জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র

(দ্বাদশ শ্রেণি)

(HSC Biology 2nd Paper )


what image shows


আমাদের বেঁচে থাকার জন্য শক্তি দরকার। প্রাণী মাত্রই তার গৃহীত খাদ্য থেকে এই শক্তি অর্জন করে। আমাদের দেহকে অবশ্য গৃহীত জটিল অণুর খাদ্য সামগ্রিকে সরল অণুতে অর্থাৎ দেহের উপযোগি শোষণযোগ্য উপাদানে পরিণত করে নিতে হয়। জটিল অণুর খাবারকে সরল করার কাজটিই হলো পরিপাক আর এর সাথে সংশ্লিষ্ট তন্ত্রটি হলো পরিপাকতন্ত্র যা আপনারা পূর্বের শ্রেণিতে পড়েছেন। কোষের বাইরে সংঘটিত পরিপাককে বহিঃকোষীয় পরিপাক বলে। যদিও কিছু নিম্নতর প্রাণীতে কোষের অভ্যন্তরে পরিপাক সম্পন্ন হয় যা অন্তঃকোষীয় পরিপাক নামে পরিচিত। এ ইউনিটের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন অংশের কার্যক্রম অর্থাৎ পরিপাক ও শোষণ প্রক্রিয়া।

এ ইউনিটের পাঠসমূহপাঠ
৩.১ : পরিপাক নালি ও গ্রন্থি পরিচিতি
পাঠ ৩.২ : শর্করা পরিপাক ও পরিশোষণ
পাঠ ৩.৩ : আমিষ পরিপাক ও পরিশোষণ
পাঠ ৩.৪ : চর্বি পরিপাক ও পরিশোষণ
পাঠ ৩.৫ : ব্যবহারিক : পরিপাক সংশ্লিষ্ট অঙ্গের স্থায়ী স্লাইড পর্যবেক্ষণ ও চিহ্নিত চিত্র অঙ্কন
পাঠ ৩.৬ : স্থূলতার ধারণা, কারণ ও প্রতিরোধ

পাঠ-৩.১ পরিপাক নালি ও গ্রন্থি পরিচিতি



শিখনফল-
♦ মানবদেহের পরিপাকতন্ত্রের অবস্থান ও প্রক্রিয়া বর্ণনা করতে পারবেন।
♦ পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন অংশ ও সংঘটিত যান্ত্রিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
♦ পরিপাক প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট গ্রন্থিসমূহের ধারণা এবং বিভিন্ন গ্রন্থির বিপাকীয় ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
♦ খাদ্যদ্রব্য পরিপাকে বিভিন্ন অংশ ও গ্রন্থির মুখ্য ক্রিয়াসমূহ বিশ্লেষণ করতে পারবেন।
♦ পরিপাক নালি ও সংশ্লিষ্ট অঙ্গের চিহ্নিত চিত্র অঙ্কন করতে পারবেন।

♣ প্রধান শব্দ ইলিয়াম, মিউসিন, ইনসুলিন

পরিপাক নালি (Digestive tract): মানবদেহে পরিপাক ও পরিশোষণ পরিপাকতন্ত্রের মাধ্যমে সংগঠিত হয়। পরিপাকতন্ত্র পরিপাক নালি ও পরিপাক গ্রন্থি নিয়ে গঠিত। মানুষের পরিপাক নালি মুখ থেকে পায়ু পর্যন্ত ৮-১০ মিটার বিস্তৃত দীর্ঘ নালি বিশেষ যা কোথাও থলির ন্যায় স্ফীত আবার কোথাও কু-ুলীকৃত। বিভিন্ন অংশ যেমন- মুখছিদ্র, মুখবিবর, গলবিল, অন্ননালি, পাকস্থলি, ক্ষুদ্রান্ত্র (ডিওডেনাম, জেজুনাম ও ইলিয়াম), বৃহদন্ত্র (সিকাম, কোলন ও মলাশয়) দ্বারা পরিপাক নালি গঠিত। চিত্র ৩.১.১: মানুষের পৌষ্টিকতন্ত্র (সরলীকৃত)
খাদ্য পরিপাকের সময় প্রথমে যান্ত্রিক ও পরে রাসায়নিক কার্যক্রম ঘটে ও যান্ত্রিক কার্যক্রমে দাঁত ও জিহ্বা এবং মুখবিবরে খাদ্য পরিপাকের রাসায়নিক কার্যক্রমের মূল ভূমিকা পালন করে লালাগ্রন্থি নিঃসৃত লালারস।

পরিপাক নালির বিভিন্ন অংশ:
মুখ: পরিপাক নালির শুরু মুখ থেকে। মুখ নাসারন্ধ্রের নিচে অবস্থিত একটি আড়াআড়ি ছিদ্র, যা উপরের ও নিচের ঠোঁট দ্বারা বেষ্টিত থাকে। মুখছিদ্রের মাধ্যমে খাদ্য বস্তু মুখবিবরে প্রবেশ করে। মুখবিবর: মুখ পরবর্তী অংশটি মুখবিবর। এর ভেতরে কয়েকটি অঙ্গ অবস্থিত। যেমন- দাঁত, মাড়ি, জিহবা, গাল ও তালু। মুখ বিবরের ঊর্ধ্ব প্রাচীর তালুর অস্থি ও পেশি দিয়ে, সামনের প্রাচীর ঠোঁটের পেশি দিয়ে এবং পার্শ্ব প্রাচীর গালের পেশি দিয়ে গঠিত। তালুর অগ্রভাগ অস্থিনির্মিত এবং শক্ত, পেছনের অংশ মাংসল ও নরম। তালুর পেছনের অংশের মধ্যভাগ থেকে একটি অপেক্ষাকৃত সরু আলজিহবা মুখবিবরে ঝুলে থাকে। মানুষের উর্ধ্ব ও নিমড়ব চোয়াল দাঁতযুক্ত। এছাড়া মুখবিবরে তিন জোড়া লালাগ্রন্থি থাকে। নিমেড়ব চোয়ালের অস্থির সাথে জিহ্বাযুক্ত থাকে। পৃষ্ঠতলের উপর থাকে স্বাদকোরক এগুলো বিভিন্ন রাসায়নিক বস্তুর প্রতি সংবেদনশীল। জিহ্বার অগ্রভাগ মিষ্টি, দুই পার্শ্ব নোনা, পশ্চাৎ ভাগের দুই পার্শ্ব টক এবং পেছনের দিক তিক্ত স্বাদ গ্রহণ করে।

কাজ:
♦ দাঁত খাদ্য দ্রব্যকে কাটা, ছেঁড়া ও পেষণে সাহায্য করে।
♦ জিহ্বা খাদ্য দ্রব্যের স্বাদ গ্রহণ করে এবং পেষণের সময় লালারস মিশ্রিত করে খাদ্য দ্রব্যকে পিচ্ছিল করে পেছনে ঠেলে দেয়।
♦ লালাগ্রন্থি থেকে নিঃসৃত “মিউসিন” খাদ্যকে পিচ্ছিল করে আর টায়ালিন ও মল্টেজ এনজাইম খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে।

গলবিল:
♦ মুখবিবরের ঠিক পেছনে প্রায় ১০ সে.মি. দীর্ঘ চওড়া অংশকে গলবিল বলে।
♦ গলবিল খাদ্যকে মুখবিবর থেকে অন্ননালিতে পৌঁছে দেয়।

অন্ননালি: গলবিলের ঠিক পেছনে প্রায় ২৫ সে.মি. লম্বা নলাকার অংশই অন্ননালি যা, শ্বাসনালির পেছন ও বক্ষ গহ্বরের মধ্যে দিয়ে উদরে অবস্থিত পাকস্থলিতে শেষ হয়।
কাজ: অন্ননালির পেশির সংকোচনে খাদ্যদ্রব্য নালি পথে পাকস্থলিতে প্রবেশ করে।

পাকস্থলি: বক্ষ গহ্বরের ডায়াফ্রামের নীচে উদরের উপরের অংশে প্রায় ২৫ সে. মি. লম্বা ও ১৫ সে.মি. চওড়া বাঁকানো থলির মত অংশই পাকস্থলি। একে কয়েকটি অংশে ভাগ করা যায়। যেমন- কার্ডিয়া, ফার্নডাস ও ছোট-বড় বাঁক, পাইরোলাস ও গ্রাসনালি। পাকস্থলির প্রত্যেক অংশের মিউকোসা স্তরে প্রায় ৪০ মিলিয়ন (৪ কোটি) গ্যাস্ট্রিক গ্রন্থি থাকে। এই গ্যাস্ট্রিক গ্রন্থিগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় দু’লিটার গ্যাস্ট্রিক রস ক্ষরিত হয়। চিত্র ৩.১.২ : পাকস্থলির অংশ বিশেষের অনুচ্ছেদ
কাজ:
♦ খাদ্যদ্রব্যকে সাময়িকভাবে জমা রাখে এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের মাধ্যমে খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে।
♦ HCl জীবানুনাশক হিসেবে কাজ করে।
♦ মিউসিন HCl-এর ক্ষতিকর ভূমিকা থেকে পাকস্থলির প্রাচীরকে রক্ষা করে।
♦ গ্যাস্ট্রিক রসের এনজাইমগুলো HCl-এর উপস্থিতিতে আমিষ ও স্নেহজাতীয় খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে।

ক্ষুদ্রান্ত্র
পাকস্থলির পাইলোরাস অংশের পর থেকে ইলিওকোলি পর্যন্ত প্রায় ৬-৭ মিটার লম্বা বিস্তৃত অংশ ক্ষুদ্রান্ত্র এটি আবার ৩ অংশে বিভক্ত, যথা- ডিওডেনাম, জেজুনাম ও ইলিয়াম। ডিওডেনামে মূলত: অগড়ব্যাশয়িক রসের এনজাইমের ক্রিয়া এবং জেজুনাম ও ইলিয়ামে আন্ত্রিক রসের এনজাইমের ক্রিয়ার পরিপাক ঘটে। ডিওডেনামে মূলত: কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও লিপিডের পরিপাক ঘটে। অম্লধর্মী পাকমণ্ড পাকস্থলি থেকে ডিওডেনামে প্রবেশ করলে যকৃত থেকে নিঃসৃত ও পিত্তথলিতে সঞ্চিত পিত্তরস নালিপথে ডিওডেনামে প্রবেশ করে ক্ষারীয় মাধ্যম সৃষ্টি করে। অন্যদিকে অগ্নাশয় থেকে রস নিঃসৃত হয়ে পাকমণ্ডের অম্লত্বের প্রশমন ঘটায়। অগ্নাশয় রসের এনজাইমসমূহ এ মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে পরিপাকে অংশ নেয়।

বৃহদন্ত্র
পৌষ্টিকনালির শেষোক্ত বৃহৎ নলাকার অংশ যা ক্ষুদ্রান্ত্রের পর থেকে প্রায় ২ মিটার লম্বা মলাশয় পর্যন্ত বিস্তৃত। বৃহদন্ত্র তিনটি অংশে বিভক্ত। যথা- সিকাম, কোলন ও মলাশয়। চিত্র ৩.১.৩ : মানুষের বৃহদন্ত্রের গঠন
সিকাম বৃহদন্ত্রের প্রথম, বড় স্ফীত ও গোলাকার থলের মতো অংশ। লম্বায় ৬ সে. মি. এবং চওড়ায় ৭.৫ সে.মি.। সিকাম থেকে একটি ক্ষুদ্র আঙ্গুল ও বন্ধ থলের ন্যায় প্রসারিত অংশকে অ্যাপেনডিক্স বলা হয়। এটি একটি নিষ্ক্রিয় অঙ্গ।
সিকামের পরবর্তী মোটা নলাকার অংশের নাম কোলন। এটি ৪টি অংশে বিভক্ত এবং প্রায় ১৫০-১৯০ সে.মি. লম্বা।
♦ কোলনের প্র ম ও সিকাম সংলগ্ন যে অংশ যকৃত বরাবর ঊর্ধ্বমুখীভাবে প্রসারিত থাকে, তাকে “ঊর্ধ্বগামী কোলন” বলে। এটি প্রায় ১৫ সে.মি. লম্বা।
♦ বামদিকে ঊর্ধ্বগামী এবং নিম্নগামী কোলনের সাথে সমকোণে ও আড়াআড়িভাবে বিস্তৃত অংশকে “অনুপ্রস্থ কোলন” বলে। এটি প্রায় ২০-৩০ সে.মি. লম্বা।
♦ অনুপ্রস্থ অংশ থেকে নিমড়বমুখীভাবে সরাসরি নিচে যে অংশ মলাশয়ে মিলিত হয় তাকে “নিম্নগামী কোলন” বলে। এটি প্রায় ২০-২৫ সে. মি.।
♦ কোলনের যে অংশটি শ্রোণি গহ্বরে প্রবেশ করে S-আকৃতিতে পরিণত হয়, তাকে সিগময়েড কোলন বলে।

মলাশয়: বৃহদন্ত্রের শেষ প্রান্ত শ্রোণিদেশে অবস্থিত প্রশস্ত অংশটিকে মলাশয় বলে। এটি প্রায় ৫ সে.মি. লম্বা। এর অন্তঃপ্রাচীরের মিউকোসা ভাঁজ সৃষ্টি করে ভাঁজগুলোর মাঝে অবতল মলাশয়িক সাইনাস থাকে। মলাশয়েরর নিম্নাংশ স্ফীত হয়ে মলাশয়িক অ্যাম্পুলা গঠন করে। কাজ: বৃহদন্ত্রে প্রতিদিন প্রায় ১৩৫ গ্রাম আর্দ্র মল তৈরি হয়, পানি শোষিত হয় এবং খাদ্যাংশের গাঁজন বা পঁচন ঘটে। বৃহদন্ত্রের মাধ্যমে মল পায়ুপথে বাইরে নির্গত হয়।

পায়ু: মলাশয় পায়ুছিদ্র পথে বাইরে উ›মুক্ত। পায়ুপথ দুটি পেশিদ্বারা গঠিত। একটি বহিঃস্থ অন্যটি অন্তঃস্থ। অন্তঃস্থটি মসৃণ পেশিদ্বারা গঠিত এবং অনৈচ্ছিকভাবে সংকুচিত হয় এবং বহিঃস্থটি জ্ঞাতসারে নিয়ন্ত্রিত হয়।
কাজ: সড়বায়ু নিয়ন্ত্রিত হয়ে পায়ু উন্মুক্ত ও বন্ধ হয়ে মলত্যাগে অংশ নেয়।

পৌষ্টিকগ্রন্থি পরিচিতি
যে সকল গ্রন্থির ক্ষরণ সরাসরি খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে সে সকল গ্রন্থিসমূহকে বলা হয় “পৌষ্টিকগ্রন্থি”। মানুষের পরিপাক গ্রন্থিগুলোকে প্রধানত দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা-
♦ পৌষ্টিক নালির বাইরে অবস্থিত কিন্তু পৌষ্টিক নালির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত গ্রন্থি, যেমন- লালাগ্রন্থি,’ যকৃত ও অগ্নাশয়।
♦ পৌষ্টিক নালির ভেতরের অংশের গ্রন্থি, যেমন- গ্যাষ্ট্রিক গ্রন্থি ও আন্ত্রিক গ্রন্থি। নিম্নে মানুষের পৌষ্টিক গ্রন্থির গঠন, অবস্থান ও কাজের বর্ণনা দেয়া হলো।

১. লালাগন্থি (Salivary gland)
মুখের দু’পাশে তিন জোড়া লালাগ্রন্থি আছে। যথা-
ক. কানের নিচে দু’পাশেরÑ প্যারোটিড গ্রন্থি।
খ. নিচের চোয়ালের ভেতর দিকেÑ সাবম্যান্ডিবুলার গ্রন্থি।
গ. জিহ্বার তলায়- সাবলিঙ্গুয়াল গ্রন্থি।

গঠন: লালাগ্রন্থিগুলো এপিথেলিয়ামে আবৃত এবং ডিম্বাকার রস নিঃসারী থলি দ্বারা গঠিত। প্রত্যেক থলির কেন্দ্রে একটি নালিকা থাকে। এগুলো একীভূত হয়ে ক্রমে গ্রন্থির মূল নালিতে পরিণত হয় এবং পরে মুখবিবরে প্রবেশ করে। গ্রন্থিগুলো দু’রকম কোষ দ্বারা গঠিত, যেমন- সেরাস কোষ ও মিউকাস কোষ। লালাগ্রন্থির এ সেরাসকোষ থেকে এনজাইম ও মিউকাস কোষ থেকে মিউকাস নিঃসৃত হয়।

কাজ
♦ লালা রসের প্রধান কাজ হচ্ছে খাদ্যকে পিচ্ছিল করে তা চিবাতে ও গিলতে সাহায্য করা।
♦ পরিপাকের কাজে টায়ালিনের মাধ্যমে সিদ্ধ শ্বেতসারকে ভেঙ্গে দ্বিশর্করা-মলটোজে এবং মলটেজ এনজাইম দিয়ে মলটোজকে গ্লুকোজে পরিণত করা।

২. যকৃত (Liver): মানুষের মধ্যচ্ছদার ঠিক নিচে পাকস্থলির ডানদিকে বিস্তৃত গাঢ় লালচে বর্ণের ত্রিকোণাকার ও পিত্তরস নিঃসরণকারী গ্রন্থিকে যকৃত বলা হয়। যকৃতের বেশির ভাগ অংশ দেহের ডানদিকে অবস্থিত। যকৃত মানবদেহের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ গ্রন্থি। একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের যকৃতের ওজন প্রায় ১.৫-২.০ কেজি। এটি চারটি অসম্পূর্ণ খণ্ড নিয়ে বিভক্ত। ডান খণ্ডটি অপেক্ষাকৃত বড় এবং এই খণ্ডের নিচে পেয়ালার মতো পিত্তরস ধারণকারী একটি থলে থাকে, একে পিত্তথলি বলে। পিত্তথলি ৭-৮ সে.মি. লম্বা। পিত্তথলি থেকে পিত্ত ডিওডেনামে উন্মুক্ত হয়। পিত্তরস হলদে সবুজ বর্ণের একটি ক্ষার জাতীয় তরল পদার্থ। এতে শতকরা ৮০% পানি ও ২০% অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান থাকে।

কাজ: যকৃত থেকে ক্ষরণকৃত পিত্তরসে, খাদ্য পরিপাকে সাহায্যকারী কোন এনজাইম না থাকায় খাদ্য পরিপাকে এদের প্রত্যক্ষ কোন ভূমিকা নেই। তবে এরা শর্করা, প্রোটিন, ভিটামিন প্রভৃতি খাদ্যকে পরিপাকের পর রক্তস্রোতে পরিবাহিতকরণে সাহায্য করে।

৩. অগ্নাশয় (Pancreas): অগ্নাশয় পাকস্থলির নিচে উদরীয় গহ্বরের ডিওডেনামের দুটি বাহুর মাঝ অংশে গোলাপি বর্ণের এবং অনিয়মিত আকৃতির একটি মিশ্র গ্রন্থি। দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ সে. মি.। অগ্নাশয়ের সম্মুখ ভাগ প্রশস্ত কিন্তু পশ্চাৎ ভাগ ক্রমশ সরু। অগ্নাশয়ে দু’ধরনের গ্রন্থি আছে। যথা- ক. অন্তঃক্ষরা (হরমোন ক্ষরণকারী) গ্রন্থি ও খ. বহিঃক্ষরা (এনজাইম নিঃস্রাবী) গ্রন্থি। চিত্র ৩.১.৪ : অগড়ব্যাশয়ের অংশ বিশেষের অনুচ্ছেদ

ক. অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি: অগ্নাশয়ের মধ্যে লোবিউলগুলোর ফাঁকে ফাঁকে আইলেটস অব ল্যাঙ্গারহান্স নামক হরমোনগ্রন্থি থাকে। এই হরমোন গ্রন্থি থেকে ইনসুলিন, গ্লুকাগন, গ্যাস্ট্রিক ও সোমাটোস্ট্যাটিন হরমোন ক্ষরিত হয়, যা দেহের নানাবিধ শারীরবৃত্তীয় কাজ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইনসুলিন ও গ্লুকাগন হরমোন রক্তে শর্করার বিপাক নিয়ন্ত্রণ করে।

খ. বহিঃক্ষরা গ্রন্থি: অগ্নাশয়ের মধ্যে কতকগুলো এনজাইম নিঃস্রাবী ও নালিযুক্ত গ্রন্থি থাকে, এদেরকে এসিনাই বলে। এরা লোবিউল গঠন করে এবং লোবিউল থেকে ছোট ছোট নালিকা বের হয়ে একত্রিত হয়ে ‘উইনসাং’ নালি গঠন করে। এই উইরসাং নালি অগ্নাশয়ের দৈর্ঘ্য বরাবর ডিওডেনামের কাছে অভিন্ন পিত্তথলির সাথে মিলিত হয়ে অ্যাম্পুলার মাধ্যমে ডিওডেনামে উন্মুক্ত হয়। অগ্নাশয় থেকে এ নালির মাধ্যমে ক্ষরিত রসকে অগ্নাশয়িক রস বলে। অগ্নাশয় রসে প্রোটিন, শর্করা ও লিপিড বা ফ্যাট পরিপাককারী এনজাইম থাকে যা খাদ্য পরিপাকে সহায়ক।

পাকস্থলি গ্রন্থি (Digestive gland): পাকস্থলির অন্তঃপ্রাচীরের বিভিন্ন অংশে অসংখ্য গ্রন্থিকোষ রয়েছে। এগুলো পরিপাকে সহায়ককারী গ্রন্থিকোষ সাহায্য করে। এসব কোষ থেকে পাচক রস নামে বর্ণহীন ও তীব্র অম্লধর্মী তরল পদার্থ নিঃসৃত হয়। এ ক্ষরণ খাদ্যের প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। পাচক রসে প্রোটিন ও স্নেহজাতীয় খাদ্য পরিপাককারী এনজাইম থাকে। এছাড়া অপরিপাকীয় খাদ্য পিচ্ছিলকরণ, পাকস্থলির প্রাচীরকে রক্ষা করা, জীবানুনাশ, অম্লক্ষারের সমতা রক্ষা করা এবং হরমোন ক্ষরণ ইত্যাদি কার্যগুলো উল্লেখযোগ্য।

আন্ত্রিক গ্রন্থি: ক্ষুদ্রান্ত্রের অন্তঃপ্রাচীরের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য পরিপাকীয় গ্রন্থিকোষ অবস্থিত। এগুলো ক্ষরণে আন্ত্রিক রসের সৃষ্টি হয়, যেখানে বিভিন্ন এনজাইম থাকে। এগুলো স্টার্চ, ডেক্সট্রিন, প্রোটিন ও ফ্যাট জাতীয় খাদ্যকে পরিপাকে সহায়তা করে। এছাড়া হরমোন ক্ষরণ করে খাদ্য পরিপাক, শোষণ ও পানি সাম্য নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করে।

শিক্ষার্থীর কাজ: অন্তঃক্ষরা ও বহিঃক্ষরা গ্রন্থির পার্থক্য ছক আকারে লিখে ক্লাসে উপস্থাপন করুন।

সারসংক্ষেপ
মানবদেহে পরিপাক ও পরিশোষণ পরিপাকতন্ত্রের মাধ্যমে সংগঠিত হয়। পরিপাকতন্ত্র পরিপাক নালি ও পরিপাক গ্রন্থি নিয়ে গঠিত। পরিপাক নালির বিভিন্ন অংশ: ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদন্ত্র, লালাগন্থি, যকৃত, অগ্নাশয়, অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি, বহিঃক্ষরা গ্রন্থি। মুখের দু’পাশে তিন জোড়া লালাগ্রন্থি আছে। যথা-
ক. কানের নিচে দু’পাশের- প্যারোটিড গ্রন্থি।
খ. নিচের চোয়ালের ভেতর দিকে- সাবম্যান্ডিবুলার গ্রন্থি।
গ. জিহ্বার তলায়- সাবলিঙ্গুয়াল গ্রন্থি।


পাঠোত্তর মূল্যায়ন- ৩.১
বহু নির্বাচনি প্রশ্ন
১. নিচের কোনটি জীবানুনাশক?
ক. HCl
খ. H2SO4
গ. NaCl
ঘ. NHNO3

২. নিচের ক্ষুদ্রান্ত্রের অংশ
i. ডিওডেনাম
ii. কোলন
iii. ইলিয়াম
নিচের কোনটি সত্য?
ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ. ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii

৩. পিত্তরস শতকরা কতভাগ পানি থাকে?
ক. ২০
খ. ৪০
গ. ৬০
ঘ. ৮০
what image shows

জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি

ড. মোহাম্মদ আবুল হাসান

গাজী সালাহউদ্দিন সিদ্দিকী