জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র

(দ্বাদশ শ্রেণি)

(HSC Biology 2nd Paper )


what image shows

আমাদের দেহ বিভিন্ন যোজক কলা নির্মিত অস্থি (bone) ও তরুণাস্থি (cartilage) এর সমন্বয়ে গঠিত। এক অস্থি অন্য অস্থির সাথে যুক্ত হয়ে অস্থি সন্ধি সৃষ্টি করে। অস্থিগুলো ঐচ্ছিক মাংসপেশি দ্বারা পরস্পর সংলগ্ন থাকায় আমরা নিজেদের ইচ্ছামতো অঙ্গ সঞ্চালন ও চলাফেরা করতে পারি। অস্থি ও তরুণাস্থি দ্বারা গঠিত যে তন্ত্র দেহের মূল কাঠামো গঠন করে, অন্তঃস্থ নরম অঙ্গগুলোকে রক্ষা করে, দেহের ভার বহন করে তাদেরকে একত্রে কঙ্কালতন্ত্র বলে। এ ইউনিটে মানব শারীরতত্ত্ব বিষয় বিভিন্ন অঙ্গের চলন সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।

এ ইউনিটের পাঠসমূহ
পাঠ ৭.১: মানুষের কঙ্কালতন্ত্রের প্রধান অংশসমূহ
পাঠ ৭.২: অস্থি ও তরুণাস্থির গঠনের তুলনা
পাঠ ৭.৩: ব্যবহারিক- মানুষের কঙ্কালতন্ত্রের অস্থিসমূহ পর্যবেক্ষণ, শনাক্তকরণ ও চিহ্নিত চিত্র অঙ্কন
পাঠ ৭.৪: বিভিন্ন প্রকার প্রধান পেশির গঠন ও কাজ
পাঠ ৭.৫: বিভিন্ন ধরনের অস্থিভঙ্গ এবং এদের প্রাথমিক চিকিৎসা, হাটু সঞ্চালনে অস্থি ও পেশির সমন্বয়


পাঠ-৭.১ মানুষের কঙ্কালতন্ত্রের প্রধান অংশসমূহ



শিখনফল-
♦ মানুষের কঙ্কালতন্ত্র সম্পর্কে বলতে পারবেন।
♦ অক্ষীয় কঙ্কালের বিভিন্ন অংশ ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
♦ উপাঙ্গীয় কঙ্কালের বিভিন্ন অংশ বিশ্লেষণ করতে পারবেন।

♣ প্রধান শব্দ কশেরুকা, তরুণাস্থি, অ্যাক্রোমিয়ন

মানুষের কঙ্কালতন্ত্র: ভ্রূণীয় মেসোডার্ম স্তর থেকে সৃষ্ট অস্থি, তরুণাস্থি ও লিগামেন্ট এর সমন্বয়ে গঠিত যে তন্ত্র দেহের কাঠামো সৃষ্টি করে, নির্দিষ্ট আকার আকৃতি দান করে, ভার বহন করে এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গাদি সুরক্ষিত রাখে, তাদেরকে একত্রে কঙ্কালতন্ত্র বলে। মানুষের কঙ্কালতন্ত্র ২০৬টি অস্থির সমন্বয়ে গঠিত এবং এ ধরনের কঙ্কালতন্ত্রকে অন্তঃকঙ্কাল বলে। কারণ বাইরে থেকে এ কঙ্কাল দেখা যায় না। মানুষের কঙ্কালতন্ত্রকে প্রধান দুটি অংশে ভাগ করা হয়। যথা-
(১) অক্ষীয় কঙ্কাল (Axial skeleton)
(২) উপাঙ্গীয় কঙ্কাল (Appendicular skeleton)।

মানবদেহের ২০৬টি অস্থির হিসাব-

অক্ষীয় কঙ্কাল: কঙ্কালতন্ত্রের যে অস্থিগুলো দেহের অক্ষ রেখা বরাবর অবস্থান করে কোমল, নমনীয় অঙ্গগুলোকে ধারণ করে ও রক্ষা করে এবং দেহ কাণ্ডের গঠনগুলো সংযুক্ত করে অবলম্বন দান করে তাদের একত্রে অক্ষীয় কঙ্কাল বলে। অক্ষীয় কঙ্কাল প্রধানতঃ তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত। যথা- (ক) করোটি, (খ) মেরুদণ্ড ও (গ) বক্ষপিঞ্জর।

করোটি (skull): মুখমণ্ডলীয় ও করোটিকার অস্থি সমন্বয়ে গঠিত মাথার কঙ্কালিক গঠনকে করোটি বলে। করোটিতে মোট ২৯টি অস্থি থাকে।

করোটিকা (Cranium): করোটির যে অংশ মস্তিষ্ক আবৃত করে রাখে তাকে করোটিকা বলে। করোটিকা ছয় প্রকারের মোট আটটি অস্থিপাত নিয়ে গঠিত।

মুখমণ্ডলীয় অস্থি (Facial bones): করোটিকার সামনের ও নিচের দিকের অংশকে মুখমণ্ডল বলে। সর্বমোট ১৪টি অস্থি নিয়ে মুখমণ্ডল গঠিত। মুখমণ্ডলীয় অস্থিসমূহ দু’ভাগে বিভক্ত। যথা- ম্যাক্সিলা বা উর্ধ্ব চোয়াল ও ম্যান্ডিবল বা নিম্নচোয়াল। মুখমণ্ডলীয় অস্থিসমূহ হলো ১ জোড়া ম্যাক্সিলা, ১ জোড়া জাইগোম্যাটিক অস্থি, ১ জোড়া নাসিকা অস্থি, ১ জোড়া ল্যাক্সিমাল অস্থি, নাসাগহ্বরের দু’পাশে দুটি ন্যাসাল ও দুটি প্যালাটাইন অস্থি, ১টি ম্যান্ডিবল এবং ১টি ভোমার; প্রতি কর্ণে ৩টি করে মোট ৬টি ও জিহ্বার গোড়ায় হাইওয়েড নামে একটি পাতলা অস্থি। এ সকল অস্থিসমূহ সুসজ্জিত হয়ে মুখমণ্ডলের কাঠামো গঠন করে এবং চোখ, কান, নাকসহ মুখগহ্বরের সৃষ্টি করে।

মেরুদণ্ড (Vertebral column): অ্যাটলাস অস্থি থেকে কক্কিক্স অস্থি পর্যন্ত বিস্তৃত দণ্ডাকৃতির যে গঠন মানবদেহের কেন্দ্রীয় অক্ষ গঠন করে তাকে মেরুদ- বা শিরদাঁড়া বলে। ৩৩টি অসম আকৃতির সীমিত সঞ্চালনক্ষম অস্থিখণ্ডক সমন্বয়ে মেরুদণ্ড গঠিত। এ সকল অস্থিখণ্ডককে কশেরুকা (vertebra) বলে। কশেরুকাগুলো কোমলাস্থি নির্মিত চাকতি দ্বারা পরস্পর যুক্ত থাকে। এদের সিমফাইসিস স্থির অবস্থায় বা চলমান অবস্থায় এটি দেহের ভারসাম্য রক্ষা করে। কশেরুকার প্রকারভেদ: দেহের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থানের ভিত্তিতে ৩৩টি কশেরুকাকে ৫টি ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-
(১) গ্রীবাদেশীয় (cervical) কশেরুকা-৭টি
(২) বক্ষদেশীয় (thoracic) কশেরুকা-১২টি
(৩) কটিদেশীয় (lumbar) কশেরুকা-৫টি
(৪) শ্রোণিদেশীয় (sacral) কশেরুকা-৫টি (একীভূত)
(৫) পুচ্ছদেশীয় (coccygeal) কশেরুকা-৪টি (একীভূত)।

পুচ্ছ অঞ্চলের ৪টি কশেরুকা একীভূত হয়ে যথাক্রমে ১টি স্যাক্রাম (sacrum) ও ১টি কক্কিক্স (coccyx) গঠন করে।

একটি আদর্শ কশেরুকার অংশসমূহ (Different parts of a typical vertebra):
একটি আদর্শ কশেরুকার সাতটি অংশ থাকে। এদের সকলের গঠন প্রায় একই রকম। তবে মেরুদণ্ডে অবস্থান ও কাজের ভিত্তিতে এদের গঠনে কিছু পার্থক্য থাকে। নিচে মানুষের একটি আদর্শ (বক্ষদেশীয় কশেরুকা) কশেরুকার গঠন বর্ণনা করা হলো:

১। সেন্ট্রাম (Centrum): সেন্ট্রাম কশেরুকার মূলদেহ। এটি শক্ত, পুরু ও স্পঞ্জি অস্থিতে গঠিত। সেন্ট্রামের উভয় প্রান্তই অবতলবিহীন ও সমান। এ ধরনের সেন্ট্রামকে এসেটাস সেন্ট্রাম বলে। ২। নিউরাল নালি (Neural canal): সেন্ট্রামের পৃষ্ঠীয় দিকে অবস্থিত নালিকে নিউরাল নালি বলে। এই নালি সুষুম্মাকাণ্ডকে ধারণ করে।

৩। নিউরাল আর্চ (Neural arch): নিউরাল নালিকে ঘিরে এক জোড়া চ্যাপ্টা পাতের মত অস্থি থাকে। এই অস্থিদ্বয়কে নিউরাল আর্চ বলে।

৪। নিউরাল কাঁটা (Neural spine): নিউরাল নালির পৃষ্ঠীয়দিকে নিউরাল আর্চ দুটোর সংযোগস্থলে একটি কাঁটার মত অংশ গঠিত হয়। একে নিউরাল কাঁটা বলে।

৫। ট্রান্সভার্স প্রসেস (Transverse process): কশেরুকার দু’পাশে আড়াআড়িভাবে অবস্থিত অস্থি গঠিত প্রবর্ধিত অংশগুলোকে ট্রান্সভার্স প্রসেস বলে।

৬। প্রি-জাইগাপোফাইসিস (Pre-zygapophysis): নিউরাল আর্চের সামনের দিক থেকে চামচের মত আকৃতি বিশিষ্ট একজোড়া ছোট অস্থি থাকে যেগুলো পূর্ববর্তী কশেরুকার পোস্ট জাইগাপোফাইসিসের সাথে যুক্ত থাকে।

৭। পোস্টজাইগাপোফাইসিস (Post-zygapophysis): প্রতিটি আদর্শ কশেরুকার নিউরাল আর্চের পিছনের দিক থেকে চামচের মত আকৃতিবিশিষ্ট একজোড়া ছোট অস্থি থাকে এদেরকে পোস্টজাইগাপোফাইসিস বলে। এগুলো পরবর্তী কশেরুকার প্রি-জাইগাপোফাইসিসের সাথে যুক্ত থাকে।

গ্রীবাদেশীয় (Cervical) কশেরুকা: এ অঞ্চলের প্রথম কশেরুকাকে অ্যাটলাস ও দ্বিতীয় কশেরুকাকে এক্সিম বলে। এসকল কশেরুকায় ট্রান্সভার্স প্রসেস ছোট এবং ট্রান্সভার্স ফোরামিনা নামক ছিদ্র থাকে।

বক্ষদেশীয় (Thoracic) কশেরুকা: বক্ষদেশীয় কশেরুকাগুলো ও পর্শুকাগুলো যুক্ত হয়ে বক্ষপিঞ্জর গঠন করে। বক্ষদেশীয় কশেরুকার গায়ে পর্শুকার সাথে সংযুক্তির জন্য ক্যাপিচুলাম ও টিউবারক্যুলাম নামক ফ্যাসেট বা সংযুক্তিস্থল থাকে।

কটিদেশীয় (Lumbar) কশেরুকা: এই কশেরুকাগুলো বেশ বড় ও মজবুত এবং এর আর্টিকুলার ফ্যাসেটগুলো বৃহদাকৃতির হয়। এদের ট্রান্সভার্স প্রসেসও বৃহদাকার হয়।

শ্রোণিদেশীয় (Sacral) কশেরুকা: শ্রোণিঅঞ্চলের ৫টি স্যাক্সাল কশেরুকা একত্রে মিলিত হয়ে স্যাক্রাম নামক ত্রিকোণাকার বৃহদাকারে যৌগিক অস্থি গঠন করে। স্যাক্রামের প্রতি দু’টি কশেরুকার মধ্যস্থলে একজোড়া করে আন্তঃকশেরুকা ছিদ্র থাকে। এদের মাধ্যমে সুষুম্মা স্নায়ু বের হয়।

পুচ্ছদেশীয় (Coccygeal) কশেরুকা: মানুষের মেরুদণ্ডের শেষ ৪টি কশেরুকা অবিচ্ছেদ্যভাবে মিলিত হয়ে একটি বৃহদাকার ত্রিভুজাকৃতির অস্থিখণ্ড গঠন করে যাকে কক্কিক্স বলে।

বক্ষপিঞ্জর (Thoracic cage): বক্ষদেশীয় ১২টি কশেরুকার সঙ্গে ১২ জোড়া পর্শুকা যুক্ত হয়ে যে খাঁচার মত আকৃতি গঠন করে তাকে বক্ষপিঞ্জর বলে। এই খাঁচার ভেতরের গহ্বরকে বক্ষগহ্বর বলে। এই গহ্বরে হৃদপি- ও ফুসফুস অবস্থান করে। দু’পাশের পর্শুকাগুলো স্টার্নাম নামক অস্থির সাথে যুক্ত থাকে। বুকের কেন্দ্রীয় সম্মুখ অংশে অবস্থিত চাপা অস্থিটির নাম স্টার্নাম। এটি ৩টি অংশে বিভক্ত। যথা- উপরের ত্রিকোণাকার ম্যানুব্রিয়াম, মাঝের লম্বা দেহ এবং নিচের ক্ষুদ্র জিফয়েড প্রসেস। স্টার্নাম বুকের খাঁচার সামনের অংশ গঠন করে।

পর্শুকা (Ribs): পর্শুকাগুলো লম্বা, সরু, চ্যাপ্টা ও বাঁকা অস্থি। মানবদেহে ১২ জোড়া পর্শুকা থাকে। পর্শুকার পশ্চাৎপ্রান্তে ফ্যাসেটবাহী মস্তক, ক্রেস্টবাহী গ্রীবা, সংযোগী তলসহ টিউবার্কল এবং কোন সৃষ্টি করে বাঁকানো দেহ নিয়ে গঠিত। পর্শুকার সম্মুখ প্রান্ত তরুণাস্থিময়।

ফ্যাসেটের সাহায্যে পর্শুকা সংশ্লিষ্ট কশেরুকার সাথে যুক্ত থাকে। পর্শুকাগুলোকে ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
(ক) প্রকৃত পর্শুকা- বক্ষদেশীয় কশেরুকা থেকে উৎপন্ন ১ম ৭ জোড়া পর্শুকাই প্রকৃত পর্শুকা।
(খ) অপ্রকৃত পর্শুকা- বক্ষদেশীয় ৮ম, ৯ম ও ১০ম কশেরুকা থেকে উৎপন্ন ৩ জোড়া পর্শুকাই অপ্রকৃত পর্শুকা।
(গ) ভাসমান পর্শুকা- ১১শ ও ১২শ বক্ষদেশীয় কশেরুকা থেকে উৎপন্ন হয়ে ভাসমান অবস্থায় থাকে বলে এ ২ জোড়া পর্শুকাকে ভাসমান পর্শুকা বলে।

উপাঙ্গীয় কঙ্কাল (Appendicular Skeleton)
মানুষের একজোড়া অগ্রপদ বা হাত, একজোড়া পশ্চাৎপদ বা পা, বক্ষ অস্থিচক্র (Pectoral girdle) ও শ্রোণিচক্র (Pelvic girdle) নিয়ে উপাঙ্গীয় কঙ্কালতন্ত্র গঠিত।

বক্ষ অস্থিচক্র (Pectoral girdle) : মানুষের দেহের দুই পাশে স্কন্ধ অঞ্চলে দুটি বক্ষ অস্থিচক্র অবস্থিত। এরা পরস্পর থেকে পৃকভাবে অবস্থান করে। এদের একজোড়া ক্ল্যাভিকল ও একজোড়া স্ক্যাপুলা থাকে। ক্ল্যাভিকল বাঁকা অস্থি। এ অস্থির কোন মজ্জাগহ্বর নেই। প্রতিটি স্ক্যাপুলা প্রশস্ত চ্যাপ্টা ত্রিকোণাকার অস্থি। এটি বক্ষ পিঞ্জরের উপরের প্রান্তের দু’পাশে অবস্থিত। এর পশ্চাৎ তলে আনুভূমিকভাবে একটি কাঁটা থাকে একে স্ক্যাপুলার কাঁটা বলে। স্ক্যাপুলার যে অংশে হিউমেরাসের মস্তক সংলগড়ব থাকে তাকে গ্লিনয়েড গহ্বর বলে। স্ক্যাপুলার পার্শ্বীয় প্রান্তের বর্ধিত অংশকে অ্যাক্রোমিয়ন বলে। বাহুর পেশিকে সংযোগ দেয়া ও হিউমেরাসকে সঞ্চালন করা বক্ষ অস্থিচক্রের প্রধান কাজ।

অগ্রপদের অস্থিসমূহ (Bones of forelimb): প্রতিটি অগ্রপদের ৩০টি করে অস্থি থাকে।
১। হিউমেরাস (Humerus): এটি অগ্রপদের সবচেয়ে বড় ও লম্বা অস্থি। হিউমেরাসের উপরের গোলাকার অংশকে মস্তক বলে। এখানে একটি বড় ও একটি ছোট টিউবারকল থাকে। হিউমেরাসের মধ্য অঞ্চলে ডেলটয়েড রিজ ও নিচের দিকে ট্রকলিয়া থাকে।

২। রেডিয়াস ও আলনা (Radius & Ulna): হিউমেরাসের নিচের অস্থির নাম রেডিয়াস আলনা। আলনার উপরের প্রান্তে মোটা ও নিচের দিকে সরু। অপরপক্ষে রেডিয়াসের মাথার কাছে সরু এবং নিচের দিকে ক্রমশ মোটা। আলনার উপরের অংশে একটা সাপের ফনার মত গঠন থাকে। এটিকে অলিক্রেনন প্রসেস বলে।

৩। কারপাল (Carpal) বা কার্পাস (Carpus) অস্থি: মানুষের কব্জিতে দুই সারিতে আটখানা কারপাল অস্থি থাাকে। এসকল অস্থি কব্জি নাড়াতে সাহায্য করে।

৪। মেটাকার্পাল (Metacarpal): করতল বা তালুতে পাঁচটি করে মেটাকারপাল অস্থি থাকে। মেটাকারপালের ৩টি অংশ থাকে। যথা- ১টি মস্তক, ১টি শ্যাফট ও ১টি বেস। মস্তক ও বেস কিছু মোটা কিন্তু শ্যাফট তুলনামুলক ভাবে সরু।

৫। ফ্যালানজেস (Phalanges): আঙ্গুলের অস্থিগুলোকে ফ্যালানজেস বলে। বৃদ্ধাঙ্গুলে ২টি এবং অন্যান্য ৪টি আঙ্গুলে ৩টি করে মোট ১৪টি ফ্যালানজেস থাকে।

শ্রোণিচক্র (Pelvic girdle): মানুষের নিতম্ব বা শ্রোণি অঞ্চলে দুই পাশে অবস্থিত ১ জোড়া সমআকৃতির অস্থি নিয়ে শ্রোণিচক্র গঠিত। শ্রোণিচক্রের প্রতিটি অস্থিকে হিপ বোন বলে। প্রতিটি হিপ বোন বা অস্থি ইলিয়াম (illium), ইশ্চিয়াম (Ischium) ও পিউবিস (Pubis) এই তিনটি অস্থির সমন্বয়ে গঠিত। ইলিয়াম, ইশ্চিয়াম ও পিউবিসের সংযোগ স্থলে অবস্থিত গহ্বরকে অ্যাসিটাবুলাম বলে। এই গহ্বরে ফিমারের মস্তক অবস্থান করে। ইশ্চিয়াম ও পিউবিসের সংযোগ স্থলে যে গহ্বরটি থাকে তাকে অবটুরেটর ফোরামেন বলে। দু’পাশের হিপবোন পিছনের দিকে স্যাক্রামের সাথে যুক্ত থাকে। সামনের দিকে পিউবিস অস্থিদ্বয় পরস্পর যুক্ত হয়ে পিউবিক সিমফাইসিস গঠন করে। শেঙাণিচক্র পশ্চাৎপদের অস্থিসমূহ ধারণ কর।

পশ্চাৎপদ বা নিম্নবাহুর অস্থিসমূহ (Bones of hind limb): প্রত্যেকটি পশ্চাৎপদ ৩০টি অস্থি নিয়ে গঠিত। এগুলো নিম্নরূপ
১। ফিমার (Femur): ফিমার পশ্চাৎপদের প্রথম বড় অস্থি। ইহা দেহের সবচেয়ে লম্বা, ভারী ও শক্ত অস্থি। এর উর্ধ্বপ্রান্তে একটি গোল মস্তক, গ্রীবা ও ছোট-বড় ট্রোকেল্টার অবস্থিত। নিম্নপ্রান্ত দুটি কন্ডাইল বিশিষ্ট। ফিমারের মস্তক শ্রোণিচক্রে অ্যাসিটাবুলামের সাথে যুক্ত থাকে। এর প্রান্তে প্যাটেল (Patella) নামক চ্যাপ্টা সিগময়েড অস্থি থাকে।

২। টিবিয়া-ফিবুলা (Tibia-fibula): এটি পশ্চাৎপদের দ্বিতীয় অস্থি। এটি যুগ্ম ও দ্বিতীয় দীর্ঘতল অস্থি। এটি ভেতরের দিকে মোটা ও বৃহদাকার টিবিয়া এবং বাইরের দিকে পাতলা ও সরু ফিবুলা নামক অস্থি নিয়ে গঠিত।

৩। টারসাল (Tarsal) বা টার্সাস (Tarsus) অস্থি: পায়ের গোড়ালি গঠনকারী ৭টি অস্থিকে টার্সাস অস্থি বলে। টার্সাস অস্থিগুলো হলো- ট্যালাস ১টি, ক্যালকেনিয়াস ১টি, কিউবয়েড ১টি, নাভিকুলার ১টি ও কুনিফর্ম ৩টি।

৪। মেটাটার্সাস (Metatarsus bone): পায়ের পাতায় ৫টি সরু ও লম্বাটে অস্থি থাকে। এদেরকে মেটাটারসাল বলে। এদের দুই মাথা মোটা এবং মধ্যভাগ সরু, নলাকার ও লম্বাটে।

৫। ফ্যালানজেস (Phalanges): পায়ের আঙ্গুলে অবস্থিত ক্ষুদ্রাকৃতির অস্থিসমূহকে ফ্যালানজেস বলে। বৃদ্ধাঙ্গুলিতে ২টি ও অন্যান্য ৪টি আঙ্গুলে ৪টি করে মোট ১৪টি ফ্যালানজেস থাকে।

মানবদেহের কঙ্কালতন্ত্র মূলতঃ দেহের কাঠামো গঠন করে, ভার বহন করে, পেশি সংযুক্তির তল সৃষ্টি করে, রক্ত কণিকা উৎপাদন ও চলাচলে সহায়তা করে। দেহের কোমল অঙ্গসমূহকে রক্ষণাবেক্ষণ করে।

শিক্ষার্থীর কাজ একটি আদর্শ কশেরুকার চিহ্নিত চিত্র এঁকে শ্রেণিকক্ষে উপস্থাপন করুন।

সারসংক্ষেপ
ভ্রূণীয় মেসোডার্ম স্তর থেকে সৃষ্ট অস্থি, তরুণাস্থি ও লিগামেন্ট এর সমন্বয়ে গঠিত যে তন্ত্র দেহের কাঠামো সৃষ্টি করে, নির্দিষ্ট আকার আকৃতি দান করে, ভার বহন করে, অভ্যন্তরীণ অঙ্গাদি সুরক্ষিত রাখে তাদেরকে একত্রে কঙ্কালতন্ত্র বলে। মানুষের কঙ্কালতন্ত্রকে প্রধান দুটি অংশে ভাগ করা হয়। যথা-(১) অক্ষীয় কঙ্কাল (Axial skeleton), (২) উপাঙ্গীয় কঙ্কাল (Appendicular skeleton)। কঙ্কালতন্ত্রের যে অস্থিগুলো দেহের অক্ষ রেখা বরাবর অবস্থান করে কোমল, নমনীয় অঙ্গগুলোকে ধারণ করে ও রক্ষা করে এবং দেহ কাণ্ডের গঠনগুলো সংযুক্ত করে অবলম্বন দান করে তাদের একত্রে অক্ষীয় কঙ্কাল বলে। অক্ষীয় কঙ্কাল প্রধানত তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত। যথা- (ক) করোটি, (খ) মেরুদণ্ড ও (গ) বক্ষপিঞ্জর। মানুষের একজোড়া অগ্রপদ বা হাত, একজোড়া পশ্চাৎপদ বা পা, বক্ষ অস্থিচক্র (Pectoral girdle) ও শ্রোণিচক্র (Pelvic girdle) নিয়ে উপাঙ্গীয় কঙ্কালতন্ত্র গঠিত।

পাঠোত্তর মূল্যায়ন-৭.১
বহু নির্বাচনি প্রশ্ন

১. মানুষের পায়ে মোট কতটি অস্থি থাকে?
ক. ১৪টি
খ. ৩০টি
গ. ৬০টি
ঘ. ২০৬টি

২. কর্ণের অস্থিগুলো হল-
i. মেলিয়াস
ii. ইনকাস
iii. ভোমার
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ. ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii

৩. নিচের কোনটি আমাদের হাতে থাকে?
ক. আলনা
খ. ফিমার
গ. টিবিয়া
ঘ. ফিবুলা


what image shows

জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি

ড. মোহাম্মদ আবুল হাসান

গাজী সালাহউদ্দিন সিদ্দিকী