমন মানের ফিউজ ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মানের ফিউজ ব্যবহার করলে কোনো কাজ দিবে না, অর্থাৎ বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে না। আবার কম মানের ফিউজ ব্যবহার করলে বারবার ফিউজ তার পুড়ে যেয়ে অসুবিধার সৃষ্টি করবে। কেউ কেউ আবার বাড়িতে ফিউজ পুড়ে গেলে তার লাগাবার সময় দুই তিনটি তার একত্র করে লাগান। এ রকম কখনও করা উচিত নয়। কারণ, এতে ফিউজের মান বেড়ে যায়। দুইটি ১০ অ্যাম্পিয়ারের ফিউজ তার একত্র করলে ২০ অ্যাম্পিয়ার ফিউজ হয়ে যাবে। পাঠ ১২ : বিদ্যুতের কার্যকর ব্যবহার ও অপচয় রোধে সচেতনতা আমাদের দেশে দিন দিন বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে চলছেই। চাহিদার সাথে নানাবিধ পরিকল্পনা গ্রহণ করেও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তার মধ্যে বাড়তি যোগ হচ্ছে জলবায়ুর পরিবর্তন। যার প্রভাব পড়ছে বিদ্যুতের চাহিদার উপর। বাড়ছে অফিস, বাসা, শপিং কমপ্লেক্স। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বড় বড় বিল্ডিং করার সাথে বাড়ছে লিফটের চাহিদা। চাহিদা বাড়ছে নির্মাণ কাজে বিদ্যুতের ব্যবহার করার প্রবণতা। এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসার জন্য সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ে নানাবিধ উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। বিদ্যুতের কার্যকর ব্যবহার করে এর অপচয় রোধে সকলকে সমভাবে এগিয়ে আসতে হবে। বিদ্যুতের কার্যকর ব্যবহার ও অপচয় রোধে আমরা নিচের কাজগুলো করতে পারি। ❏ বাসায় বা অফিসে প্রয়োজন ব্যতীত লাইট, ফ্যান বা এয়ার-কুলার বন্ধ রাখার ব্যাপারে সচেতন থাকা। ❏ সাধারণ বাল্বের পরিবর্তে ফ্লোরোসেন্স বা এনার্জি সেভিং বাল্ব ব্যবহার করতে হবে, এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়। ❏ রান্নার কাজে বিদ্যুতের ব্যবহার পরিহার করতে হবে। প্রেসার কুকারে রান্না করলে ২৫% বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়। ❏ অপ্রয়োজনে এয়ারকুলারের ব্যবহার না করা নিশ্চিত করতে হবে। ❏ ফ্রিজ কেনার সময় প্রয়োজনীয় সাইজের কেনা উচিত। প্রয়োজনের চেয়ে বড় সাইজের ফ্রিজে বাড়তি বিদ্যুৎ লাগে। ❏ বড় বড় ফ্যাক্টরিগুলোতে নিজেদের জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা। ❏ সোলার বিদ্যুৎ ব্যবহারে স্ব-উদ্যোগী হওয়া। নতুন শব্দ তড়িৎ বিভব, তড়িৎ প্রবাহ, রোধ, ওহমের সূত্র, একমুখী প্রবাহ, পর্যাবৃত্ত প্রবাহ, তড়িৎ বর্তনী, অ্যামিটার, ভোল্টমিটার, ফিউজ। এই অধ্যায় পাঠ শেষে যা শিখলাম- - দুটি ভিন্ন বিভবের পরিবাহককে সংযুক্ত করলে এদের যে বৈদ্যুতিক অবস্থা এদের মধ্যে চার্জ আদান প্রদানের দিক নির্ণয় করে তাই হলো বৈদ্যুতিক বিভব। - যতক্ষণ পর্যন্ত দুটি পরিবাহকের মধ্যে বিভব পার্থক্য বর্তমান থাকে তড়িৎ প্রবাহ ততক্ষণ পর্যন্ত চলে। - কোনোভাবে যদি পরিবাহকদ্বয়ের মধ্যবর্তী বিভব পার্থক্য বজায় রাখা যায় তখন তড়িৎ প্রবাহ নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। - পরিবাহির যে ধর্মের জন্য এর মধ্য দিয়ে তড়িৎ চলাচল বাধাগ্র¯ত হয় তাই হলো রোধ। - তাপমাত্রা স্থির থাকলে কোনো নির্দিষ্ট পরিবাহকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ প্রবাহের মান পরিবাহকের দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্যের মানের সমানুপাতিক। - যখন তড়িৎ প্রবাহ সবসময় একই দিকে প্রবাহিত হয়, সেই প্রবাহকে অপর্যাবৃত্ত প্রবাহ বলে। - যখন নির্দিষ্ট সময় পর পর তড়িৎ প্রবাহের দিক পরিবর্তিত হয়, সেই তড়িৎ প্রবাহকে পর্যাবৃত্ত প্রবাহ বলে। - বর্তনীতে তড়িৎযন্ত্র ও উপকরণসমূহ দু’ভাবে সংযুক্ত করা হয়। এগুলো হলো শ্রেণিসংযোগ বর্তনী ও সমান্তরাল সংযোগ বর্তনী। - অ্যামিটারের সাহায্যে বর্তনীর তড়িৎ প্রবাহ সরাসরি অ্যাম্পিয়ার এককে পরিমাপ করা যায়। - যে যন্ত্রের সাহায্যে বর্তনীর যেকোনো দুই বিন্দুর মধ্যকার বিভব পার্থক্য সরাসরি ভোল্ট এককে পরিমাপ করা যায় তাই ভোল্টমিটার। - ফিউজ বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা এড়াবার জন্য বর্তনীতে এক ধরনের বিশেষ ব্যবস্থা। - বিদ্যুতের কার্যকর ব্যবহার করে এর অপচয় রোধে সকলকে সমভাবে এগিয়ে আসতে হবে।