জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র

(দ্বাদশ শ্রেণি)

(HSC Biology 2nd Paper )


what image shows বৈচিত্র্যময় এ পৃথিবীতে বিভিন্ন প্রকার প্রাণীর বসবাস। এসব প্রাণী সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে হলে প্রাণীর স্বভাব, বসতি, দৈহিক গঠন, খাদ্য, শরীরবৃত্ত ও জীবনচμ সম্পর্কে জানা অত্যাবশ্যক। তাছাড়া প্রতিটি প্রাণীর কিছু স্বকীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন পর্বের সৃষ্টি হয়েছে। একটি পর্বের একটি প্রাণী সম্পর্কে অধ্যয়ন করে সার্বিকভাবে উল্লিখিত পর্বের সকল প্রাণীর পরিচিতি লাভ করা যায়। এ ইউনিটে পাঠ্যসূচিভুক্ত হাইড্রা, ঘাসফড়িং ও রুই মাছ এই তিনটি প্রাণী সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

পাঠ-২.১ হাইড্রা (Hydra)- শ্রেণিবিন্যাস, স্বভাব ও বাসস্থান



হাইড্রার শ্রেণিবিন্যাসগত অবস্থান (Systemic position of Hydra): Hydra আবিষ্কার করেন আব্রাহাম ট্রেম্বলে। এর নামকরণ করেন বিজ্ঞানী লিনিয়াস।
Kingdom : Animalia (প্রাণী)
Sub-Kingdom : Metazoa (বহুকোষী)
Phylum : Cnidaria (নিডোব্লাস্ট কোষ ও সিলেন্টেরন)
Class : Hydrozoa (অবিভক্ত সিলেন্টেরন)
Order : Hydroida (পলিপ দশা প্রধান)
Genus : Hydra
Species : Hydra vulgaris

HYDRA-র স্বভাব (Habit): Hydra স্বাধীন মুক্তজীবী ও মাংসাশী প্রাণী। HYDRA মিঠা পানিতে নিমজ্জিত কঠিন বস্তু ও জলজ উদ্ভিদের পাতার নিচের পৃষ্ঠে ঝুলন্ত অবস্থায় আটকে থাকে। কর্ষিকার সাহায্যে এরা খাদ্য গ্রহণ, দেহের সংকোচন, প্রসারণ ও চলাচল সম্পন্ন করে থাকে। ব্যাপন প্রক্রিয়ায় শ্বসন ও রেচন সম্পন্ন করে। মুকুলোদগম ও দ্বিবিভাজনের সাহায্যে অযৌন জনন এবং জননকোষ সৃষ্টি করে যৌন জনন সম্পন্ন করে। Hydra পুনরুৎপত্তি (regeneration) ক্ষমতা প্রাপ্ত।

Hydra-র বাসস্থান (Habitat): Hydra মিঠাপানির প্রাণী। এরা সাধারণত খাল, বিল, পুকুর, হ্রদ, ডোবা, ঝর্ণার পানিতে বাস করে। ঘোলা পানিতে এদের কম পাওয়া গেলেও পরিস্কার, অপেক্ষাকৃত শীতল এবং স্রোতহীন পানিতে এদেরকে তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। চলাচলে সক্ষম হলেও Hydra অধিকাংশ সময়ই পানিতে অবস্থিত কোন বস্তুকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকে। অনেক সময় এরা ভাসমান পত্রখণ্ড সংলগ্ন হয়ে পানিতে নিম্নমুখী অবস্থায় ঝুলতে থাকে। শিক্ষার্থীর কাজ নিচের ছকে হাইড্রার শ্রেণিবিন্যাস লিখুন।

সারসংক্ষেপ Hydra আবিষ্কার করেন আব্রাহাম ট্রেম্বলে। এর নামকরণ করেন বিজ্ঞানী লিনিয়াস। বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রজাতির Hydra পাওয়া যায় তম্মধ্যে Hydra vulgaris সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। কর্ষিকার সাহায্যে এরা খাদ্য গ্রহণ, দেহের সংকোচন, প্রসারণ ও চলাচল সম্পন্ন করে থাকে। ব্যাপন প্রক্রিয়ায় শ্বসন ও রেচন সম্পন্ন করে। মুকুলোদগম ও দ্বিবিভাজনের সাহায্যে অযৌন জনন এবং জননকোষ সৃষ্টি করে যৌন জনন সম্পন্ন করে। Hydra পুনরুৎপত্তি (regeneration) ক্ষমতা প্রাপ্ত। Hydra মিঠাপানির প্রাণী। এরা সাধারণত খাল, বিল, পুকুর, হ্রদ, ডোবা, ঝর্ণার পানিতে বাস করে। ঘোলা পানিতে এদের কম পাওয়া গেলেও পরিস্কার, অপেক্ষাকৃত শীতল এবং স্রোতহীন পানিতে এদেরকে তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়।

পাঠ-২.২ গঠন, খাদ্য গ্রহণ ও পরিপাক



বাহ্যিক গঠন: Hydra -র দেহ নরম, নলাকার এবং অরীয় প্রতিসম। এরা সাধারণত ১০-৩০ মি.মি. পর্যন্ত লম্বা ও প্রায় ১ মিলিমিটার চওড়া হয়। একটি পরিণত হাইড্রার দেহ নিম্নলিখিত অংশ নিয়ে গঠিত-

১. হাইপোস্টোম (Hypostome): দেহের মুক্ত ও সম্মুখ প্রান্তে অবস্থিত মোচাকৃতি, সংকোচন প্রসারণশীল অংশটিই হাইপোস্টোম। এর চূড়ায় মুখছিদ্র অবস্থিত। মুখ ছিদ্রপথে খাদ্য গৃহীত ও অপাচ্য অংশ বহিষ্কৃত হয়।

২. দেহকাণ্ড (Trunk): হাইপোস্টোমের নিচ থেকে পাদচাকতির উপর পর্যন্ত অংশটিকে দেহকাণ্ড বলে। দেহকাণ্ডে নিম্নলিখিত অংশগুলো পাওয়া যায়-

ক. কর্ষিকা (Tentacles): হাইপোস্টোমের চারপাশে ৫-৮ টি সরু, সংকোচন প্রসারণক্ষম, দেহ অপেক্ষা সামান্য লম্বা ও ফাঁপা সুতার ন্যায় কর্ষিকা থাকে। কর্ষিকার বহিঃপ্রাচীরে অসংখ্য ছোট ছোট টিউমারের মত নেমাটোসিস্ট ব্যাটারী বিদ্যমান। প্রত্যেক ব্যাটারীতে কয়েকটি করে বিভিন্ন ধরনের নেমাটোসিস্ট থাকে। কর্ষিকা ও নেমাটোসিস্টের সহযোগিতায় Hydra খাদ্য গ্রহণ, চলন ও আত্মরক্ষায় অংশ নেয়।

খ. মুকুল (Bud): দেহকাণ্ডের সাথে এক বা একাধিক গঠনরত ও পরিণত মুকুল সংলগড়ব অবস্থায় থাকতে পারে যা পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ হাইড্রায় পরিণত হয়। গ্রীষ্মকালে যখনই পর্যাপ্ত খাদ্য পাওয়া যায় এবং অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করে তখনই মুকুলোদগম (Budding) প্রক্রিয়ায় হাইড্রার অযৌন জনন সম্পন্ন হয়।

গ. জননাঙ্গ (Gonad) : প্রজনন ঋতুতে (হেমন্ত ও শীতকালে) দেহকাণ্ডের উপরের অর্ধাংশে এক বা একাধিক কোণাকার শুক্রাশয় এবং নিচের অর্ধাংশে এক বা একাধিক গোলাকার ডিম্বাশয় নামক অস্থায়ী জননাঙ্গ দেখা যায়। শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয় যথাক্রমে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু উৎপাদন করে যৌন জননে অংশ গ্রহণ করে।

গ. পাদচাকতি (Pedal disc) : দেহকাণ্ডের নিম্নে বা পশ্চাৎ প্রান্তে অবস্থিত গোলাকার বা চাপা অংশই হলো পদতল বা পাদচাকতি। পাদচাকতি থেকে নিঃসৃত আঠালো রসের সাহায্যে Hydra কোন তলের সাথে লেগে থাকে এবং বুদবুদ সৃষ্টি করে প্রাণীকে ভাসিয়ে রাখতে সাহায্য করে। পাদচাকতি বিমুক্ত করে হাইড্রা বিভিন্ন রকমের চলন সম্পন্ন করে। গ্রন্থিকোষ নিঃসৃত পিচ্ছিলরস অ্যামিবয়েড চলনে সাহায্য করে এবং ক্ষণপদ গঠনকারী কোষের সাহায্যে গ্লাইডিং চলন সম্পন্ন করে।


HYDRA-র অভ্যন্তরীণ গঠন (Internal structure): Hydra দ্বিস্তরী (diploblastic) প্রাণী। Hydra -র দেহ মূলত দেহপ্রাচীর (body wall) ও কেন্দ্রীয় গ্যাস্ট্রোভাস্কুলার গহ্বর (Coelenteron) নিয়ে গঠিত। হাইড্রার দেহের প্রস্থচ্ছেদ ও লম্বচ্ছেদের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ গঠন সুস্পষ্ট প্রতিভাত হয়। নিচে হাইড্রার অভ্যন্তরীণ গঠন আলোচনা করা হল-

বহিঃত্বক/এপিডার্মিসের গঠন: একটি পাতলা ও নমনীয় কিউটিকল এ আবৃত এপিডার্মিস দেহের বহিঃত্বক গঠন করে। গঠন ও কাজের ভিত্তিতে Hydra-র এপিডার্মিস সাত ধরনের কোষ নিয়ে গঠিত। নিচে কোষসমূহ নিয়ে আলোচনা করা হলো-

১। পেশি আবরণী কোষ (Musculo epithelial cell): এপিডার্মিসে বিদ্যমান যেসব কোষ দেহের সাধারণ বহিরাবরণ গঠন করে তাদের পেশি আবরণী কোষ বলে। বহির্মুখী চওড়া ও অন্তর্মুখী সরু প্রান্তবিশিষ্ট এ কোষগুলো দেখতে কোনাকার, চওড়া প্রান্ত, গহ্বরযুক্ত, সাইটোপ্লাজম পূর্ণ। ভিতরের সরু প্রান্তের শেষে মায়োনিম নির্মিত দুটি পেশি প্রবর্ধন দেহ অক্ষের সমান্তরালে অবস্থান করে।

কাজ
♦ আবরণী কোষের মতো দেহাবরণ সৃষ্টি করে দেহকে রক্ষা করে।
♦ প্রবর্ধনগুলো সংকোচন-প্রসারণের মাধ্যমে দেহের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটিয়ে পেশির মতো কাজ করে।
♦ মিউকাস দানা কিউটিকল ক্ষরণ করে ও দেহ পিচ্ছিল রাখে।

২। ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ (Interstitial cell): পেশি আবরণী কোষের অন্তর্মুখী সরু প্রান্তের ফাঁকে ফাঁকে গুচ্ছাকারে অবস্থিত ক্ষুদ্রাকৃতির অপরিণত কোষগুলোকে ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ বলে। এগুলো গোল বা তিনকোণা, ৫ µm ব্যাসযুক্ত, এবং সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াস ও মসৃণ এন্ডোপ্লাজমিক জালিকাসহ অসংখ্য মাইটোকন্ড্রিয়া নিয়ে গঠিত।

কাজ
♦ প্রয়োজনে অন্য যে কোন কোষে পরিণত হয়।
♦ হাইড্রার বৃদ্ধি, প্রজনন, পুনরুৎপত্তি ও মুকুল সৃষ্টিতে অংশ নেয়।

৩। স্নায়ু কোষ (Nerve cell): এসব কোষ মেসোগ্লিয়া ঘেঁষে অবস্থিত। অনিয়ত আকার বিশিষ্ট এবং একটি ক্ষুদ্র কোষদেহ ও দুই বা ততোধিক সূক্ষ্ম শাখান্বিত স্নায়ুতন্তু নিয়ে গঠিত। তন্তুগুলো পরস্পর মিলে স্নায়ু জালিকা গঠন করে।

কাজ
♦ সংবেদী কোষে সংগৃহীত উদ্দীপনা দিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে ।
♦ এরা দেহের বিভিন্ন কোষের কাজের মধ্যে সমন্বয় করে

৪। সংবেদী কোষ (Sensory cell): এসব কোষ সরু, লম্বাকৃতির বা মাকু আকৃতির। মুখের চারদিকে, কর্ষিকায় ও পাদচাক্তিতে অধিক সংখ্যায় অবস্থান করে। এসব কোষ বাইরের দিকে সংবেদী রোম বহন করে এবং ভিতরের দিকে স্নায়ুতন্তু দ্বারা স্নায়ু কোষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে থাকে।

কাজ:
♦ পরিবেশ হতে বিভিন্ন অনুভূতি (আলো, তাপ, স্পর্শ, রাসায়নিক পদার্থ ইত্যাদি) গ্রহণ করে তা স্নায়ু কোষে প্রেরণ করে থাকে।


৫। গ্রন্থিকোষ (Gland cell): হাইপোস্টোম, কর্ষিকা, পাদচাক্তির তলদেশের কতগুলো পেশি আরবণী কোষ রূপান্তরিত হয়ে বিশেষ ধরনের নিঃস্র্রাবী কোষে পরিণত হয়, এদের গ্রন্থিকোষ বলে। এর বাইরের প্রান্ত অসংখ্য নিঃসারী দানা যুক্ত এবং ভিতরের প্রান্ত পেশি প্রবর্ধনযুক্ত। প্রবর্ধনগুলো পদতলের কেন্দ্র থেকে অরীয়ভাবে বিন্যস্ত ।

কাজ
♦ এ কোষগুলো আঁঠালো পদার্থ নিঃসৃত করে প্রাণীকে কোন বস্তুর সাথে আটকে রাখতে সহায়তা করে। বুদবুদ সৃষ্টি করে এরা প্রাণীকে ভাসতে সাহায্য করে।

৬। জননকোষ (Germ cell): প্রজনন ঋতুতে Hydra Ñর দেহকাণ্ডের নির্দিষ্ট অঞ্চলের এপিডার্মিসের ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ বিভাজিত হয়ে শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয় গঠন করে। পরিণত শুক্রাণু অতিক্ষুদ্র নিউক্লিয়াসযুক্ত একটি স্ফীত মস্তক, সেন্ট্রিওলযুক্ত একটি সংকীর্ণ মধ্যখণ্ড ও একটি লম্বা বিচলনক্ষম লেজ নিয়ে গঠিত। পরিণত ডিম্বাণুটি বড় ও গোল; এর সাথে তিনটি পোলার বডি যুক্ত থাকে।

কাজ
♦ যৌন জননে অংশগ্রহণ করে।

৭। নিডোব্লাস্ট কোষ (Cnidoblast cell): Hydra -র পদতল ছাড়া বহিঃত্বকের সর্বত্র বিশেষ করে কর্ষিকার পেশি আবরণী কোষের ফাঁকে ফাঁকে বা ঐসব কোষের ভিতরে এগুলো অনুপ্রবিষ্ট থাকে। নিম্নে নিডোব্লাস্ট কোষের অংশসমূহ তুলে ধরা হলো-

(ক) কোষ আবরণী (Cell membrane): প্রতিটি নিডোব্লাস্ট কোষ প্রোটিন লিপিড নির্মিত একটি দ্বিস্তরী আবরণী দ্বারা তৈরি। ইহা সাইটোপ্লাজম ও নিউক্লিয়াস দ্বারা গঠিত।

(খ) নেমাটোসিস্ট (Nematocyst): কোষের ভিতরে আমিষ ও ফিনলে গঠিত হিপনোটক্সিন নামক বিষাক্ত তরলে পূর্ণ ক্যাপসুলটি নেমাটোসিস্ট। নেমাটোসিস্টের সূত্রকটি লম্বা, সরু ও ফাঁপা প্রকৃতির। সূত্রকের গোড়ার অংশটি প্রশস্ত থাকে যাকে বাট (but) বা শ্যাফট (shaft) বলে। শ্যাফটে বার্ব (barb) নামক তিনটি বড় কাঁটা এবং বার্বিওল (barbule) নামক কতগুলো ছোট কাঁটা থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় সূত্রকটি থলির ভিতরে উল্টো অবস্থায় প্যাঁচানো থাকে।

(গ) অপারকুলাম (Operculum): নিডোব্লাস্ট কোষের নেমাটোসিস্ট থলিটি বাইরের দিকে একটি ঢাকনা দ্বারা আবৃত থাকে, যাকে অপারকুলাম বলে।

(ঘ) নিডোসিল (Cnidocil): এটি নিডোব্লাস্টের মুক্তপ্রান্তের একপাশে অবস্থিত দৃঢ়, ক্ষুদ্র, সংবেদনশীল রোমের মত অংশ। এর উপর চাপ পড়লেই নেমাটোসিস্ট সূত্রক বাহিরে নিক্ষিপ্ত হয়।

(ঙ) পেশিসূত্র ও ল্যাসো (Muscle fibre and lasso): অনেক নিডোব্লাস্ট কোষে নেমাটোসিস্ট থলির প্রাচীর হতে পেশিতন্তু বের হয়ে সাইটোপ্লাজমে প্রবেশ করে। তাছাড়া নেমাটোসিস্ট থলির নিম্ন দিকে ল্যাসো নামক প্যাঁচানো সূত্রক থাকে।


নিডোব্লাস্ট কোষের কাজ ♦ এগুলো Hydra -র শিকার অসাড় করা ও ধরার কাজে ব্যবহৃত হয়। ♦ Hydra -র আত্মরক্ষায় অংশ নেয়। ♦ চলনে সহায়তা করে। ♦ প্রাণীকে কোন বস্তু আকড়ে ধরতে সাহায্য করে। Hydra-র গ্যাস্ট্রোডার্মিস (অন্তঃত্বক) কোষসমূহ: গ্যাস্ট্রোডার্মিস দেহের অন্তঃত্বক গঠন করে। এর অধিকাংশই বৃহদাকার কলামনার এপিথেলিয়াল কোষ দ্বারা গঠিত। HYDRA র গ্যাস্ট্রোডার্মিস নিম্নলিখিত কোষ নিয়ে গঠিত-

১। পুষ্টি কোষ বা পেশি আবরণী কোষ (Nutritive cell or musculo epithelial cells): গ্যাস্ট্রোডার্মিসের বেশির ভাগ অংশ জুড়ে এ কোষগুলো অবস্থান করে, স্তম্ভাকার কোষগুলো একটি বড় নিউক্লিয়াসযুক্ত ও গহ্বরযুক্ত। পুষ্টি কোষসমূহকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

(ক) ফ্ল্যাজেলীয় কোষ (Flagellated cell): কোষের মক্তু প্রান্তে ১-৪টি লম্বা সুতার মত ফ্ল্যাজেলা যুক্ত থাকে। এসব ফ্ল্যাজেলার আন্দোলনের ফলে সিলেন্টেরনের অভ্যন্তরে প্রবেশকৃত খাদ্য মরে যায়।

(খ) ক্ষণপদীয় কোষ (Pseudopodial cell): এসব কোষ এদের মুক্ত প্রান্তে অস্থায়ী ক্ষণপদ গঠন করে যার সাহায্যে পরিপাককৃত খাদ্য কোষের ভিতরে প্রবেশ করায়। এরা পরিপাককৃত খাদ্যের পরিশোষণে ভূমিকা রাখে।

২। ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ (Interstitial cell): এন্ডোডার্মের কোষগুলোর ফাঁকে ফাঁকে গোলাকৃতি ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ অবস্থান করে। প্রতিটি ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ মাইটোকন্ড্রিয়া, মসৃণ এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা ও রাইবোসোম নিয়ে গঠিত।

৩। গ্রন্থি কোষ (Gland cell): আবরণী পেশিকোষের ফাঁকে ফাঁকে প্রচুর পরিমাণে ডিম্বাকৃতির গ্রন্থিকোষ বিদ্যমান থাকে। হাইপোস্টোমে এদের সংখ্যা সর্বাধিক। এসব কোষ সাধারণত মিউকাস নিঃসারী অথবা এনজাইম নিঃসারী হয়ে থাকে।

৪। স্নায়ু কোষ (Nerve cell): এন্ডোডার্মের এ কোষগুলো মেসোগ্লিয়া ঘেঁসে অবস্থান করে এবং সংখ্যায় খুব কম হয়ে থাকে। বহুভূজাকৃতি এ কোষগুলো দুই বা ততোধিক শাখান্বিত তন্তু সৃষ্টি করে স্নায়ুজালক গঠন করে।

৫। সংবেদী কোষ (Nerve cell): সংবেদী কোষগুলো লম্বা ও সরু। এন্ডোডার্মে প্রচুর পরিমাণে অবস্থান করে। সংবেদী কোষের মুক্তপ্রান্তে সংবেদী লোম এবং মেসোগ্লিয়া সংলগড়ব প্রান্তে সংবেদী তন্তু থাকে। সংবেদী তন্তুগুলো স্নায়ুতন্ত্রের সাথে যুক্ত থাকে।


হাইড্রার খাদ্য গ্রহণ ও পরিপাক (Feeding and digestion of Hydra) : HYDRA মাংসাশী প্রাণী। জলজ প্রাণী অর্থাৎ নেমাটোসিস্ট দিয়ে সহজেই যাদেরকে দুর্বল করা যায় যেমন- ক্ষুদ্র Crustacea, লার্ভা, ছোট অ্যানিলিড, মাছের ডিম, ছোট ছোট কৃমি, সাইক্লপস ইত্যাদি হাইড্রার প্রধান খাদ্য।

হাইড্রার খাদ্যগ্রহণ পদ্ধতি (Feeding) : খাদ্য গ্রহণের সময় HYDRA পদতলকে ভিত্তির সাথে আটকে নির্দিষ্ট এলাকা জুড়ে মূলদেহ ও কর্ষিকাগুলো ভাসিয়ে শিকারের অপেক্ষায় থাকে। কোন শিকার যদি কর্ষিকার আওতাভুক্ত হয় তবে কর্ষিকা থেকে পেনিট্রান্ট নেমাটোসিস্ট নিক্ষিপ্ত হয়ে শিকার দেহে বিদ্ধ হয় এবং হিপনোটক্সিন নামক বিষ অনুপ্ের বশ করিয়ে দেয়, যার ফলে শিকার অসাড় হয়ে যায়। অন্যদিকে ভলভেন্ট নেমাটোসিস্ট শিকারের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গকে পেছিয়ে ধরে। এসময় মুখছিদ্রের চারিদিকে অবস্থিত গ্রন্থিকোষ থেকে মিউকাস নিঃসৃত হয় যা মুখছিদ্রকে পিচ্ছিল করে। কর্ষিকাগুলো সংকুচিত হয়ে ধৃত শিকারকে মুখের নিকট নিয়ে আসে। হাইপোস্টোম ও দেহ প্রাচীরের সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে খাদ্য সিলেন্টেরনে প্রবেশ করে।


HYDRA-র খাদ্য পরিপাক প্রণালী (Process of digestion): যে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় জটিল ও শোষণ অনুপযোগী খাদ্যবস্তু দেহাভ্যন্তরে বিভিন্ন এনজাইম ও পানির সাহায্যে ভেঙ্গে তরল, সরল ও শোষণ উপযোগী খাদ্যবস্তুতে পরিণত হয় তাকে পরিপাক (Digestion) বলে। HYDRA-র খাদ্য পরিপাকের সময় অন্তঃত্বকের গ্রন্থিকোষ থেকে এনজাইম নিঃসৃত হয়। HYDRA-র খাদ্য পরিপাক দুটি পর্যায়ে সংঘটিত হয়। যথা-

১। বহিঃকোষীয় পরিপাক (Extracellular digestion) : কোষের বাইরে খাদ্যবস্তুর পরিপাককে বহিঃকোষীয় পরিপাক বলে। খাদ্য সিলেন্টেরনে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে মুখছিদ্র বন্ধ হয়ে যায় এবং অন্তঃত্বকীয় গ্রন্থিগুলো সক্রিয় হয়। মূলত গ্যাস্ট্রোডার্মিস নিঃসৃত এনজাইমের ক্রিয়ায় শিকারের মৃত্যু ঘটে। এরপর দেহ প্রাচীরের সংকোচন ও প্রসারণের ক্রিয়ায় খাদ্যবস্তু চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়। পরবর্তীতে অন্তঃত্বকের ফ্ল্যাজেলীয় কোষের ফ্ল্যাজেলায় সঞ্চালনে খাদ্যকণা এনজাইমের সাথে ভালোভাবে মিশ্রিত হয়। গ্রন্থিকোষ নির্মিত ট্রিপসিন এনজাইম প্রোটিনকে পলিপেপটাইডে পরিণত করে। লিপিড ও শর্করা খাদ্যবস্তুর কোন পরিবর্তন হয় না।

২। অন্তঃকোষীয় পরিপাক (Intracellular digestion) : কোষের অভ্যন্তরে খাদ্যগহ্বরের মধ্যে খাদ্যবস্তুর যে পরিপাক হয় তাকে অন্তঃকোষীয় পরিপাক বলে। সিলেন্টেরনে দেহের সংকোচন প্রসারণের ফলে খাদ্য আরও ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। পেশি অন্তঃআবরণীর ক্ষনপদীয় কোষগুলো ক্ষণপদ বের করে এবং কিছু কিছু খাদ্যকণা সামান্য তরল পদার্থের সাথে ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে গৃহীত হয়। ফলে কোষের ভিতরে খাদ্য গহ্বরের সৃষ্টি হয়। খাদ্য-গহ্বরে খাদ্যের আম্লিক ও ক্ষারীয় উভয় দশাই অতিবাহিত হয়। সাইটোপ্লাজমে অবস্থিত বিভিন্ন এনজাইম খাদ্যগহ্বরে প্রবেশ করে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যকে পরিপাক করে। HYDRA স্টার্চ জাতীয় খাদ্য পরিপাক না করতে পারলেও প্রোটিন, স্নেহ জাতীয় খাদ্য পরিপাক করে। পরিপাককৃত খাদ্যসার ব্যাপন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন কোষে পরিবাহিত হয়। খাদ্যের অপরিপাককৃত অংশ মুখছিদ্র দিয়ে দেহের বাইরে নিক্ষিপ্ত হয়। শিক্ষার্থীর কাজ হাইড্রার এপিডামিসের কোষগুলো কালার পেন্সিল দিয়ে আর্ট পেপারে এঁকে ক্লাসে উপস্থাপন করুন।

সারসংক্ষেপ HYDRA-র দেহ প্রাচীরে অবস্থিত ইন্টারস্টিশিয়াল কোষগুলো দেহের প্রয়োজনে দেহের যে কোন কোষ উৎপাদনে সক্ষম। এসব কোষ দেহের পুরনো কোষগুলোর অভাব পূরণ করে। নিডোসাইটের অভ্যন্তরীণ ভাগ হিপনোটক্সিন (আমিষ ও ফিনল) নামক বিষাক্ত তরলে পূর্ণ থাকে, যা শিকারকে অসাড় করতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া HYDRA ক্ষণপদীয় কোষের মাধ্যমে অন্তঃকোষীয় পরিপাক ও গ্রন্থিকোষের মাধ্যমে বহিঃকোষীয় পরিপাক সম্পন্ন করে।

পাঠ-২.৩ চলন, প্রজনন, মিথোজীবীতা


শিখনফল-
♦ হাইড্রার চলন সম্পর্কে বলতে পারবেন।
♦ হাইড্রার যৌন ও অযৌন প্রজনন ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
♦ মিথোজীবীতা বিশ্লেষণ করতে পারবেন।

প্রধান শব্দ: মুকুলোদগম, ব্লাস্টোসিল, মরুলা, মিথোজীবীতা

হাইড্রার চলন (Locomotion of Hydra): যে পদ্ধতিতে জীবদেহ জৈবিক প্রয়োজনে অর্থাৎ খাদ্য সংগ্রহ, আত্মরক্ষা, প্রজনন বা প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন করে তাকে চলন বলে। HYDRA-র চলনের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট অঙ্গ নেই। এপিডার্মিসে বিদ্যমান পেশি আবরণী কোষ HYDRA-র চলনে প্রধান ভূমিকা রাখে। তবে কর্ষিকা, নিডোব্লাস্ট কোষ, গ্রন্থি কোষ ও পাদচাকতি হাইড্রার চলনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। HYDRA-য় নিম্ন বর্ণিত বিভিন্ন ধরনের চলন লক্ষণীয়-

১। লুপিং বা হামাগুড়ি (Looping): HYDRA লম্বা দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য এ পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে। HYDRA-এ প্রক্রিয়ায় শুরুতে দেহকে গতিপথের দিকে প্রসারিত করে ও দেহকে বাঁকিয়ে মৌখিক তলকে ভিত্তির কাছাকাছি নিয়ে আসে এবং কর্ষিকার গ্লুটিন্যান্ট নেমোটোসিস্টের সহযোগিতায় ভিত্তিকে আটকে ধরে। পরবর্তীতে পদতলকে বিমুক্ত করে মুখের সন্বিকটে স্থাপন করে এবং কর্ষিকা বিযুক্ত করে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে হাইড্রা এ পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি করে স্থান ত্যাগ করে।


২। সমারসল্টিং বা ডিগবাজী (Somersaulting): সমারসল্টিং হলো হাইড্রার সাধারণ ও দ্রুত চলন প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার প্রারম্ভে হাইড্রা তার দেহকে গতিপথের দিকে বাঁকিয়ে কর্ষিকার গ্লুটিন্যান্ট জাতীয় নেমাটোসিস্ট দ্বারা গতিপথকে স্পর্শ করে। পরে কর্ষিকা মুক্ত করে দেহকে সোজা করে দাঁড়ায়, পুনরায় পাদচাকতি অংশ গতিপথের দিকে বাঁকিয়ে পদতল দ্বারা চলন তলকে আঁকড়ে ধরে, এরপর চলন তল থেকে কর্ষিকাসমূহকে বিমুক্ত করে পাদচাকতির উপর ভর করে দাঁড়ায়। এভাবে HYDRA দ্রুত চলন সম্পন্ন করে।


৩। গ্লাইডিং বা অ্যামিবয়েড চলন (Gliding): পদতল দ্বারা HYDRA-মসৃণ তলের উপর গ্লাইডিং পদ্ধতিতে ধীর গতিতে খুব অল্প দূরত্ব অতিμম করে। পাদচাকতির গ্রন্থিকোষ থেকে নিঃসৃত পিচ্ছিল রস চলন তলকে পিচ্ছিল করে। পরে ঐ স্থান থেকেই প্রক্ষিপ্ত কোষীয় ক্ষণপদের অ্যামিবয়েড চলনের সাহায্যে দেহটি অত্যন্ত ধীরগতিতে খুব সামান্য দূরত্ব অতিμম করে।

৪। হাঁটা (Walking): বিশেষ কোন কারণে অনেক সময় HYDRA কর্ষিকার উপর ভর দিয়ে উল্টোভাবে দাঁড়ায় এবং কষির্কাগুলোকে পায়ের ন্যায় ব্যবহার করে ধীর গতিতে গতিপথ অতিμম করে।

৫। সাঁতার (Swimming): HYDRA কর্ষিকাগুলোকে ঢেউয়ের মত আন্দোলিত করে এবং দেহকে ভিত্তি থেকে মুক্ত করে সহজেই সাঁতার কাটতে পারে।

৬। ভাসা (Floating): পাদচাকতির এক্টোডার্মাল গ্রন্থিকোষ থেকে গ্যাসীয় বুদবুদ সৃষ্টি করে HYDRA দেহকে হালকা করে ভিত্তি থেকে বিচ্যুত হয়ে পানির উপরিতলে ভেসে ওঠে। এ বুদবুদকে পাদচাকতির সংলগ্ন করে হাইড্রা পানিতে নিষ্ক্রিয়ভাবে ভেসে স্রোতের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়।

৭। আরোহন-অবরোহন (Climbing): জলজ উদ্ভিদ বা পানিতে নিমজ্জিত বা ভাসমান বস্তুকে আঁকড়ে ধরার নিমিত্তে হাইড্রা কোন কোন সময় কর্ষিকাগুলোকে প্রসারিত করে। পরবর্তীতে পাদচাকতিতে বিমুক্ত করে নতুন স্থানে স্থাপন করে নিচ থেকে উপরে আরোহন অথবা উপর থেকে নিচে অবরোহন করে থাকে।

৮। দেহের সংকোচন ও প্রসারণ (Body extraction and expansion): এ প্রক্রিয়ায় হাইড্রা তার দেহকে মুক্ত করে দেহ প্রাচীরের পেশি আবরণী টিস্যুর সংকোচন প্রসারণের মাধ্যমে দেহের আকার দ্রুত লম্বা ও খাটো হয়। বহিঃত্বকে পেশি লেজের সংকোচনে দেহ খাটো ও অন্তঃত্বকের পেশি লেজের সংকোচনে দেহ লম্বা হয়। এতে এক ধরনের চলন সম্পন্ন হয়।


হাইড্রার প্রজনন (Reproduction of Hydra): যে প্রক্রিয়ায় জীব নিজ বংশ রক্ষার জন্য দেহাংশের মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে (অযৌন) বা একই প্রজাতির অন্য সদস্যের সহযোগিতায় ও গ্যামিট সৃষ্টির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে (যৌন) অনুরূপ বংশধর সৃষ্টি করে তাকে প্রজনন বলে। প্রজনন প্রতিটি জীবের সাধারণ জৈবিক প্রক্রিয়া। HYDRA যৌন ও অযৌন উভয় পদ্ধতিতে বংশবৃদ্ধি করে।

অযৌন প্রজনন (Asexual reproduction): যে প্রজনন প্রক্রিয়ায় কোন জননকোষ সৃষ্টি হয় না তাকে অযৌন জনন বলে। HYDRA মুকুলোদগম ও দ্বিবিভাজন এর মাধ্যমে অযৌন জনন সম্পন্ন করে।

(ক) মুকুলোদগম (Budding): এটি HYDRA-এর একটি স্বাভাবিক জনন পদ্ধতি। HYDRA-সহ কোনো কোনো অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের দেহে এক ধরনের প্রবৃদ্ধি গঠনের মাধ্যমে অযৌন-জনন সম্পন্ন হয়। এ প্রবৃদ্ধিকে মুকুল বা ইঁফ বলে। মুকুল গঠনের মাধ্যমে অযৌন প্রজনন প্রক্রিয়াকে মুকুলোদগম বলে। গ্রীষ্মকালে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ থাকায় এ প্রক্রিয়াটি এ ঋতুতেই বেশি দেখা যায়। এ প্রক্রিয়ার শুরুতে HYDRA-এর দেহের মধ্যাংশ বা নিম্নাংশের কোন স্থানের ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ দ্রুত বিভাজিত হয়ে ফাঁপা নলাকার মুকুল সৃষ্টি করে। এতে বহিঃত্বক, মেসোগ্লিয়া ও অন্তঃত্বকের সৃষ্টি হয়। মুকুলটি মাতৃপ্রাণী হতে পুষ্টি গ্রহণ করে, বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় এবং শীর্ষপ্রান্তে মুখছিদ্র, হাইপোস্টোম ও কর্ষিকা সৃষ্টি করে। এ প্রক্রিয়ায় মুকুল একটি অপত্য হাইড্রায় পরিণত হয়। পরে মাতৃপ্রাণী ও মুকুলের সংযোগস্থলে একটি বৃত্তাকার খাঁজের সৃষ্টি হয়। এ খাঁজ ক্রমে ক্রমে গভীরতর হতে থাকে এবং অবশেষে মাতৃ হাইড্রা ও মুকুলের সংযোগকারী সিলেন্টেরন বন্ধ হয়ে শিশু হাইড্রাকে মাতৃদেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। বিচ্ছিন্ন হওয়া অপত্য হাইড্রার ছিন্ন অংশে পদতল গঠিত হয় এবং এটি স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করে।


(খ) দ্বিবিভাজন (Binary fission): দ্বিবিভাজন হাইড্রার একটি অস্বাভাবিক প্রজনন। হাইড্রার বিভাজন দুইভাবে হতে পারে যথা- অনুদৈর্ঘ্য বিভাজন ও অনুপ্রস্থ বিভাজন। হাইড্রার দ্বিবিভাজনে ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ বিশেষ ভূমিকা রাখে।
যৌন প্রজনন (Sexual reproduction): যে প্রজনন পদ্ধতিতে প্রাণীর জননকোষ (ডিম্বাণু ও শুক্রাণু) তৈরি হয় তাকে যৌন প্রজনন বলে। HYDRA সাধারণত একলিঙ্গ প্রাণী তবে কিছু কিছু প্রজাতির HYDRA উভলিঙ্গ। HYDRA-র যৌন প্রজনন

তিনটি প্রধান ধাপে সম্পন্ন হয় যা নিম্নে বর্ণনা করা হলো-
১। জননকোষ সৃষ্টি (Gametogenesis): জননকোষ (Gamete) বা শুক্রাণু ও ডিম্বাণু গঠন প্রক্রিয়াকে গ্যামেটোজেনেসিস বলে। গ্যামেটোজেনেসিস দু প্রকারের হয়ে থাকে। যথা-
(ক) স্পার্মাটোজেনেসিস (Spermatogenesis): যে প্রক্রিয়ায় শুক্রাশয়ে শুক্রাণু গঠিত হয় তাকে স্পার্মাটোজেনেসিস বলে। এ প্রক্রিয়ায় শুক্রাশয়ে অবস্থিত ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ বারবার মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয়ে স্পার্মাটোগোনিয়া সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে এ স্পার্মাটোগোনিয়া স্পার্মাটোসাইটে (2n) পরিণত হয়। গোলাকার স্পার্মাটোসাইট মায়োসিস পদ্ধতিতে বিভাজিত হয়ে ৪টি স্পার্মাটিড (n) উৎপন্ন করে যার প্রতিটি একেকটি শুক্রাণুতে পরিণত হয়। পরিণত শুক্রাণু নিউক্লিয়াসযুক্ত একটি স্ফীত মস্তক (Head), সেন্ট্রিওলযুক্ত একটি সংকীর্ণ মধ্যখণ্ড (middle piece) এবং একটি লম্বা, সরু, বিচলনক্ষম, লেজ (tail) দিয়ে তৈরি।


(খ) উওজেনেসিস (Oogenesis): ডিম্বাশয়ের অভ্যন্তরে ডিম্বাণু তৈরির প্রক্রিয়াকে উওজেনেসিস বলে। এ পদ্ধতিতে প্রথমে ডিম্বাশয়ের প্রিমোর্ডিয়াল জননকোষ বা ডিম্ব মাতৃকোষ (2n) মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় বিভক্ত হয়ে উওগোনিয়া তৈরি করে। এদের ভেতর কেন্দ্রস্থ একটি কোষ আকারে বড় হয় যাকে উওসাইট (2n) বলে। অন্যান্য উওগোনিয়াগুলো উওসাইটের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উওসাইট মায়োসিস বিভাজনের মাধ্যমে বিভাজিত হয়ে ৩টি ক্ষুদ্র পোলার বডি ও ১টি বড় সক্রিয় উওটিড (n) এ পরিণত হয়। পরবর্তীতে এ উওটিড ডিম্বাণুতে পরিণত হয় এবং পোলার বডিগুলো বিলুপ্ত হয়।

২। নিষেক (Fertilization): একলিঙ্গ বা উভলিঙ্গ হাইড্রায় পরনিষেক ঘটে। শুক্রাণু পরিণত হলে শুক্রাশয়ের নিপলের মাধ্যমে শুক্রাশয় থেকে বের হয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে সাঁতার কেটে ডিম্বাণুর সন্ধান করতে থাকে। ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করতে না পারলে শুক্রাণুগুলো নষ্ট হয়ে যায়। একাধিক শুক্রাণু ডিম্বাশয়ে অবস্থিত ডিম্বাণুর আবরণ ভেদ করলেও একটি মাত্র শুক্রাণুর নিউক্লিয়াস ডিম্বাণুর নিউক্লিয়াসের সাথে একীভূত হয়ে নিষেক সম্পন্ন করে এবং একটি ডিপ্লয়েড জাইগোট (2n) গঠন করে।

৩। পরিস্ফুটন (Development): মাতৃদেহে জাইগোট আবদ্ধ থাকা অবস্থায় মাইটোসিস বিভাজনের মাধ্যমে এর বৃদ্ধি শুরু হয়। জাইগোটের বিভাজন হলোব্লাষ্টিক বা সম্পূর্ণ ধরনের। এ প্রক্রিয়ায় জাইগোট মাইটোসিস বিভাজনে বারবার বিভাজিত হয়ে বহুকোষী, নিরেট ও গোলাকার কোষপি-ে পরিণত হয় যাকে মরুলা (morula) বলে। পরবর্তীতে মরুলার কোষগুলো একটি ফাঁপা, গোলাকার ভ্রুণে পরিণত হয় যাকে ব্লাস্টুলা (blastula) বলে। ব্লাস্টুলার কোষগুলোকে ব্লাস্টোমিয়ার এবং কেন্দ্রের ফাঁকা অংশকে ব্লাস্টোসিল বলে। ব্লাস্টুলার ব্লাস্টোমিয়ারগুলো দ্রুত বিভাজিত হয়ে গ্যাস্ট্রুলেশন ঘটানোর মাধ্যমে একটি দ্বিস্তরী, নিরেট ও গোলাকার গ্যাস্ট্রুলা গঠন করে। গ্যাস্ট্রুলার অভ্যন্তরে সৃষ্ট গহ্বরকে আদি সিলেন্টেরন বলা হয়ে থাকে। গ্যাস্ট্রুলা গঠিত হওয়ার পর বহিঃস্তরে একটি কাইটিন নির্মিত কাঁটাময় খোলক বা সিস্ট (cyst) গঠিত হয়। সিস্টে আবৃত ভ্রুণটি মাতৃপ্রাণী হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে জলাশয়ের তলদেশে চলে যায়। সাধারণত শীতকালে নি¤ড়ব তাপমাত্রায় ভ্রুণের কোন বিকাশ ঘটে না। বসন্তের শুরুতে অনুকূল তাপমাত্রায় সিস্টের ভিতরে ভ্রুণের পরবর্তী পরিস্ফুটন ঘটে। ভ্রুণটি ক্রমশ লম্বা হতে থাকে এবং এর শীর্ষভাগে হাইপোস্টোম, মুখছিদ্র ও কর্ষিকা এবং পশ্চাৎপ্রান্তে পাদচাকতি থাকে। ভ্রুণের এ দশাকে হাইড্রুলা (Hydrula) বলে। পরিশেষে সিস্টের বহিরাবরণ ফেঁটে গেলে অপরিণত অপত্য HYDRA সিস্টের বাইরে স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করে।


HYDRA-র মিথোজীবীতা (Symbiosis of Hydra):
যখন দুটি ভিন্ন প্রজাতিভুক্ত জীব ঘনিষ্ঠভাবে সহাবস্থানের ফলে পরস্পরের কাছ থেকে উপকৃত হয়, তখন এ ধরনের সাহচর্যকে মিথোজীবীতা (Symbiosis) বলে। দুটি জীবের প্রতিটিকে মিথোজীবী (Symbiont) প্রাণী বলে। উদাহরণ: সবুজ হাইড্রা (Chlorohydra viridissima) এবং এককোষী শৈবাল (Zoochlorella) এর সহাবস্থান মিথোজীবীতার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

ব্যাখ্যা: (Zoochlorella) নামক সবুজ শৈবাল (Chlorohydra virridissima) হাইড্রার দেহের গ্যাস্ট্রোডার্মিসে বাস করে। যার কারণে HYDRA সবুজ বর্ণ ধারণ করে। এরা একে অপর হতে কখনোই বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। নিম্নোক্তভাবে এরা পরস্পরের কাছ থেকে উপকৃত হয়।

শৈবাল যেভাবে উপকৃত হয়
১. হাইড্রার গ্যাস্ট্রোডার্মাল পেশি আবরণী কোষে শৈবাল নিরাপদ আশ্রয় ও সুরক্ষা লাভ করে।
২. হাইড্রার শ্বসনে সৃষ্ট CO2 কে ও H2O কে শৈবাল সালোকসংশ্লেষণের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে।
৩. হাইড্রায় বিপাকীয় কাজে উদ্ভূত নাইট্রোজেন ঘটিত বর্জ্যপদার্থকে শৈবাল বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে।

হাইড্রা যেভাবে উপকৃত হয়
১. শৈবালের সালোকসংশ্লেষণে সৃষ্ট O2 হাইড্রার শ্বসনে ব্যবহৃত হয়।
২. হাইড্রার বিপাকে সৃষ্ট নাইট্রোজেনজাত বর্জ্য পদার্থ শৈবাল কর্তৃক গৃহীত হওয়ায় হাইড্রা সহজেই বর্জ্য পদার্থ মুক্ত হয়।
৩. সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় শৈবাল যে খাদ্য প্রস্তুত করে তার উদ্ধৃত অংশ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
৪. হাইড্রার শ্বসনে সৃষ্ট CO2 শৈবাল গ্রহণ করে প্রাণীকে ঝামেলামুক্ত করে।
৫. মৃত শৈবালকে হাইড্রা অনেক সময় ভক্ষণ করে।
শিক্ষার্থীর কাজ নিচে সমারসল্টিং ও লুপিং চলনের মধ্যে দুটি পার্থক্য লিখুন।

সারসংক্ষেপ
যে পদ্ধতিতে জীবদেহ জৈবিক প্রয়োজনে অর্থাৎ খাদ্য সংগ্রহ, আত্মরক্ষা, প্রজনন বা প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন করে তাকে চলন বলে। HYDRA-র চলনের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট অঙ্গ নেই। এপিডামিসে বিদ্যমান পেশি আবরণী কোষ HYDRA-র চলনে প্রধান ভূমিকা রাখে। তবে কর্ষিকা, নিডোব্লাস্ট কোষ, গ্রন্থি কোষ ও পাদচাকতি হাইড্রার চলনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। HYDRA বিভিন্ন ধরনের চলন প্রক্রিয়া প্রদর্শন করলেও লুপিং ও সমারসল্টিং এ দুটোই মূল চলন প্রক্রিয়া। মুকুলোদগম হলো হাইড্রার স্বাভাবিক জনন প্রক্রিয়া। হাইড্রা মিথোজীবীতা প্রদর্শনকারী একটি জীব।
পাঠোত্তর মূল্যায়ন-২.৩
বহু নির্বাচনী প্রশ্ন
১. কোনটি হাইড্রার দ্রুত চলন প্রক্রিয়া-
ক. লুপিং
খ. সমারসল্টিং
গ. গ্লাইডিং
ঘ. ভাসা

২. ব্লাস্টুলার ফাঁকা গহ্বরকে কি বলে?
ক. ব্লাস্টোসিল
খ. ব্লাস্টোমিয়ার
গ. মরুলা
ঘ. সিস্ট

৩. HYDRA-এর ক্ষেত্রে
i. অনুদৈর্ঘ্য বিভাজন ঘটে।
ii. অনুপ্রস্থ বিভাজন ঘটে।
iii. দ্বিবিভাজনে ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ ভুমিকা রাখে।

নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i ও ii
খ. ii ও iii
গ. i ও iii
ঘ. i, ii ও iii

পাঠ- ২.৪ ব্যবহারিক- হাইড্রার স্থায়ী স্লাইড পর্যবেক্ষণ ও চিহ্নিত চিত্র অঙ্কন



পরীক্ষণের নাম: হাইড্রার স্থায়ী স্লাইড পর্যবেক্ষণ ও চিহ্নিত চিত্র অঙ্কন।
১। HYDRA-র বাহ্যিক গঠন পর্যবেক্ষণ
শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য
(ক) দেহ তিন অংশে বিভক্ত যথা- হাইপোস্টোম, দেহকা- ও পাদচাকতি।
(খ) দেহটি নলাকার, একপ্রান্ত খোলা ও অন্যপ্রান্ত বন্ধ।
(গ) হাইপোস্টোমকে ঘিরে লম্বা, সরু কর্ষিকা বিদ্যমান।
(ঘ) দেহের নিম্নপ্রান্তে গোলাকার পাদচাকতি অবস্থিত।
(ঙ) দেহে মুকুল দেখা যায়।


২। হাইড্রার লম্বচ্ছেদ শনাক্তকরণ
(ক) হাইড্রার দেহ প্রাচীর দ্বিস্তরবিশিষ্ট বাইরে এপিডার্মিস ও ভিতরে গ্যাস্ট্রোডার্মিসও মাঝে মেসোগ্লিয়া নামক অকোষীয় স্তর রয়েছে।
(খ) দেহের মাঝখানে লম্বা নলাকার গহ্বর রয়েছে যা সিলেন্টেরন নামে পরিচিত।
(গ) দেহের উপরের প্রান্তে কর্ষিকা ও নিচের প্রান্তে পাদ-চাকতি অবস্থিত।
(ঘ) হাইপোস্টোমের শীর্ষে মুখছিদ্র বিদ্যমান।

উপরের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বলা যায়, নমুনাটি হাইড্রার লম্বচ্ছেদ।


৩। HYDRA-র প্রস্থচ্ছেদ শনাক্তকরণ
(ক) দেখতে আংটির মত গোলাকার।
(খ) দেহ প্রাচীর দ্বিস্তরী। বাইরে এপিডার্মিস ও ভিতরে গ্যাস্ট্রোডার্মিস।
(গ) দুই স্তরের মাঝখানে অকোষীয় মেসোগ্লিয়া স্তর বিদ্যমান।
(ঘ) কেন্দ্রে গোলাকার সিলেন্টেরন অবস্থিত।
(ঙ) উভয় স্তরেই বিভিন্ন ধরনের কোষ দেখা যায়। যেমন- পেশি আবরণী, ইন্টারস্টিশিয়াল, সংবেদী, ফ্ল্যাজেলীয় কোষ।

উপরের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বলা যায়, নমুনাটি হাইড্রার লম্বচ্ছেদ।

পাঠ- ২.৫ ঘাসফড়িং : শ্রেণিবিন্যাস, স্বভাব ও বাসস্থান, পরিপাক

শিখনফল- ♦ ঘাসফড়িং এর শ্রেণিবিন্যাস উল্লেখ করতে পারবেন। ♦ ঘাসফড়িং এর স্বভাব ও বাসস্থান বলতে পারবেন। ♦ ঘাসফড়িং-এর পরিপাক প্রণালি বর্ণনা করতে পারবেন। ♣ প্রধান শব্দ ক্রপ, হেপাটিক সিকা, মালপিজিয়ান নালিকা, হিমোসিল ঘাসফড়িং (grasshopper): Arthropoda পর্বের Insecta শ্রেণির Pterygota উপশ্রেণির Orthoptera বর্গভুক্ত পতঙ্গ। এ পর্যন্ত প্রায় দশ হাজার প্রজাতির ঘাসফড়িং শনাক্ত করা হয়েছে। শ্রেণিবিন্যাস (Systemic Position): Phylum : Arthropoda Class : Insecta Sub class : Pterygota Order : Orthoptera Family : Acrididae Genus : Poekilocerux Species : P. pictus স্বভাব ও বাসস্থান (Habit and Habitat): ফসলের অন্যতম ক্ষতিকারক প্রাণী বা পেস্ট (pest) হিসেবে পৃথিবীর সর্বত্র ঘাসফড়িং পাওয়া যায়। এরা যেহেতু ঘাস, পাতা, শস্য ও শস্যের কচিপাতা আহার করে তাই সাধারণত মুক্ত তৃণভূমিতে এদের ব্যাপক দেখা যায়। স্বাদুপানির ও ম্যানগ্রোভ জলাশয়ে যেহেতু পানির উঠা-নামা বেশি হয় এবং ডিম প্লাবিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাই এসব বসতিতে ঘাসফড়িং কম দেখা যায়। ঘাসফড়িং এর অনেক প্রজাতি যখন দলবদ্ধ হয়ে চলাচল করে তখন তাদেরকে পঙ্গপাল (locust) বলে। তবে বাংলাদেশের ঘাসফড়িং পঙ্গপাল প্রকৃতির নয়। এরা অনেক দূর পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে এবং প্রতিকূল পরিবেশে এদের কিছু প্রজাতি পরিযায়ী হয়। পরিপাক (Digestion): ঘাসফড়িং এর পৌষ্টিকতন্ত্র এর খাদ্যাভ্যাসের সাথে অভিযোজিত এবং এর পরিপাকতন্ত্র ১. পরিপাকনালি (alimentary canal) ও ২. পরিপাকগ্রন্থি (digestive gland) নিয়ে গঠিত। পরিপাকনালি (Alimentary Canal): ঘাসফড়িং এর পরিপাকনালি সরল প্রকৃতির এবং দেহের মধ্যরেখা বরাবর মুখছিদ্র থেকে পায়ুছিদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত। পরিপাকনালি ক. স্টোমোডিয়াম, খ. মেসেন্টেরন ও গ. প্রোক্টোডিয়াম এ তিনটি অংশে বিভক্ত। স্টোমোডিয়াম বা অগ্রপারিপাকনালি (Stomodaeum or Foregut): এটি পরিপাকনালির প্রথম অংশ এবং এটি মুখছিদ্র থেকে গিজার্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। স্টোমোডিয়ামের অন্তঃপ্রাচীর কাইটিন নামক শক্ত আবরণে আবৃত। মুখছিদ্রটি ক্ষুদ্র এবং মুখবিবরে উন্মুক্ত। মুখছিদ্রের অঙ্কীয়তলে ফ্যারিংস থাকে। মুখবিবরের পরবর্তী অংশটি হলো গলবিলীয় অন্ননালি যা মোচাকার থলির আকৃতির ক্রপে প্রবেশ করে। ক্রপের পরবর্তী ত্রিকোণাকার বেশ শক্ত, পুরু প্রাচীর বিশিষ্ট অংশটির নাম গিজার্ড। গিজার্ডের অন্তঃপ্রাচীর কাইটিনময় দুটি দাঁত ও পুরু বৃত্তাকার পেশিযুক্ত। গিজার্ডের দৃঢ় সংকোচন প্রসারণে শক্ত খাদ্য চূর্ণ বিচূর্ণ হয়। মেসেন্টেরন বা মধ্য পরিপাকনালি বা পাকস্থলি (Mesenteron or midgut): মেসেন্টেরন গিজার্ডের পর থেকে শুরু করে পাকস্থলি পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। মেসেন্টেরনের অন্তঃপ্রাচীর কিউটিকলের পরিবর্তে পেরিট্রফিক পর্দা দিয়ে আবৃত। মেসেন্টেরন ও স্টোমোডিয়ামের সংযোগস্থলে ছয় জোড়া ফাঁপা, লম্বা, মোচাকৃতির থলি থাকে যা হেপাটিক সিকা বা গ্যাস্ট্রিক সিকা নামে পরিচিত। হেপাটিক সিকা খাদ্যের সার অংশ শোষণে ও উৎসেচক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মেসেন্টেরনের শেষ ভাগে সূক্ষ্ম চুলের মত অসংখ্য সবুজ বর্ণের হলদে অঙ্গাণু থাকে। এদেরকে মালপিজিয়ান নালিকা বলে। এরা সাধারণত রেচন অঙ্গ হিসেবে কাজ করে। প্রোক্টোডিয়াম বা পশ্চাৎ পরিপাকনালি (Proctodaeum or hindgut): প্রোক্টেডিয়াম মালপিজিয়ান নালিকার পশ্চাৎ প্রান্ত থেকে শুরু হয়ে পায়ুছিদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত। এ নালির প্রথম অংশ হলো প্যাচবিহীন প্রশস্ত নলাকার ইলিয়াম পরবর্তী সরু নলাকৃতির অংশের নাম কোলন। কোলনের পরবর্তী সর্বশেষ স্ফীত ও পুরু প্রাচীরযুক্ত থলির ন্যায় অংশের নাম রেকটাম বা মলাশয় যা পায়ুছিদ্রের মাধ্যমে বাইরে উন্মুক্ত হয়। পরিপাকগ্রন্থি (Digestive gland): ঘাসফড়িং এর দেহে পরিপাকগ্রন্থি হিসেবে লালাগ্রন্থি, মেসেন্টেরনের অšঃÍ আবরণ এবং হেপাটিক সিকা কাজ করে। লালাগ্রন্থি ঘাসফড়িং এর প্রধান পরিপাকগ্রন্থি। স্টোমোডিয়ামের ক্রপের নিচে ক্ষুদ্র, শাখা প্রশাখাযুক্ত একজোড়া লালাগ্রন্থি অবস্থিত। লালাগ্রন্থির নালি ল্যাবিয়ামের গোড়ায় মুখবিবরে উন্মুক্ত হয়। লালাগ্রন্থি থেকে নিঃসৃত লালারস খাদ্য চর্বণে ও গলাধঃকরণে সহায়তা করে। মেসেন্টেরনের অন্তঃপ্রাচীরে অসংখ্য নিঃ¯্রাবী কোষ থাকে যা থেকে নিঃসৃত পাচকরস খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে। স্টোমোডিয়াম ও মেসেন্টেরনের সংযোগস্থলে হেপাটিক সিকা থাকে যা পরিপাক সহায়ক গ্রন্থি হিসেবে কাজ করে। চিত্র ২.৫.১ : ঘাসফড়িং এর পরিপাকতন্ত্র খাদ্যবস্তু পরিপাক (Digestion of Food): খাদ্যবস্তু মুখছিদ্রপথে মুখবিবরে প্রবেশের পর ম্যাক্সিলা ও ম্যান্ডিবল কর্তৃক খাদ্যবস্তু কর্তিত ও প্রেষিত হয়। কর্তিত ও প্রেষিত খাদ্যবস্তুর সাথে লালাগ্রন্থি নিঃসৃত লালারস মিশ্রিত হয়। লালারসে অ্যামাইলেজ, সেলুলেজ প্রভৃতি এনজাইম থাকে যা খাদ্যবস্তুকে পিচ্ছিল করে এবং বিভিন্ন ধরনের শর্করাকে আর্দ্র বিশ্লেষণ করে। ক্রপ থেকে খাদ্যবস্তু গিজার্ডে প্রবেশের পর কাইটিনময় দাঁতে পিষ্ট হয়ে ক্ষুদ্রতর কণায় পরিণত হয়। গিজার্ড থেকে খাদ্যবস্তু পাকস্থলীতে পৌঁছাবার পর পরিপাক ক্রিয়া শুরু হয়। মেসেন্টেরন ও হেপাটিক সিকা নিঃসৃত উৎসেচক বা এনজাইমসমূহ যেমন- মলটেজ, অ্যামাইলেজ, লাইপেজ, প্রোটিয়েজ, ইনভারটেজ, ট্রিপটেজ কঠিন খাদ্যবস্তুকে সরল ও তরল খাদ্যরসে পরিণত করে। পরিপাককৃত তরল খাদ্য সারাংশ মেসেন্টেরনের কোষীয় প্রাচীরের মাধ্যমে পরিশোষিত হয়ে হিমোসিলের মাধ্যমে সারাদেহে পরিবাহিত হয়। খাদ্যে অপাচ্য অংশ যেমন- অ্যামিনো এসিড, ইউরিক এসিড কোলন হয়ে মলাশয়ে মল আকারে প্রবেশ করে। অজীর্ণ খাদ্যবস্তু কোলনের মধ্য দিয়ে মলাশয়ে প্রবেশের পূর্বেই কোলনের প্রাচীর অপাচ্য অংশ থেকে অতিরিক্ত পানি, খনিজ লবণ ইত্যাদি শোষণ করে নেয়। পরে কঠিন অপাচ্য বস্তু মলরূপে পায়ু ছিত্রপথে দেহের বাইরে নির্গত হয়। শিক্ষার্থীর কাজ ঘাসফড়িং এর পরিপাকতন্ত্র অঙ্কন করে বিভিন্ন অংশ চিহ্নিত করুন। সারসংক্ষেপ ঘাসফড়িং (grasshopper) Arthropoda পর্বের Insecta শ্রেণির Pterygota উপশ্রেণির Orthoptera বর্গভুক্ত পতঙ্গ বলা হয়। এ পর্যন্ত প্রায় দশ হাজার প্রজাতির ঘাসফড়িং শনাক্ত করা হয়েছে। ঘাসফড়িং এর পৌষ্টিকতন্ত্র এর খাদ্যাভ্যাসের সাথে অভিযোজিত এবং এর পরিপাকতন্ত্র পরিপাকনালি ও পরিপাকগ্রন্থি নিয়ে গঠিত। ঘাসফড়িং এর পরিপাকনালি সরল প্রকৃতির এবং দেহের মধ্যরেখা বরাবর মুখছিদ্র থেকে পায়ুছিদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত। পরিপাকনালি স্টোমোডিয়াম, মেসেন্টেরন ও প্রোক্টোডিয়াম এ তিনটি অংশে বিভক্ত। পাঠোত্তর মূল্যায়ন-২.৫ বহু নির্বাচনি প্রশ্ন ১. মালপিজিয়ান নালিকা কোন অঙ্গ হিসেবে কাজ করে? ক. শোষণ অঙ্গ খ. রেচন অঙ্গ গ. শ্বসন অঙ্গ ঘ. কোনটি নয় ২. ঘাসফড়িং কোন গোত্রের অন্তর্ভুক্ত? ক. Cypirindae খ. Tetrigidae গ. Meconematidae ঘ. Acrididae ৩. পরিপাকতন্ত্রের সাথে সম্পর্কিতÑ i. মালপিজিয়ান নালিকা ii. ওমাটিডিয়া iii. হেপাটিক সিকা নিচের কোনটি সঠিক? ক. iii খ. i ও iii গ. ii ও iii ঘ. i, ii ও iii

পাঠ- ২.৬ ব্যবহারিকঃ ঘাসফড়িং / তেলাপোকা এর মুখোপাঙ্গ শনাক্তকরণ ও চিহ্নিত চিত্র অঙ্কন।



পাঠ- ২.৭ সংবহন ও শ্বসন



পাঠ- ২.৮ রেচন ও প্রজনন



পাঠ- ২.৯ পুঞ্জাক্ষির গঠন ও দর্শন কৌশল



পাঠ-২.১০ রুই মাছ : শ্রেণিবিন্যাস, স্বভাব, বাসস্থান ও গঠন


শিখনফল -
♦ রুই মাছের শ্রেণিবিন্যাস বলতে পারবেন।
♦ রুই মাছের স্বভাব ও বাসস্থান উল্লেখ করতে পারবেন।
♦ রুই মাছের বাহ্যিক গঠন ব্যাখ্যা করতে পারবেন।

প্রধান শব্দ ফাইটোপ্লাঙ্কটন, কানকুয়া, অ্যানুলাস, সার্কুলি

রুই মাছ: রুই মাছ বাংলাদেশ তথা এশিয়া অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের একটি সাধারণ মাছ। এদেরকে মেজর কার্প বলা হয়। কার্প জাতীয় মাছ বলতে সেই সমস্ত মাছকে বোঝায় যাদের অন্তঃকঙ্কাল অস্থি দ্বারা তৈরি মস্তক আঁইশবিহীন এবং অতিরিক্ত শ্বসন অঙ্গবিহীন। আমাদের দেশে রুই অর্থাৎ Labeo rohita মাছের চাহিদা অনেক বেশি।
শ্রেণিবিন্যাসগত অবস্থান (Systemic position)
Phylum : Chordata
Subphylum : Vertebrata
Class : Osteichthyes
Subclass : Actinopterygii
Order : Cypriniformes
Family : Cyprinidae
Genus : Labeo
Species : L. rohita

স্বভাব ও বাসস্থান (Habit & Habitat): স্বাদু পানির জলাশয় বিশেষ করে পুকুর, হ্রদ, নদী, খাল, বিল, হাওর-বাওর প্রভৃতিতে Labeo rohita পাওয়া যায়। রুই মাছ তৃণভোজী স্বভাবের। দুই থেকে তিন বছর বয়সে এরা যৌন পরিপক্কতা লাভ করে। জুন-জুলাই মাসে প্রবাহমান জলাশয়ে এরা ডিম পাড়ে। হালদা নদী রুই মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে গণ্য। বর্তমানে হ্যাচারী বা মৎস্য খামারে প্রণোদিত প্রজননের মাধ্যমে রুই মাছের বাণিজ্যিক চাষ করা হয়। রুই মাছ ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মায়ানমার ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে পাওয়া যায়।

রুই মাছের বাহ্যিক গঠন (External structure of L. rohita) : রুই মাছের দেহ মাকু সদৃশ (Spindle shaped) অর্থাৎ মধ্যভাগ মোটা ও দুই প্রান্ত ক্রমশ সরু, প্রস্থ থেকে উচ্চতা বেশি। চলনের সময় পানির ভিতর গতি বাধাপ্রাপ্ত হয় না বলে এ ধরনের আকৃতিকে স্ট্রিমলাইনড (Streamlined) বলে। দেহের পৃষ্ঠভাগ কালো বর্ণের এবং পার্শ্ব অঙ্কভাগ রূপালি সাদা বর্ণের। পূর্ণাঙ্গ রুই মাছ ১৫-২৫ কেজি ওজন বিশিষ্ট হয়। রুই মাছের দেহকে মস্তক বা মাথা (Head), ধড় বা দেহকাণ্ড (trunk), লেজ বা পুচ্ছ (tail) এ তিন ভাগে ভাগ করা হয়। চিত্র ২.১০.১ : খ. ৎড়যরঃধ এর বাহ্যিক গঠন

মাথা (Head): দেহের অগ্রপ্রান্ত হতে কানকুয়ার পশ্চাৎ প্রান্ত পর্যন্ত অংশকে মস্তক বলে। উদর থেকে মস্তকের উপরিভাগ বেশি উত্তল। থুঁতনী (snout) ভোঁতা, নিচু, কদাচিত স্ফীত। মুখ নিচের দিকে অবস্থিত, আড়াআড়িভাবে বিস্তৃত। মুখছিদ্রের পিছনে কোনো পাতা (eye lids) নেই, কর্নিয়া স্বচ্ছ চামড়ার আস্তরণ দ্বারা আবৃত থাকে। মুখের উপরের চোয়ালে একজোড়া খাটো ও সরু বার্বেল অবস্থিত। এদেরকে ম্যাক্সিলারি বার্বেল (maxillary barbel) বলে। এরা সংবেদী অঙ্গ হিসেবে কাজ করে। মস্তকের প্রতিপার্শ্বে একটা বৃহৎ ফুলকা প্রকোষ্ঠ থাকে। এতে চিরুনীর ন্যায় চারটি ফুলকা থাকে। ফুলকা প্রকোষ্ঠটি কানকুয়া (operculum) নামে পরিচিত। কানকুয়ার নিচের কিনারায় ব্রাঙ্কিওস্টিগাল (branchiostegal) পর্দা ফুলকা প্রকোষ্ঠের বড় ছিদ্রকে ঢেকে রাখে।

দেহকাণ্ড (Trunk): মস্তক ও লেজের মধ্যবর্তী প্রশস্ত অংশটি দেহকাণ্ড। দেহকাণ্ড অস্থিময় সাইক্লয়েড আঁইশ দ্বারা নিবিড়ভাবে আবৃত থাকে। দেহকাণ্ডের উভয় পার্শ্বে একটি করে পার্শ্ব রেখা (Lateral line) দেহের দৈর্ঘ্য বরাবর লেজ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। দেহকাণ্ডের পৃষ্ঠ দিকে একটি পৃষ্ঠ পাখনা (Dorsal fin) পার্শ্বদিকে কানকুয়ার পিছনে একজোড়া বক্ষ পাখনা (pectoral fin), দেহকাণ্ডের মাঝামাঝি একজোড়া শ্রোণি পাখনা (pelvic fin) ও লেজ সংলগড়ব পায়ু পাখনা (anal fin) থাকে। দেহকাণ্ডের পিছনের দিকে মধ্যঅঙ্কীয় দিকে তিনটি ছোট ছিদ্র পর পর অবস্থান করে থাকে। ছিদ্রগুলো হলো- পায়ুছিদ্র, জননছিদ্র ও রেচনছিদ্র।

লেজ (Tail): রই মাছের পায়ুর পিছনের অংশকে লেজ বলে। লেজকে পরিবৃত্ত করে পুচ্ছ পাখনা (caudal) থাকে। পুচ্ছ পাখনা হোমোসার্কাল (homocercal) প্রকৃতির অর্থাৎ দুটি সমখণ্ডকে বিভক্ত। পুচ্ছ পাখনাই রুই মাছের একমাত্র চলন অঙ্গ।

আঁইশ (Scale): রুই মাছের দেহত্বক অস্থিময় কতগুলো পাত সদৃশ্য গঠন দ্বারা আবৃত থাকে, এদেরকে আঁইশ বলে। রুই মাছের দেহ সাইক্লয়েড আঁইশ (Cycloid scale) দ্বারা আবৃত থাকে। এগুলো সাধারণত গোলাকার ও রূপালী বর্ণের হয়ে থাকে। আঁইশের কেন্দ্রস্থলে ফোকাস রেখা থাকে। আঁইশের কেন্দ্রস্থলকে ফোকাস বলে। আঁইশের কেন্দ্রকে ঘিরে ঘন সন্নিবিষ্ট কতগুলো রেখা থাকে। এগুলোকে সার্কুলি (circuli) বলে। আঁইশে সার্কুলিগুলোর মাঝে গাঢ় বর্ণের বৃদ্ধি রেখা অর্থাৎ অ্যানুলি (একবচনে অ্যানুলাস) থাকে, যেগুলোর সংখ্যা প্রতিবছর একটি করে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এগুলো গণনা করে মাছের বয়স নির্ধারণ করা হয়। রাসায়নিকভাবে আঁইশগুলো চুন ও কোলাজেন তন্তু নিয়ে গঠিত। এরা চলনের সময় পানির বাধা হ্রাস করে। তাছাড়া শ্রেণিবিন্যাস ও বয়স নির্ণয়ে এরা ভূমিকা রাখে।

শিক্ষার্থীর কাজ: আঁইশের মাধ্যমে রুই মছের বয়স নির্ণয় করুন।

সারসংক্ষেপ
অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় যে সমস্ত অস্থিবিশিষ্ট মাছ মিঠাপানিতে বাস করে, যাদের একের অধিক শ্বসন অঙ্গ থাকে না এবং যাদের মাথা আঁশবিহীন তাদেরকে কার্প জাতীয় মাছ বলে। রুই মাছের দেহকে মাথা, দেহকা- ও লেজ এ তিন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। রুই মাছে মোট পাঁচ ধরনের পাখনা রয়েছে, যথাÑ বক্ষ পাখনা, শ্রোণি পাখনা, পৃষ্ঠীয় পাখনা, পায়ু পাখনা ও পুচ্ছ পাখনা।
পাঠোত্তর মূল্যায়ন-২.১০
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন

১. কোনটি দেখে মাছের বয়স নির্ণয় করা যায়?
ক. ফোকাস
খ. অ্যানুলাস
গ. সারকুলাস
ঘ. রেডিই

২. রুই মাছ কোন বর্গের অন্তর্গত?
ক. Cypriniformes
খ. Siluriformes
গ. Rajiformes
ঘ. Perciformes

৩. রুই মাছের ক্ষেত্রে-
i. রুই মাছের আঁইশকে সাইক্লয়েড আঁইশ বলে।
ii. রুই মাছ মাংসাশী।
iii. রুই মাছে ৫ ধরনের পাখনা রয়েছে।
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ. ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii

পাঠ- ২.১১ খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাস এবং রক্ত সংবহনতন্ত্র


শিখনফল -
♦ রুই মাছের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে বলতে পারবেন।
♦ রুই মাছের রক্ত, হৃদপি-, অলিন্দ, নিলয় তথা রক্ত সংবহনতন্ত্র ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
♣ প্রধান শব্দ স্বভাব, শাকাশী, অলিন্দ, নিলয়, পোর্টাল শিরাতন্ত্র, ডর্সাল অ্যাওটা

খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাস (Food and eating habit): রুই মাছ শাকাশী। এরা সাধারণত জলাশয়ের মধ্যস্তরে খাবার খায়। ছোট অবস্থায় রুই মাছের প্রধান খাদ্য হচ্ছে Zooplankton এবং বয়স্করা Phytoplankton খেয়ে বাঁচে। রুই মাছের মুখ কিছুটা নিচের দিকে নামানো এবং ঠোঁট পুরু থাকার কারণে মাঝে মাঝে এরা পানির তলদেশ থেকে পঁচা জৈব পদার্থ খেয়ে জীবনধারণ করে। এছাড়া ফিসমিল (Fish meal), খৈলের গুঁড়া, কুঁড়া ইত্যাদি পুকুরে চাষের সময় সম্পূরক খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বয়স্ক রুই মাছ মাঝে মাঝে কাঁদা ও বালি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

রুই মাছের রক্ত সংবহনতন্ত্র (Blood circulatory system of Labeo rohita): প্রাণিদেহের যেসব অঙ্গ প্রত্যঙ্গের পারস্পরিক সহযোগিতায় রক্ত, খাদ্যসার, হরমোন, রেচন বর্জ্য ইত্যাদি দ্রব্য দেহের বিভিন্ন কোষে পরিবাহিত হয় তাকে রক্ত সংবহনতন্ত্র বলে। রক্ত, হৃদপিণ্ড, ধমনিতন্ত্র, শিরাতন্ত্রের সমন্বয়ে Labeo-র রক্ত সংবহনতন্ত্র গঠিত।

১। রক্ত (Blood) : রক্তরস (plasma) ও রক্ত কণিকা (blood corpuscles) নিয়ে রুই মাছের রক্ত গঠিত। রক্ত কণিকা দু ধরনের যথা- ডিম্বাকৃতির নিউক্লিয়াসযুক্ত লোহিত রক্ত কণিকা (RBC) এবং অ্যামিবয়েড লিউকোসাইডযুক্ত শ্বেত রক্ত কণিকা (WBC)। রুই মাছের রক্ত লাল বর্ণের।

২। হৃদপিণ্ড- (Heart) : রুই মাছের হৃদপিণ্ড ফুলকাদ্বয়ের পিছনে পেরিকার্ডিয়াল গহ্বর (Pericardial cavity) নামক একটি বিশেষ প্রোকোষ্ঠে আবৃত থাকে। পেরিকার্ডিয়াম নামক শক্ত আবরণে হৃদপিণ্ডটি আবৃত থাকে। রুই মাছের হৃদপিণ্ড তিনটি প্রকোষ্ঠে বিভক্ত। যথা- সাইনাস ভেনোসাস (sinus venosus), অ্যাট্রিয়াম বা অলিন্দ (atrium or auricle) এবং ভেন্ট্রিকল বা নিলয় (ventricle)। সাইনাস ভেনোসাস পাতলা প্রাচীর বিশিষ্ট প্রকোষ্ঠ যা হৃদপিণ্ডের পৃষ্ঠদেশে অবস্থিত। শিরাসমূহের CO2 অ্যাট্রিয়াম হৃদপিণ্ডের বৃহত্তম প্রকোষ্ঠ। এর প্রাচীরও পাতলা। এটি একদিকে সাইনাস ভেনোসাস অন্যদিকে অ্যাট্রিও ভেন্ট্রিকুলার ছিদ্রপথে ভেন্ট্রিকলে উন্মুক্ত। পেরিকার্ডিয়াম গহ্বরে অঙ্কীয় পশ্চাৎ দেশে ভেন্ট্রিকল অবস্থিত। এর প্রাচীর পুরু ও মাংসল। এর গহ্বর নিয়ত এবং একটি ছিদ্রপথে বাল্বাস আর্টারিওসাস নামক প্রকোষ্ঠে যুক্ত হয়। এ ছিদ্রে দুটি অর্ধ চন্দ্রাকৃতি কপাটিকা থাকে। ফলে এদের হৃদপিণ্ডের মধ্য দিয়ে রক্ত কেবল একমুখী প্রবাহে প্রবাহিত হয়।

৩। ধমনিতন্ত্র (Arterial system) : যেসব রক্ত বাহিকার মাধ্যমে O2 যুক্ত রক্ত সারা দেহে প্রবাহিত হয় তাকে ধমনিতন্ত্র বলে। রুই মাছের ধমনিতন্ত্র প্রধানত অন্তর্বাহী ব্রাঙ্কিয়াল- ধমনি (afferent branchial arteries), বহির্বাহী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনি (efferent branchial arteries), ডর্সাল অ্যাওর্টা ও এর শাখা প্রশাখা নিয়ে গঠিত। চিত্র ২.১১.১ : রুই মাছের হৃদপিণ্ড

(ক) অন্তর্বাহী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনি (Afferent branchial artery) : যে সব ধমনি হৃদপিণ্ড হতে ফুলকার দিকে CO2 সমৃদ্ধ রক্ত বহন করে তাকে অন্তর্বাহী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনি বলে। হৃদপিণ্ডের বাল্বাস অ্যাওটার সম্মুখ ভাগ থেকে যে দৃঢ় প্রাচীর বিশিষ্ট ধমনি উৎপন্ন হয় তাকে ভেন্ট্রাল অ্যাওর্টা বলে। এটি গলবিলের অঙ্কীয় দিক দিয়ে হাইওয়েড আর্চ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। ভেন্ট্রাল অ্যাওটার প্রতিপাশ থেকে চারটি করে মোট চার জোড়া অন্তর্বাহী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনি বের হয়। প্র ম জোড়া ধমনি প্র ম ফুলকা জোড়ায় প্রবেশ করে। অনুরূপভাবে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ জোড়া ধমনি যথাক্রমে ২য়, ৩য় ও ৪র্থ ফুলকা জোড়ায় প্রবেশ করে। এরা CO2 সমৃদ্ধ রক্ত ফুলকায় সরবরাহ করে।

(খ) বহির্বাহী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনি (Efferent branchial artery): যেসব ধমনি ফুলকা হতে O2 সমৃদ্ধ রক্ত দেহের বিভিন্ন অংশে পরিবহন করে তাকে বহির্বাহী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনি বলে। রুই মাছের চারজোড়া ফুলকা থেকে চার জোড়া বহির্বাহী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনির সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ প্রতিটি ফুলকা আর্চে একটি করে অন্তর্বাহী ও বর্হিবাহী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনি থাকে। প্রথম বহির্বাহী ধমনি অঙ্কীয়দেশে হাইওয়েড আর্চের সিউডোব্রাঙ্কে রক্ত বহন করে এবং সিউডোব্রাঙ্কের সম্মুখে অপথ্যালমিক ধমনি বিস্তৃত হয় ও চোখে রক্ত প্রেরণ করে। প্রতি পাশের প্র ম ও দ্বিতীয় বহির্বাহী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনি মিলিত হয়ে একটি অনুদৈর্ঘ্য ল্যাটারাল অ্যাওর্টায় পরিণত হয়। তৃতীয় ও চর্তু বহির্বাহী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনি একত্রিত হয়ে ল্যাটারাল অ্যাওর্টায় পরিণত হয়। ল্যাটারাল অ্যাওর্টা সম্মুখে ক্যারোটিড ধমনিরূপে বিস্তৃত হয় এবং করোটিতে রক্ত সরবরাহ করে। দু’পাশের ল্যাটারাল অ্যাওর্টা পশ্চাতে একীভূত হয়ে ডর্সাল অ্যাওর্টা গঠন করে।

(গ) ডর্সাল অ্যাওর্টা (Dorsal aorta): ডর্সাল অ্যাওর্টা দেহের পৃষ্টদেশে মেরুদণ্ডের নিচ দিয়ে সম্মুখ হতে পশ্চাৎ পর্যন্ত অর্থাৎ লেজ পর্যন্ত প্রসারিত থাকে। ইহা বিভিন্ন শাখা ধমনি সৃষ্টির মাধ্যমে বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত সরবরাহ করে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শাখা ধমনি হচ্ছে সিলিয়াক ও মেসেনটারিক ধমনি, সাবক্ল্যাভিয়ান ধমনি, প্যারাইটাল ধমনি, রেনাল ধমনি, কডাল ধমনি। চিত্র ২.১১.২ : রুই মাছের অন্তর্বাহী ও বহির্বাহী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনিতš ¿

৪। শিরাতন্ত্র (Venous system): যে সকল রক্তনালিকা সাধারণত দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে CO2 সমৃদ্ধ রক্ত হৃদপিণ্ডে নিয়ে আসে তাকে শিরা বলে। শরীরের সম্মুখ অংশের অ্যান্টেরিয়র কার্ডিনাল শিরা চুক্ষগোলক, নাসা ও হাইওয়েড অঞ্চল থেকে রক্ত সংগ্রহ করে এবং ইনফিরিয়র জুগুলার শিরা নি¤ড়বচোয়ালের পার্শ্বদেশ এবং ফুলকা থলিসমূহের অঙ্কীয়দেশ হতে রক্ত সংগ্রহ করে ডাক্টাস ক্যুভিয়ে উন্মুক্ত হয় এবং ডাক্টাস ক্যুভিয়ে হৃদপিণ্ডের সাইনাস ভেনোসাসে মুক্ত হয়। সাবক্লেভিয়ান শিরা দেহের দুই পাশের বক্ষ পাখনা হতে রক্ত সংগ্রহ করে সরাসরি সাইনাস ভেনোসাসে মুক্ত হয়। দেহের পশ্চাৎ অংশ ও পৌষ্টিকতন্ত্রের বিভিন্ন অংশ থেকে সৃষ্ট বিভিন্ন শিরা সম্মিলিত ভাবে হেপাটিক পোর্টাল শিরা গঠন করে যার মাধ্যমে রক্ত যকৃতে যায় এবং যকৃতে প্রবেশ করে শাখায়িত হয়ে রক্ত জালকের সৃষ্টি করে। লেজ হতে মধ্য পুচ্ছক শিরা (cardinal vein) রক্ত সংগ্রহ করে। এটি দেহকা- অঞ্চলে ডান ও বাম অংশে দ্বিধাবিভক্ত হয়। ডান শাখাটি ডান পশ্চাৎ কার্ডিনাল শিরা নামে সামনের দিকে অগ্রসর হয় এবং বাম শাখাটি রেনাল পোর্টাল শিরা হিসেবে বৃক্কে (kidney) প্রবেশ করে এবং কৌশিক জালিকার সৃষ্টি করে। বৃক্ক থেকে বাম পশ্চাৎ কার্ডিনাল শিরা উৎপন্ন হয়ে সম্মুখ দিকে বিস্তৃত হয়। ডান ও বাম পশ্চাৎ কার্ডিনাল শিরাদ্বয়কে আড়াআড়িভাবে যুক্তকারী অনেকগুলো শাখা আছে যাদেরকে ট্রান্সভার্স অ্যানাসটোমোসিস (Transverse anastomosis) বলে।

শিক্ষার্থীর কাজ অ্যাফারেন্ট ও ইফারেন্ট ব্রাঙ্কিয়াল ধমনিসমূহের ২টি পার্থক্য লিখুন

সারসংক্ষেপ
কেবল CO2 সমৃদ্ধ রক্ত বহন করে বলে মাছের হৃদপিণ্ডকে শিরা হৃদপিণ্ড বলে। অন্তর্বাহী ও বহির্বাহী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনি নিয়েই রুই মাছের ধমনিতন্ত্র গঠিত। যে সব শিরা দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে উৎপন্ন হয়ে সরাসরি হৃদপিণ্ডে না পৌঁছে অন্য কোন অঙ্গ প্রবেশ করে এবং জালিকা গঠন করে তাকে পোর্টাল শিরাতন্ত্র বলে। রুই মাছের প্রধান শ্বসনঅঙ্গ হলো চার জোড়া ফুলকা।

পাঠোত্তর মূল্যায়ন-২.১১

বহু নির্বাচনি প্রশ্ন

১. অন্তবার্হী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনি কত জোড়া?
ক. ১
খ. ২
গ. ৩
ঘ. ৪

২. রুই মাছের হৃদপিণ্ড কয়টি প্রকোষ্ঠে বিভক্ত?
ক. ২
খ. ৩
গ. ৩
ঘ. ৪

৩. রুই মাছের হৃদপিণ্ড গঠনকারী প্রকোষ্ঠগুলো হলো-
i. atrium
ii. Ventricle
iii. Sinus venosus
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ. ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii চিত্র ২.১১.৩ : অস্থিময় মাছের শিরাতন্ত্র

পাঠ- ২.১২ শ্বসনতন্ত্র ও প্রজনন (প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম)



শিখনফল –
♦ রুই মাছের শ্বসনতন্ত্র সম্পর্কে বলতে পারবেন।
♦ বায়ু লি বর্ণনা করতে পারবেন।
♦ রুই মাছের জীবনচক্র ব্যাখ্যা করতে পারবেন।

♣ প্রধান শব্দ ফুলকা রেকার, পটকা, পেলাজিক ডিম, ব্রাঙ্কিয়াল আর্চ

রুই মাছের শ্বসনতন্ত্র (Respiratory system of L. rohita): যে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের উপস্থিতিতে কোষ মধ্যস্থ খাদ্য জারিত হয়ে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও পানি উৎপন্ন হয় এবং খাদ্যের স্থিতিশক্তি তাপ ও গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হয় তাকে শ্বসন বলে। দেহে যেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শ্বসনকাজে অংশগ্রহণ করে তাদের একত্রে শ্বসনতন্ত্র বলে। বর্তমানে এ তন্ত্রকে গ্যাস বিনিময় তন্ত্র (Gases exchange system) বলে।
রুই মাছ একটি অস্থিময় মাছ। জলজ প্রাণী হওয়ায় রুই মাছ পানিতে দ্রবীভূত O2 গ্রহণ করে। চার জোড়া ফুলকা (gill) এ মাছের শ্বসন অঙ্গ। প্রতিটি ফুলকা কানকো (operculum) দ্বারা আবৃত থাকে। এরা গলবিলের দুইপাশে দুটি ফুলকা প্রকোষ্ঠে অবস্থান করে। গলবিলের পার্শ্বপ্রাচীরে পাঁচ জোড়া ফুলকা ছিদ্র থাকে। দুটি ফুলকা ছিদ্রের মধ্যবর্তী গলবিলের প্রাচীর অস্থি দ্বারা গঠিত যাকে ফুলকা আর্চ (gill arch) বলে। এদের মধ্যে চারটি ফুলকা আর্চ একটি করে ফুলকা বহন করে। পঞ্চম আর্চ কোন ফুলকা বহন করে না। হাইওয়েড আর্চের হ্রাসপ্রাপ্ত (vestigial) ফুলকা বা সিউডোব্রাঙ্কিয়া (pseudobranchia) কানকোর ভিতরের দিকে একটি চাকের মত লেগে থাকে। এতে মাত্র এক সারি ফুলকা ফিলামেন্ট (gill filament) থাকে। ফুলকা আর্চের ভিতরের দিকে গলবিল প্রাচীর থেকে কয়েকটি ভাঁজের মত সৃষ্টি হয়। এদেরকে ফুলকা রেকার (gill raker) বলে। ফুলকা রেকারগুলো ফুলকাগুলোকে কঠিন বস্তুর ঘর্ষণ থেকে রক্ষা করে। চিত্র ২.১২.১: খধনবড় র (ক) বামপাশের ফুলকা; (খ) ফুলকা-সূত্রের সাধারণ গঠন, (গ) একটি ফুলকা-সূত্রের লম্বচ্ছেদ।

ফুলকার গঠন (Structure of gill): প্রতিটি ফুলকা দুই সারি ফুলকা ল্যামেলা বা ফিলামেন্ট (gill lamella or filament) বহন করে। এগুলো ভিতরের দিকে (proximally) ব্রাঙ্কিয়াল আর্চের সাথে যুক্ত থাকে। প্রত্যেক সারি ফুলকা ল্যামেলাকে হেমিব্রাঙ্ক বা ডেমিব্রাঙ্ক (Hemibranch or demibranch) বলে। দুই সারি হেমিব্রাঙ্কের মধ্যে হ্রাস প্রাপ্ত ইন্টারব্রাঙ্কিয়াল পর্দা থাকে। যার ফলে হেমিব্রাঙ্কের ডগাগুলো মুক্ত থাকে। প্রতিটি ফুলকা ল্যামেলা অনেকগুলো ছোট ছোট আড়াআড়িভাবে সাজানো পাত বা প্লেট বহন করে। এ পাতগুলো পাতলা এপিথেলিয়াম পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে এবং দেহের ভিতরে রক্তনালিকার কৈশিকজালিকা বিস্তৃত থাকে। পাতগুলো একপাশ দিয়ে অন্তর্বাহী (afferent) ও অপর পাশ দিয়ে বহির্বাহী (efferent) রক্ত নালিকা (ধমনি) বিস্তৃত হয়। চিত্র ২.১২.২ : রুই মাছের ফুলকার অভ্যন্তরীণ গঠন

শ্বসন কৌশল (Mechanism of respiration): প্রত্যেকটি জীবের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন অক্সিজেন। রুই মাছের শ্বসনক্রিয়া শ্বাসগ্রহণ (Inspiration) ও শ্বাসত্যাগ (Expiration) এ দুই ধাপে সম্পন্ন হয়। এ ক্ষেত্রে ফুলকা প্রকোষ্ঠ চোষণ পাম্প (Suction pump) হিসেবে কাজ করে। এর ফলে অন্তর্বাহী ধমনি (afferent artery) দিয়ে হৃদপিণ্ড থেকে CO2 সমৃদ্ধ রক্ত ফুলকায় প্রবেশ করে। ফুলকায় অবস্থিত কৈশিক জালক থেকে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় CO2 পানিতে নির্গত হয় এবং পানি থেকে দ্রবীভূত O2 ফুলকার কৈশিক জালকে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে। এ O2 সমৃদ্ধ রক্ত তখন বহির্বাহী (efferent artery) ধমনির মাধ্যমে সারাদেহে ছড়িয়ে পড়ে। চিত্র ২.১২.৩ : খধনবড়-র শ্বসন কৌশল

বায়ুলি বা পটকা (Air bladder / swim bladder): রুই মাছের বায়ুলি বা সাঁতার থলি বা পটকা একটি পাতলা প্রাচীর বিশিষ্ট থলি বিশেষ। এটি পৌষ্টিক নালির পৃষ্ঠীয় প্রাচীর থেকে উৎপত্তি লাভ করে। এটি দেখতে চকচকে এবং এর ভিতরে বিভিন্ন ধরনের গ্যাস যেমন- O2, N2, CO2 বিদ্যমান থাকে। রুই মাছের বায়ুলি দু’ প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট যথা সম্মুখ ও পশ্চাৎ কক্ষ। সম্মুখ কক্ষটি ছোট এবং পশ্চাৎ কক্ষটি বড়। দুটি কক্ষের মাঝখানে একটি গভীর খাঁজ রয়েছে। বায়ুলির সম্মুখ কক্ষ একটি সরু নুম্যাটিক ডাক্ট (pneumatic duct) দ্বারা অন্ননালির সম্মুখে পৃষ্ঠীয় অঞ্চলে যুক্ত হয়। চিত্র ২.১২.৪: রুই মাছের বায়ুলি

বায়ুথলির কাজ
১. বায়ুলি প্লবতা রক্ষাকারী অঙ্গ (Hydrostatic organ) হিসেবে কাজ করে।
২. শব্দ সৃষ্টি করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
৩. পানিতে দ্রবীভূত O2-এর ঘাটতি দেখা দিলে বায়ুলিতে বিদ্যমান গ্যাস সে ঘাটতি পূরণ করে মাছের শ্বসন কাজে সহায়তা করে।
৪. এটি মাছের আপেক্ষিক গুরুত্ব নিয়ন্ত্রণ করে পানির নিচে বিভিন্ন গভীরতায় মাছকে স্থির রাখতে সহায়তা করে।
৫. বায়ুলির এক অংশের গ্যাস অন্য অংশে স্থানান্তর করার মাধ্যমে মাছ পানিতে দেহের মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্র রক্ষা করে।

রুই মাছের প্রজনন ও জীবনচক্র (Reproduction and life cycle of L. rohita)
প্রজনন (Reproduction): রুই মাছ দুবছর বয়সে জননক্ষম হয়ে ওঠে। প্রকৃতিতে উপযুক্ত পরিবেশ ছাড়া রুই মাছ প্রজনন করে না। কোন বদ্ধ জলাশয়ে রুই মাছের স্পনিং (Spawning) বা ডিম ত্যাগ ঘটে না। স্রোতযুক্ত নদীর পানিতে, খাল, প্লাবনভূমি ইত্যাদিতে এরা ডিম ছাড়ে। সাধারণত স্ত্রী মাছ ৫১-৭০ সে.মি. এবং পুরুষ মাছ ৬৫ সে.মি. লম্বা হলে প্রজননের জন্য প্রস্তুত হয়। এক প্রজনন ঋতুতে ৩৫ লক্ষ ডিম দেয়। তবে গড়ে প্রতিটি পূর্ণবয়ষ্ক মাছে প্রায় ১ লক্ষ করে ডিম থাকে। সাধারণত জুলাই আগস্ট মাসে রুই মাছ প্রজননে অংশ নেয়। এরা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। চিত্র ২.১২.৫ : রুই মাছের রেচন জননতন্ত্র

নিষেক (Fertilization): শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনের ফলে জাইগোট উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াকে নিষেক বলে। ভরা বর্ষায় যখন নদীতে প্রবল স্রোত থাকে এবং আবহাওয়া মেঘলা আর মুষলধারে বৃষ্টি হয় তখন রুই মাছ নদীর অগভীর অংশে ঝাঁক বেঁধে ডিম ছাড়তে উদ্বুদ্ধ হয়। প্রজননের সময় নদীর পানির তাপমাত্রা ২৭-৩০ সেলসিয়াস হয় এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে O2 থাকে। নদীর পানিতে প্রচুর পরিমাণে ভাসমান জৈব ও অজৈব কণা থাকার কারণে পানি ঘোলা হয়ে যায়। পানির ঘোলাটে অবস্থায় রুই মাছ প্রচণ্ড ছুটাছুটি করে। অধিকাংশ কঠিনাস্থি মাছের ডিম পানির উপরে ভেসে থাকে। এদেরকে পেলাজিক ডিম বলে। কিন্তু রুই মাছের ডিম পানির তলায় ডুবে যায়। এ ধরনের ডিমকে ডিমারসাল ডিম বলে। প্রজননের সময় পুরুষ মাছ স্ত্রী মাছকে অনুসরণ করে। স্ত্রী মাছ প্র মে পানিতে ডিম (egg) ছাড়লে পুরুষ মাছ তার উপর বীর্য (sperm) ছড়িয়ে দেয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে নিষেক সম্পন্ন হয়। রুই মাছের নিষেক দেহের বাইরে নদীর পানিতে সম্পন্ন হয় বলে একে বহিঃনিষেক (External fertilization) বলে।

জীবন চক্র (Life cycle) : রুই মাছ একলিঙ্গিক। নিষেকের পর ডিম জাইগোটে (2n) পরিণত হয়। জাইগোট পরবর্তীতে বিভাজিত হয়ে মরুলা, ব্লাস্টুলা ও গ্যাস্ট্রুলা দশায় পরিণত হয়। গ্যাস্ট্রুলা দশা পরবর্তীতে লার্ভা দশায় পরিণত হয়। এ লার্ভা দশা পরবর্তীতে রেণু পোনা (Hatchlings), ধানী পোনা (Fry), আঙ্গুরী পোনা (Fingerlings) য় পরিণত হয়। ২৫ দিন বয়সী পোনাটিকে পুর্ণাঙ্গ মাছের সকল বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। এসময় পোনার মুখের দু’পাশে স্পর্শী (Barbel) সুস্পষ্ট হয় এবং দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩০ মি. মি. হয়। এভাবে রুই মাছ সাধারণত দেড় থেকে দুই বছর বয়সে যৌন পরিপক্কতা লাভ করে।

শিক্ষার্থীর কাজ রুই মাছের ফুলকার লম্বচ্ছেদ অঙ্কন করে এর বিভিন্ন অংশ চিহ্নিত করুন এবং ক্লাসে উপস্থাপন করুন

সারসংক্ষেপ
চার জোড়া ফুলকা রুই মাছের প্রধান শ্বসন অঙ্গ। রুই মাছের মেরুদ-ের নিচে এবং পৌষ্টিকনালির উপরে যোজক টিস্যুতে গঠিত পাতলা প্রাচীর বিশিষ্ট থলিটির নাম বায়ুলি বা পটকা। এ বায়ুলিই রুই মাছকে ভাসিয়ে রাখতে সহায়তা করে থাকে। অধিকাংশ কঠিনাস্থি মাছের ডিম পানির উপরে ভেসে থাকে। এদেরকে পেলাজিক ডিম বলে। কিন্তু রুই মাছের ডিম পানির তলায় ডুবে যায়। এ ধরনের ডিমকে ডিমারসাল ডিম বলে।

পাঠোত্তর মূল্যায়ন-২.১২
বহু নির্বাচনি প্রশড়ব

১. রুই মাছের বায়ুলিতে কোন গ্যাস থাকে নাÑ
ক. O2
খ. N2
গ. CO2
ঘ. H2

২. রুই মাছ কোথায় প্রজনন করে?
ক. পুকুরে
খ. নদীতে
গ. মোহনায়
ঘ. খাল-বিলে
৩. নিচের বৈশিষ্ট্যগুলো পড়–নÑ
i. রুই মাছে বহিঃনিষেক ঘটে।
ii. রুই মাছে দুই জোড়া ফুলকা থাকে।
iii. রুই মাছের ডিমকে ডিমারসাল ডিম বলে।
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ. ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii চিত্র ২.১২.৬ : রুই মাছের জীবনচক্র

পাঠ- ২.১৩ ব্যবহারিক- রুই/টাকি মাছের রক্ত সংবহনতন্ত্র ব্যবচ্ছেদ, পর্যবেক্ষণ এবং চিহ্নিত চিত্র অঙ্কন



পরীক্ষণের নাম: রুই মাছের রক্ত সংবহনতন্ত্র ব্যবচ্ছেদ, পর্যবেক্ষণ এবং চিহ্নিত চিত্র অঙ্কন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি: কাঁচি, নিডল (সুই), আলপিন, ডাইসেকটিং ট্রে, চিমটা, ব্লেড, পেনসিল, ড্রইং খাতা।

১। অন্তর্বাহী বা অ্যাফারেন্ট ব্রাঙ্কিয়াল ধমনি ব্যবচ্ছেদ: একটি সদ্য মৃত রুই মাছকে চিৎ করে ট্রেতে রেখে পায়ুছিদ্র থেকে শুরু করে ওষ্ঠের আগ পর্যন্ত কাঁচি দিয়ে কেটে দেহ বিহবর উন্মুক্ত করতে হবে। অঙ্কীয়দেশে দেহত্বক ও পেশি সাবধানে কেটে ফেলতে হবে যাতে কোন রক্তনালি কেটে রক্ত বেরিয়ে না পড়ে। বক্ষীয় অংশ উন্মুক্ত করলেই সাদা রং-এর পেরিকার্ডিয়াম পর্দা দ্বারা আবৃত হৃদপিণ্ড দেখা যাবে। পেরিকার্ডিয়াম পর্দা অপসারণ করে হৃদপিণ্ডকে উন্মুক্ত করতে হবে। অতঃপর হৃদপিণ্ডের সম্মুখ প্রান্তে অবস্থিত ভেন্ট্রাল অ্যাওর্টা (অঙ্কীয় মহাধমনি) দেখা যাবে। এ মহাধমনি থেকে উভয় পাশে চারটি করে অন্তর্বাহী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনি প্রসারিত হয়ে ফুলকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। পেশি পর্দা ও ফুলকা ঝিল্লী পরিষ্কার করলে এগুলো স্পষ্ট দেখা যাবে। এখন এর বিভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষণ, শনাক্ত ও খাতায় চিহ্নিত চিত্র আঁকতে হবে।

চিত্র ২.১৩.১: Labeo-র অন্তর্বাহী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনিতন্ত্র

২। বহির্বাহী বা ইফারেন্ট ব্রাঙ্কিয়াল ধমনি ব্যবচ্ছেদ: অন্তর্বাহী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনি শনাক্তকরণের পর রুই মাছের মুখ গহ্বরের এক পাশের ফুলকা ও অপারকুলাম কেটে ফেলতে হবে। হৃদপি-ের পিছনে গলবিলের নিচের দিকে আড়াআড়িভাবে কেটে মুখগহ্বরকে উন্মুক্ত করতে হবে। এরপর সাবধানে মুখ গহ্বরের ছাদের ঝিল্লী অপসারণ করলে ডর্সাল অ্যাওর্টা (পৃষ্ঠীয় মহাধমনি) দেখা যাবে। পশ্চাৎ দিক থেকে ডর্সাল অ্যাওর্টা অনুসরণ করে সম্মুখ দিকে অগ্রসর হলে বহির্বাহী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনিগুলো পাওয়া যাবে। এখন এর বিভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষণ ও শনাক্ত করে খাতায় চিহ্নিত চিত্র আঁকতে হবে।

চিত্র ২.১৩.২ : Labeo-র বহির্বাহী ব্রাঙ্কিয়াল ধমনিতন্ত্র

পাঠ- ২.১৪ রুই মাছের প্রাকৃতিক সংরক্ষণ

রুই মাছ বাংলাদেশের অতি পরিচিত ও সুস্বাদু মাছ। রুই মাছ Cyprinidae গোত্রভুক্ত প্রজাতি। এ গোত্রভুক্ত মাছগুলোকে সাধারণত কার্প জাতীয় মাছ বলে। রুই মাছ ছাড়াও বাংলাদেশে কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস জাতীয় কার্প মাছ পাওয়া যায়। কিন্তু বিভিন্ন হ্যাচারীতে চাষের কারণে সীমিত ও নির্দিষ্ট মাছের মধ্যে অন্তঃপ্রজননের ফলে জিনগত বৈচিত্র্য বিনষ্ট হয়। রোগাক্রান্ত মাছের আধিক্য দেখা যায়। এছাড়া নদী ভরাট করা, নদীর প্রবাহ পরিবর্তিত হওয়া, হাওরবাওর, খাল, বিল ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়ার কারণে এ সম্পদ আজ হুমকির সম্মুখীন। এ সম্পদকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে এবং এর যথাযথ যতড়ব নিতে হবে। নিম্নে রুই মাছকে প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষণের বিষয়টি আলোচনা করা হলো-

১। হালদা নদী সংরক্ষণ: চট্টগ্রামের হালদা নদী এশিয়ার বৃহত্তম একটি প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র। হালদা নদীর বৈশিষ্ট্য হলো এটি এমন একটি নদী যা বাংলাদেশে উৎপত্তি হয়ে বাংলাদেশে পতিত হয়েছে। হালদা নদীকে মা মাছের মেটারনিটি ক্লিনিকও বলা হয়ে থাকে। হালদা নদী থেকেই রুই জাতীয় মাছ, যেমন রুই, মৃগেল, কাতলা, কালিবাউস মাছের ডিম সরাসরি সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হালদা নদীর ঐতিহ্য আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন নদী দূষণ, হালদা নদী সংলগড়ব এলাকায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে শিল্প কারখানা গড়ে ওঠা, হালদা নদীর অক্স বা বাঁকসমূহ কেটে মাছের প্রজনন বান্ধব পরিবেশ নষ্ট করা, সুইচগেট নির্মাণ, প্রজনন ঋতুতে নির্বিচারে ডিমওয়ালা বা ব্রুড মাছ ধরাসহ নানা মানবসৃষ্ট কারণে এ নদীতে রুই মাছের প্রজনন কমে গেছে। আশার কথা হলো সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার ২০০৭ সালে গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে হালদা নদীকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করেছে। এমতাবস্থায় সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে।

২। অভয়াশ্রম: নির্দিষ্ট প্রজাতির মাছ বছরের নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট প্রজনন ক্ষেত্রে বংশবৃদ্ধি করে থাকে। তাই অবাধ বিচরণ ও প্রজননের জন্য সুনির্দিষ্ট জলাশয় বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মাছের অভয়াশ্রম হিসেবে সরকার থেকে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা যেমন- হালদা নদীর মদুনা ঘাট এলাকা, বিলাইছড়ি এলাকাকে মৌসুমী অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। যেহেতু নির্দিষ্ট সময় ব্যতীত এ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো অরক্ষিত থাকে তাই কিছু মানুষ নিষেধ অমান্য করে সারা বছর মাছ ধরে থাকে। তাই এসব এলাকাগুলোকে কঠিন নজরদারির মধ্যে রেখে সারা বছর ব্যাপী অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করা দরকার।

৩। পোনা মজুদ: নদী-নালা, খাল-বিল অবৈধ ভাবে ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়ার কারণে মাছের উৎপাদন দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। বদ্ধ বিল ও জলাশয়ে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্য পোনা মজুদ করা দরকার। প্রতি বছরে জানুয়ারী থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত একবার ও জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত একবার মোট দুইবার রুই মাছের পোনা মজুদ করা যায়।

৪। পরিবেশ ব্যবস্থাপনা: হালদা নদী বাংলাদেশের একমাত্র জোয়ার ভাটার নদী যেখান থেকে মৎস্যচাষীরা পোনার বদলে রুই মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করে নিয়ে যান। হালদা নদীতে রুই মাছের বিশুদ্ধ জিন পাওয়া যায় তাই এ নদী সংরক্ষণ করা অত্যাবশ্যক। এছাড়া হালদা নদীর তীরবর্তী যেসব দূষণ সৃষ্টিকারী শিল্প-প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলো বন্ধ করতে হবে। অপরিকল্পিত বাঁধ ইত্যাদি নির্মাণ বন্ধ করতে হবে।
৫। জনসচেতনতা: প্রজননক্ষম মাতৃ রুই মাছের গুরুত্ব, মাছের জীবনচμ, মাছ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জ্ঞান সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। নির্দিষ্ট নিচের মাপের (সাধারণত ৮-৯ ইঞ্চি) কোন রুই মাছের পোনা যাতে বাজারে বিক্রি না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এছাড়া জলাশয়ের পাশের এলাকার জমিতে কীটনাশক ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কলকারখানার নিক্ষিপ্ত বর্জ্য যাতে সরাসরি জলাশয়ে মিশে জলাশয়ের পানিকে দূষিত করতে না পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে মৎস আইন সংশোধন করতে হবে এবং আইনের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষার্থীর কাজ রুই মাছ সংরক্ষণের জন্য একটি প্রস্তাবনা তৈরি করে গ্রুপে আলোচনা করুন।

সারসংক্ষেপ গত পঞ্চাশের দশকে দেশের মোট মৎস চাহিদার ৭০% পূরন করতো হালদা নদী। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে হালদা নদীতে মাছের উৎপাদন দিন দিন কমে যাচ্ছে। রুই মাছ চলমান পানি ছাড়া স্পনিং (spawning) করে না। তাই রুই মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদনের জন্য হালদা নদী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পাঠ- ২.১৫ ব্যবহারিক- কার্প জাতীয় মাছের ফুলকা ও বায়ুলি শনাক্তকরণ


পরীক্ষণের নাম: কার্প জাতীয় মাছের ফুলকা ও বায়ুলি শনাক্তকরণ।



প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি: কাঁচি, চিমটা, আলপিন, ব্লেড, ডাইসেকটিং ট্রে, নিডল (সুই), পেনসিল, ড্রইং খাতা।

১। ফুলকা ব্যবচ্ছেদ (Dissection of gill): প্রথমে একটি রুই মাছ বাম হাতে নিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুল ও তর্জনী দিয়ে মাথাটি শক্ত করে ধরতে হবে, ডান হাতে নেয়া ধারালো কাঁচির সাহায্যে কানকো অপসারণ করে ফুলকা প্রকোষ্ঠ উন্মুক্ত করতে হবে। পরে ফুলকা কেটে স্লাইডে নিয়ে এর বিভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষণ করবেন।
পর্যবেক্ষণ
১. লাল বর্ণের চারটি ফুলকা একটি বিশেষ ফুলকা প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ থাকে।
২. প্রত্যেকটি ফুলকা একেকটি অস্থিময় ব্রাঙ্কিয়াল আর্চ এ অবলম্বিত।
৩. ফুলকা আর্চের অন্তঃকিনারা প্রসারিত হয়ে কাঁটাযুক্ত পাতলা ফুলকা রেকার থাকে।
৪. প্রতিটি ফুলকা দুই সারি ফুলকা ফিলামেন্ট বা ফুলকা ল্যামিলা দিয়ে গঠিত।

চিত্র ২.১৫.১: রুই মাছের ফুলকা

২। বায়ুলি ব্যবচ্ছেদ (Dissection of air bladder): একটি রুই মাছকে চিৎ করে ট্রের উপরে রেখে লেজ ও অপারকুলামের দিকে পিন দিয়ে আটকে দিতে হবে। একটি ধারালো স্কালপেলের সাহায্যে পেটের দিক থেকে ছিদ্র করে লম্বালম্বি ভাবে পায়ু থেকে গলবিল পর্যন্ত কেটে মাংসপেশি ও ত্বক কেটে নিতে হবে। অন্ত্রের উপরের মিউকাস পর্দাটি চিমটা দিয়ে ধীরে ধীরে পরিস্কার করে অন্ত্রের প্যাচ খুলে পিন দিয়ে আটকে দিতে হবে। পরিপাকতন্ত্রের অন্যান্য অংশগুলো অপসারণ করলে অন্ননালির সাথে সংযুক্ত বায়ুলি বা পটকা দেখা যাবে।
পর্যবেক্ষণ
১. বায়ুলিটি বায়ুপূর্ণ ও দেখতে চকচকে সাদা থলের মত।
২. বায়ুলিটি দুই প্রকোষ্ঠে বিভক্ত এবং এ প্রকোষ্ঠ দুটির মাঝে গভীর ভাঁজ বিদ্যমান।
৩. সম্মুখ প্রকোষ্ঠটি পশ্চাৎ প্রকোষ্ঠের তুলনায় আকারে ছোট এবং একটি বায়ুনালি (নুম্যাটিক ডাক্ট) দ্বারা অন্ননালির সাথে যুক্ত থাকে।

চিত্র ২.১৫.১ : রুই মাছের বায়ুলি


what image shows

জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি

ড. মোহাম্মদ আবুল হাসান

গাজী সালাহউদ্দিন সিদ্দিকী