জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র

(দ্বাদশ শ্রেণি)

(HSC Biology 2nd Paper )


what image shows

মানবসমাজ বাসস্থান ও পরিবেশে থেকে নানা ধরনের রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য জীবাণুর সংস্পর্শে আসে। দেহের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এসব জীবাণুর বিভিন্ন পযার্য়ের দেহে প্রবেশকে প্রতিহত করে। দেহের সব রকম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা যা ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ও অন্যান্য জীবাণুর আক্রমণ থেকে মানুষকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে তার সম্পর্কে সংক্ষেপে এ ইউনিটে আলোচনা করা হয়েছে।

পাঠ-১০.১ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা


শিখনফল
♦ মানবদেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারবে।
প্রধান শব্দ ইমিউনিটি, লাইসোজাইম, ইন্টারফেরন

মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ, কলা ও কোষ নিয়মতান্ত্রিকভাবে একত্রে দেহের প্রতিরক্ষা (defence) ব্যবস্থাপনায় কোন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, পরজীবী ও অন্যান্য জীবাণুর আক্রমণ থেকে মানুষকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাকে বলা হয় ইমিউনিটি (immunity)। দেহের বিভিন্ন অঙ্গ, কলা ও কোষ সমন্বয়ে গঠিত যে তন্ত্র দেহকে রোগাক্রমণের হাত থেকে এবং রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে রক্ষা করে তাকে ইমিউন তন্ত্র (immune system) বলা হয়। রোগ প্রতিরোধে ইমিউনিটির প্রধান উদ্দেশ্য তিন প্রকারের। যথা-
১। অণুজীবদের (microorganisms)বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা,
২। দেহের ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলোকে শনাক্ত করা ও প্রতিস্থাপিত করা এবং
৩। পরিত্যক্ত বা নষ্ট কোষগুলোকে শনাক্ত করা এবং তাদের ধ্বংস করা।মানবদেহে প্রধাণত লিস্ফয়েড অঙ্গ ও শ্বেত রক্ত কণিকাগুলো দেহের প্রতিরক্ষার কাজে অংশ গ্রহণ করে থাকে। ইমিউন তন্ত্রের লিস্ফয়েড অঙ্গগুলো প্রাথমিক বা মুখ্য ও গৌন অঙ্গ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।


১। প্রাথমিক বা মুখ্য লিস্ফয়েড অঙ্গ (Primary lymphoid organs)
ক. লসিকা গ্রন্থি (Lymph nodes): লসিকা বহনকারী লসিকানালির স্বল্প ব্যবধানে বহু গোলাকার বা ডিম্বাকার স্ফীত অংশ থাকে, এদের লসিকা গ্রন্থি বা লসিকা পর্ব বলে। দেহের প্রায় সর্বত্র বিস্তৃত, তবে ঘাড়ে, বগলে, কুঁচকিতে লসিকা গ্রন্থির পরিমাণ বেশি।
খ. লসিকা (Lymph): লসিকা বর্ণহীন ও রক্তের ন্যায় এক ধরনের যোজক কলাবিশেষ। লসিকানালির মধ্য দিয়ে ঈষৎ ক্ষারধর্মী যে তরল যোজক কলা বা লসিকা প্রবাহিত হয় তাই লসিকা।
গ. লসিকানালি (Lymphatic vessels): দেহের সর্বত্র বিস্তৃত নালিকা যেগুলো লসিকা পরিবহন করে।
ঘ. থাইমাস গ্রন্থি (Thymus gland): শ্বাসনালির পিছনে অবস্থিত গ্রন্থি।
ঙ. অস্থিমজ্জা (Bone marrow): অস্থি গহ্বরে অবস্থিত লোহিত বর্ণের নরম ও চর্বিযুক্ত কলা।

২। গৌন লিস্ফয়েড অঙ্গ (Secondary lymphoid organs):
ক. প্লিহা (Spleen): উদর গহ্বরে পাকস্থলীর পাশে অবস্থিত লালচে বর্ণের মুষ্ঠি আকারের গঠন।
খ টনসিল (Tonsils): গলার পিছনের দিকে অবস্থিত দুটি ডিম্বাকার গঠন।
গ. পেয়ার প্যাচ (Peyer’s patches): ক্ষুদ্রান্ত্রে বিদ্যমান বিশেষ ধরনের লসিকা কলা।

দেহের রোগ মুক্তিতে ইমিউন তন্ত্র রস নির্ভর ও কোষ নির্ভর সহজাত প্রতিরক্ষা সৃষ্টি করে। ইমিউন তন্ত্র দেহের রস নির্ভর সহজাত প্রতিরক্ষায় অংশগ্রহণ করে।
১। কমপ্লিমেন্ট- ১১টির বেশী সিরাম প্রোটিনের সমন্বয়ে জীবাণু সংক্রমন রোধে কাজ করে।
২। লাইসোজাইম- ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীর ধবংস করে।
৩। ইন্টারফেরন- এক ধরনের প্রোটিন যা ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি ব্যাহত করে।

ইমিউন তন্ত্র সহজাত ও অর্জিত প্রতিরক্ষায় অংশগ্রহণকারী কোষগুলো-
১। দেহের বিভিন্ন ধরনের শ্বেত রক্তকণিকা কোষগুলো সহজাত প্রতিরক্ষায় জড়িত। সেগুলো হলো-
ক. গ্রানুলার লিউকোসাইট (Granular leukocytes): রক্তে অবস্থিত নিউট্রোফিল, ইওসিনোফিল ও বেসোফিল।
খ. মনোনিউক্লিয়ার ফ্যাগোসাইট (Mononuclear phagocytes): দু’রকমের দেখা যায়। যথা- মনোসাইট এবং ম্যাক্রোফেজ। মনোসাইট রক্তে অবস্থিত এক প্রকার শ্বেতকণিকা। এরা ফ্যাগাসাইটোসিস পদ্ধতিতে দেহে প্রবিষ্ট রোগজীবাণুকে ধ্বংস করে। ম্যাক্রোফেজ (macrophage) কোষ বিভিন্ন রকমের হয়। যথা- যকৃতের কুফার কোষ, অ্যালভিওলার ম্যাক্রোফেজ (alveolar macrophage), অস্টিওক্লাস্ট (osteoclast), যকৃতের মেসেঞ্জিয়াল কোষ (meessengial cell), মস্তিষ্কের মাইক্রোগিড়য়াল কোষ (microglial cell) ইত্যাদি।
গ. নাল কোষ (Null cell): বিশেষ ধরনের লিস্ফোসাইট বা কিলার সেল বা ন্যাচারাল কিলার সেল (N.K. cell) নামে পরিচিত।

২। দেহের যেসব কোষ অর্জিত প্রতিরক্ষায় জড়িত সেগুলো হলো-
ক. B-লিস্ফোসাইট (B-lymphocyte) কোষ অ্যান্টিবডির মাধ্যমে রস নির্ভর প্রতিরক্ষা সৃষ্টি করে।
খ. T-লিস্ফোসাইট (T-lymphocyte) অ্যান্টিবডির মাধ্যমে কোষ নির্ভর প্রতিরক্ষা দিয়ে থাকে।


সারসংক্ষেপ

মানব দেহের বিভিন্ন অঙ্গ, কলা ও কোষ নিয়মতান্ত্রিকভাবে একত্রে দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনায় কোন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, পরজীবী ও অন্যান্য জীবাণুর আক্রমণ থেকে মানুষকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাকে বলা হয় ইমিউনিটি। রোগ প্রতিরোধে ইমিউনিটির প্রধান উদ্দেশ্য তিন প্রকারের। ইমিউন তন্ত্রের লিস্ফয়েড অঙ্গগুলো প্রাথমিক ও গৌন অঙ্গ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রাথমিক বা মুখ্য লিস্ফয়েড অঙ্গ- লসিকা গ্রন্থি, লসিকা, লসিকানালি, থাইমাস গ্রন্থি ও অস্থিমজ্জা। গৌন লিস্ফয়েড অঙ্গ- প্লিহা, টনসিল ও পেয়ার প্যাচ।

পাঠ-১০.২ প্রতিরক্ষার স্তরসমূহ


শিখনফল
♦ মানবদেহের প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর হিসেবে ত্বকের কাজ বিশ্লেষণ করতে পারবে।
♦ খাদ্যদ্রব্যের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করার ক্ষেত্রে পরিপাক নালীর এসিড ও এনজাইমের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে পারবে।
♦ ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসে ম্যাক্রোফেজ (Macrophage) ও নিউট্রোফিল (Neutrophil) এর ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে পারবে।

প্রধান শব্দ: মেলানিন, ম্যাক্রোফেজ

আমাদের চারপাশে রয়েছে অসংখ্য জীবাণুর বসবাস। এ জীবাণুদের মধ্যে একটি অংশ আমাদের দেহে রোগ সৃষ্টি করে থাকে। অসংখ্য জীবাণুদের মাঝে বসবাস করেও আমরা কিন্তু সুস্থ থাকি। কারণ আমাদের দেহে রয়েছে তিন স্তরের রোগ প্রতিরোগ ব্যবস্থা। রোগজীবাণু কিংবা পরজীবী আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য মানবদেহে সাধারণভাবে তিন ধরনের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা লক্ষ করা যায়।


প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর

এ প্রতিরক্ষার প্রথম স্তরে নিম্নলিখিত উপাদানগুলো জীবাণু প্রতিরোধ করে থাকে-

১। ত্বক (Skin): ত্বক দেহে অণুজীব প্রবেশের প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। ত্বকীয় গ্রন্থি নিঃসৃত ঘাম ও তৈল ব্যাকটেরিয়ার জন্য বিষস্বরূপ। তাকে বিদ্যমান মিথোজীবী অণুজীব সংক্রামক অণুজীব প্রতিরোধ করে।

২। সিলিয়া ও মিউকাস (Cilia and Mucus):
শ্বাসনালিতে বিদ্যমান সিলিয়া ও মিউকাস অবিরাম ধূলিকণা ও অণুজীবদের হাঁচি (sneezing)) ও কাশির (Coughing)) মাধ্যমে বের করে দেয়।

৩। এসিড (Acid) :
পাকস্থলীতে বিদ্যমান হাইড্রোক্লোরিক এসিড (HCl) খাদ্যের সঙ্গে আগত বিভিন্ন অণুজীব ধ্বংস করে। যোনিতে বিদ্যমান মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া ল্যাকটিক এসিড উৎপন্ন করে অণুজীবের সংক্রমণ রোধ করে।

৪। লাইসোজাইম এনজাইম (Lysozyme enzyme):
লালা, অশ্রু, মূত্র ও ঘামে বিদ্যমান লাইসোজাইম এনজাইম দেহে আগত অধিকাংশ ক্ষতিকর অণুজীব ধ্বংস করে।

৫। রক্ত জমাট (Blood clotting):
ক্ষতস্থানে দ্রুত রক্ত তঞ্চন ঘটে দেহে অণুজীব প্রবেশ রোধ করে। সিলেবাস অন্তর্ভুক্ত এই প্রতিরক্ষা স্তরে দেহের ত্বক, পরিপাকনালির এসিড এবং এনজাইমের ভূমিকা উল্লেখ করা হলো-

প্রতিরক্ষায় ত্বকের ভূমিকা-
ত্বক প্রথম স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। ত্বক দেহকে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি এবং প্রভাবে সৃষ্ট রোগ (ক্যান্সার) হতে দেহকে রক্ষা করে। ত্বকের এপিডার্মিসের কোষে মেলালিন (melanine)) জাতীয় পদার্থ সৃষ্টি হয় যা অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে। ত্বক দেহের বাইরের স্তরে দৃঢ় ও কেরাটিনাইজড (keratinized) আবরণী তৈরি করে, যা দেহের সকল বাহ্যিক অংশকে আচ্ছাদিত করে এবং ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে একটি ফলপ্রসূ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। দেহত্বক ছিঁড়ে গেলে বা কেটে গেলে ত্বকে অবস্থিত হিস্টিওসাইট (ম্যাক্রোফেজ) জীবাণু ধ্বংস করে দেহকে প্রতিরক্ষা দান করে। ঘাম ও তৈল গ্রন্থির নিঃসরণ ত্বকের উপরিভাগের pH-কে অম্লীয় (pH= 3-5) করে তোলে, ফলে অণুজীবসমূহ বেশি সময় ত্বকে বেঁচে থাকতে পারে না। কিছু সংখ্যক উপকারী ব্যাকটেরিয়া ত্বকে অবস্থানকালে এসিড ও বিপাকীয় বর্জ্য নিঃসরণ করে, যা অণুজীবের সংখ্যাবৃদ্ধিকে বাঁধা দেয়। ঘাম নিঃসৃত লবণ ও ফ্যাটি এসিডে অবস্থিত লাইসোজাইম (lysozyme) ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীরকে ধ্বংস করে। অশ্রুগ্রন্থি নিঃসৃতেও লাইসোজাইম থাকে যারা চোখে জীবাণুর সংক্রমণ প্রতিহত করে।

খাদ্যদ্রব্যের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসে পরিপাকনালির এসিড ও এনজাইমের ভূমিকা-
লালারসের লাইসোজাইম এনজাইম খাদ্য-পানীয়তে উপস্থিত ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে। লালারসের অবিরাম ক্ষরণে মুখের অভ্যন্তরে বা দাঁতে খাদ্যকণা সঞ্চিত হতে পারে না, ফলে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে। আর যেসব ব্যাকটেরিয়া লালারস দ্বারা ধ্বংস হয় না তারা পাকস্থলী থেকে নিঃসৃত HCl এসিড দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। পাকস্থলীরসে অতি অল্পমাত্রায় বিদ্যমান লাইসোজাইমও ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে থাকে।


দ্বিতীয় প্রতিরক্ষা স্তর

শ্বেত রক্তকণিকা থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন ধরনের ফ্যাগোসাইটিক কোষ (ম্যাক্রোফেজ, নিউট্রোফিল ইত্যাদি), প্রদাহ সৃষ্টিকারী সাড়া (inflammatory response) ও দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রভৃতি দেহে দ্বিতীয় স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে।


ফ্যাগোসাইটিক কোষ-
দেহের প্রথম স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কোনো কারণে অকার্যকর হয়ে পড়লে ব্যাকটেরিয়া ত্বকের ক্ষতস্থান দিয়ে দেহে প্রবেশের সুযোগ পায়। এক্ষেত্রে ক্ষতস্থানের সূক্ষ্ম রক্তনালিকাগুলোর প্রসারণের ফলে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। কৈশিক জালিকার ভেদ্যতা বৃদ্ধির ফলে ফ্যাগোসাইটগুলো (ম্যাক্রোফেজ, নিউট্রোফিল, মনোসাইট ইত্যাদি) আন্তঃকোষীয় ফাঁকে বের হয়ে আসে এবং অনুপ্রবেশকৃত ব্যাকটেরিয়াকে গলাধঃকরণ করে।


প্রদাহ সৃষ্টিকারী সাড়া-
সংক্রমিত স্থানে উৎপন্ন পুঁজ (pus) হচ্ছে রক্তরসে অবস্থিত মৃত কোষ, নিষ্ক্রিয় ব্যাকটেরিয়া ও ফ্যাগোসাইটের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ। ফ্যাগোসাইটোসিসের (phagocytosis) পরিণতি প্রকাশ পায় যখন সংক্রমণের স্থানটি গাঢ় লাল বর্ণের হয়ে স্ফীত হয়। রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ত্বকের ওই অঞ্চলে লালচে ভাব ফুটে ওঠে। লসিকাবাহিত ব্যাকটেরিয়া ও ফ্যাগোসাইট লসিকা গ্রন্থিতে ব্যাকটেরিয়াগুলোকে গলাধঃকরণের মাধ্যমে নিষ্কাষিত করে। লিম্ফোসাইট ও ক্ষতিগ্রস্থ কলা নিঃসৃত হিস্টামিন (histamin) এরপ প্রভাবে রক্তের কৈশিক জালিকা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং প্রদাহ সৃজনক্ষম প্রতিক্রিয়া (inflammatory response) দেখা যায়।


দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি-
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেহের বৃদ্ধিপ্রাপ্ত তাপমাত্রা হচ্ছে অণুজীব ও শ্বেতকণিকার মধ্যকার সংঘর্ষের বহিঃপ্রকাশ। এ ধরনের প্রদাহ অধিকতর বিস্তৃত এবং একে Systemic reaction বলে। উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর শুধু জীবাণুর বৃদ্ধিকে প্রতিহত করে তা নয়, কখনো কখনো এরা আসলে দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও ক্রিয়াশীল করে তোলে বটে, অবশ্য যদি না তা অতিরিক্ত পর্যায়ের অসুবিধা ঘটায়। এক্ষেত্রে দুটি কারণে জ্বর হয়ে থাকে। প্রথমত রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীব দ্বারা নিঃসৃত বিষক্রিয়া, দ্বিতীয়ত পাইরোজেন নামক রাসায়নিক পদার্থ (fever producing substance) যা শ্বেতকণিকা থেকে নিঃসৃত হয়ে থাকে।


ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসে ম্যাক্রোফেজ ও নিউট্রোফিলসের ভূমিকা
মাক্রোফেজ (Macrophage)- ম্যাক্রোফেজ বিশেষ প্রকার শ্বেতকণিকা, যা মনোসাইট (monocyte) থেকে উৎপন্ন হয়। মনোসাইট রক্তের বাইরে বৃহদাকার ধারণ করে ম্যাক্রোফেজে পরিণত হয়। রেটিকিউলো এন্ডোথেলিয়াল সিস্টেম (Reticulo-endothelial system) বা মনোনিউক্লিয়ার ফ্যাগোসাইট সিস্টেমের (Mononuclear phagocyte system)ভিতর (যেমন- অস্থিমজ্জা, যকৃৎ, প্লিহা, লিষ্ফ নোড ও সাইনাসের ভিতর) ম্যাক্রোফেজ ঘুরে বেড়ায়। এমনকি ভ্রাম্যমাণ কোষ (wandering cells) হিসেবেও এরা কলার ভিতর বিচরণ করতে পারে। যেমন- কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ভিতর মাইক্রোগ্লিয়া (microglia), যকৃৎ রক্তনালির ভিতর কুফার কোষ (Kuffer cell), যোজক কলার মধ্যে আবদ্ধ হিস্টিওসাইট বিভিন্ন প্রকার ম্যাক্রোফেজ।


এধরনের কোষ, জীবাণুকে ফ্যাগোসাইটোসিস (phagocytosis) পদ্ধতিতে আত্মাসাৎ করে জীবাণু ধ্বংস করতে পারে। এটা ছাড়াও B ও T লিষ্ফোসাইটকে উদ্বুদ্ধ করে অনাক্রম্যতামূলক সক্রিয়তা সৃষ্টি করতেও সক্ষম। এ কারণে ম্যাক্রোফেজকে ইমিউনিটি সৃষ্টির প্রাথমিক উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়। ম্যাক্রোফেজগুলো প্রাথমিকভাবে দেহে প্রবিষ্ট জীবাণুকে ভক্ষণ করে ধ্বংস করে। তা ছাড়াও ইমিউনিটি সৃষ্টিতে এরা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। দেহত্বক ভেদ করে রোগ জীবাণু কোষ কলায় পৌঁছানো মাত্রই প্রতিক্রিয়া হিসেবে সেখানে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। ফলে দেহের বিভিন্ন জায়গা থেকে ধীরে ধীরে উক্ত প্রদাহস্থলে ম্যাক্রোফেজ এসে জড়ো হতে থাকে। ম্যাক্রোফেজ কর্তৃক উৎপাদিত প্রোটিন দু’ভাবে ব্যাকটেরিয়ার আকমণ প্রতিহত করে। যেমন-


(ক) ভৌত পদ্ধতিতে:
ম্যাক্রোফেজ ব্যাকটেরিয়ার দেহ প্রাচীরে গর্ত বা ছিদ্র করে ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলে।


(খ) ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায়:
যে প্রক্রিয়ায় শ্বেত রক্ত কণিকাসমূহ অণুজীব ভক্ষণ করে তাকে ফ্যাগোসাইটোসিস বলে। ম্যাক্রোফেজ ব্যাকটেরিয়ার দেহের বাইরের দিকে আঠার মতো লেগে থেকে অন্যান্য ম্যাক্রোফেজকে ফ্যাগোসাইটোসিসের জন্য আহ্বান জানাতে থাকে। ম্যাক্রোফেজ কর্তৃক ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু নিধন চারটি পর্যায়ক্রমিক ধাপে সম্পন্ন হয়।


১. কেমোট্যাক্সিস:
প্রথমে ম্যাক্রোফেজ কেমোট্যাক্সিস প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে আক্রান্ত স্থানে উপস্থিত হয়।


২. সংলগ্নীকরণ: অতঃপর ব্যাকটেরিয়া ও ম্যাক্রোফেজ নিকটবর্তী হয়ে পাশাপাশি অবস্থান করে। একে সংলগ্নীকরণ বলা হয়। ম্যাক্রোফেজের প্লাজমা আবরণীর কিছু রাসায়নিক গ্রাহক পদার্থ অণুজীবদের সাথে সংযুক্ত হয়ে ফ্যাগোসাইটিক প্রক্রিয়া শুরু করে।


৩. গ্রাসকরণ:
ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় ম্যাক্রোফেজ ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য রোগ জীবাণুকে দেহাভ্যন্তরে টেনে নেয় বা গ্রাস করে। অর্থাৎ এ সময়ে ম্যাক্রোফেজ অণুজীবের চারদিকে ক্ষণপদ সৃষ্টি করে এটিকে ঘিরে ফেলে এবং পরিশেষে ইনভ্যাজিনেশন প্রক্রিয়া সাইটোপ্লাজমের ভিতরে নিয়ে আসে। এ প্রক্রিয়াকে ইনজেশন বা গ্রাসকরণ বা ভক্ষণ বলে। দেহাভ্যন্তরে প্রবেশের পর জীবাণুর এ দশাকে ফ্যাগোসোম (phagosome) বলে।


৪. হত্যা ও পরিপাক:
ফ্যাগোসোম ম্যাক্রোফেজের সাইটোপ্লাজমে উপস্থিত লাইসোজাইম (lyozyme) এনজাইমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ফ্যাগোলাইসোজোম (phagolysome) তৈরি করে। ফ্যাগোলাইসোজোম তৈরি হওয়ায় ১০-৩০ মিনিটের মধ্যে উক্ত এনজাইমের প্রভাবে ব্যাকটেরিয়ার মৃত্যু ঘটে। অতঃপর মৃত ব্যাকটেরিয়ার অন্তঃকোষীয় পরিপাক (যেমনলাইেসাজাইম, লাইপেজ, নিউক্লিয়েজ ও গ্লাইকোলাইসিস প্রভৃতির ক্রিয়ার পরিপাক) সম্পন্ন হয় এবং অপাচ্য অংশ বাইরে নিষ্ক্রান্ত হয়।


ম্যাক্রোফেজের ইমিউনিটিতে সাড়াদান

ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় জীবাণু ভক্ষণ ছাড়াও ম্যাক্রোফেজ B ও T লিষ্ফোসাইটকে উদ্বুদ্ধ করে ইমিউনিটি মূলক সক্রিয়তা সৃষ্টি করতে সক্ষম। এ কারণে ম্যাক্রোফেজকে ইমিউনিটি সৃষ্টির প্রাথমিক উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়। আমাদের দেহের প্রতিটি কোষের প্লাজমা পর্দায় MHC (Major Histocompatibility Complex) নামক প্রোটিন থাকে। ম্যাক্রোফেজ নিজের MHC প্রোটিনের দেহের অন্যান্য কোষের MHC প্রোটিনের তুলনা সাপেক্ষে আপন কোষগুলোকে শনাক্ত করতে পারে।


বহিরাগত কোনো জীবাণু দেহে প্রবেশ করলে প্রোটিনের উপস্থিত সাপেক্ষে ম্যাক্রোফেজ তাদের চিনতে পারে। ভাইরাস ও অন্যান্য বহিরাগত বিষাক্ত পদার্থও এদের দ্বারা চিহ্নিত হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, MHC প্রোটিন MHC জিন দ্বারা সংশ্লেষিত হয় এবং আঙুলের ছাপের মতো একজনের MHC প্রোটিনের সঙ্গে অপরের প্রোটিনের কোনো মিল পাওয়া যায় না। বহিরাগত জীবাণু, পরজীবী কোষ বা ভাইরাস প্রভৃতি ম্যাক্রোফেজের সংস্পর্শে এলে ম্যাকোফেজ হতে ইন্টারলিউকিন-1 (interleukin-1) নামক প্রোটিন নিঃসৃত হয় এবং উহার প্রভাবে লিষ্ফোসাইট কোষগুলো উদ্বুদ্ধ হয়ে অনাক্রম্যতাজনিত সাড়া জাগায়। এছাড়া ম্যাক্রোফেজ কর্তৃক ভক্ষিত হয়ে জীবাণু পাচিত হলে উহার কিছু প্রোটিন (অ্যান্টিজেন) ম্যাক্রোফেজের প্লাজমা পর্দায় MHC প্রোটিনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে বাইরে উন্মুক্ত হয়। এ অবস্থায় এটি লিষ্ফোসাইট কর্তৃক চিহ্নিত হয় ও সক্রিয় হয়ে ওঠে।


নিউট্রোফিলস ইমিউনিটিতে সাড়াদান
নিউট্রোফিল মানবদেহের সহজাত রোগ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এক অত্যাবশ্যকীয় অংশ। মানুষের রক্তে যে শ্বেত রক্তকণিকা সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় তা হলো নিউট্রোফিল (৬০-৭০%)। নিউট্রোফিল প্রধাণত তিন ধরনের প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়া নিধন করে। যথা


১। ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায়:
ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে ফ্যাগোসাইটিক নিউট্রোফিলস কলাকোষের মধ্য দিয়ে দেহের যেকোনো অংশে প্রবেশ করতে পারে এবং ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে। এ কাজে লিষ্ফোসাইট থেকে নিঃসৃত হরমোন সৃদশ রাসায়নিক পদার্থ, যেমন- ইন্টারলিউকিন, লিউকোট্রিন প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব রাসায়নিক পদার্থকে সাইটোকাইনস (cytokines) বলে। সাইটোকাইনসের প্রভাবে রক্ত নালিকা প্রসারিত ও ছিদ্রময় হয়ে ওঠে। ফলে নিউট্রোফিল এসব ছিদ্র দিয়ে রক্ত জালিকায় অন্তরাবরণীয় আস্তরণের যেকোনো একটি সংযোগস্থলের মধ্য দিয়ে এ কোষগুলো মুহূর্তে তাদের প্রোটোপ্লাজমীয় ক্ষণপদ (pesudopodium) প্রবেশ করিয়ে দেয় এবং প্রোটোপ্লাজমের অর্ধতরল পদার্থকে ক্ষণপদের দিকে ঠেলে দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রান্ত হয়।
এ পদ্ধতিতে খুব কম সময়ের (প্রায় ১মিনিট) মধ্যেই অসংখ্য রক্ত কণিকা রক্ত প্রবাহ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। দেহের যে অংশে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে সেখানে পৌঁছেই তারা বিপদাপন্ন অঞ্চলকে ঘিরে ফেলে এবং ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে শুরু করে। প্রতিটি কোষ প্রায় ১৫-২০টি রোগ জীবাণু গ্রাস করতে সক্ষম। এদের জীবন্ত অবস্থায়ই তারা গ্রাস করে।


২। প্রোটিওলাইটিক এনজাইম দ্বারা:
ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে ব্যাকটেরিয়া ছাড়াও নিউট্রোফিল প্রোটিওলাইটিক এনজাইম (যেমন- লেকটোফেরিন, লাইসোজাইম, কোলাজিনেজ, ক্যাথিলিসিডিন ইত্যাদি) নিঃসরণ করে যা ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় গিলে ফেলা জীবাণুর (ফ্যাগোসোম) সঙ্গে মিশে গিয়ে ফ্যাগোলাইসোজোম তৈরি হয়, যেখানে রোগজীবাণু মারা পড়ে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।


৩। ভৌত পদ্ধতিতে :
এ পদ্ধতিতে নিউট্রোফিল রক্ত নালির মধ্যে DNA গঠনের অনুরূপ জালকাকৃতির এক ধরনের বহিঃকোষীয় ফাঁদ (Neutrophil Extracellular Traps-NETs) তৈরি করে ব্যাকটেরিয়াকে নিধন করে। নিউট্রোফিল, প্রোটিন (সিরাইন প্রোটিয়েজ) ও ক্রোমাটিনের সমন্বয়ে গঠিত উক্ত জালে ব্যাকটেরিয়া আটকা পড়ার পর সেখানেই তাদের মৃত্যু ঘটে। অর্থাৎ এ পদ্ধতি ভৌত উপায়ে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ প্রতিহত করে।


তৃতীয় প্রতিরক্ষা স্তর (Third line of defence)

ইমিউনিটি জনিত সাড়া (immune response) তৃতীয় স্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্গত এবং এটি নির্দিষ্টভাবে (In specific) প্রতিরক্ষা প্রদান করতে পারে। অর্থাৎ বিশেষ বিশেষ জীবাণু বা পরজীবীর বিরুদ্ধে কিংবা বিশেষ কোনো অ্যান্টিজেন প্রতিরোধের জন্য এই ব্যবস্থায় ভিন্ন রকমের প্রতিহত পন্থা দেখা যায়।


১। সহজাত ইমিউনিটি (inborn or innate or natural immunity):
যে ইমিউনিটি জন্মের সময় থেকে বংশ পরম্পরায় সঞ্চালিত হয় এবং দেহের সাধারণ ও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম, তাকে সহজাত ইমিউনিটি বলে। এ রকম ইমিউনিটি জন্মগত। এটি বিশেষ কোনো রোগ জীবাণুর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট নয়। এটি দেহের সাধারণ ও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা, যা জন্ম থেকেই রোগ বা জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকরী। উদাহরণ- ত্বক, মিউকাস পর্দা, পাকস্থলীর আম্লিক pH, ক্ষরিত লালারস, চোখের পানি, শ্বসনতন্ত্রের সিলিয়া, রক্ত কণিকা (ম্যাক্রোফেজ ও নিউট্রোফিল) প্রভৃতি দ্বারা এই ইমিউনিটি রোগ বা জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে।


২। জিনগত ইমিউনিটি (genetic immunity):
জিনগত গঠনের ভিত্তিতে এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা সৃষ্টি হয় বলে এটিকে বংশগত বা জিনগত ইমিউনিটি বলা হয়। এই ইমিউনিটি বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আংশিকভাবে বা জীবাণুর সম্পূর্ণভাবে পোলিও, হাম, কলেরা, আমাশয়, ভাইরাসজনিত পক্ষাঘাত, মাম্পস, সিফিলিস প্রভৃতিকে রোধ করতে পারে। শিক্ষার্থীর কাজ নিচের ছকে ম্যাক্রোফেজ ও নিউট্রোফিল-এর মধ্যকার পার্থক্যগুলো লিখুন। ম্যাক্রোফেজ নিউট্রোফিল


সারসংক্ষেপ
রোগ জীবাণু কিংবা পরজীবী আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য মানবদেহে সাধারণভাবে তিন ধরনের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা লক্ষ করা যায়। প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর- ত্বক, সিলিয়া ও মিউকাস, এসিড, লাইসোজাইম এনজাইম ও রক্ত জমাট। দ্বিতীয় প্রতিরক্ষা স্তর- শ্বেত রক্তকণিকা থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন ধরনের ফ্যাগোসাইটিক কোষ (ম্যাক্রোফেজ, নিউট্রোফিল ইত্যাদি), প্রদাহ সৃষ্টিকারী সাড়া ও দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রভৃতি দেহে দ্বিতীয় স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। ম্যাক্রোফেজ কর্তৃক উৎপাদিত প্রোটিন দু’ভাবে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ প্রতিহত করে। যেমন- ভৌত পদ্ধতি ও ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়া। ম্যাক্রোফেজ কর্তৃক ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু নিধন চারটি পর্যায়ক্রমিক ধাপে সম্পন্ন হয়। যথা- কেমোট্যাক্সিস, সংলগড়বীকরণ, গ্রাসকরণ ও হত্যা এবং পরিপাক। নিউট্রোফিলস প্রধাণত তিন ধরনের প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়া নিধন করে। যথা- ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়া, প্রোটিওলাইটিক এনজাইম দ্বারা ও ভৌত পদ্ধতি।

পাঠ-১০.৩ সহজাত ও অর্জিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা


সহজাত ইমিউনিটি প্রতিরোধ গড়ার পদ্ধতি- এ ধরনের ইমিউনিটি নিম্নলিখিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে-
১। আগ্রাসন ভোজন (Phagocytosis): রেটিকিউলো এন্ডোথেলিয়াল তন্ত্রের আগ্রাসন কোষ, রক্তের মনোসাইট, নিউট্রোফিল, যকৃতের ফুফার কোষ, সংযোগী কলার হিস্টিওসাইট, প্লিহা, লসিকাগ্রন্থি, থাইমাস গ্রন্থির জালককোষ সক্রিয় আগ্রাসন পদ্ধতিতে রোগ জীবাণু ধ্বংস করে। এ ছাড়া প্রদাহ স্থানে আগ্রাসক কোষ প্রবেশ করে স্বাভাবিক অনাক্রম্যতায় অংশগ্রহণ করে।
২। এসিড ও উৎসেচক: পাকস্থলীতে গৃহিত জীবাণু পাকস্থলীর হাইড্রোক্লোরিক এসিড ও পাচক উৎসেচক দ্বারা বিনষ্ট হয়।
৩। ত্বক ও শ্লেষ্মা ঝিল্লি: ত্বক তার কঠিন বহিঃস্তরের মাধ্যমে দেহে রোগ জীবাণু প্রবেশে বাধা প্রদান করে। নাসিকার মিউকাস স্তর রোগ জীবাণুকে মুখবিবরে লালার মধ্যে ঠেলে দেয়। তখন রোগ জীবাণু গলাধঃকৃত হয়ে পাকস্থলীতে আসে এবং এসিডের সংস্পর্শে বিনষ্ট হয়।
৪। রক্তস্থিত রাসায়নিক পদার্থ: রক্তের কিছু রাসায়নিক পদার্থ জীবাণু বিনাশে অংশগ্রহণ করে। যেমন
লাইেসাজাইম: এটি এক রকম মিউকোলাইটিক পলিস্যাকারাইড জাতীয় পদার্থ, যা ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে।
বেসিক পলিপেপটাইড: এই পদার্থটি কোনো কোনো গ্রাম-পজিটিভ ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে বিক্রিয়া করে ও তাদের নিষ্ক্রিয় ও বিনষ্ট করে।
প্রোপারডিন: এটি একটি বৃহদাকার প্রোটিন যা গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়াগুলো বিনষ্ট করে।
অ্যান্টিবডি: এরা রক্তের স্বাভাবিক অ্যান্টিবডি। অ্যান্টিজেনের উপস্থিতিতে এরা উৎপন্ন হয় এবং বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও প্রতিবিষকে ধ্বংস করে।
প্রাকৃতিক কিলার সেল: এরা এক ধরনের লিষ্ফোসাইট, এরা বিভিন্ড়ব বিজাতীয় কোষ, টিউমার কোষ প্রভৃতিকে বিনষ্ট করে।

সহজাত ইমিউনিটি-তন্ত্রের প্রধান কাজ- মেরদণ্ডী প্রাণীর দেহে সহজাত ইমিউনতন্ত্রের প্রধান কাজগুলো হলো-
১। সংক্রমণ স্থানে অনাক্রম্য কোষগুলোকে নিযুক্ত করে সাইটোকাইনস (cytokines)-এর মতো রাসায়নিক দূত উৎপাদন করা।
২। কমপ্লিমেন্ট তন্ত্রকে সক্রিয় করে ব্যাকটেরিয়াকে শনাক্ত করা এবং মৃত কোষ পরিস্কার করা।
৩। অঙ্গ, কলা বা লসিকাতে উপস্থিত বহিরাগত বস্তুগুলোকে বিশেষ শ্বেতরক্তকণিকা দিয়ে শনাক্ত করা ও বর্জন করা।
৪। অর্জিত ইমিউন তন্ত্রকে সক্রিয় করে তোলা।

অর্জিত ইমিউনিটি বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেসব ইমিউনিটি সহজাত নয়, জন্মের পর দেহে রোগ জীবাণু প্রবেশের ফলে সৃষ্টি হয় তাদের অর্জিত ইমিউনিটি বলে। এ রকম ইমিউনিটি প্রাণীর জন্মের পর অর্থাৎ প্রাণির জীবদ্দশায় অর্জিত হয়। কোনো ক্ষতিকর অণুজীব কিংবা ক্ষতিকর পদার্থের প্রভাবে বা অন্য কোনো কারণে দেহে এ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ দেহের প্রয়োজনে যে ইমিউনিটি আবির্ভাব ঘটে সেটাই হচ্ছে অর্জিত ইমিউনিটি। অর্জিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আবার নি¤েড়বাক্তভাবে ভাগ করা যায়-

১। নিয়ন্ত্রিত মাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে-
ক. কোষনির্ভর ইমিউনিটি বা কোষ নিয়ন্ত্রিত ইমিউনিটি (Cellular immunity or Cell mediated immunity)- দেহের যে ইমিউনিটি T-লিষ্ফোসাইট বা T-কোষের সাহায্যে ঘটে তাকে কোষভিত্তিক ইমিউনিটি বলে। এ ধরনের অর্জিত ইমিউনিটি T-শ্রেণির লিষ্ফোসাইট সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং অনুপ্রবিষ্ট রোগ জীবাণু ধ্বংস করে। লোহিত মজ্জা থেকে লিষ্ফোসাইট সৃষ্টিকারী কোষ থাইমাস গ্রন্থিতে প্রবেশ করে T-লিষ্ফোসাইটে পরিণত হয় এবং লসিকাগ্রন্থিতে আশ্রয় লাভ করে। দেহে অ্যান্টিজেন প্রবেশ করলে তাকে ম্যাক্রোফেজ গ্রাস করে। T-লিষ্ফোসাইট ম্যাক্রোফেজযুক্ত অ্যান্টিজেনকে গ্রহণ করে এবং লিষ্ফোকাইনিন এনজাইমের সাহায্যে তাদের ধ্বংস করে।
খ. রসভিত্তিক ইমিউনিটি বা হিউমোরাল ইমিউনিটি বা অ্যান্টিবডি নিয়ন্ত্রিত ইমিউনিটি (Humoral immunity or Antibody mediated immunity)- দেহে যে অনাক্রম্যতা B-লিষ্ফোসাইটের B-কোষ এর সাহায্যে ঘটে তাকে রসভিত্তিক ইমিউনিটি বলে। B-লিষ্ফোসাইট এ ধরনের ইমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত। রক্তে অ্যান্টিজেন প্রবেশ করার পর ইলিম্ফোসাইট তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়। অ্যান্টিজেনের প্রভাবে ই-লিষ্ফোসাইট কোষ ব্লাস্ট কোষে পরিণত হয় এবং ব্লাস্ট কোষ থেকে প্লাজমা কোষ তৈরি হয়। প্লাজমা কোষ অ্যান্টিবডি বা ইমিউনোগ্লোবিউলিন সৃষ্টি করে।

২। সক্রিয়তার ওপর নির্ভর করে-
(ক) সক্রিয় বা প্রত্যক্ষ ইমিউনিটি (Active immunity): মেরুদণ্ডী প্রাণিদেহে (যেমন- মানুষ) এমন কিছু ব্যবস্থা থাকে, যা দেহে জীবাণু অনুপ্রবেশের পরে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে জীবাণু ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এ ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় ইমিউনিটি অন্তর্ভুক্ত। এই অনাক্রম্যতার পরিচায়ক হচ্ছে ঞ-লিষ্ফোসাইট দ্বারা জীবাণু দমন কিংবা ই-লিষ্ফোসাইট কর্তৃক অ্যান্টিবডি ক্ষরণের মাধ্যমে জীবাণু দমন। এ ইমিউনিটি আবার দুই শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যথা-

১। প্রাকৃতিকভাবে লব্ধ সক্রিয় ইমিউনিটি (Naturally acquired active immunity): আমাদের দেহে কোনো রোগের জীবাণু প্রবেশ করলে তা অ্যান্টিজেন নামক পদার্থের প্রভাবে রক্তের ঞ ও ই-লিষ্ফোসাইট সক্রিয় হয়ে ওঠে। সক্রিয় লিষ্ফোসাইটগুলোর প্রভাবে ফ্যাগোসাইটোসিস (phagocytosis) প্রক্রিয়ায় জীবাণুর সংক্রমণ প্রতিহত হয়। তাছাড়াও সক্রিয় লিষ্ফোসাইটগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্মৃতিকোষ (memory cell) সৃষ্টি করে, যেগুলো রক্তের মধ্যে দীর্ঘদিন মজুদ থাকে ও ভবিষ্যতে আগের মতো জীবাণু দেহে প্রবেশ করলে তাদের সহজে ও দ্রুত দমন করে ফেলে।

২। কৃত্রিম উপায়ে লব্ধ সক্রিয় ইমিউনিটি (Artificially acquired active immunity): এ রকম ইমিউনিটি প্রতিষেধক প্রয়োগ দ্বারা (vaccination) সৃষ্টি করা যায়। ভ্যাক্সিন (vaccine) বা টিকা হলো নিষ্ক্রিয় জীবাণু বা অ্যান্টিজেন (attenuated antigens) দেহে ভ্যাক্সিন প্রয়োগ করলে, নিষ্ক্রিয় জীবাণু বা অ্যান্টিজেন কোনো রোগ সৃষ্টি করতে পারে না, কিন্তু অ্যান্টিজেনের সংস্পর্শে দেহের T ও B-লিষ্ফোসাইট সক্রিয় হয়ে ওঠে ও বিশেষ জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক সব ব্যবস্থাই জেগে ওঠে।
সক্রিয় ইমিউনিটির প্রধান বৈশিষ্ট্য
১। দেহে সরাসরি সক্রিয়ভাবে উৎপন্ন হয়।
২। সক্রিয় ইমিউনিটির প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
৩। এ ধরনের ইমিউনিটি নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি উৎপাদনের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় পরে উপশম ঘটে।
৪। এ ধরনের ইমিউনিটিতে কোনো পার্শ্বীয় প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না।


(খ) নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ইমিউনিটি (Passive immunity): এই প্রতিরক্ষা প্রাণী নিজ দেহে সক্রিয়ভাবে অ্যান্টিবডি সৃষ্টি না করে জীবাণু দমনের জন্য অন্য কোনো প্রাণী থেকে অ্যান্টিবডি লাভ করে। এ ধরনের অনাক্রম্যতা দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। যথা-

১। প্রাকৃতিগতভাবে লব্ধ পরোক্ষ/নিষ্ক্রিয় ইমিউনিটি (Artificially acquired passive immunity): মাতৃগর্ভে শিশু অমরার (placenta) মাধ্যমে মাতৃদেহ থেকে অ্যান্টিবডি (IgG) অর্জন করতে পারে ও এর সাহায্যে অপরিণত শিশু জীবাণুর সংক্রমণ প্রতিরোধে সক্ষম হয়। এটা ছাড়াও শিশু মাতৃদুগ্ধের মাধ্যমে (বিশেষতঃ কলোস্ট্রামের মাধ্যমে) IgG জাতীয় অ্যান্টিবডি প্রাপ্ত হয়। এটা শিশুর দেহে জীবাণু দমনে সহায়তা করে।

২। কৃত্রিম উপায়ে লব্ধ পরোক্ষ ইমিউনিটি (Artificially acquired passive immunity): এ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কৃত্রিম উপায়ে অন্য প্রাণীর দেহে রোগ জীবাণু প্রবেশ করিয়ে অনেক ক্ষেত্রে রোগ জীবাণু প্রতিরোধের জন্য প্রতিষেধক (vaccine) তৈরি করা হয়। এই প্রতিষেধক দ্বারা মানবদেহে রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়। এ প্রতিরোধ ব্যবস্থার উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জলাতঙ্ক প্রতিরোধের জন্য অ্যান্টির‌্যাবিজ (antirabies) প্রতিষেধকের ব্যবহার। সাম্প্রতিক সময়ে অধিক শক্তিশালী, নিরাপদ ও উন্নত প্রতিষেধক (vaccine) তৈরির চেষ্টা চলছে। যার একটি সাফল্য হচ্ছে- কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে হেপাটাইটিস ভাইরাসের (hepatiites virus) সফল ভ্যাকসিন প্রস্তুত।

নিষ্ক্রিয় ইমিউনিটির প্রধান বৈশিষ্ট্য
১। যে ইমিউনিটি দেহের বাইরে থেকে কোনো উপাদান দেহে প্রবেশ করিয়ে সৃষ্টি করা হয়, তাকে নিষ্ক্রিয় ইমিউনিটি বলে।
২। নিষ্ক্রিয় অনাক্রম্যতার প্রভাব স্বল্পস্থায়ী।
৩। এ ধরনের অনাক্রম্যতায় পার্শ্বীয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।

অর্জিত অনাক্রম্যতাতন্ত্রের প্রধান কাজ: মেরুদন্ডী প্রাণিদেহে অর্জিত অনাক্রম্যতাতন্ত্রের প্রধান কাজগুলো হলো-
১। বিশেষ কোষের মাধ্যমে জীবাণুর সংক্রমণ প্রতিরোধ করা।
২। একদা সংক্রমিত নির্দিষ্ট জীবাণুকে মনে রাখা ও পরবর্তীকালে সেই জীবাণুর আক্রমণকে প্রতিহত করা।
৩। জীবাণুর ভবিষ্যৎ আক্রমনের জন্য দেহকে প্রস্তুত রাখা।

পাঠ-১০.৪ প্রতিরক্ষায় অ্যান্টিবডি

উদ্দেশ্য এ পাঠ শেষে আপনি- * মানবদেহের প্রতিরক্ষায় অ্যান্টিবডি এর ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে পারবেন। * অ্যান্টিবডির প্রকারভেদ উল্লেখ করতে পারবেন। প্রধান শব্দ অ্যান্টিজেন, অ্যান্টিবডি, এনিটোপ

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অ্যান্টিবডির ভূমিকা
অ্যান্টিজেন (Antigen)- অ্যান্টিজেন হচ্ছে যেকোনো বিজাতীয় প্রোটিন বা পলিস্যাকারাইড, যা প্রাণিদেহে থাকে না। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা এদের নিঃসৃত বিষাক্ত পদার্থ অন্যদেহের প্রতিটি কোষে যে প্রোটিন রয়েছে তা নির্দিষ্ট প্রাণিদেহের জন্য অপরিচিত এবং এটিই অ্যান্টিজেন হিসেবে কাজ করে। একটি অ্যান্টিজেন প্রাণিদেহকে একটি নির্দিষ্টি অ্যান্টিবডি উৎপাদনে উদ্দীপ্ত করে। অ্যান্টিজেন শব্দটি Antibody generating এর সংক্ষিপ্ত রূপ। যে সব বিজাতীয় জীবাণু বা অধিবিষ দেহে প্রবেশ করলে অ্যান্টিবডি সৃষ্টি হয় তাদের অ্যান্টিজেন বলে।
অ্যান্টিজেনের বিশেষায়িত কিছু থাকে তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে ইমিউনো সাড়া (immunogenicity) সৃষ্টির ক্ষমতা থাকতে হবে এবং এরা অবশই non-self বা বহিরাগত বস্তু হবে। অধিকাংশই অ্যান্টিজেন প্রোটিনধর্মী ও জটিল গঠনবিশিষ্ট। এদের আণবিক ওজন সাধারণত ১০,০০০ ডাল্টনের অধিক। তবে অ্যান্টিজেন জটিল শর্করা অর্থাৎ বৃহদাকার পলিস্যাকারাইড বা বৃহদাকার লাইপোপ্রোটিন বা মিউকোপলিস্যাকারাইড বা গ্লাইকোপ্রোটিন বা নিউক্লিওপ্রোটিনও হতে পারে। অ্যান্টিজেন অ্যান্টিবডির সঙ্গে সংযুক্ত বা আবদ্ধ হতে পারে। অ্যান্টিজেনধর্মী জটিল প্রোটিনের যে অংশ অ্যান্টিবডির সঙ্গে সংযুক্ত হয় তাকে এনিটোপ (enitope) বা অ্যান্টিজেনিক ডিটারমিন্যান্ট (antigentic determinant) বা নির্ধারক বলে। কোনো কোনো অ্যান্টিজেনধর্মী প্রোটিনের বা একটি অ্যান্টিজেনের একাধিক এপিটোপ থাকতে পারে। কখনো কখনো বিশেষ ক্ষুদ্র রাসায়নিক অণু (যেমন- নানা ধরনের ওষুধ, ধূলাবালির রাসায়নিক উপাদান, নানা ধরনের শিল্পজাত রাসায়নিক পদার্থ, ত্বকের শুকনো আঁশের অপজাত পদার্থ, প্রাণীর খুশকিজাত পদার্থ প্রভৃতি) নিজে অ্যান্টিজেন না হলেও কোনো বৃহৎ প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অ্যান্টিজেনধর্মী হয়ে পড়ে ও অ্যান্টিবডির সঙ্গে আবদ্ধ হয়। এমন পদার্থকে বলা হয় হ্যাপ্টেন (hapten)। হ্যাপ্টেনগুলো বিশেষ প্রোটিনের ওপর এপিটোপ হিসেবে কাজ করে। [বি:দ্র: রক্ত গ্রুপের (blood group) ক্ষেত্রে, লোহিত রক্তকণিকার আবরণীতে বিদ্যমান বংশগতভাবে উৎপন্ন অ্যান্টিজেন পদার্থ, যা জেনেটিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং ভ্রূণ অবস্থায় উৎপন্ন হয়ে আজীবন অপরিবর্তিত থাকে । মানুষের রক্তে প্রধান তিন ধরনের অ্যান্টিজেন থাকে। যথা- A, B ও Rh]

অ্যান্টিজেনের বৈশিষ্ট্য
১। অ্যান্টিজেনের যে বিশেষ স্থানে অ্যান্টিবডি যুক্ত হয় তাকে অ্যান্টিজেনিক নির্ধারক স্থান (antigentic determinant site) অথবা এপিটোপ (epitope) বলে। এপিটোপ নির্দিষ্ট রাসায়নিক গ্রুপ থাকে যার সঙ্গে অ্যান্টিবডির অ্যান্টিজেন বাইন্ডিং সাইট (antigen binding site) বা প্যারাটোপ (paratop) যুক্ত হয়।
২। অ্যান্টিজেন নির্ধারক স্থানগুলোকে অন্য কথায় ভ্যালেন্স (valence) বলে; বেশিরভাগ অ্যান্টিজেনের অনেকগুলো অ্যান্টিজেন নির্ধারক স্থান থাকে বলে এগুলোকে মালটিভ্যালেন্ট (mutivallent) বলে।
৩। অ্যান্টিজেনের দুটি বিশেষ ক্ষমতা থাকে, যেমন (i) অনাক্রম্যতাকরণ (immunogenecity)- নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি উৎপাদনের ক্ষমতা; ও (ii) বিক্রিয়াকরণ (reactivity)- উৎপন্ন অ্যান্টিবডির সঙ্গে অ্যান্টিজেনের বিক্রিয়া করার ক্ষমতা। যেসব অ্যান্টিজেনের এই দুটি ক্ষমতা থাকে তাদের সম্পূর্ণ অ্যান্টিজেন (complete antigen) বলে। অ্যান্টিজেনের উদাহরণ- সমগ্র অণুজীব (microbs), যেমন- ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ইত্যাদি অ্যান্টিজেন হিসেবে কাজ করে; আবার অণুজীবের কয়েকটি উপাংশও অ্যান্টিজেন হিসেবে কাজ করে। ব্যাকটেরিয়ার কোনো অংশ, যেমন- ফ্ল্যাজেলা, ক্যাপসিউল ও কোষ প্রাচীর অ্যান্টিজেন হিসেবে কাজ করে অর্থাৎ অ্যান্টিজেনধর্মী (antigenic)। ব্যাকটেরিয়াঘটিত অধিবিষ (bacterial toxins) তীব্র অ্যান্টিজেনধর্মী। অণুজীব ছাড়া অন্যান্য পদার্থ, যেমন- ডিমের সাদা অংশ, ফুলের রেণু, গ্রহণ অযোগ্য রক্তকণিকা (incompatible blood cells), কলাকোষের এবং আন্তরযন্ত্রীয় অঙ্গের প্রতিস্থাপন (transplantation) ইত্যাদি অ্যান্টিজেনের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। অ্যান্টিজেনের প্রকারভেদ- অ্যান্টিজেন দু’রকমের হয়। যথা- এক্সোজেনাস (Exogenous) ও এন্ডোজেনাস (Endogenous)।

১। এক্সোজেনাস অ্যান্টিজেন (Exogenous antigen)- যে সব অ্যান্টিজেন প্রাণিদেহের বাইরে উৎপন্ন হয় তাদের এক্সোজেনাস অ্যান্টিজেন বলে। যেমন- পরাগ রেণু, দূষক পদার্থ, ভেষজ পদার্থ, রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ইত্যাদি।

২। এন্ডোজেনাস অ্যান্টিজেন (Enodogenous antigen)- যে সব অ্যান্টিজেন প্রাণিদেহের ভিতরে উৎপন্ন হয় তাদের এন্ডোজেনাস অ্যান্টিজেন বলে। যেমন- ইঁদুর, বিড়াল, ভেড়া, ঘোড়া প্রভৃতির লোহিত কণিকায় অবস্থিত ফরম্যান অ্যান্টিজেন (foreman antigen) স্তন্যপায়ী প্রাণীর হৃদপিণ্ডে অবস্থিত কার্ডিওলিপিন (cardiolipin) অ্যান্টিজেন এই রকমের অ্যান্টিজেন। এই প্রকার অ্যান্টিজেন বিভিন্ন রকমের হয়। যেমন-
ক. জেনোজেনিক অ্যান্টিজেন (Xenogenic antigen)- জাতিজনিগতভাবে পৃক প্রজাতির দেহে যে সব সমপ্রকৃতির অ্যান্টিজেন দেখা যায় তাদের জেনোজেনিক অ্যান্টিজেন বলে।
খ. অটোলোগাস অ্যান্টিজেন (Autologus antigen)- বিশেষ পরিস্থিতিতে যখন দেহ গঠনকারী কোনো উপাদান অ্যান্টিজেন হিসেবে কাজ করে তখন তাকে অটোলোগাস অ্যান্টিজেন বলে।
গ. অ্যালোজেনিক অ্যান্টিজেন (Allogenic antigen)- একই প্রজাতির দুটি প্রাণীর যে সব অ্যান্টিজেন জিনগতভাবে নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু অ্যান্টিজেনিক ভিটামিন্যান্টস দ্বারা পরস্পরের থেকে পৃক, তাদের অ্যালোজেনিক অ্যান্টিজেন বলে। এ ধরনের অ্যান্টিজেন লোহিত কণিকা, শ্বেতকণিকা, অণুচক্রিকা, সিরাম প্রোটিন প্রভৃতিতে থাকে।
অ্যান্টিজেনের সাধারণ ধর্ম (General properties of antigen)- অ্যান্টিজেনের প্রধান কয়েকটি ধর্ম হলো-
১। রাসায়নিক প্রকৃতি- অ্যান্টিজেন প্রধানত প্রোটিন। কিন্তু অ্যান্টিজেন পলিস্যাকারাইড ও লাইপ্রোপ্রোটিন জাতীয় হয়।
২। বহিরাগত ধর্ম- বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া অ্যান্টিজেন সাধারণত বহিরাগত হয়।
৩। আণবিক ভর- কার্যকরী অ্যান্টিজেনের আণবিক ভর সাধারণত ১০,০০০ ডাল্টনের বেশি। সর্বাপেক্ষা ভালো অ্যান্টিজেনের আণবিক ভর মোটামুটি ১০,০০০ ডাল্টন হওয়া প্রয়োজন। ইনসুলিনের আণবিক ভর ৫০০০ D।
৪। উপলব্ধি ক্ষমতা- কোনো পদার্থকে অ্যান্টিজেন হতে হলে তার এমন কিছু গঠন বা ডিটারমিন্যান্ট গ্রুপ থাকা প্রয়োজন যা অনাক্রম্য তন্ত্রের বিভিন ড়ব উপাদান কর্তৃক চিহ্নিত হতে পারে।
৫। প্রজাতি নির্দিষ্টতা- একই প্রজাতির অন্তর্গত সব প্রাণীর কলাতে প্রজাতি নির্দিষ্টতা অ্যান্টিজেন থাকে।
৬। অঙ্গ নির্দিষ্টতা- নির্দিষ্ট কোনো কলা বা অঙ্গে অঙ্গ নির্দিষ্টতা অ্যান্টিজেন থাকে।

অ্যান্টিবডি (Antibody) অ্যান্টিবডি অ্যান্টিজেনের বিপরীত বস্তু বা নিজস্ব বস্তু বা কণিকা বা কোষ অথবা কোষগুচ্ছ । অ্যান্টিবডি প্রধানত অ্যান্টিজেনের সাড়ায় দেহের B-লিষ্ফোসাইট থেকে উৎপাদিত প্রোটিন জাতীয় পদার্থ। এরা রক্তের প্লাজমা ও কলারসে বর্তমান থাকে। এরা অ্যান্টিজেনের সাথে যুক্ত (combine) হতে পারে এবং ক্লোনাল নির্বাচন (colonal selection) দ্বারা উৎপাদিত হয় এবং দেহের প্রধান সৈনিক বা রক্ষণাবেক্ষণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। অ্যান্টিবডিগুলো অনুপ্রবেশকারী বা বহিরাগত অ্যান্টিজেনকে ভক্ষণ করে, কখনো বিনষ্ট করে, কখনো মেরে ফেলে, কখনো বাইরে নিক্ষেপ করে। অ্যান্টিজেন হচ্ছে non-self আর অ্যান্টিবডি হচ্ছে self বস্তু। দেহের সব অ্যান্টিবডি গামা-গ্লোবিউলিন (-globulin) নামে পরিচিত। আর যেহেতু অ্যান্টিবডিসমূহ দেহের সুরক্ষার (immunity) কাজ করে তাই এদেরকে ইমিউনোগ্লোবিউলিন (Immunoglobulin,, সংক্ষেপে- Ig) বলা হয়। এদের আণবিক ওজন ১,৫০,০০০-৯,০০,০০০/- ডাল্টনের মধ্যে সীমিত। প্লাজমা প্রোটিনের প্রায় ২০% ইমিউনোগ্লোবিউলিন। অ্যান্টিবডি বা ইমিউনোগ্লোবিউলিনের গঠন (Structure of Antibody or Immunoglobulin) সকল প্রকার অ্যান্টিবডির একটি সাধারণ গঠন লক্ষ করা যায়। গাঠনিক অংশগুলো নিম্নরূপ-
১। হালকা চেইন ও ভারী চেইন (Light and Heavy chains)- প্রতিটি অ্যান্টিবডি প্রধানত চারটি পলিপেপটাইড চেইন দ্বারা গঠিত। এদের মধ্যে দুটো দৈর্ঘ্যে ছোট (যাদের প্রতিটিতে প্রায় ২০০-২২০টি অ্যামিনো এসিড থাকে) ও অপর দুটি আকারে বড় (যাদের প্রতিটিতে প্রায় ৪০০-৪৫০টি অ্যামিনো এসিড থাকে)। ছোট পলিপেপটাইড চেইন দুটিকে হালকা চেইন ও বড় পলিপেপটাইড চেইন দুটিকে ভারী চেইন নামে অভিহিত করা হয়। হালকা ও ভারী চেইনের ওজন যথাক্রমে 23KD I 50-70 KD (KD= KiloDaltons)। কোনো কোনো অ্যান্টিবডির চারটির বেশি পলিপেপটাইড শৃঙ্খলও থাকতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারী চেইনের প্রান্তে একটি হালকা চেইন সমান্তরালভাবে অবস্থান করে এবং এভাবে প্রান্তদেশে অন্তত দুইটি হালকা ও ভারী উভয় ধরনের জোড়া তৈরি হয়।
২। ডাইসালফাইড বন্ধন (Disulfide bond)- পলিপেপটাইড চেইন শৃঙ্খলগুলো পরস্পরের সাথে ডাইসালফাইড বন্ধন (s-s) দ্বারা যুক্ত হয়ে পাশাপাশি অবস্থান করে Y-আকৃতির অ্যান্টিবডি গঠন সৃষ্টি করে। কখনো কখনো এই আকৃতি T-এর মতোও দেখা যায়।
৩। স্থায়ী ও পরিবর্তনশীল অংশ (Constant and variable region)- প্রতিটি ভারী চেইন ও হালকা চেইনের দুটি অংশ থাকে- একটি অপরিবর্তনশীল অংশ বা স্থায়ী অংশ এবং অপরটি পরিবর্তনশীল অংশ। পরিবর্তনশীল অংশ প্রতিটি নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডির ক্ষেত্রে আলাদা হয় এবং এই অংশেই অ্যান্টিজেনের সঙ্গে অ্যান্টিবডির সংযুক্তি ঘটে। অ্যান্টিজেনের এ অংশটির নাম প্যারাটপ (paratope)। এটি তালা-চাবি (lock and key) পদ্ধতিতে কাজ করে। এক্ষেত্রে চাবি হচ্ছে প্যারাটপ, আর তালা অ্যান্টিজেন (জীবাণু)। যেহেতু অধিকাংশ অ্যান্টিবডির অ্যান্টিজেনকে আবদ্ধ করার জন্য দুটি পরিবর্তনশীল অংশ আছে তাই এদের বাইভ্যালেন্ট (bivalent) বলে।
অ্যান্টিবডির প্রকার (Types of Antibody)- মানবদেহের রক্তে পাঁচ রকমের ইমিউনোগ্লোবিউলিন অর্থাৎ অ্যান্টিবডি দেখা যায়। যথা- IgG, IgA, IgM, IgD I IgE । এগুলো মানবদেহের প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাঁচ প্রকার অ্যান্টিবডির মধ্যে ওমএ রক্তরসে সর্বাধিক মাত্রায় থাকে এবং ওমউ ও ওমঊ সবচেয়ে কম পরিমাণে থাকে। এদের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নরূপ
১। IgG (Immunoglobulin-G): এ ধরনের অ্যান্টিবডি রক্তেই বেশি থাকে, তবে লসিকা ও অন্ত্রেও পাওয়া যায়। মানুষের রক্তের সব ধরনের অ্যান্টিবডির প্রায় ৮০% IgG। এরা মনোমার হিসেবে থাকে। এর চারটি প্রকারভেদ আছে। যথা- IgG1, IgG2, IgG3 I IgG4 । এরা সহজেই অমরাকে (placenta) অতিক্রম করতে পারে, ফলে মায়ের রক্ত থেকে ভ্রূণের রক্তে স্থানান্তরিত হয়। এই কারণে একে ম্যাটারনাল অ্যান্টিবডিও (maternal antibody) বলে।
কাজ: ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসকে অপসোনাইজেশন (opsonisation) এর মাধ্যমে ধ্বংস করে। এগুলো বিষাক্ত পদার্থ (toxin) প্রশমনেও কাজ করে এবং কমপ্লিমেন্ট সিস্টেমকে (complement system) উদ্দীপিত করে দেহকে সুরক্ষিত রাখে।
২। IgM (Immunoglobulin-M): এরা সবচেয়ে বড় আকারের অ্যান্টিবডি এবং ভ্রূণের দেহে প্রথম সংশ্লেষিত হয়। রক্তে এরা পেন্টামার হিসেবে থাকে। এছাড়া এরা লসিকা এবং B-লিষ্ফোসাইটের উপরিতলে অবস্থান করে। রক্তরসে এদের পরিমাণ প্রায় ৫-১০%। এর ২টি প্রকারভেদ আছে। যেমন- IgM1 I IgM2।
কাজ: এ ধরনের অ্যান্টিবডি অ্যাগ্লুটিনেশন, ব্যাকটেরিওলাইসিস (bacteriolysis), কমপ্লিমেন্ট ফিক্সেশন (complement fixation) প্রভৃতি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেহের প্রতিরক্ষায় সাহায্য করে। এমনকি এরা ফ্যাগোসাইটোসিস ত্বরান্বিত করে এবং সব ধরনের অ্যান্টিবডির তুলনায় পরজীবী দমনে এরা অধিক কার্যকরী। অণুজীবের পলিস্যাকারাইড জাতীয় অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে বিশেষ কার্যকরী। রক্তে ABO গ্রুপের অ্যান্টি- A ও অ্যান্টি- B এবং জীবাণু প্রতিরোধে সংশ্লেষিত অ্যান্টিবডি IgM।
৩। IgA (Immunoglobulin-A): এ ধরনের অ্যান্টিবডি রক্তে বেশি থাকে। এছাড়া ঘাম, অশ্রু, লালা ইত্যাদিতেও এদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। এরা মনোমার ও ডাইমার হিসেবে থাকে। অ্যান্টিবডির প্রায় ১০-১৫% এই প্রকার। মিউকাস স্তরে এর ক্ষরণ ঘটে। সব ক্ষরিত দেহ তরলে এটি থাকে। তাই একে ক্ষরণকারী অ্যান্টিবডি (secretory antibdoy) বলে। এর ২টি প্রকারভেদ আছে। যেমন- IgG1 ও IgG2। মায়েদের কলোস্ট্রামেও IgA পাওয়া যায়।
কাজ: মিউকাস স্তরে ক্ষরিত IgA দেহের অনাবৃত তলকে জীবাণুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে এবং জীবাণুকে পোষক দেহে প্রবেশে বাঁধা দেয়।
৪। IgD (Immunoglobulin-D): রক্তে এ জাতীয় অ্যান্টিবডি খুব কম পরিমাণে (০.২%) থাকে। এরা মনোমার হিসেব ইলিেষ্ফাসাইটের উপরিতলে সংলগ্ন থাকে।
কাজ: এরা B-লিষ্ফোসাইটের অ্যান্টিজেন গ্রাহক হিসেবে কাজ করে এবং ই-লিষ্ফোসাইটকে উত্তেজিত করে অ্যান্টিবডি ক্ষরণে প্ররোচিত করে।
৫। IgE (Immunoglobulin-E): রক্তরসে বেশ অল্প পরিমাণে (০.১%) থাকে। এরা মনোমার অবস্থায় মাস্ট কোষ ও বেসোফিল শ্বেতকণিকার পর্দার ওপর সংলগ্ন থাকে।
কাজ: কৃমিজাতীয় পরজীবী নিষ্কাশনে সহায়তা করে এবং বিভিন্ন ধরনের অ্যালার্জি থেকে দেহকে রক্ষা করে। মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি (Monoclonal antibody): যে সব অ্যান্টিবডি এক প্রকার প্লাজমা কোষ থেকে উৎপন্ন হয়, তাদের মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি বলে।
পলিক্লোনাল অ্যান্টিবডি (polyclonal antibody): যে সব অ্যান্টিবডি বহু প্রকার প্লাজমা কোষ থেকে উৎপন্ন হয় তাদের পলিক্লোনাল অ্যান্টিবডি বলে।
অ্যান্টিবডির কার্যপদ্ধতি (Function of Antibody or Immunoglobulin)- অ্যান্টিবডির প্রতিরক্ষা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। একটি অ্যান্টিবডি একটি নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেন বা নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধেই শুধুমাত্র কাজ করে থাকে। অ্যান্টিবডি নিম্নলিখিত যেকোনো একটি পদ্ধতির সাহায্যে অনুপ্রবেশকারী জীবাণু বা তার প্রতিবিষকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে-
১। দলবদ্ধকরণ বা স্তূপীভবন (Agglutination): এক্ষেত্রে অ্যান্টিবডি একাধিক অ্যান্টিজেনসম্পন্ন জীবাণুর অ্যান্টিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া ঘটিয়ে তাদের দলবদ্ধ করে। এই প্রক্রিয়াকে অ্যাগ্লুটিনেশন বলে। যে অ্যান্টিবডি অ্যান্টিজেন যুক্ত কোষগুলোকে দানা বাঁধতে সাহায্য করে তাদের অ্যাগ্লুটিনিন (agglutinin) বলে।
২। অধঃক্ষেপণ (Precipitation): এক্ষেত্রে অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডির বিক্রিয়ালব্ধ পদার্থ অধঃক্ষিপ্ত হয়। যে অ্যান্টিবডি অ্যান্টিজেনকে অধঃক্ষিপ্ত করে, তাকে প্রেসিপিটিন (precipitine) বলে।
৩। অপসোনাইজেশন (Opsonization): অ্যাগ্লুটিনেশনের মাধ্যমে অ্যান্টিবডি অণুজীবগুলোর ফ্যাগোসাইটোসিসকে আরো ত্বরান্বিত করে। ফ্যাগোসাইটোসিসের জন্য অণুজীবগুলোকে অ্যান্টিবডি যেভাবে সমর্থ বা যোগ্য করে তোলে তাকে অপসোনাইজেশন বলে। এর অ্যান্টিবডিকে অপসোনিন (Opsonin) বলে।
৪। বিশ্লিষ্টকরণ (Lysis): এক্ষেত্রে অ্যান্টিবডি সরাসরি জীবাণুর ঝিল্লিকে আক্রমণ করে এবং তাকে ছিন্ন করে ফেলে।
৫। ব্যাকটেরিওলাইসিন (Bacteriolysin) : এক্ষেত্রে অ্যান্টিবডি দেহে প্রবেশকারী জীবাণুর কোষকে ধ্বংস করে। সংক্ষেপে অ্যান্টিবডির প্রধান কাজগুলো হলো- দেহে অনুপ্ের বশকৃত ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান নষ্ট করতে সহায়তা করে; ব্যাকটেরিয়া নিঃসৃত বিষাক্ত পদার্থকে নিষ্ক্রিয় করতে সহায়তা করে; গর্ভকালীন সময়ে অ্যান্টিবডি মায়ের শরীর থেকে বাচ্চার শরীরে প্রবেশ করে বাচ্চার দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে; কিছু কিছু অ্যান্টিবডি সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়; কিছু অ্যান্টিবডি দেহে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের অনুপ্রবেশে বাঁধা দান করে; অনেক অ্যান্টিবডি আছে যেগুলো কৃমি ধ্বংস করতে সহায়তা করে; অপসোনাইজেশনের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে; এরা কমপ্লিমেন্ট সিস্টেমকে সক্রিয় করে। শিক্ষার্থীর কাজ নিচের ছকে অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডির পার্থক্যগুলো লিখুন। অ্যান্টিজেন অ্যান্টিবডি
সারসংক্ষেপ অ্যান্টিজেন হচ্ছে যেকোনো বিজাতীয় প্রোটিন বা পলিস্যাকারাইড, যা প্রাণিদেহে থাকে না। অ্যান্টিজেন শব্দটি Antibody generating এর সংক্ষিপ্ত রূপ। যে সব বিজাতীয় জীবাণু বা অধিবিষ দেহে প্রবেশ করলে অ্যান্টিবডি সৃষ্টি হয় তাদের অ্যান্টিজেন বলে। অ্যান্টিজেন দু’রকমের হয়। যথা- এক্সোজেনাস (Exogenous) ও এন্ডোজেনাস (Endogenous)। এন্ডোজেনাস অ্যান্টিজেন তিন রকমের। যথা-
ক. জেনোজেনিক অ্যান্টিজেন
খ. অটোলোগাস অ্যান্টিজেন
গ. অ্যালোজেনিক অ্যান্টিজেন। অ্যান্টিবডি অ্যান্টিজেনের বিপরীত বস্তু ংবষভ অর্থাৎ নিজস্ব বস্ত বা কণিকা বা কোষ অথবা কোষগুচ্ছ। অ্যান্টিবডি প্রধানত অ্যান্টিজেনের সাড়ায় দেহের B-লিষ্ফোসাইট থেকে উৎপাদিত প্রোটিন জাতীয় পদার্থ। এরা রক্তের প্লাজমা ও কলারসে বর্তমান থাকে। সকল প্রকার অ্যান্টিবডির একটি সাধারণ গঠন লক্ষ করা যায়। গাঠনিক অংশগুলো নিম্নরূপ- ১। হালকা চেইন ও ভারী চেইন, ২। ডাইসালফাইড বন্ধন এবং ৩। স্থায়ী ও পরিবর্তনশীল অংশ। মানবদেহের রক্তে পাঁচ রকমের অ্যান্টিবডি দেখা যায়। যথা- IgG, IgA, IgM, IgD I IgE






প্রধান শব্দভিত্তিক সারসংক্ষেপ

♦ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: জীবাণুর আক্রমণ থেকে আমাদের দেহকে রক্ষা করার ব্যবস্থাকে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বলে। আমাদের দেহে তিন স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে।

♦ ম্যাক্রোফেজ: ম্যাক্রোফেজ নামে বিশেষ এক ধরনের কোষ থাকে যারা রোগ-জীবাণুকে খেয়ে ফেলে।

♦ অ্যান্টিজেন: যে রাসায়নিক পদার্থ এন্টিবডি তৈরি করতে সাহায্য করে তাকে অ্যান্টিজেন বলে।

♦ অ্যান্টিবডি: অ্যান্টিবডি হলো এক প্রকার প্রোটিন জাতীয় পদার্থ। এ অ্যান্টিবডি আমাদের দেহের শ্বেত রক্তকণিকা উৎপন্ন করে থাকে।

♦ টিকা, ভ্যাকসিন: টিকা, ভ্যাকসিন মানুষের দেহে বিশেষ বিশেষ রোগের হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা অর্জন করতে সাহায্য করে।

♦ স্মৃতি কোষ: আমাদের দেহে কিছু স্মৃতি কোষ রয়েছে যা দেহের ক্ষতিকারক জীবাণুদের প্রকৃতি মনে রাখে।

♦ ইন্টারফেরন: ভাইরাসে আক্রান্ত কোষ থেকে ইন্টারফেরন নামক এক ধরনের বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ নি:সৃত হয়ে কোষকে রক্ষা করে।

♦ ভ্যাক্সিনেশন: বহিরাগত জীবাণু যেমন ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়া ইত্যাদির সংক্রমন থেকে দেহকে রক্ষা করার উপায়কে ভ্যাক্সিনেশন বলে।

♦ সহজাত প্রতিরক্ষা: আমাদের দেহে জন্মগতভাবেই জীবাণুর বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকে, একে সহজাত প্রতিরক্ষা স্তর বলে।
what image shows

জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি

ড. মোহাম্মদ আবুল হাসান

গাজী সালাহউদ্দিন সিদ্দিকী