what image shows

বিজ্ঞান

অষ্টম শ্রেণি


দশম অধ্যায় : অম্ল, ক্ষারক ও লবণ

লেবুর রস, ভিনেগার, চুন, এন্টাসিড ঔষধ, খাবার লবণ এগুলো আমাদের অতি প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী। এদের মধ্যে কোনোটি অম্ল-বা এসিড, কোনোটি ক্ষারক আবার হয়তো লবণ। এদের রাসায়নিক ধর্মও ভিন্ন ভিন্ন। ধর্ম অনুযায়ী এদের একেকটি এক এক কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা- * অম্ল-ও ক্ষারকের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে পারব। * ক্ষারের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে পারব। * লবণের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে পারব। * নিরপেক্ষ পদার্থ ব্যাখ্যা করতে পারব। * পরীক্ষণ কার্যক্রমে যন্ত্রপাতি ব্যবহার সঠিকভাবে করতে পারব। * আমাদের জীবনে অম্ল- , ক্ষার ও লবণের অবদান উপলব্ধি করব। * পরীক্ষণ কার্যক্রম চলাকালীন প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণে দলীয় সদস্যদের সচেতন করতে পারব। পাঠ ১-৪ : আম্ব- , ক্ষারক ও নির্দেশক কাজ : অম্ল-কী তা জানা। প্রয়োজনীয় উপকরণ : লেবুর রস, লিটমাস পেপার, বিকার, চিমটা। পদ্ধতি : টেষ্টটিউবে ২-৩ মিলিলিটার লেবুর রস নাও। প্রথমে চিমটা দিয়ে লাল লিটমাস কাগজ বিকারে নেওয়া লেবুর রসে ডুবাও। কাগজের রং কি পরিবর্তন হলো ? না, হলো না। এবার নীল লিটমাস কাগজ লেবুর রসে ডুবাও। এখন কি লিটমাস কাগজের রং পরিবর্তন হলো ? হ্যাঁ, লিটমাস কাগজের রং নীল থেকে লাল হয়ে গেল। তোমরা কি জান এর কারণ কী? লিটমাস কাগজ তৈরি করা হয় সাধারণ কাগজে লিচেন (Lichens) নামক এক ধরনের গাছ থেকে প্রাপ্ত রঙের সাহায্যে। এভাবে প্রাপ্ত লিটমাস কাগজ দেখতে রক্তবর্ণের হয়। এই রক্তবর্ণের লিটমাস কাগজকে পটাশিয়াম কার্বনেট (K2CO3) ও অ্যামোনিয়া (HN3) দিয়ে গাঁজন (Fermentation) করলে তা নীলবর্ণ ধারণ করে। অন্যদিকে নীলবর্ণের লিটমাস কাগজে সালফিউরিক এসিড (H2SO4) বা হাইড্রোক্লোরিক এসিড যোগ করলে তা লাল বর্ণের লিটমাস কাগজে পরিণত হয়। অন্যদিকে লেবুর রসে থাকে সাইট্রিক এসিড। এতে যখন লাল লিটমাস ডুবানো হয়, তখন কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া হয় না, ফলে লিটমাস কাগজের রঙের কোনোই পরিবর্তন হয় না। পক্ষান্তরে নীল লিটমাস কাগজ ডুবালে, এতে থাকা অ্যামোনিয়ার সাথে লেবুর সাইট্রিক এসিডের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, ফলে লিটমাস কাগজের রং পরিবর্তিত হয়ে যায়। তাহলে একথা বলা যায় যে, এসিডের একটি ধর্ম হলো এরা নীল লিটমাসকে লাল করে। তোমরা কি জান লেবুর রসের মতো আমলকি, করমচা, কামরাঙ্গা, বাতাবি লেবু, আঙুর ইত্যাদি টক লাগে কেন? কারণ হলো এই ফলগুলোতে নানা রকম এসিড থাকে। অর্থাৎ এটা বলা যায় যে, এসিডসমূহ টকস্বাদযুক্ত হয়। নিচের টেবিলে বেশকিছু ফল ও এতে উপস্থিত এসিডের নাম দেওয়া হলো। কাজ : ক্ষারকের সম্পর্কে জানা প্রয়োজনীয় উপকরণ : চুন, বিকার, পানি, লাল ও নীল লিটমাস কাগজ, হাতমোজা, নাড়ানি, চামচ, ড্রপার, চিমটা। পদ্ধতি : হাতমোজা পরে চামচ দিয়ে ৫-১০ গ্রাম চুন বিকারে নাও। এবার ড্রপার দিয়ে আস্তে আস্তে ১০০ মিলিলিটার পানি যোগ কর। নাড়ানি দিয়ে ভালোভাবে নাড়া দাও। এরপর ১০ মিনিট মিশ্রণটিকে রেখে দাও। সতর্কতার সাথে মিশ্রণের উপরিভাগ থেকে পরিষ্কার দ্রবণ আলাদা করে নাও। এই পরিষ্কার দ্রবণটিই হলো চুনের পানি। এখন চুনের পানিতে চিমটা দিয়ে লাল ও নীল লিটমাস কাগজ ডুবাও। লিটমাস কাগজের রং কি পরিবর্তন হলো ? হ্যাঁ, লাল লিটমাস কাগজের রং পরিবর্তিত হয়ে নীল হয়ে গেল আর নীল লিটমাসের রং পরিবর্তন হলো না। নীল লিটমাস কাগজে অ্যামোনিয়া থাকে আর অ্যামোনিয়া ও চুনের পানিতে থাকা ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সাইড [[Ca(OH)2]] একই ধর্মবিশিষ্ট হওয়ায় একে অপরের সাথে কোনো বিক্রিয়া করে না। ফলে লিটমাস কাগজের রঙের কোনো পরিবর্তন হয় না। পক্ষান্তরে লাল লিটমাস কাগজে থাকে এসিড যা বিপরীতধর্মী [[Ca(OH)2]] এর সাথে বিক্রিয়া করে, ফলে লিটমাস কাগজের রং পরিবর্তিত হয়। চুনের পানিতে থাকা [[Ca(OH)2]] এর মতো যে সকল রাসায়নিক পদার্থ লাল লিটমাস কাগজকে নীল করে তাদেরকে আমরা ক্ষারক বলি। সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড (NaOH) একটি ক্ষারক যা সাবান তৈরির একটি মূল উপাদান। এটি কাগজ ও রেয়ন শিল্পেও ব্যবহৃত হয়। নির্দেশক : তোমরা উপরে যে লিটমাস কাগজ ব্যবহার করলে তা নিজের রং পরিবর্তনের মাধ্যমে কোনো একটি পদার্থ আম্ব-না ক্ষারক তা নির্দেশ করল। লিটমাস কাগজ এর মতো যেসব পদার্থ নিজেদের রং পরিবর্তনের মাধ্যমে কোনো একটি বস্তু আম্ব-না ক্ষার বা কোনোটিই নয় তা নির্দেশ করে তাদেরকে নির্দেশক বলে। লিটমাস কাগজের মতো মিথাইল অরেঞ্জ, ফেনোলফথ্যালিন, মিথাইল রেড এগুলো নানা রকমের নির্দেশক যারা একটি অজানা পদার্থ এসিড, ক্ষার না নিরপেক্ষ তা বুঝতে সাহায্য করে। তোমরা কি জান এসিড ও ক্ষারকের মূল পার্থক্য কী? এটি বুঝার জন্য প্রথমে আমরা কয়েকটি এসিডের সংকেত লক্ষ করি। ভিনেগার বা এসিটিক এসিড (CH3COOH), অক্সালিক এসিড (HOOC-COOH), হাইড্রোক্লোরিক এসিড (HCl), সালফিউরিক এসিড (H2SO4) । এই সবগুলো এসিডের মিল কোথায়? এদের সবগুলোতেই এক বা একাধিক H আছে এবং এরা সবাই পানিতে হাইড্রোজেন আয়ন (H+) তৈরি করে। তাহলে বলা যায় যে, এসিড হলো H সকল রাসায়নিক পদার্থ যাদের মধ্যে এক বা একাধিক H হাইড্রোজেন পরমাণু থাকে এবং যারা পানিতে H+ উৎপন্ন করে। মিথেন (CH4) কি এসিড? না, এসিড নয়। কারণ যদিও মিথেনে ৪টি H পরমাণু আছে, কিন্তু মিথেন পানিতে H+ তৈরি করে না। এবার কয়েকটি ক্ষারকের দিকে লক্ষ করি। সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড (NaOH), পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইড (KOH), অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড (NH4OH), ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড [Ca(OH)2]। বল তো সবগুলোর মধ্যে মিল কোথায়? এদের সবগুলোতেই OH আছে। অর্থাৎ ক্ষারক হলো সেই সকল রাসায়নিক বস্তু যাদের মধ্যে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন পরমাণু থাকে এবং যারা পানিতে হাইড্রক্সিল আয়ন (OH-) হাইড্রোক্সাইড তৈরি করে। তবে কিছু কিছু রাসায়নিক পদার্থ, যেমন- ক্যালসিয়াম অক্সাইড বা চুন, অ্যামোনিয়া (NH3), যাদের মধ্যে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন দু’ধরনের পরমাণু নেই, কিন্তু এরা পানিতে OH- তৈরি করে, এদেরকেও ক্ষারক বলা হয়। ক্ষার (Alkali) : তোমরা এর আগে জেনেছ যে, ক্ষারক হলো মূলত ধাতব অক্সাইড বা হাইড্রোক্সাইড। কিছু কিছু ক্ষারক আছে যারা পানিতে দ্রবীভূত হয় আর কিছু আছে যারা দ্রবীভূত হয় না। যে সমস্ত ক্ষারক পানিতে দ্রবীতূত হয় তাদেরকে বলে ক্ষার। তাহলে ক্ষার হলো বিশেষ ধরনের ক্ষারক। NaOH, KOH, Ca(OH)2 , NH4 OH এরা সবাই ক্ষার। এদেরকে কিন্তু ক্ষারকও বলা যায়। পক্ষান্তরে অ্যালুমিনিয়াম হাইড্রোক্সাইড [Al(OH)2 ] কিন্তু পানিতে দ্রবীভূত হয় না। তাই এটি একটি ক্ষারক হলেও ক্ষার নয়। অতএব একথা বলা যায় যে, সকল ক্ষার ক্ষারক হলেও সকল ক্ষারক কিন্তু ক্ষার নয়। আবার CuO একটি ক্ষারক কিন্তু ক্ষার নয়। তোমরা সবাই জান যে সাবান স্পর্শ করলে পিচ্ছিল মনে হয়। এর কারণ হলো সাবানে ক্ষারক থাকে। তাহলে বলা যায় যে, ক্ষার ও ক্ষারকের একটি বৈশিষ্ট্য হলো এরা পিচ্ছিল হয়। আবার দেখা গেছে যে ক্ষার ও ক্ষারকসমূহ সাধারণত তিতা স্বাদযুক্ত হয়। উল্লখ্য যে, কখনই পরীক্ষাগারে ক্ষারকের স্বাদ পরীক্ষা করা যাবে না। পাঠ ৫ ও ৬ : এসিড ও ক্ষারকের ব্যবহার তোমরা কি জান আমাদের বহুল ব্যবহৃত বিচিং পাউডার কীভাবে তৈরি হয়? এটি তৈরি হয় শুকনো ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড ও ক্লোরিন গ্যাসের (C12 ) বিক্রিয়া ঘটিয়ে। আবার ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইডের পাতলা দ্রবণ যা চুনের পানি বা লাইম ওয়াটার (Lime water) নামে পরিচিত সেটি আমাদের ঘরবাড়ি হোয়াইট ওয়াশ করতে ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে পানি ও ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইডের তৈরি পেষ্ট যা মিল্ক অফ লাইম (Milk of Lime) নামে অধিক পরিচিত, তা পোকামাকড় দমনে ব্যবহৃত হয়। তোমরা কি জান আমাদের পাকস্থলীতে এসিডিটি হলে যে এন্টাসিড ঔষধ খাই তা আসলে কী? এন্টাসিড ঔষধ হলো মূলত ম্যাগনেসিয়াম হাইড্রোক্সাইড [Mg(OH)2 ] যা সাসপেনশান ও ট্যাবলেট দুভাবেই পাওয়া যায়। হাইড্রোক্সিল (OH)2 এর সাসপেনশান মিল্ক অফ ম্যাগনেসিয়া (Milk of Magnesia) নামেই অধিক পরিচিত। কখনও কখনও এন্টাসিডে অ্যালুমিনিয়াম হাইড্রোক্সাইডও [Al (OH)3 ] থাকে। ফলমূল বা সবজিতে যে সকল এসিড থাকে এদেরকে জৈব এসিড বলে। এদেরকে খাওয়া যায় এবং কোনো কোনটি মানব দেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। যেমন- এসকরবিক এসিড যা আমরা ভিটামিন সি বলে জানি। এর অভাবে মানবদেহে স্কার্ভি (Scurv) রোগ হয়। অন্যদিকে কিছু কিছু এসিড আছে যেমন- হাইড্রোক্লোরিক এসিড (HCl), সালফিউরিক এসিড (H2 SO4 )), ফসফরিক এসিড (H3 PO4 ), নাইট্রিক এসিড (HNO3 ), পারকোরিক এসিড (HClO4 ) ইত্যাদি যেগুলো প্রকৃতিতে প্রাপ্ত নানারকম খনিজ পদার্থ থেকে তৈরি করা হয়, এদেরকে খনিজ এসিড (Mineral Acids) বলে। এগুলো খাওয়ার উপযোগী নয়। বরং বলা যায় এরা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। খনিজ এসিড ত্বকে লাগলে ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি হয়। তোমরা কি জান আমাদের সমাজের কিছু খারাপ চরিত্রের লোক যে এসিড ছুড়ে মানুষের শরীর ঝলসে দেয় সেগুলো কোন ধরনের এসিড? এগুলো হলো খনিজ এসিড, বিশেষ করে H2 SO4 । তোমরা কি জান এসিড ছোড়ার শাস্তি কী? এসিড ছোড়ার শাস্তি খুবই কঠোর, এমনকি মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। দুষ্ট চরিত্রের লোকেরা এসিড ছুড়ে একদিকে যেমন মারাত্মক অপরাধ করছে অন্যদিকে শিল্প কারখানায় অতি প্রয়োজনীয় এসিড অপচয় করছে। এর বিরুদ্ধে অবশ্যই আমাদের সোচ্চার হতে হবে এবং মানুষকে সচেতন করতে হবে। সেক্ষেত্রে আমরা পোষ্টার, লিফলেট এগুলো তৈরি করে মানুষের মধ্যে বিলি করতে পারি। এতে একদিকে যেমন আমাদের মূল্যবান সম্পদ খনিজ এসিডসমূহের অপচয় রোধ করা যাবে অন্যদিকে এসিড ছোড়ার মতো মারাত্মক শাস্তিযোগ্য অপরাধ থেকে আমাদের সমাজও রক্ষা পাবে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এবং শিল্প কারখানায় এসিডের ব্যবহার অনস্বীকার্য। আমরা টয়লেট পরিষ্কারের কাজে যে সমস্ত পরিষ্কারক ব্যবহার করি তাতে থাকে এসিড। সোনার গহনা তৈরির সময় স্বর্ণকাররা নাইট্রিক এসিড ব্যবহার করেন। আমরা বিভিন্ন কাজে যেমনÑ- আইপিএস, গাড়ি, মাইক বাজানোর সময়, সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে ব্যাটারি ব্যবহার করি তাতে সালফিউরিক এসিড ব্যবহৃত হয়। তোমরা অনেকে হয়তো জান যে, বাসাবাড়িতে সাপের উপদ্রব কমানোর জন্য যে রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহৃত হয় সেটি হলো কার্বোলিক এসিড। তোমরা কি জান আমাদের খাদ্যদ্রব্য হজম করার জন্য পাকস্থলীতে এসিড অত্যাবশ্যকীয় এবং সেটি হলো হাইড্রোক্লোরিক এসিড। সার কারখানায় অতি প্রয়োজনীয় একটি উপাদান হলো সালফিউরিক এসিড। এছাড়া ডিটারজেন্ট থেকে শুরু করে নানারকম রং, ঔষধপত্র, কীটনাশকসহ পেইন্ট, কাগজ, বিস্ফোরক ও রেয়ন তৈরিতে প্রচুর H2 SO4 ব্যবহৃত হয়। কোনো একটি দেশ কতটা শিল্পোন্নত তা বিচার করা হয় ঐ দেশ কতটুকু 2 SO4 তৈরি করে তার উপর ভিত্তি করে। ইস্পাত তৈরির কারখানায়, ঔষধ, চামড়া শিল্প ইত্যাদি অনেক শিল্পে ঐঈষ ব্যবহৃত হয়। সার কারখানায়, বিস্ফোরক প্রস্তুতি, খনি থেকে মূল্যবান ধাতু যেমন সোনা আহরণে ও রকেটে জ্বালানির সাথে HNO3 ব্যবহৃত হয়। পাঠ ৭- ১০ : এসিড ও ক্ষারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য কাজ : চুনাপাথরের সাথে হাইড্রোক্লোরিক এসিডের বিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ। প্রয়োজনীয় উপকরণ : চুনাপাথর, ১টি চামচ, পাতলা হাইড্রোক্লোরিক এসিড, কাচের ড্রপার, এ্যাপ্রোন। পদ্ধতি : এ্যাপ্রোনটি পরে নাও। চুনাপাথর গুঁড়া করে নাও। চুনাপাথরের গুঁড়া চামচে নাও। এবার কাঁচের ড্রপার দিয়ে পাতলা হাইড্রোক্লোরিক এসিড চামচে যোগ করতে থাক। কোনো পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছ? গ্যাসের বুদবুদ উঠছে? হ্যাঁ, গ্যাসের বুদবুদ উঠছে এবং অনেকটা ফেনার মতো মনে হচ্ছে। কারণ হলো চুনাপাথরে (CaCO3 ) পাতলা হাইড্রোক্লোরিক এসিড যোগ করাতে ক্যালসিয়াম কার্বনেট ও হাইড্রোক্লোরিক এসিডের মধ্যে বিক্রিয়া ঘটে এবং ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড ও কার্বন ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন হয় এবং সে কারণেই আমরা বুদবুদ দেখি। উৎপন্ন্ কার্বন ডাইঅক্সাইড চলে গেলে আমরা ক্যালসিয়াম ক্লোরাইডের ও পানির পরিষ্কার দ্রবণ দেখতে পাই। হাইড্রোক্লোরিক এসিডের মতো প্রায় সকল এসিডই কার্বোনেটের সাথে বিক্রিয়া করে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন করে। তোমরা শুনে আশ্চর্য হবে যে, কখনও কখনও এসিডের এই ধর্মকে কাজে লাগিয়ে উৎপন্ন CO2 আগুন নেভানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। তোমরা বল তো খাবার সোডা (NaHCO2 ) ও হাইড্রোক্লোরিক এসিডের বিক্রিয়ায় কী ঘটবে ? খাবার সোডা ও হাইড্রোক্লোরিক এসিডের বিক্রিয়ায় সোডিয়াম ক্লোরাইড লবণ, পানি ও CO2 গ্যাস উৎপন্ন হবে। তোমরা আগের শ্রেণিতে খাবার সোডাতে লেবুর রস বা ভিনেগার যোগ করলে কী ঘটে তা জেনেছ। তোমাদের তা কি মনে আছে? এখানে কী ধরনের বিক্রিয়া ঘটবে তা নিজেরা লেখ। কাজ : এসিডের সাথে ধাতু মিশালে কী ঘটে তা দেখা প্রয়োজনীয় উপকরণ : ধাতু হিসেবে দস্তার গুঁড়া (Zn), পাতলা হাইড্রোক্লোরিক এসিড, স্পিরিট ল্যাম্প, টেস্টটিউব, এ্যাপ্রোন। পদ্ধতি : এ্যাপ্রোন পরে নাও। টেস্টটিউবের অর্ধেক পরিমাণ ভরে পাতলা হাইড্রোক্লোরিক এসিড নাও। অল্প পরিমাণ দস্তার গুঁড়া টেষ্টটিউবে নেওয়া এসিডে ছেড়ে দাও। কোনো গ্যাসের বুদবুদ উঠছে কি? না উঠলে স্পিরিট ল্যাম্প জ্বালিয়ে টেস্ট টিউবের তলায় হালকা তাপ দাও । গ্যাসের বুদবুদ উঠছে কি? এটি দস্তা ও হাইড্রোক্লোরিক এসিডের বিক্রিয়ায় উৎপন্ন হাইড্রোজেন গ্যাসের বুদবুদ। এটি হাইড্রোজেন গ্যাস কিনা তা পরীক্ষা করে দেখতে পার। টেস্টটিউবের মুখে একটি জ্বলন্ত দিয়াশলাই ধরে দেখ কী ঘটে? পপ পপ শব্দ করে জ্বলছে? হ্যাঁ ঠিক তাই। এটি হাইড্রোজেন ছাড়া অন্য গ্যাস হলে এমন শব্দ হতো না। হাইড্রোক্লোরিক এসিডের মতো প্রায় সকল এসিডই ধাতুর সাথে বিক্রিয়া করে হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন করে। কাজ : চুনের সাথে পানি মিশালে কী ঘটে তা দেখ। প্রয়োজনীয় উপকরণ : চুন, পানি, বিকার, হাতমোজা, স্পেচুলা, ড্রপার। পদ্ধতি : ৫ গ্রাম পরিমাণ (ভিন্ন পরিমাণও নেওয়া যেতে পারে) চুন বিকারে নাও। ড্রপার দিয়ে ৪০ গ্রাম পানি আস্তে আস্তে যোগ কর। হাতমোজা পরে বিকার স্পর্শ কর। পানি যোগ করার পর কোনো পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছ? বিকার অনেক বেশি গরম হয়ে যাচ্ছে আর বিকারের মিশ্রণটি অনেকটা ফুটন্ত পানির মতো টগবগ করছে। চুনে পানি যোগ করায় চুন ও পানির মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড উৎপন্ন হয়। এই বিক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপে পানি ফুটতে থাকে। কাজ : চুনের পানির সাথে এসিডের বিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ। প্রয়োজনীয় উপকরন : চুন, পানি, সালফিউরিক এসিড, বিকার, লাল লিটমাস কাগজ, নাড়ানি, চিমটা, ড্রপার। পদ্ধতি : পুর্বের মতো চুনের পানি তৈরি কর। ছোট বিকারে ১০ মিলিলিটার চুনের পানি নাও। এবার চিমটা দিয়ে লাল লিটমাস কাগজকে চুনের পানিতে ডুবাও। লিটমাস কাগজের রং লাল থেকে নীল হয়ে গেল কি? হ্যাঁ, ঠিক তাই। এতে প্রমাণিত হলো চুনের পানি একটি ক্ষারকীয় পদার্থ। এবার পাতলা সালফিউরিক এসিড ড্রপার দিয়ে আস্তে আস্তে যোগ কর ও নাড়ানি দিয়ে নাড়া দাও। লিটমাস কাগজ বিকারের দ্রবণে ডুবিয়ে দেখ এর রঙের কী ধরনের পরিবর্তন হয়। এভাবে আস্তে আস্তে H2 SO2 যোগ করতে থাক এবং লিটমাস কাগজ ডুবিয়ে পরীক্ষা কর। এক পর্যায়ে দেখবে লিটমাস কাগজের রং আর পরিবর্তন হচ্ছে না। কেন লিটমাস কাগজের রং পরিবর্তন হচ্ছে না? কারণ হলো চুনের পানিতে থাকা ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড যোগকৃত H2 SO4 এর সাথে বিক্রিয়া করে ক্যালসিয়াম সালফেট ও পানি উৎপন্ন করে। ফলে ধীরে ধীরে Ca(OH)2 এর পরিমাণ কমতে থাকে এবং যখন সব H2 SO4 ,Ca(OH)2 এর সাথে বিক্রিয়া করে ফেলে তখন লিটমাস কাগজের রং আর পরিবর্তন হয় না। এখানে উৎপন্ন ক্যালসিয়াম সালফেট হলো একটি লবণ। তাহলে আমরা বলতে পারি ক্ষারক ও এসিডের বিক্রিয়ায় উৎপন্ন মূল পদার্থই (পানি ছাড়া) হলো লবণ। আরও কিছু ক্ষারক ও এসিডের বিক্রিয়ায় উৎপন্ন লবণ দেখে নেওয়া যাক : তবে একমাত্র যে ক্ষারক ও এসিডের বিক্রিয়াতেই লবণ উৎপন্ন হয় তা নয়। অন্য বিক্রিয়ার মাধ্যমেও লবণ উৎপন্ন করা যায়। যেমন- ধাতু ও এসিডের মধ্যে বিক্রিয়ায় লবণ উৎপন্ন হয়। আবার কার্বোনেটের সাথে (যা একটি লবণ) এসিডের বিক্রিয়া ঘটিয়েও লবণ উৎপন্ন করা যায়। পাঠ ১১-১৩ : অম্ল- , ক্ষার ও লবণ শনাক্তকরণ কাজ : পানিও খাবার লবণের মিশ্রণে লিটমাস কাগজের রং পরিবর্তন হয় কি না তা দেখা। প্রয়োজনীয় উপকরণ : বিকার, নাড়ানি, লবণ, পানি, লাল ও নীল লিটমাস কাগজ, চিমটা। পদ্ধতি : একটি বিকারে ৫০ মিলিলিটার পানি নিয়ে তাতে ১০-১৫ গ্রাম খাবার লবণ যোগ কর। নাড়ানি দিয়ে ভালোভাবে নাড়া দাও। এবার চিমটা দিয়ে প্রথমে নীল লিটমাস কাগজ ও পরে লাল লিটমাস কাগজ লবণ-পানির মিশ্রণে ডুবাও। লিটমাস কাগজের রং কি পরিবর্তন হলো? না, হলো না। কেন হলো না? কারণ হলো এখানে কোনো এসিড বা ক্ষারক নেই। এসিড থাকলে নীল লিটমাস লাল হতো আর ক্ষারক থাকলে লাল লিটমাস নীল হতো। পানিতে আছে লবণ যা একটি নিরপেক্ষ পদার্থ। না এসিড, না ক্ষারক। তাই কোনো লিটমাস কাগজের রং পরিবর্তন হয় না। খাবার লবণের মতো অনেক লবণ আছে যারা নিরপেক্ষ পদার্থ অর্থাৎ এরা লিটমাস কাগজের রং পরিবর্তন করে না। বি:দ্র: কখনও কখনও বিশেষ কারণে [যেমন- দূষণ] পানিতে এসিড বা ক্ষারক থাকতে পারে। তখন কিন্তু নিরপেক্ষ পদার্থ হলেও পানি লিটমাস কাগজের রং পরিবর্তন করতে পারে। কাজ : ফুল ও সবজির নির্যাস তৈরি ও অম্ল-ও ক্ষারক শনাক্তকরণ শেখা। প্রয়োজনীয় উপকরণ : জবা, বাগান বিলাস ও হলুদ কৃষ্ণচুড়া ফুলের পাপড়ি, বেগুনি বাঁধাকপির পাতা, সালাদ তৈরির বীট, পুঁই শাকের বীজ, বিকার (৬টি), নাড়ানি, পানি, বুনসেন বার্নার বা গ্যাসের চুলা, ফিল্টার কাগজ, বোতল, কাগজ কলম, লেবুর রস, ভিনেগার, টক দই, চুনের পানি, সাবান পানি, খাবার সোডা, সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড, হাইড্রোক্লোরিক এসিড, কাচের খন্ড, ড্রপার। পদ্ধতি : উপরে বর্ণিত নানা রকম ফুল ও সবজির উপাদান সংগ্রহ কর। আলাদাভাবে এক একটি বিকারে এক একটি ফুলে পাপড়ি বা সবজির উপাদান নিয়ে তাতে পরিমাণ মতো পানি দিয়ে বুনসেন বার্নার বা চুলায় জ্বাল দাও। পানি প্রায় অর্ধেক হলে, মিশ্রণগুলো ঠান্ডা কর। ফিল্টার কাগজ দিয়ে আলাদা আলাদাভাবে ছেঁকে প্রাপ্ত নির্যাস ভিন্ন ভিন্ন বোতলে রাখ। কোন বোতলে কোন ধরনের নির্যাস তা বোতলের গায়ে লিখে রাখ। এবার টেষ্টটিউব নিয়ে একে একে লেবুর রস, চুনের পানি, টক দই, ভিনেগার, সাবান পানি, খাবার সোডা, HCl, NaOH নাও ও কোনটিতে কী নিলে তা গায়ে লিখে রাখ। এবার একটি নির্যাস নিয়ে ড্রপার দিয়ে অল্প পরিমাণে প্রতিটি টেষ্টটিউবে যোগ করে ভালোভাবে ঝাঁকাও। নির্যাসের রঙে কোনো পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছ? কোন কোন দ্রব্যের ক্ষেত্রে বর্ণ লাল ও কোন কোন ক্ষেত্রে নীল হয়েছে তা ছক তৈরি করে লিখে রাখ। এই ছক থেকে তোমরা বুঝতে পারবে কোন দ্রব্যটি এসিডীয় ও কোনটি ক্ষারকীয়। একে একে প্রতিটি নির্যাস নিয়ে রং পরিবর্তন ছকে লিখে রাখ। এবার প্রতিটি দ্রব্য নিয়ে লাল ও নীল লিটমাস কাগজ দিয়ে দেখ কোন দ্রব্যটি অম্লয় আর কোনটি ক্ষারকীয়। একই ধরনের সকল বস্তু একই রকম বর্ণ ধারণ করে। এই অধ্যায় পাঠ শেষে যা শিখলাম- - যে সমস্ত পদার্থ পানিতে হাইড্রোজেন আয়ন উৎপন্ন করে তারা হলো অম্ল-বা এসিড। - অ¤-নীল লিটমাসকে লাল করে। অম্ল-টক স্বাদযুক্ত হয়। - ধাতব অক্সাইড ও হাইড্রোক্সাইডসমূহ হলো ক্ষারক। ক্ষারক লাল লিটমাসকে নীল করে। - ক্ষার হলো সেই সমস্ত ক্ষারক যারা পানিতে দ্রবীভূত হয়। ক্ষারকসমূহ তেতো স্বাদের হয়। - নির্দেশকসমূহ নিজেদের বর্ণ পরিবর্তনের মাধ্যমে কোনো একটি বস্তু অম্ল- , ক্ষারক না নিরপেক্ষ তা নির্দেশ করে। - লবণ হলো অম্ল-ও ক্ষারকের বিক্রিয়ায় উৎপন্ন নিরপেক্ষ পদার্থ। - এসিডের সাথে ধাতব কার্বোনেট বা বাইকার্বোনেটের বিক্রিয়ায় লবণ, পানি ও কার্বন ডাইঅক্সাইড তৈরি হয়। - এসিডের সাথে ধাতুর বিক্রিয়ায় লবণ ও হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন হয়।