জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র

(দ্বাদশ শ্রেণি)

(HSC Biology 2nd Paper )


what image shows আমরা যখন খাবার খাই তখন চোখ দিয়ে খাবারটি আগে দেখি, নাক দিয়ে গন্ধ নেই, হাতের সাহায্যে খাবারটি মুখে নেই, জিহ্বা দিয়ে স্বাদ নেই, চোয়ালের পেশি দিয়ে খাদ্য চিবাই, গলধঃকরণ করি এবং পাকস্থলিতে যেয়ে পেরিস্টালসিস শুরু হয়। এছাড়া লালাক্ষরণ থেকে শুরু করে পৌষ্টিকনালির বিভিন্ন অংশে নানা ধরনের এনজাইম ও হরমোন নিঃসৃত হয়। এভাবে আমাদের দেহের অঙ্গগুলো সঠিক সময়ে নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করে বলে দেহের প্রত্যেকটি কাজ সুসম্পন্ন হয়। বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পারস্পরিক সহযোগিতামূলক কাজের মাধ্যমে দেহের সকল কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াকে সমন্বয় (Co-ordination) বলে। অর্থাৎ জীব যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনায় সাড়া দিয়ে সকল কর্মকাণ্ডকে সুসংহতভাবে নির্বাহ করে তাকে সমন্বয় (Co-ordination) বলে। সমন্বয়ের জন্য প্রাণীতে পৃথক কিন্তু সম্পর্কযুক্ত দুইটি তন্ত্র, যথা- স্নায়ুতন্ত্র এবং অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিতন্ত্র বিদ্যমান। স্নায়ুবিক সমন্বয় স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে এবং রাসায়নিক সমন্বয় অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি তন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এ ইউনিটে মানবদেহের সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণের সাথে জড়িত স্নায়ুতন্ত্র, সংবেদী অঙ্গসমূহ এবং হরমোনের ক্রিয়া বিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

পাঠ-৮.১ স্নায়ুতন্ত্রের প্রকারভেদ

স্নায়ুবিক সমন্বয় (Neural co-ordination) : স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ, তন্ত্র, কলা ও কোষের মধ্যে যে সমন্বয় ঘটে তাকে স্নায়ুবিক বা নিউরাল সমন্বয় বলে। এক্ষেত্রে স্নায়ুর মাধ্যমে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা এক কোষ থেকে অন্য কোষে পরিবাহিত হয়। এ বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা পরিশেষে স্নায়ুকোষের প্রান্তীয় নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণের মাধ্যমে রাসায়নিক উদ্দীপনায় পরিণত হয়। যেমন, একটি পেশি সংকোচনের জন্য মটর স্নায়ুর মাধ্যমে যে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা প্রেরিত হয় এটা পরিশেষে স্নায়ুপেশির সংযোগস্থলে (neuromuscular junction) অ্যাসিটাল কোলিন রূপে মুক্ত হয়। এ অ্যাসিটাল কোলিন পেশি মেমব্রেনের উপর ক্রিয়া করে, ফলে পেশি সংকুচিত হয় ।

স্নায়ুতন্ত্র (Nervous system): ভ্রƒণীয় এক্টোডার্ম থেকে উদ্ভূত মানবদেহের যে তন্ত্র পরিবর্তনশীল পরিবেশের ও দেহাভ্যন্তরের বিভিন্ন উদ্দীপনায় সাড়া দিয়ে দৈহিক, মানসিক ও শারীরবৃত্তীয় কাজের সমন্বয় ঘটায় তাকে স্নায়ুতন্ত্র বলে।

স্নায়ু তন্ত্রের সংগঠন ((Organization of nervous system): স্নায়ুতন্ত্র একটি সিঙ্গেল ইউনিফাইড কমুনিকেশন সিস্টেম হলেও অঙ্গ সংস্থানিক ভিত্তিতে একে সামগ্রিকভাবে সাধারণতঃ দু’ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যথা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (Central nervous system বা CNS) ও প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র (Peripheral nervous system বা PNS)। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র গঠিত হয় মস্তিষ্ক (brain) ও সুষুম্না রজ্জু (spinal cord) নিয়ে। প্রান্তীয় বা পেরিফেরাল স্নায়ুতন্ত্র গঠিত হয় মস্তিষ্কের সাথে সংশ্লিষ্ট করোটিক স্নায়ু, স্পাইনাল কর্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট সুষুম্মা স্নায়ু বা স্পাইরাল স্নায়ু এবং গ্যাংগ্লিয়া নামক স্নায়ু কোষ বডি গুচ্ছ। স্নায়ুতন্ত্রের গাঠনিক একক দুই ধরনের, যথা- নিউরন ও নিউরোগ্লিয়াল কোষ বা গ্লিয়া ।

নিউরন (Neuron) : একটি আদর্শ নিউরনকে প্রধানতঃ দুটি অংশে ভাগ করা যায়, যথা-

ক. কোষদেহ (Cell body/soma): কোষ দেহে প্লাজমামেমব্রেন, সাইটোপ্লাজম, নিউক্লিয়াস বিভিন্ন অঙ্গাণু আছে। কোষ দেহ গোলাকার, তারকাকার বা ত্রিভুজাকার হতে পারে। সাইটোপ্লাজমে মাইটোকন্ড্রিয়া, গলপিবস্তু, লাইসোসোম, চর্বি, গ্লাইকোজেন, রঞ্জক কণাসহ অসংখ্য নিসল দানা (Nissl’s granules) থাকে। নিসল দানা প্রকৃতপক্ষে রাইবোসোমের সমষ্টি। এরা নিউরো ট্রান্সমিটার বস্তু তৈরি করে। কোষদেহ সুপ্রত্যক্ষ নিউক্লিয়োলাস কেন্দ্রীয় একটি নিউক্লিয়াস ধারণ করে।

খ. প্রলম্বিত অংশ বা প্রবর্ধক (Processes): কোষদেহ থেকে সৃষ্ট শাখা- প্রশাখাকেই প্রলম্বিত অংশ বলে। প্রলম্বিত অংশ দুই প্রকারের, যথা- ১। ডেনড্রনঃ বহু শাখা- প্রশাখাবিশিষ্ট ছোট ছোট প্রলম্বিত অংশগুলোর নাম ডেনড্রন। ডেনড্রনের শাখাগুলোকে ডেনড্রাইট বলে। ডেনড্রাইটের মাধ্যমে উদ্দীপনা দেহের দিকে সংগৃহীত হয়। একটি স্নায়ু কোষে ডেনড্রাইটের সংখ্যা শূন্য থেকে অসংখ্য পর্যন্ত হতে পারে।

২। অ্যাক্সন (Axon): প্রায় শাখা-প্রশাখাবিহীন দীর্ঘ প্রলম্বিত অংশের নাম অ্যাক্সন। অ্যাক্সন কোষ দেহ থেকে এক বা একাধিক মিটার বিস্তৃত হতে পারে। যেমন সায়াটিক স্নায়ুতে থাকে যা স্পাইনাল স্নায়ু থেকে পদতল পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। খাটোতম অ্যাক্সন থাকে মস্তিস্কের নিউরনে যা মাত্র কয়েক মাইক্রোমিটার দীর্ঘ। অ্যাক্সনের মাধ্যমেই উদ্দীপনা কোষদেহ থেকে বাইরের পরবর্তী নিউরন, পেশিকোষ বা গ্রন্থিতে প্রবাহিত হয়। অ্যাক্সন নিউরিলেমা দ্বারা আবৃত থাকে। নিউরিলেমার নিচে একটি বিচ্ছিন্ন ফ্যাটি পদার্থের স্তর থাকে একে মায়েলিন শীথ (Myelin sheath) বলে। রাবার শীথ যেমন বিদ্যুৎবাহী তারকে অন্তরীত করে ঠিক তেমনি মায়েলিন শীথ অ্যাক্সনকে অন্তরীত করে। যে স্থানগুলোতে মায়েলিন শীথ (Myelin sheath) অনুপস্থিত সেখানে সংকোচনের সৃষ্টি হয়। এসব সংকোচনকে র‌্যানভিয়ারের পর্ব (Ranvier node) বলে। যেহেতু স্নায়ু উদ্দীপনা মায়েলিন শীথের মধ্য দিয়ে যেতে পারে না সেহেতু এরা এক পর্ব (Node) থেকে আরেক পর্বে লাফ দিয়ে স্নায়ু তাড়নার গতি বৃদ্ধি করে।

নিউরোগ্লিয়াল কোষ বা গ্লিয়া (Neuroglia or Glia): নিউরনকে পরিবেষ্টনকারী এক বিশেষ ধরণের কোষ স্নায়ুতন্ত্রে দেখা যায়। এদেরকে নিউরোগ্লিয়াল কোষ বলে। এরা প্রণোদনা পরিবহনে সক্ষম নয়। বরং শুধু মাত্র নিউরনের আবরক, সহায়ক ও পুষ্টি দাতা হিসেবে কাজ করে।

সিন্যাপস (Synapse): দুটি নিউরনের সংযোগস্থলকে অথবা একটি নিউরন ও একটি ইফেক্টরের (যেমন পেশি অথবা গ্রন্থি) সংযোগস্থলকে সিন্যাপস বলে। সিন্যাপস এর মাধ্যমে উত্তেজনা বা তথ্য এক নিউরন থেকে অন্য নিউরনে প্রেরিত হয়। এগুলোর মাধ্যমেই প্রান্তীয় স্নায়ু দ্বারা গৃহীত উদ্দীপনা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে প্রেরিত হয় এবং কেন্দ্রের নিদের্শাবলি প্রান্তের সুনির্দিষ্ট অঙ্গে পৌঁছায়। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সকল উচ্চতর কার্যাবলি যেমন- সমন্বয়, শিক্ষণ, স্মৃতি ইত্যাদি সবকিছুই সম্ভব হয় কেবল সিন্যাপসের জন্য। স্নায়ুতন্ত্রে সিন্যাপস অসংখ্য এবং ধারণা করা হয় এর সংখ্যা প্রায় (10 to the power 14)। এসব সিন্যাপস বিভিন্ন ধরনের ও বিভিন্ন নামের হয়ে থাকে।

সিন্যাপসের গঠন: দুটি নিউরনের অংশ মিলিত হয়ে সিন্যাপস গঠন করে। যে নিউরনের অ্যাক্সন সিন্যাপস গঠনে অংশ নেয় তাকে প্রিসিন্যাপটিক নিউরন বলে। সিন্যাপস গঠনকারী অন্য নিউরনকে পোস্ট সিন্যাপটিক নিউরন বলে। প্রিসিন্যাপটিক নিউরনের প্রিসিন্যাপটিক মেমব্রেন এবং পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনের স্টসিন্যাপটিক মেমব্রেন সম্মিলিতভাবে সিন্যাপস গঠন করে। এ দুটি মেমব্রেনের মাঝে প্রায় ২০ ন্যানোমিটার দৈর্ঘ্যরে তরল পূর্ণ ফাঁক থাকে একে সিন্যাপটিক ক্লেফট (Synaptic cleft) বলে। প্রিসিন্যাপটিক মেমব্রেন প্রকৃতপক্ষে প্রিসিন্যাপটিক নিউরনের অ্যাক্সনের স্ফীত প্রান্তের অংশ। অ্যাক্সনের স্ফীত প্রান্তকে সিন্যাপটিক নব (Synaptic knob) বলে। এ নবের ভিতরে অসংখ্য মাইটোকন্ড্রিয়া, মাইক্রোফিলামেট এবং নিউরোট্রান্সমিটার যুক্ত ভেসিকল থাকে। আর পোস্টসিন্যাপটিক মেমব্রেন, পোস্টসিন্যাপটিক নিউরনের সোমা বা ডেনড্রাইট বা অ্যাক্সনের অংশ। নিউরোট্রান্সমিটার যে সব রাসায়নিক বস্তু স্নায়ুকোষ থেকে নিঃসৃত হয়ে স্নায়ু উদ্দীপনা এক নিউরন হতে অন্য নিউরন কিংবা পেশিকোষ অথবা কোন গ্রন্থিতে পরিবহনে সহায়তা করে তাদের নিউরোট্রান্সমিটার বলে।

সিন্যাপসের কাজ
♦ এগুলো এক নিউরন থেকে অন্য নিউরনের তথ্যের প্রেরণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
♦ এরা উদ্দীপনা বাছাই করে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে প্রেরণ করে।
♦ এরা নিউরোট্রান্সমিটার বস্তু ক্ষরণ করে।
♦ এরা বিভিন্ন নিউরনের মধ্যে সমন্বয় ঘটায় এবং স্নায়ু উদ্দীপনার গতিপথ নির্ধারণ করে।
♦ স্নায়ুতন্ত্রের স্নায়ুসমূহ অতি উদ্দীপিত হলে অবসাদ গ্রস্থ (fatigued) হতে বাধা দেয়া।
♦ খুব অল্প মাত্রার স্নায়ু উদ্দীপনাকে ফিল্টার করে বাদ দেয়া (যেমন ঘড়ির কাটার খুব সামান্য শব্দ শুনি না)।
♦ সব উদ্দীপনার ক্রিয়াকে সমষ্টিবদ্ধ করে (summation) তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করা।
♦ স্মৃতি শক্তির ভৌত কাঠামো হিসেবে কাজ করা।

সংক্ষেপে স্নায়ুতন্ত্রের কাজ (functions of nervous system)
১। পরিবেশের যেকোন প্রভাবকে উপলব্ধি করে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা । পরিবেশের সঙ্গে দেহের সমন্বয় রক্ষা এর প্রধান উদ্দেশ্য।
২। দেহের বিভিন্ন অঙ্গ সমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে এদের সুনিয়ন্ত্রিত করা। যেমন- চলন কালে চলন অঙ্গ সমূহের সঙ্গে মাথা, ঘাড়, চক্ষু, কর্ণ প্রভৃতি অঙ্গ একই সঙ্গে সমন্বিত হয়। দেহের অ্যাসোসিয়েসন কেন্দ্র ও চেষ্টীয় অঞ্চল সমূহসমন্বিত কাজের মাধ্যমে দেহের যান্ত্রিক ও রাসায়নিক বিক্রিয়াকে সুনিয়ন্ত্রিত করে।
৩। ঐচ্ছিক অনৈচ্ছিক পেশির নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রন্থির ক্ষরণের ন্যায় চেষ্টীয় কাজ সম্পন্ন করার জন্য বাইরের উদ্দীপনাকে গ্রহণ করা ।
৪। স্নায়ুকোষ সমূহের উদ্দীপনাকে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পরিচালনা করে সংবেদী অঙ্গ সমূহ কার্যকর করে।
৫। বিভিন্ন তথ্যসমূহ সংরক্ষণের মাধ্যমে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে আচরণকে পরিবর্তিত করে ।

স্নায়ুতু ন্ত্রের শ্রেণিবিন্যাস: কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের যে স্ফীত অংশ করোটির মধ্যে অবস্থান করে এবং মানবদেহের সকল কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণ করে তাকে মস্তিষ্ক বলে। ভ্রূণীয় বিকাশের সময় এক্টোডার্ম থেকে সৃষ্ট নিউরাল টিউবের সামনের অংশ স্ফীত হয়ে মস্তিষ্ক গঠন করে। প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের মস্তিষ্কের আয়তন প্রায় ১৫০০ ঘন সেন্টিমিটার, গড় ওজন প্রায় ১.৩৬ কেজি এবং প্রায় ১০০ বিলিয়ন নিউরন থাকে। মস্তিষ্ক স্নায়ুতন্ত্রের সবচেয়ে বড়, জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

স্নায়ুতু ন্ত্রের শ্রেণিবিন্যাস: কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের যে স্ফীত অংশ করোটির মধ্যে অবস্থান করে এবং মানবদেহের সকল কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণ করে তাকে মস্তিষ্ক বলে। ভ্রূণীয় বিকাশের সময় এক্টোডার্ম থেকে সৃষ্ট নিউরাল টিউবের সামনের অংশ স্ফীত হয়ে মস্তিষ্ক গঠন করে। প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের মস্তিষ্কের আয়তন প্রায় ১৫০০ ঘন সেন্টিমিটার, গড় ওজন প্রায় ১.৩৬ কেজি এবং প্রায় ১০০ বিলিয়ন নিউরন থাকে। মস্তিষ্ক স্নায়ুতন্ত্রের সবচেয়ে বড়, জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানব মস্তিষ্ক ৩টি প্রধান অংশে বিভক্ত। যথা- (১) অগ্রমস্তিষ্ক, (২) মধ্যমস্তিষ্ক ও (৩) পশ্চাৎ মস্তিষ্ক।

(১) অগ্রমস্তিষ্কঃ অগ্রমস্তিষ্ক মস্তিষ্কের প্রধান অংশ গঠন করে। এটি তিন অংশে বিভক্ত। যথা- (ক) সেরেব্রাম, (খ) থ্যালামাস ও (গ) হাইপোথ্যালামাস। সেরেব্রাম- মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় অংশ (মস্তিষ্কের প্রায় ৮০% গঠন করে) এবং মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশকে ঢেকে রাখে। দুটি সেরেব্রাল হেমিস্ফিয়ার সমন্বয়ে সেরেব্রাম গঠিত। খণ্ডদুটি ভেতরের দিকে কর্পাস ক্যালোসাম নামে চওড়া স্নায়ুগুচ্ছ দিয়ে যুক্ত। প্রতিটি সেরেব্রাল হেমিস্ফিয়ার ৫টি খণ্ডে বিভক্ত। যথা- ফ্রন্টাল লোব, প্যারাইটাল লোব, অক্সিপিটাল লোব, টেম্পোরাল লোব ও লিম্বিক লোব। কাজঃ বাকশক্তি, স্মৃতি শক্তি, চিন্তা, বুদ্ধি-বৃত্তি, সৃজনশীলতা, ইচ্ছা শক্তি, সহজাত প্রবৃত্তি, কর্মপ্রেরণা প্রভৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট এবং সর্বোপরি মানুষের ঐচ্ছিক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। থ্যালামাস- সেরেব্রাল হেমিস্ফিয়ারের নিচে দুটি ক্ষুদ্র ও ডিম্বাকৃতির থ্যালামাস থাকে যা ধূসর পদার্থ দিয়ে গঠিত। কাজঃ সংবেদী-উদ্দীপনা গ্রহণ করে এবং রিলে করে সেরেব্রামে পাঠায়। মানুষের ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক আচরণের প্রকাশ ঘটায়। ঘুমন্ত মানুষকে হঠাৎ জাগিয়ে তোলা ও পরিবেশ সম্পর্কে সতর্ক করে তোলে। হাইপোথ্যালামাস- এটি থ্যালামাসের ঠিক নিচে ধূসর পদার্থ দিয়ে গঠিত। এটি অন্ততঃ এক ডজন পৃক অঞ্চলে বিভক্ত থাকে। কাজঃ স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের সকল কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রাগ, ভাল লাগা, ভীতি, আবেগ প্রভৃতির কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। পিটুইটারী গ্রন্থিও বিভিন্ন হরমোন নিঃসরণ করে।

(২) মধ্যমস্তিষ্কঃ হাইপোথ্যালামাসের নিচে ছোট অংশটি মধ্যমস্তিষ্ক। পৃষ্ঠীয় দিকে দুটি গোলাকার খ- এবং অঙ্কীয় দিকে দুটি নলাকার ও পুরু স্নায়ুরজ্জু নিয়ে গঠিত, প্রথম দুটি সেরেব্রাল পেডাংকল এবং শেষের দুটি কর্পোরা কোয়াডি্ের জমিনা। কাজঃ অগ্র ও পশ্চাৎ মস্তিষ্কের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে। দর্শন ও শ্রবণের রিফ্লেক্স কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। দেহের ভারসাম্য রক্ষা ও নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে।

(৩) পশ্চাৎ মস্তিষ্কঃ এটি মস্তিষ্কের পিছনের অংশ এবং ৩টি প্রধান অংশ নিয়ে গঠিত। যথা- সেরেবেলাম, মেডুলা অবলংগাটা এবং পনস।

সেরেবেলাম- পশ্চাৎ মস্তিষ্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সেরেবেলাম যা সেরেব্রাল হেমিস্ফিয়ারের নিচে অবস্থিত। দুটি কু-লীকৃত সমগোলার্ধ নিয়ে গঠিত যারা ভার্নিস নামে একটি ক্ষুদ্র যোজকের সাহায্যে যুক্ত। এটি বাইরের দিকে কর্টেক্স এবং ভেতরের দিকে মেডুলা নিয়ে গঠিত। কাজঃ দেহের ভারসাম্য রক্ষা করে। ঐচ্ছিক চলাফেরাকে নিয়ন্ত্রণ করে। পেশির টান ও দেহভঙ্গি নিয়ন্ত্রণ করে।

মেডুলা অবলংগাটা- এটি পনস ও সুষুম্মাকাণ্ডের মধ্যবর্তী অনেকটা ত্রিকোণাকার পুরু গঠন বিশেষ। কাজঃ এটি সুষুম্মাকা- ও মস্তিষ্কের মধ্যে যোগসূত্র সৃষ্টি করে। এটি পৌষ্টিক নালির পেরিস্টালসিস, রক্তনালির সংকোচনশ্লন, হৃদস্পন্দন, ফুসফুসের সংকোচন-প্রসারণ, লালাগ্রন্থির ক্ষরণ, মলমূত্র ত্যাগ, বমি ইত্যাদি শরীরবৃত্তীয় কার্য্যাবলি নিয়ন্ত্রণ করে।

পনস- এটি সেরেবেলামের অঙ্কভাগে মেডুলার সামনের দিকে আড়াআড়িভাবে অবস্থিত একটি পি-াকার গঠন। কাজঃ এটি সেরেবেলাম ও মেডুলাকে মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশের সাথে সংযুক্ত করে। স্বাভাবিক শ্বাসক্রিয়ার হার নিয়ন্ত্রণ করে। শিক্ষার্থীর কাজ মানব মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের নাম ও কাজের একটি ছক প্রস্তুত করুন।

সারসংক্ষেপ স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ, তন্ত্র, কলা ও কোষের মধ্যে যে সমন্বয় ঘটে তাকে স্নায়বিক বা নিউরাল সমন্বয় বলে। ভ্রূণীয় এক্টোডার্ম থেকে উদ্ভূত মানবদেহের যে তন্ত্র পরিবর্তনশীল পরিবেশের ও দেহাভ্যন্তে রর বিভিন্ন উদ্দীপনায় সাড়া দিয়ে দৈহিক, মানসিক ও শারীরবৃত্তীয় কাজের সমন্বয় ঘটায় তাকে স্নায়ুতন্ত্র বলে। স্নায়ুতন্ত্র একটি সিঙ্গেল ইউনিফাইড কমুনিকেশন সিস্টেম হলেও অঙ্গ সংস্থানিক ভিত্তিতে একে সামগ্রিকভাবে সাধারণতঃ দুভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যথা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র এবং প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র। মানব মস্তিষ্ক ৩টি প্রধান ভাগে বিভক্ত। যথা- (১) অগ্রমস্তিষ্ক, (২) মধ্যমস্তিষ্ক ও (৩) পশ্চাৎ মস্তিষ্ক।

পাঠ-৮.২ বিভিন্ন প্রকার করোটিক স্নায়ুর নাম, উৎপত্তি, বিস্তার ও কাজ



পাঠ-৮.৩ চোখের গঠন ও কাজ

পাঠ-৮.৪ কর্ণের গঠন ও কাজ

পাঠ-৮.৫ রাসায়নিক সমন্বয়: অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিসমূহের নাম, অবস্থান, নিঃসরণ ও কাজ








প্রধান শব্দভিত্তিক সারসংক্ষেপ


♦ মস্তিষ্ক: কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সবচেয়ে সামনের অংশ বিশেষভাবে রূপান্তরিত হয়ে মস্তিষ্কে (মগজ / ঘিলু) পরিণত হয়েছে।

♦ মস্তিষ্কের নিলয়: মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলে খণ্ডাংশ বা lobe গুলোর অভ্যন্তরে কতগুলো গহ্বর থাকে। এদেরকে মস্তিষ্কের নিলয় বা lobe (Ventricles of brain) বলে।

♦ অমরা: মাতৃদেহ ও ভ্রূণের মাঝখানে গঠিত এক প্রকার অস্থায়ী অঙ্গ হলো অমরা। অমরার মাধ্যমে ভ্রূণ মাতৃদেহ থেকে খাদ্য ও অক্সিজেন পেয়ে থাকে।

♦ থাইরয়েড গ্রন্থি: শ্বাসনালির উভয় পার্শ্বে হরিদ্রাভ লাল বর্ণের যে দুটি পিণ্ড অবস্থিত থাকে, তাকে থাইরয়েড গ্রন্থি বলে।

♦ সাইন্যাপস: দুটি নিউরণের সংযেগস্থলকে সাইন্যাপস বলে।

♦ উপযোজন: বিভিন্ন দূরত্বে অবস্থিত দর্শনীয় বস্তু থেকে আসা আলোক রশ্মি রেটিনায় আপতিত করার বিশেষ ক্ষমতাকে উপযোজন বলে।

♦ ইনসুলিন: ইনসুলিন অগ্নাশয় থেকে নিসৃত একধরণের হরমোন যা গ্লুকোজকে গ্লাইকোজেন এ পরিণত করে।

♦ অপসোনিন: অপসোনিন এক ধরনের অণু যা একটি অ্যন্টিজেন ও একটি ইমিউন কোষকে বাধঁতে সাহায্য করে।

♦ গ্যাস্ট্রিন: গ্যাস্ট্রিন হরমোন পাচক রস ক্ষরণে সাহায্য করে।

♦ মাস্টার গ্লান্ড: পিটুইটারি গ্রন্থিকে মাস্টার গ্লান্ড বলে কারণ এই গ্রন্থি অন্যান্য গ্রন্থির কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণ করে।

♦ ট্রপিক হরমোন: যে হরমোন অন্য অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিকে তার হরমোন ক্ষরণে উদ্ভুদ্ধ করে তাকে ট্রপিক হরমোন বলে।

♦ কুশিং সিন্ড্রোম: কুশিং সিন্ড্রোম (ইংরেজি: Cushing Syndrome) হল, কর্টিসল হরমোনের নিয়ন্ত্রণহীন বৃদ্ধির ফলে উদ্ভূত সকল সমস্যা।

♦ মানুষের চক্ষু গ্রন্থি মনে রাখার কৌশল: "হামলা"
হা = হার্ডেরিয়ান গ্রন্থি
ম = মিবোমিয়ান গ্রন্থি
লা = ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি
what image shows

জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি

ড. মোহাম্মদ আবুল হাসান

গাজী সালাহউদ্দিন সিদ্দিকী