what image shows

বিজ্ঞান

অষ্টম শ্রেণি


চতুর্থ অধ্যায় : উদ্ভিদে বংশ বৃদ্ধি

তামরা লক্ষ করলে দেখবে এক জোড়া কবুতর হতে বছর ঘরুতে না ঘুরতে অনেকগুলো কবুতর হয়ে যায়। একটি গাভি বছর বছর বাচ্চা দিয়ে গোয়াল ঘর ভরে দেয়। একটি উদ্ভিদে বহু বীজ সৃষ্টি হয়। এই বীজগুলো থেকে নতুন উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়। এ সবই জীবের প্রজনন বা বংশ বৃদ্ধির উদাহরণ।
what image shows


এই অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা:


♦  যৌন এবং অযৌন প্রজননের মধ্যে পার্থক্য করতে পারব।
♦  বিভিন্ন প্রকার পরাগায়নের মধ্যে পার্থক্য করতে পারব।
♦  পারিবেশে সংঘটিত স্বপরাগায়ন এবং পর পরাগায়ন চিহ্নিত করে কারণ ব্যাখ্যা করতে পারব।
♦  পরাগায়ন ব্যাখ্যা করতে পারব।
♦  নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে পারব।
♦  পরীক্ষার মাধ্যমে অঙ্কুরোদগম প্রদর্শন করতে পারব।

পাঠ ১-৩ : প্রজনন বা জনন

পৃথিবীর প্রতিটি জীব মৃত্যুর পূর্বে তার বংশধর রেখে যেতে চায়। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। যে জটিল প্রক্রিয়ায় জীব তার প্রতিরূপ বা বংশধর সৃষ্টি করে তাকে প্রজনন বলে। প্রজনন প্রধানত দুই প্রকার, যথা অযৌন ও যৌন প্রজনন।
অযৌন জনন: যে প্রজনন প্রক্রিয়া যৌন জনন কোষ সৃষ্টি ও দুটো জনন কোষের মিলন ছাড়াই সম্পন্ন হয় তাই অযৌন জনন। নিম্নশ্রেণির জীবে অযৌন জননের প্রবণতা বেশি। অযৌন প্রজনন প্রধানত দুই ধরনের, যথা স্পোর উৎপাদন ও অঙ্গজ প্রজনন।

(ক) স্পোর উৎপাদন : প্রধানত নিম্নশ্রেণির উদ্ভিদে অণুবীজ উৎপাদনের মাধ্যমে বংশ রক্ষা করার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। উদ্ভিদের দেহকোষ পরিবর্তিত হয়ে অণুবীজবাহী একটি অঙ্গের সৃষ্টি করে। এদের অণুবীজথলী বলে। একটি অণুবীজথলিতে সাধারণত অসংখ্য অণুবীজ থাকে। তবে কখনও একটি থলিতে একটি অণুবীজ থাকতে পারে। অণুবীজথলির বাইরেও উৎপন্ন হয়। এদের বহিঃঅণুবীজ বলে। বহিঃঅণুবীজের কোনোটিকে কনিডিয়াম বলে। গঁপড়ৎ উদ্ভিদে অসংখ্য অণুবীজথলের মধ্যে উৎপন্ন হয়। Penicillium কনিডিয়া সৃষ্টির মাধ্যমে বংশ বৃদ্ধি করে।

(খ) অঙ্গজ প্রজনন : কোনো ধরনের অযৌন রেণু বা জনন কোষ সৃষ্টি না করে দেহের অংশ খন্ডিত হয়ে বা কোনো প্রত্যঙ্গ রূপান্তরিত হয়ে যে প্রজনন ঘটে তাকে অঙ্গজ প্রজনন বলে। এ ধরনের প্রজনন প্রাকৃতিক নিয়মে বা স্বতস্ফুর্তভাবে ঘটলে তাকে প্রাকৃতিক অঙ্গজ প্রজনন বলা হয়। যখন কৃত্রিমভাবে অঙ্গজ প্রজনন ঘটানো হয় তখন তাকে কৃত্রিম অঙ্গজ প্রজনন বলে।

প্রাকৃতিক অঙ্গজ প্রজনন : বিভিন্ন পদ্ধতিতে স্বাভাবিক নিয়মেই এ ধরনের অঙ্গজ প্রজনন দেখা যায়, যেমন চুপড়ী আলু, কলা, ঘাস ইত্যাদি।
১। দেহের খন্ডায়ন : সাধারণত নিম্নশ্রেণির উদ্ভিদে এ ধরনের প্রজনন দেখা যায়। Spirogyra, Mucor ইত্যাদি উদ্ভিদের দেহ কোনো কারণে খন্ডিত হলে প্রতিটি খন্ড একটি স্বাধীন উদ্ভিদ হিসেবে জীবনযাপন শুরু করে।

২। মূলের মাধ্যমে : কোনো কোনো উদ্ভিদের মূল থেকে শিশু উদ্ভিদের সৃষ্টি হতে দেখা যায়, যেমন- সেগুন, পটোল ইত্যাদি। কোনো কোনো মূল খাদ্য সঞ্চয়ের মাধ্যমে বেশ মোটা ও রসালো হয়। এর গায়ে কুঁড়ি সৃষ্টি হয় এবং তা থেকে নতুন উদ্ভিদ গজায়, যেমন- মিষ্টি আলু।

৩। রূপান্তরিত কান্ডের মাধ্যমে : উদ্ভিদের কোন অংশকে কাণ্ড বলে তা নিশ্চয়ই তোমরা জান। তবে কিছু কান্ডের অবস্থান ও বাইরের চেহারা দেখে তাকে কাণ্ড বলে মনেই হয় না। এরা পরিবর্তিত কাণ্ড। বিভিন্ন প্রতিকূলতা ঠেকাতে, খাদ্য সঞ্চয় করতে অথবা অঙ্গজ প্রজননের প্রয়োজনে এরা পরিবর্তিত হয়। এদের বিভিন্ন রূপ নিম্নে দেওয়া হলো :

(ক) টিউবার : কিছু কিছু উদ্ভিদে মাটির নিচের শাখার অগ্রভাগে খাদ্য সঞ্চয়ের ফলে ফুলে কন্দের সৃষ্টি করে, এদের টিউবার বলে। ভবিষ্যতে এ কন্দ প্রজননের কাজ করে। কন্দের গায়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গর্ত থাকে। এগুলো দেখতে চোখের ন্যায় তাই এদের চোখ বলা হয়। একটা চোখের মধ্যে একটি কুঁড়ি থাকে। আঁশের ন্যায় অসবুজ পাতার (শল্কপত্র) কক্ষে এসব কুঁড়ি জন্মে। প্রতিটি চোখ থেকে একটি স্বাধীন উদ্ভিদের জন্ম হয়, যেমন- আলু।

(খ) রাইজোম : এরা মাটির নিচে সমান্তরালভাবে অবস্থান করে। এদের পর্ব, পর্বসন্ধি স্পষ্ট। পর্বসন্ধিতে শল্কপত্রের কক্ষে কাক্ষিক মুকুল জন্মে। এরাও খাদ্য সঞ্চয় করে মোটা ও রসালো হয়। অনুকূল পরিবেশে এসব মুকুল বৃদ্ধি পেয়ে আলাদা আলাদা উদ্ভিদ উৎপন্ন করে। আদা উদ্ভিদে এ ধরনের রাইজোম দেখা যায়।

(গ) কন্দ : এরা অতি ক্ষুদ্র কাণ্ড। এদের কাক্ষিক ও শীর্ষ মুকুল নতুন উদ্ভিদের জন্ম দেয়, যেমন-পিঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি।

(ঘ) স্টোলন : তোমরা কচুর লতি দেখে থাকবে। এগুলো কচুর শাখাকাণ্ড। এগুলো প্রজননের জন্যই পরিবর্তিত হয়। স্টোলনের অগ্রভাগে মুকুল উৎপন্ন হয়। এভাবে স্টোলন উদ্ভিদের প্রজননে সাহায্য করে, যেমন-কচু, পুদিনা।

(ঙ) অফসেট : কচুরি পানা, টোপাপানা ইত্যাদি জলজ উদ্ভিদে শাখা কাণ্ড বৃদ্ধি পেয়ে একটি নতুন উদ্ভিদ উৎপন্ন করে। কিছুদিন পর মাতৃউদ্ভিদ থেকে এটি বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন উদ্ভিদে পরিণত হয়, যেমন-কচুরি পানা।

(চ) পর্ণকাণ্ড বা ফাইলোক্ল্যাড : পানি সংরক্ষণ, পরিমিত মাত্রায় খরচ ও অপচয় রোধের জন্য মরু উদ্ভিদের পাতা ছোট হয় এবং কণ্টকে পরিণত হয়। কাণ্ড পানি সংরক্ষণের জন্য রসালো হয় ও পাতার ন্যায় চ্যাপ্টা ও সবুজ হয় এবং নিজেই পাতার কাজ করে। যেমন- ফণিমনসা।
(ছ) বুলবিল : কোনো কোনো উদ্ভিদের কাক্ষিক মুকুলের বৃদ্ধি যথাযথভাবে না হয়ে একটি পিন্ডের ন্যায় আকার ধারণ করে। এদের বুলবিল বলে। এসব বুলবিল কিছুদিন পর গাছ থেকে খসে মাটিতে পড়ে এবং নতুন গাছের জন্ম দেয়, যেমন-চুপড়ি আলু।

(জ) পাতার মাধ্যমে : কখনও কখনও পাতার কিনারায় মুকুল সৃষ্টি হয়ে নতুন উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়। যেমন- পাথরকুচি। এতক্ষণ যেসব প্রক্রিয়ার কথা বলা হলো তা প্রাকৃতিকভাবেই ঘটে। অঙ্গজ প্রজননে উৎপাদিত উদ্ভিদ মাতৃউদ্ভিদের ন্যায় গুণসম্পন্ন হয়। এর ফলে কোনো নতুন বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ ঘটে না। উন্নত গুণসম্পন্ন অর্থকরী ফসলের ক্ষেত্রে তাই অনেক সময় কৃত্রিম অঙ্গজ প্রজনন ঘটানো হয়।

কৃত্রিম অঙ্গজ প্রজনন : ভালো জাতের আম, কমলা, লেবু, পেঁয়াজ ইত্যাদি গাছের কলম করতে তোমরা দেখেছ। কেন কলম করা হয় তা কি ভেবে দেখেছ? যেসব উদ্ভিদের বীজ থেকে উৎপাদিত উদ্ভিদের ফলন মাতৃউদ্ভিদের তুলনায় অনুন্নত ও পরিমাণে কম হয় সাধাণত সেসব উদ্ভিদে কৃত্রিম অঙ্গজ প্রজননের মাধ্যমে মাতৃউদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করা হয়। এবার এসো কৃত্রিম প্রজনন সম্পর্কে আমরা জানি।

১। কলম (Grafting) : গাছের একটি সরল, কচি ও তরতজা শাখা থেকে এ ধরনের পদ্ধতিতে মূল গজিয়ে শাখাটিকে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রস্তুত করা হয়। উপযুক্ত স্থানে বাকল সামান্য কেটে নিতে হয়। এবার ঐ ক্ষত স্থানটি মাটি ও গোবর মিশিয়ে ভালোভাবে আবৃত করে দিতে হবে। এবার সেলোফেন টেপ অথবা পলিথিন দিয়ে মুড়ে দিতে হবে যাতে পানি লেগে মাটি খসে না যায়। নিয়মিত পানি দিয়ে এ অংশটি মাঝে-মধ্যে ভিজিয়ে দিতে হবে। এভাবে কিছুদিন রেখে দিলে এ সথানে মূল গজাবে। এর পরে মূলসহ শাখার এ অংশটি মাতৃউদ্ভিদ থেকে কেটে নিয়ে মাটিতে রোপণ করে দিলে নতুন একটি উদ্ভিদ হিসেবে বেড়ে উঠবে।

২। কাটিং ( Cutting ): তোমরা লক্ষ করেছ যে গোলাপের ডাল কেটে ভেজা মাটিতে পুঁতে দিলে কিছুদিনের মধ্যেই তা থেকে নতুন কুঁড়ি উৎপন্ন হয়। এসব কুঁড়ি বড় হয়ে একটি নতুন গোলাপ ফুল গাছ উৎপন্ন করে। কাজ : শাখা কলম বা কাটিং কীভাবে প্রস্তুত করতে হয় তা একটি গোলাপের ডাল নিয়ে প্রদর্শন কর।

পাঠ ৪ : যৌন প্রজনন

ফুল থেকে ফল এবং ফল থেকে বীজ হয়। বীজ থেকে নতুন গাছের জন্ম হয়। তাই ফুল উদ্ভিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এভাবে একটি সপুষ্পক উদ্ভিদ বংশ বৃদ্ধি করে। তোমার বিদ্যালয় বা বাড়ির আশেপাশে বহু ফুল ফুটে থাকে।

এগুলো থেকে দুইএকটি এনে পর্যবেক্ষণ করে দেখ। একটি ফুল নিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে দেখবে এর মোট পাঁচটি অংশ রয়েছে। অংশগুলো হলো পুষ্পাক্ষ, বৃতি, দল বা পাপড়ি, পুংকেশর ও গর্ভকেশর। কোনো কোনো ফুলে এর চেয়ে বাড়তি কিছু অংশ থাকতে পারে, যেমনÑজবা ফুলের উপবৃতি। আবার এ পাঁচটির যে কোনো একটি বা দুটি অংশ নাও থাকতে পারে। সবগুলো স্তবক থাকলে তাকে সম্পূর্ণ ফুল বলে। তবে কোনো একটি স্তবক না থাকলে তাকে অসম্পূর্ণ ফুল বলে। বৃন্ত থাকলে তাকে সবৃন্তক এবং বৃন্ত না থাকলে অবৃন্তক ফুল বলে।

ফুলের বিভিন্ন অংশ
what image shows


বৃতি : ফুলের সর্ব বাহিরের স্তবককে বৃতি বলে। সাধারণত এরা সবুজ রঙের হয়। বৃতি খন্ডিত না হলে সেটি যুক্ত বৃতি, কিন্তু যখন এটি খন্ডিত হয় তখন বিযুক্ত বৃতি বলে। এর প্রতি খন্ডকে বৃত্যাংশ বলে। বৃতি ফুলের অন্য অংশগুলোকে রোদ, বৃষ্টি ও পোকা-মাকড় থেকে রক্ষা করে।

দলমন্ডল : এটি বাইরের দিক থেকে দি¦তীয় স্তবক। কতগুলো পাপড়ি মিলে দলমণ্ডল গঠন করে। এর প্রতিটি অংশকে পাপড়ি বা দলাংশ বলে। পাপড়িগুলো পরস্পর যুক্ত (ধুতরা) অথবা পৃথক (জবা) থাকতে পারে। এরা বিভিন্ন রঙের হয়। দলমন্ডল রঙিন হওয়ায় পোকা-মাকড় ও পশুপাখি আকর্ষণ করে ও পরাগায়ন নিশ্চিত করে। এরা ফুলের অন্য অংশগুলোকে রোদ, বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে।

পুংস্তবক : এটি ফুলের তৃতীয় স্তবক। এই স্তবকে প্রতিটি অংশকে পুংকেশর বলে। পুংকেশরের দন্ডের ন্যায় অংশকে পুংদন্ড এবং শীর্ষের থলের ন্যায় অংশকে পরাগধানী বলে। পরাগধানীর মধ্যে পরাগ উৎপন্ন হয়। পরাগ থেকে পুং জননকোষ উৎপন্ন হয়। এরা সরাসরি জনন কাজে অংশগ্রহণ করে।

স্ত্রীস্তবক বা গর্র্ভকেশর : এটি ফুলের চতুর্থ স্তবক। এক বা একাধিক গর্ভপত্র নিয়ে একটি স্ত্রীস্তবক গঠিত হয়। একের অধিক গর্ভপত্র সম্পূর্ণভাবে পরস্পরের সাথে যুক্ত থাকলে তাকে যুক্তগর্ভপত্রী, আর আলাদা খাকলে বিযুক্তগর্ভপত্রী বলে। একটি গর্ভপত্রের তিনটি অংশ, যথা- গর্ভাশয়, গর্ভদন্ড ও গর্ভমুন্ড। গর্ভাশয়ের ভিতরে ডিম্বক সাজানো থাকে। ডিম্বকে স্ত্রী জননকোষ বা ডিম্বাণু সৃষ্টি হয়। এরা পুংস্তবকের ন্যায় সরাসরি জনন কাজে অংশগ্রহণ করে। বৃত্তি ও দলমন্ডলকে ফুলের সাহায্যকারী ¯তবক এবং পুংস্তবক ও ¯ত্রীস্তবককে অত্যাবশ্যকীয় ¯তবক বলে। পু®পমঞ্জরী পুষ্পমঞ্জরী তোমরা সবাই দেখেছ। গাছের ছোট একটি শাখায় ফুলগুলো বিশেষ একটি নিয়মে সাজানো থাকে। ফুলসহ এই শাখাকে পুষ্পমঞ্জরী বলে। পরাগায়নের জন্য এর গুরুত্ব খুব বেশি। এ শাখার বৃদ্ধি অসীম হলে অনিয়ত পুষ্পমুঞ্জরী ও বৃদ্ধি সসীম হলে তাকে নিয়ত পুষ্পমঞ্জরী বলে।

পাঠ ৫ ও ৬ পরাগায়ন

পরাগায়নকে পরাগসংযোগও বলা হয়। পরাগায়ন ফল ও বীজ উৎপাদন প্রক্রিয়ার পূর্বশর্ত। একটি ফুলের পুংস্তবকের পরাগধানীতে তোমার আঙুলের ডগা ঘষে দেখ। তোমার হাতে নিশ্চয়ই হলুদ বা কমলা রঙের গুঁড়ো লেগেছে। এই গুঁড়োবস্তুই পরাগ বা পরাগরেণু। ফুলের পরাগধানী হতে পরাগরেণুর একই ফুলে অথবা একই জাতের অন্য ফুলের গর্ভমুন্ডে স্থানান্তরিত হওয়াকে পরাগায়ন বলে। পরাগায়ন দু’প্রকার, যথা- স্ব-পরাগায়ন ও পর-পরাগায়ন।

স্ব-পরাগায়ন : একই ফুলে বা একই গাছের ভিন্ন দুটি ফুলের মধ্যে যখন পরাগায়ন ঘটে তখন তাকে স্ব- পরাগায়ন বলে। সরিষা, কুমড়া, ধুতুরা ইত্যাদি উদ্ভিদে স্ব-পরাগায়ন ঘটে। পর-পরাগায়ন : একই প্রজাতির দুটি ভিন্ন উদ্ভিদের ফুলের মধ্যে যখন পরাগ সংযোগ ঘটে তখন তাকে পর-পরাগায়ন বলে। শিমুল, পেঁপে ইত্যাদি গাছের ফুলে পর-পরাগায়ন হতে দেখা যায়।

পরাগায়নের মাধ্যম : পরাগ স্থানান্তরের কাজটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো না কোনো মাধ্যমের দ্বারা হয়ে থাকে। যে বাহক পরাগ বহন করে গর্ভমুন্ড পর্যন্ত নিয়ে যায় তাকে পরাগায়নের মাধ্যম বলে। বায়ু, পানি, কীট-পতঙ্গ, পাখি, বাদুড়, শামুক এমনকি মানুষ এ ধরনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে থাকে। মধু খেতে অথবা সুন্দর রঙের আকর্ষণে পতঙ্গ বা প্রাণী ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ায়। এ সময়ে পরাগরেণু বাহকের গায়ে লেগে যায়। এই বাহকটি যখন অন্য ফুলে গিয়ে বসে তখন পরাগ পরবর্তী ফুলের গর্ভমুন্ডে লেগে যায়। এভাবে তাদের অজান্তে পরাগায়নের কাজটি হয়ে যায়। পরাগায়নের মাধ্যমগুলোর সাহায্য পেতে ফুলের গঠনে কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। একে অভিযোজন বলা হয়। বিভিন্ন মাধ্যমের জন্য অভিযোজনগুলোও অলাদা। অভিযোজনগুলো নিমরূপ :

পতঙ্গপরাগী ফুলের অভিযোজন : ফুল বড়, রঙ্গীন, মধুগ্রন্থিযুক্ত। পরাগরেণু ও গর্ভমুন্ড আঁঠাল ও সুগন্ধযুক্ত, যেমনজবা, কুমড়া, সরিষা ইত্যাদি।

বায়ুপরাগী ফুলের অভিযোজন : ফুল ছোট, হালকা ও মধুগ্রন্থিহীন। এসব ফুলে সুগন্ধ নেই। এরা আকারে ক্ষুদ্র। এদের গর্ভমুন্ড আঁঠাল, শাখান্বিত, কখনও পালকের ন্যায়, যেমন-ধান। পানিপরাগী ফুলের অভিযোজন : এরা আকারে ক্ষুদ্র এবং হালকা। এরা সহজেই পানিতে ভাসতে পারে। এসব ফুলে সুগন্ধ নেই। স্ত্রীফুলের বৃন্ত লম্বা কিন্তু পুং ফুলের বৃন্ত ছোট। পরিণত পুংফুল বৃন্ত থেকে খুলে পানিতে ভাসতে থাকে, যেমন-পাতাশ্যাওলা। প্রাণিপরাগী ফুলের অভিযোজন : এসব ফুল মোটামুটি বড় ধরনের হয়। তবে ছোট হলে ফুলগুলো পুষ্পমঞ্জরীতে সজ্জিত থাকে। এদের রং আকর্ষণীয় হয়। এসব ফুলে গন্ধ থাকতে পারে বা নাও থাকতে পারে। যেমনÑ কদম, শিমুল, কচু ইত্যাদি।

পাঠ ৭ ও ৮ : নিষিক্তকরণ ও ফলের উৎপত্তি


জননকোষ (Gamate) সৃষ্টি, নিষিক্তকরণের পূর্বশর্ত। একটি পুং গ্যামেট অন্য একটি স্ত্রী-গ্যামেটের সঙ্গে পরিপূর্ণভাবে মিলিত হওয়াকে নিষিক্তকরণ বলে। Aa20.JPG

পরাগায়নের ফলে পরাগরেণু গর্ভমুন্ডে স্থানান্তরিত হয়। এখান থেকে নিঃসৃত রস শুষে নিয়ে এটি ফুলে উঠে এবং এর আবরণ ভেদ করে একটি নালি বেরিয়ে আসে। এটি পরাগনালি। পরাগনালি গর্ভদন্ড ভেদ করে গর্ভাশয়ে ডিম্বকের কাছে গিয়ে পৌঁছে। ইতোমধ্যে এই পরাগনালিতে দুটো পুং গ্যামেট সৃষ্টি হয়। ডিম্বকের ভিতর পৌঁছে এ নালিকা ফেটে যায় এবং পুং গ্যামেট দুটো মুক্ত হয়। ডিম্বকের ভিতর ভ্রƒণথলি থাকে। এর মধ্যে স্ত্রী গ্যামেট বা ডিম্বাণুু উৎপন্ন হয়। পুং গ্যামেটের একটি এই স্ত্রী গ্যামেটের সঙ্গে মিলিত হয়। এভাবে নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়া শেষ হয়। অন্য পুং গ্যামেটটি গৌণ কেন্দ্রিকার সাথে মিলিত হয় এবং শস্যকনা উৎপন্ন করে।

ফলের উৎপত্তি : আমরা ফল বলতে সাধারণত আম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, আঙুর, আপেল, পেয়ারা, সফেদা ইত্যাদি সুমিষ্ট ফলগুলোকে বুঝি। এগুলো পেকে গেলে রান্না ছাড়াই খাওয়া যায়। লাউ, কুমড়া, ঝিঙা, পটল এরাও ফল। এদের কাঁচা খাওয়া হয় না বলে এদের সবজি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রকৃতপক্ষে এরা সবাই ফল। নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়া শেষ হলেই ফল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়া গর্ভাশয়ে যে উদ্দীপনার সৃষ্টি করে তার কারণে ধীরে ধীরে গর্ভাশয়টি ফলে পরিণত হয়। এর ডিম্বকগুলো বীজে রূপান্তরিত হয়। নিষিক্তকরণের পর গর্ভাশয় এককভাবে অথবা ফুলের অন্যান্য অংশসহ পরিপুষ্ট হয়ে যে অঙ্গ গঠন করে তাকে ফল বলে।

শুধু গর্ভাশয় ফলে পরিণত হলে তাকে প্রকৃত ফল বলে, যেমন- আম, কাঁঠাল। গর্ভাশয় ছাড়া ফুলের অন্যান্য অংশ পুষ্ট হয়ে যখন ফলে পরিণত হয় তখন তাকে অপ্রকৃত ফল বলে, যেমন-আপেল, চালতা ইত্যাদি। সকল প্রকৃত ও অপ্রকৃত ফলকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা যায়, যেমন- সরল ফল, গুচ্ছফল ও যৌগিক ফল।

১) সরল ফল : ফুলের একটি মাত্র গর্ভাশয় থেকে যে ফলের উৎপত্তি তাকে সরল ফল বলে, যেমন- আম। এরা রসাল বা শুষ্ক হতে পারে।

রসাল ফল : যে ফলের ফলত্বক পুরু এবং রসাল তাকে রসাল ফল বলে। এ ধরনের ফল পাকলে সাধারণ ফলত্বক ফেটে যায় না। যেমন- আম, জাম, কলা ইত্যাদি।

নীরস ফল : যে ফলের ফলত্বক পাতলা এবং পরিপক্ক হলে ত্বক শুকিয়ে ফেটে যায় তাকে নীরস ফল বলে। যেমনশিম, ঢেঁড়স, সরিষা ইত্যাদি।

২) গুচ্ছ ফল : একটি ফুলে যখন অনেকগুলো গর্ভাশয় থাকে এবং প্রতিটি গর্ভাশয় ফলে পরিণত হয়ে একটি বোঁটার উপর গুচ্ছাকারে থাকে তখন তাকে গুচ্ছ ফল বলে, যেমন-চম্পা, নয়নতারা, আকন্দ।

৩) যৌগিক ফল : একটি মঞ্জরীর সম্পূর্ণ অংশ যখন একটি ফলে পরিণত হয় তখন তাকে যৌগিক ফল বলে, যেমনআনারস, কাঁঠাল।
কাজ : কয়েকটি ফল সংগ্রহ কর এবং এগুলো কী ধরনের ফল তা খাতায় লেখ। একটি কচি আমের লম্বচ্ছেদ কর এবং এর ভিতরের অংশগুলোর চিহ্নিত চিত্র আঁক।

পাঠ ৯ ও ১০ : বীজের গঠন ও অঙ্কুরোদগম

বীজের গঠন : একটি বাটির মধ্যে একটি ফিল্টার পেপার রেখে পানি দিয়ে ভিজিয়ে তার উপর ৮/১০টি ভেজা ছোলার বীজ ৩/৪ দিন ঢেকে রেখে দিলে এগুলো থেকে অঙ্কুর বের হবে। বীজের সুঁচাল অংশের কাছে একটি ছিদ্র আছে, একে মাইক্রোপাইল বলে। এর ভিতর দিয়ে ভ্রূণমূল বাইরে বেরিয়ে আসে। অঙ্কুর বের হওয়া বীজটিকে দু আঙ্গুল দিয়ে সামান্য চাপ দিয়ে ছোলা বীজের আবরণটি সরিয়ে ফেললে হলুদ রঙের একটি অংশ বের হবে, এটিকে আরও একটু চাপ দিলে পুরু বীজপত্র দুটি দুই দিকে খুলে যাবে। এ দুটো যেখানে লেগে আছে সেখানে সাদা রঙের একটি লম্বাটে অঙ্গ দেখা যাবে। এর নিচের দিকের অংশকে ভ্রƒণমূল এবং উপরের অংশকে ভ্রণকাণ্ড বলে। ভ্রণকান্ডের নিচের অংশকে বীজপত্রাধিকাণ্ড (এপিকোটাইল) ও ভ্রণমুলের উপরের অংশকে বীজপত্রাবকাণ্ড (হাইপোকোটাইল) বলে। ভ্রূণমূল, ভ্রণকাণ্ড ও বীজপত্রকে একত্রে ভ্রণ এবং বাইরের আবরণটিকে বীজত্বক বলে। বীজত্বক দু’স্তরবিশিষ্ট। বাইরের অংশকে টেষ্টা এবং ভিতরের স্তরকে টেগমেন বলে।
কাজ : পরীক্ষার মাধ্যমে একটি মটর বীজের বিভিন্ন অংশ প্রদর্শন কর।

অঙ্কুরোদগম : বীজ থেকে শিশু উদ্ভিদ উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াকে অঙ্কুরোদগম বলে। যথাযথভাবে অঙ্কুরোদগম হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পানি, তাপ ও অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। যখন বীজপত্র মাটির নিচে অবস্থান করে আর ভ্রƒণকাণ্ড মাটি ভেদ করে উপরে উঠে আসে কিন্তু বীজপত্রটি মাটির ভিতরে থেকে যায় তখন তাকে মৃদগত অঙ্কুরোদগম বলে, যেমন ছোলা, ধান ইত্যাদি। কখনও বীজপত্রসহ ভ্রণমুকুল মাটি ভেদ করে উপরে উঠে আসে তখন তাকে মৃদভেদী অঙ্কুরোদগম বলে। কুমড়া, রেড়ী, তেঁতুল ইত্যাদি বীজে মৃদভেদী অঙ্কুরোদগম দেখা যায়। Aa23.JPG

ছোলা বীজের অঙ্কুরোদগম : এক্ষেত্রে মৃদগত অঙ্কুরোদম হয়। এই প্রকার অঙ্কুরোদগমে বীজপত্র দু’টি মাটির নিচে রেখে ভ্রণকাণ্ড উপরে উঠে আসে। এপিকোটাইলের অতিরিক্ত বৃদ্ধি এর কারণ। ছোলাবীজ একটি অশস্যল দ্বিবীজপত্রী বীজ। মাটিতে ছোলা বীজ বুনে পরিমিত পানি, তাপ ও বায়ুর ব্যবস্থা করলে দুই তিন দিনের মধ্যে বীজ হতে অঙ্কুর বের হবে এবং মাটির উপরে উঠে আসবে। পানি পেয়ে বীজটি প্রথমে ফুলে উঠে এবং ডিম্বক রন্ধ্রের ভিতর দিয়ে ভ্রূণমূল বেরিয়ে আসে। এটি ধীরে ধীরে প্রধান মূলে পরিণত হয়। দ্বিতীয় ধাপে ভ্রণকাণ্ড মাটির উপরে উঠে আসে। এক্ষেত্রে ভ্রণপত্র দুটো মাটির নিচে থেকে যায়। প্রাথমিক অবস্থায় ভ্রণ তার খাদ্য বীজপত্র থেকে পেয়ে থাকে। এটি কোন ধরনের অঙ্কুরোদগম ?

এ অধ্যায় পাঠ শেষে যা শিখলাম- - প্রজনন প্রধানত দু’ধরনের, যথাÑ অযৌন ও যৌন।
- ফুল উন্নত উদ্ভিদের জনন অঙ্গ।
- একটি আদর্শ ফুলের পাঁচটি অংশ।
- ফল প্রধানত তিন ধরনের, সরল, গুচ্ছিত ও যৌগিক।
- অংকুরোদগম দু’ধরনের, যথা-মৃদগত ও মৃদভেদী।