জীববিজ্ঞান প্রথম পত্র


(একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি)


পঞ্চম অধ্যায়: শৈবাল ও ছত্রাক


শৈবাল


শৈবাল উদ্ভিদে ক্লোরোপ্লাস্ট থাকে। তাই এরা সূর্যালোকের উপস্থিতিতে ক্লোরোফিলের সহায়তায় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরি করতে সক্ষম এবং এরা স্বভোজী। ছত্রাক উদ্ভিদে ক্লোরোপ্লাস্ট থাকে না। তাই এরা নিজেরা খাদ্য তৈরি করতে পারে না। এরা মৃতজীবী বা পরজীবী হিসেবে বাস করে। শৈবাল সমাঙ্গদেহী বিভাগের অর্ন্তগত ক্লোরোফিল সমন্বিত এক প্রকার প্রাচীনতম নিম্নশ্রেণির উদ্ভিদ। শৈবালের দেহ থ্যালাসের ন্যায় কিন্তু দেহকোষে ক্লোরোফিল থাকাতে এরা স্বভোজী। অর্থাৎ আলোকের উপস্থিতিতে এবং পানি ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের সহায়তায় এরা নিজেরা নিজেদের দেহকোষে খাদ্য (শর্করা) প্রস্তুত করতে সক্ষম। শৈবালের দেহকোষে প্রধান রঞ্জক পদার্থ সবুজ বর্ণের ক্লোরোফিল উপস্থিত থাকলেও অনেক সময় নানা রকম ভিন্ন রঞ্জক পদার্থ দিয়ে এরা আবৃত থাকে। ঐ সব রঞ্জক পদার্থের উপর ভিত্তি করে শৈবালের শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। শৈবালের দেহকোষে সুগঠিত ও স্বতন্ত্র নিউক্লিয়াস, মাইটোকন্ড্রিয়া এবং অন্যান্য কোষ অঙ্গাণু থাকে। প্রোক্যারিয়োটিক হওয়ায় নীলাভ-সবুজ শৈবাল বর্তমানে সায়ানো ব্যাকটেরিয়া হিসেবে বিবেচিত। শৈবাল কখনও এককভাবে, কখনও দলবদ্ধভাবে নালা নর্দমা, পুকুর, হ্রদ, নদী, সাগর, এক কথায় পৃথিবীর সমস্ত জলাশয়ে ছড়িয়ে রয়েছে এদের প্রায় ত্রিশ হাজার প্রজাতি। বসবাসের প্রকৃতি অনুযায়ী এদের বিভিন্ন নাম দেয়া হয়। যেমন- জলাশয়ে পানির নিচে মাটিতে আবদ্ধ শৈবালকে ‘বেনথিক শৈবাল’ বলা হয়। পাথরের গায়ে জন্মানো শৈবালকে ‘লিথোফাইটিক শৈবাল’ বলা হয়। উচ্চশ্রেণির জীবের টিস্যুর অভ্যন্তরে জন্মানো শৈবালকে ‘এন্ডোফাইটিক শৈবাল’ বলা হয়। যে সমস্ত শৈবাল অন্যান্য উচ্চশ্রেণির উদ্ভিদ অথবা অন্য শৈবালের গায়ে জন্মায় তাদের ‘এপিফাইটিক শৈবাল’ বলা হয়। সম্পূর্ণ ভাসমান এককোষী শৈবালদেরকে ফাইটোপ্লাঙ্কটন বলা হয়। শৈবালের হাজার হাজার প্রজাতির মধ্যে আকার, আকৃতি ও গঠনে বহু পার্থক্য থাকলেও কতিপয় মৌলিক বৈশিষ্ট্যে এরা একই রকম। তাই এরা শৈবাল নামে পরিচিত।

শৈবালের বৈশিষ্ট্য :
শৈবালে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা যায়-
১। এরা সবাই অপুষ্পক।
২। এরা স্বভোজী অর্থাৎ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় নিজেরা নিজেদের খাদ্য প্রস্তুত করতে পারে।
৩। এরা প্রকৃতকোষী, এককোষী অথবা বহুকোষী হয়। এরা সমাঙ্গদেহী উদ্ভিদ অর্থাৎ এদেরকে মূল, কান্ড এবং পাতায় বিভক্ত করা যায় না।
৪। এদের দেহে ভাস্কুলার টিস্যু (পরিবহন টিস্যু) থাকে না।
৫। অধিকাংশ শৈবালের জননাঙ্গ এককোষী। কোন কোন শৈবালের জননাঙ্গ বহুকোষী হয়। জননাঙ্গ বহুকোষী হলে তা বন্ধ্যা কোষের স্তর দিয়ে পরিবেষ্টিত থাকে না।
৬। এদের রেণুলী (স্পোরাঞ্জিয়া) সব সময় এককোষী।
৭। এদের জাইগোট স্ত্রীজননাঙ্গে থাকা অবস্থায় কখনও বহুকোষী ভ্রূণে পরিণত হয় না।
৮। এদের কোষ প্রাচীর সাধারণত সেলুলোজ ও পেকটিন দিয়ে গঠিত।
৯। গ্যামিটের মিলনের পরেও এদের বহুকোষী ভ্রূণ গঠিত হয় না।
১০। সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া এদের সঞ্চিত খাদ্য শর্করা।

শৈবালের গঠন :
শৈবালের গঠনকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- (ক) বাহ্যিক গঠন এবং (খ) কোষীয় গঠন।

(ক) বাহ্যিক গঠন-
এরা আণুবীক্ষণিক থেকে অনেক দীর্ঘাকার হয়। বাদামি শৈবাল ৬০ মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ বা লম্বা হয়। যেমন- Macrocystis sp.। এককোষী শৈবাল যাদের ফ্ল্যাজেলা থাকে তারা সচল, যেমন- Chlamydomonas এবং যাদের ফ্ল্যাজেলা থাকে না তারা নিশ্চল হয়, যেমন- Chlorella । অনেক প্রজাতি রয়েছে যারা কলোনি করে থাকে। প্রত্যেক কলোনিতে অনেকগুলো কোষ থাকে, যেমন- Volvox । বহু প্রজাতি রয়েছে যাদের দেহ ফিলামেন্টাস। ফিলামেন্ট অশাখান্বিত হয়, যেমন Spirogyra, Ulothrixআবার শাখান্বিতও হয়, যেমন- Chaetophora । অনেক সামুদ্রিক শৈবালের দেহকে বাহ্যিকভাবে মূল, কান্ড ও পাতার ন্যায় অংশে বিভক্ত করা যায়। যেমন- Sargassum । কোন কোন শৈবালের দেহে পর্ব মধ্যপর্ব উপস্থিত, যেমন- Chara । কোন কোন শৈবালের দেহ লম্বা পাতার ন্যায়, যেমন- Ulva । সর্বোপরি শৈবালের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ গঠনে প্রচুর পার্থক্য বিদ্যমান।

(খ) কোষীয় গঠন-
সব শৈবালই প্রকৃতকোষী। শৈবাল কোষের গঠন প্রায় উচ্চশ্রেণির উদ্ভিদ কোষের ন্যায়। এদের কোষের বাইরে সেলুলোজ নির্মিত জড় কোষ প্রাচীর থাকে। কোষ প্রাচীরের ভেতরের দিকে কোষ ঝিল্লী বিদ্যমান থাকে। কোষ ঝিল্লী দিয়ে আবৃত থাকে সাইটোপ্লাজম। সাইটোপ্লাজমে বিদ্যমান থাকে সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াস, ক্লোরোপ্লাস্ট, মাইটোকন্ড্রিয়া, পাইরিনয়েড, রাইবোসোম ইত্যাদি অঙ্গাণু এবং সঞ্চিত খাদ্য।

শৈবালের জনন :
শৈবাল তিনটি প্রক্রিয়ায় জনন কার্য সম্পন্ন করে। যেমন- (ক) অঙ্গজ জনন, (খ) অযৌন জনন এবং (গ) যৌন জনন।

(ক) অঙ্গজ জনন-
দৈহিক অঙ্গের মাধ্যমে অঙ্গজ জনন সম্পন্ন হয়। এটি বিভিন্ন উপায়ে ঘটে। যথা-
১। কোষের বিভাজন- এককোষী শৈবাল কোষের বিভাজনের মাধ্যমে অঙ্গজ জনন সম্পন্ন করে। এ প্রক্রিয়ায় মাতৃকোষটি দু’ভাগে ভাগ হয়। ফলে দুটি অপত্য কোষের সৃষ্টি হয়। পরে প্রত্যেকটি অপত্য কোষ এক একটি পূর্ণাঙ্গ শৈবালে পরিণত হয়। যেমন- Desmids, Diatom (Navicula) ইত্যাদি শৈবালে এ রকম ঘটে।
২। খন্ডায়ন- বহুকোষী শৈবালে বিভিন্ন আঘাত বা অন্য কোন কারণে ফিলামেন্টটি ভেঙ্গে গিয়ে কয়েকটি খন্ডে পরিণত হয়। পরবর্তীতে প্রতিটি খন্ড এক একটি পূর্ণাঙ্গ শৈবালে পরিণত হয়। যেমন- - Chara, Ulothrixইত্যাদি।
৩। টিউবার সৃষ্টি- কোন কোন শৈবালে মাটির নিচের অংশে টিউবার তৈরি হয় যা পরবর্তীতে পৃক হয়ে এক একটি পূর্ণাঙ্গ শৈবালে পরিণত হয়। যেমন- Chara ইত্যাদি।
৪। কুঁড়ি (Budding) উৎপাদন- কুঁড়ি উৎপাদনের মাধ্যমে কোন কোন শৈবালে নতুনভাবে পূর্নাঙ্গ শৈবাল সৃষ্টি হয়। যেমন- Protosiphon ।

(খ) অযৌন জনন-
স্পোর উৎপাদনের মাধ্যমে শৈবালে অযৌন জনন সম্পন্ন হয়। এদের যে কোনো একটি অঙ্গজ কোষ স্পোরথলি হিসেবে কাজ করে। এসব থলিতে এক থেকে অসংখ্য স্পোর তৈরি হয়। স্পোরগুলো ফ্লাজেলাবিশিষ্ট এবং সচল হলে তাদেরকে জুস্পোর বলা হয়। জুস্পোরগুলো সাধারণত ২-৪ ফ্ল্যাজেলাবিশিষ্ট হয়। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে জুস্পোরগুলো অধিক ফ্ল্যাজেলাবিশিষ্ট হতে পারে। স্পোরগুলো ফ্ল্যাজেলাবিহীন এবং নিশ্চল হলে তাদেরকে অ্যাপ্লানোস্পোর বলা হয়। বিরূপ পরিবেশে অ্যাপ্লানোস্পোর চতুর্দিকে পুরু প্রাচীর তৈরি করে, একে হিপনোস্পোর বলা হয়। এছাড়া কিছু শৈবালে অ্যাকাইনিটি উৎপাদনের মাধ্যমে অযৌন জনন ঘটে। যেমন- Pithophora, Cladophora ইত্যাদি শৈবালে এ রকম ঘটে।

(গ) যৌন জনন-
শৈবালে তিন ধরনের যৌন জনন হয়। যথা- ১। আইসোগ্যামি, ২। অ্যানাইসোগ্যামি এবং ৩। ঊগ্যামি।

১। আইসোগ্যামি-
আইসো অর্থাৎ সমান বা একই ধরনের। এক্ষেত্রে একই ধরনের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একটি স্ত্রী গ্যামিট (-) এবং অপরটি পুংগ্যামিট (+) একত্রে মিলনের মাধ্যমে যৌন জনন সম্পন্ন করে। এ ধরনের গ্যামিটকে আইসোগ্যামিট বলা হয়।

২। অ্যানাইসোগ্যামি-
অ্যানাইসো অর্থাৎ অসম বা ভিন্ন আকৃতির। এক্ষেত্রে অসম আকৃতির দু’টি গ্যামিটের মিলনের মাধ্যমে যৌন জনন সম্পন্ন হয়। এতে পুংগ্যামিট (+), স্ত্রীগ্যামিট (-) অপেক্ষা আকারে ক্ষুদ্র হয়। এ ধরনের গ্যামিটকে অ্যানাইসোগ্যামিট বলা হয়।

৩। ঊগ্যামি-
দুটি ভিন্ন আকৃতির গ্যামিটের মধ্যে মিলন ঘটে যার বড় আকৃতিরটি স্ত্রী (-) টি নিশ্চল এবং ছোট আকৃতিরটি পুং (+)। এক্ষত্রে স্ত্রী গ্যামিটটি নিশ্চল ও পুং গ্যামিটটি সচল হয়। সচল পুং গ্যামিট নিশ্চল স্ত্রী গ্যামিটের নিকট এসে মিলন ঘটায়। এ ধরনের যৌন জননকে ঊগ্যামি বলে।

Ulothrix

Ulothrix এর আবাসস্থল:
Ulothrix একটি এককোষী সবুজ শৈবাল। এরা প্রধানত স্বাদু পানিতে বসবাস করে। তাই পুকুর, খাল, বিল, হাওড়, নদ-নদী, ঝরণা, পানির চৌবাচ্চা প্রভৃতি স্থানে এদের পাওয়া যায়। সাধারণত এরা ধীর গতির প্রবাহমান অথবা আবদ্ধ জলাশয়ের পরিস্কার পানিতে জন্মায়। যে স্থানে সর্বদা পানি পড়ে সে জায়গায় এরা কঠিন বস্তুর সাথে সংলগড়ব অবস্থায় লেগে থাকে। প্রসারতা লাভের জন্য এরা ঠান্ডা বা ছায়াঘন পরিবেশ বেছে নেয়। এদের কতিপয় প্রজাতি সমুদ্রে বাস করে।

Ulothrix এর গঠন: এর গঠনকে দু’ভাবে বর্ণনা করা হয়। যথা- (ক) দৈহিক গঠন এবং (খ) কৌষিক গঠন।

(ক) দৈহিক গঠন-
Ulothrix একটি ফিলামেন্টাস এবং অশাখ সবুজ শৈবাল। এর বৃদ্ধির কোন সীমা নেই। এর দেহ একসারি খর্বাকৃতির ও বেলনাকার কোষ দিয়ে গঠিত। এর গোড়ার দিকের কোষটি অন্যান্য কোষ থেকে লম্বাকৃতির, বর্ণহীন বা বাদামি এবং নিচের দিকে ক্রমান্বয়ে সরু। একে হোল্ডফাস্ট বলা হয়। এ কোষটি বিভাজনক্ষম নয়। হোল্ডফাস্ট দ্বারা শৈবালটি অন্য কোন বস্তুর সাথে আবদ্ধ থাকে। এর শীর্ষ কোষটির উপরিভাগ উত্তল লেন্সের ন্যায়। হোল্ডফাস্ট ছাড়া অন্য যে কোনো কোষ আড়াড়িভাবে বিভক্ত হয়। তাই ফিলামেন্টটি দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। চিত্র ৭.২.১ : Ulothrix শৈবাল

(খ) কৌষিক গঠন-
ফিলামেন্টের প্রতিটি কোষের একটি সুনির্দিষ্ট কোষ প্রাচীর থাকে। কোষ প্রাচীরের নিচে কোষ ঝিল্লী থাকে। কোষ ঝিল্লীর পরই ভেতরের দিকে সাইটোপ্লাজমের স্তর থাকে। হোল্ডফাস্ট ব্যতীত প্রত্যেক কোষে একটি করে নিউক্লিয়াস, একটি বেল্ট আকৃতির কেদ্বারোপ্লাস্ট এবং এক বা একাধিক পাইরিনয়েড বিদ্যমান থাকে। পাইরিনয়েড হলো প্রোটিন জাতীয় পদার্থের চকচকে দানার ন্যায় পদার্থ এবং এর চারদিকে অনেক সময় স্টার্চ থাকে। ক্লোরোপ্লাস্টটি কোষকে আংশিক অথবা সম্পূর্ণরূপে আবৃত করে রাখে। এর কোষের কেন্দ্রে একটি কোষরসপূর্ণ কোষ গহবর বিদ্যমান থাকে।

Ulothrix এর জনন:
Ulothrix তিনটি পদ্ধতিতে জনন কার্য সম্পন্ন করে। যথা- (ক) অঙ্গজ জনন, (খ) অযৌন জনন এবং (গ) যৌন জনন।

(ক) অঙ্গজ জনন:
সাধারণত খন্ডায়নের মাধ্যমে Ulothrix অঙ্গজ জনন সম্পন্ন করে। আঘাত বা অন্য কোন কারণে এর ফিলামেন্টটি ভেঙ্গে কয়েকটি খন্ডে পরিণত হয় এবং কোষ বিভাজনের মাধ্যমে প্রত্যেকটি খন্ড বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে এক একটি নতুন পূর্ণাঙ্গ Ulothrix এ পরিণত হয়।

(খ) অযৌন জনন:
সাধারণত ১। জুস্পোর এবং ২। অ্যাপ্লানোস্পোর সৃষ্টির মাধ্যমে Ulothrix এর অযৌন জনন সম্পন্ন হয়। নিম্নে এদের বর্ণনা দেয়া হলো-

১। জুস্পোর সৃস্টির মাধ্যমে Ulothrix এর অযৌন জনন-
টষড়ঃযৎরী এর জুস্পোরগুলো বিশেষ কোন কারণ ছাড়া চার ফ্ল্যাজেলাযুক্ত হয়। যে সকল কোষ থেকে জুস্পোর উৎপন্ন হয় সে সকল কোষকে বলা হয় জুস্পোরাঞ্জিয়াম। হোল্ডফাস্ট ছাড়া অন্য যে কোনো কোষ থেকে জুস্পোর উৎপন্ন হতে পারে। প্রজাতির ভিন্নতার উপর নির্ভর করে প্রতিটি জুস্পোরাঞ্জিয়াম থেকে ১-৩২টি জুস্পোর তৈরি হয়। একটি মাত্র জুস্পোর উৎপন্ন হলে কোষের সম্পূর্ণ প্রোটোপ্লাস্টই একটি জুস্পোরে পরিণত হয়। আবার একাধিক জুস্পোর উৎপন্ন হলে প্রোটোপ্লাস্ট একটু সংকুচিত হয় এবং লম্বালম্বিভাবে দু’ভাগে বিভক্ত হয়। প্রজাতির ভিন্নতার উপর নির্ভর করে ৩২টি অপত্য প্রোটোপ্লাস্ট উৎপন্ন হওয়া পর্যন্ত এ বিভাজন চলতে পারে। এ সময় প্রতিটি অপত্য প্রোটোপ্লাস্ট চার ফ্ল্যাজেলাযুক্ত জুস্পোরে পরিণত হয়। সরু কোষের প্রজাতি থেকে সৃষ্ট সকল জুস্পোর একই রকমের হয়। কিন্তু মোটা বা স্থল কোষের প্রজাতি থেকে দু’প্রকারের জুস্পোর উৎপন্ন হয়। যথা-

i. মাইক্রোজুস্পোর-
এরা তুলনামুলকভাবে ক্ষুদ্রাকৃতির। এদের আইস্পট মধ্যখানে থাকে এবং একটি স্পোরাঞ্জিয়াম থেকে ৮-৩২টি জুস্পোর উৎপন্ন হয় এবং

ii. মেগাজুস্পোর-
এরা তুলনামুলকভাবে বৃহদাকৃতির। এদের আইস্পট সম্মুখভাগে থাকে এবং একটি স্পোরাঞ্জিয়াম থেকে ১-৪টি জুস্পোর উৎপন্ন হয়। জুস্পোরগুলো দেখতে নাসপাতির ন্যায়। একটি ভেসিকল এর মাধ্যমে পরিবেষ্টিত অবস্থায় জুস্পোরগুলো জুস্পোরাঞ্জিয়াম হতে প্রাচীরের গায়ে উৎপন্ন ছিদ্র পথে বের হয় এবং ভেসিকলের অবলুপ্তির পর এরা মুক্তভাবে ভেসে বেড়ায়। ২-৬ দিন সন্তরণের পর জুস্পোরের ফ্ল্যাজেলাযুক্ত মাথাটি কোন জলজ বস্তুর সাথে আবদ্ধ হয়। আবদ্ধ হওয়ার পর এরা আস্তে আস্তে ফ্ল্যাজেলাবিহীন হয় এবং এদের চারদিকে একটি প্রাচীর নিঃসরণ করে ক্রমে দীর্ঘ হয়ে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নতুন Ulothrix ফিলামেন্ট তৈরি করে।

২। অ্যাপ্লানোস্পোর সৃস্টির মাধ্যমে Ulothrix এর অযৌন জনন-
কখনও কখনও প্রতিকূল পরিবেশে জুস্পোরগুলো জুস্পোরাঞ্জিয়াম হতে নির্গত না হয়ে এদের চারদিকে একটি প্রাচীর গঠন করে অ্যাপ্লানোস্পোরে পরিণত হয়। অ্যাপ্লানোস্পোরগুলো নিশ্চল এবং এদের প্রাচীর পাতলা। অ্যাপ্লানোস্পোরগুলো মাতৃকোষ থেকে বাইরে নির্গত হয় অথবা প্রতিকূল অবস্থায় এরা মাতৃকোষের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে। অনুকূল পরিবেশে প্রতিটি অ্যাপ্লানোস্পোর অঙ্কুরিত হয়ে নতুন Ulothrix ফিলামেন্ট সৃষ্টি করে। বিশেষ পরিস্থিতিতে জুস্পোর এবং অ্যাপ্লানোস্পোর ছাড়াও অ্যাকাইনিটি, হিপনোস্পোর এবং পামেলা দশা সৃষ্টির মাধ্যমে Ulothrix অযৌন জনন সম্পন্ন করে। যেমন- কখনও কখনও দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি না হওয়ার কারণে বা জলাশয়ের পানি শুকিয়ে গেলে Ulothrix এর ফিলামেন্ট খন্ড খন্ড হয়। পরে প্রতিটি খন্ড পুরু প্রাচীর দ্বারা আবৃত হয়ে প্রতিকূল সময় অতিবাহিত করে। এ অবস্থাকে অ্যাকাইনিটি বলা হয়। অনুকূল পরিবেশে অ্যাকাইনিটি অঙ্কুরিত হয় এবং নতুন Ulothrix ফিলামেন্ট গঠন করে। আবার অনেক সময় প্রতিকূল পরিবেশে প্রতিটি কোষের প্রোটোপ্লাস্ট গোলাকৃতি ধারণ করে এবং চারদিকে একটি পুরু প্রাচীর দিয়ে আবৃত হয়। এ অবস্থাকে হিপনোস্পোর বলা হয়। অনুকূল পরিবেশে অ্যাকাইনিটি অঙ্কুরিত হয়ে নতুন Ulothrix ফিলামেন্ট গঠন করে। কখনও কখনও হিপনোস্পোর এর প্রোটোপ্লাস্ট বিভক্ত হয়ে অপত্য প্রোটোপ্লাস্টে পরিণত হয় ও জুস্পোর তৈরি করে। এক সময় কোষ প্রাচীর ভেঙ্গে জুস্পোরগুলো মুক্ত হয় এবং অঙ্কুরিত হয়ে নতুন Ulothrix ফিলামেন্ট গঠন করে। আবার জলাশয়ের পানি শুকিয়ে গেলে জলাশয়ের কিনারায় ভেজা মাটিতে যখন পরিত্যক্তভাবে জন্মায় তখন ফিলামেন্টের ভেতরে সৃষ্ট অ্যাপ্লানোস্পোরগুলো মিউসিলেজ দ্বারা আবৃত থাকে। এ অবস্থাকে পামেলা দশা বলা হয়। অনুকূল পরিবেশে মিউসিলেজের আবরণটি পানিতে দ্রবীভূত হয় এবং প্রতিটি অ্যাপ্লানোস্পোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ জুস্পোর তৈরির মাধ্যমে একটি নতুন Ulothrix ফিলামেন্ট গঠন করে।

(গ) যৌন জনন:
একটি হেটারোথ্যালিক বা ভিন্নবাসী শৈবাল এর স্ত্রী (-) ও পুরুষ (+) আলাদা ফিলামেন্ট থেকে উৎপন্ন হয়। এর যৌন জনন আইসোগ্যামাস প্রকৃতির। এর যৌন জনন তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়। যথা- ১। গ্যামিট উৎপাদন, ২। নিষেক এবং ৩। জাইগোটের অঙ্কুরোদগম।

১। গ্যামিট উৎপাদন-
হোল্ডফাস্ট ব্যতীত যে কোনো একটি কোষের প্রোটোপ্লাস্ট বিভাজনের মাধ্যমে ৮-৬৪টি অপত্য প্রোটোপ্লাস্ট তৈরি করে। প্রতিটি অপত্য প্রোটোপ্লাস্ট একটি নাসপাতি আকৃতির দ্বিফ্ল্যাজিলেট গ্যামিটে রূপান্তরিত হয় এবং এগুলো জুস্পোর থেকে আকারে ক্ষুদ্র। এদের আইস্পট অত্যন্ত স্পষ্ট। আকার আকৃতিতে অভিন্ন হলেও প্রকৃতিতে ভিন্নধর্মী তাই এদেরকে (+) এবং (-) স্ট্রেন নামে চিহ্নিত করা হয়। এরা যে কোষ থেকে উৎপন্ন হয় তাকে গ্যামিট্যাঞ্জিয়াম বলা হয় এবং এর প্রাচীরে ছিদ্র সৃষ্টি হয়। এসব ছিদ্র পথে একটি ভেসিকল দিয়ে আবৃত অবস্থায় ফিলামেন্টগুলো গ্যামিট্যাঞ্জিয়াম থেকে বের হয়ে বাইরে আসে। ভেসিকলের অবলুপ্তির পর এরা মুক্তভাবে সাঁতার কাটতে থাকে।

২। নিষেক-
সাঁতার শেষে দুটি ভিন্ন ফিলামেন্ট থেকে দুটি ভিন্নধর্মী গ্যামিট (+) ও (-) পরস্পর মিলিত হয়ে যৌন মিলন সম্পন্ন করে। ফলে একটি চার ফ্ল্যাজেলাবিশিষ্ট জাইগোট গঠন করে। জাইগোটটি ডিপ্লয়েড (২হ)। জাইগোটটি কিছুক্ষণ সচল থাকার পর ফ্ল্যাজেলা হারিয়ে নিশ্চল হয়। এ অবস্থায় এর চারদিকে পুরু প্রাচীর দ্বারা আবৃত হয়ে বিশ্রামকাল অতিক্রম করে। বিশ্রামের আগে এরা প্রচুর খাদ্য সঞ্চয় করে।

৩। জাইগোটের অঙ্কুরোদগম-
বিশ্রাম শেষে জাইগোটে মায়োসিস বিভাজন হয় এবং ৪-১৬টি হ্যাপ্লয়েড (হ) জুস্পোর সৃষ্টি করে। আবার প্রতিকূল পরিবেশে থাকলে অ্যাপ্লানোস্পোর তৈরি হয়। জাইগোটের প্রাীচর বিদীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে জুস্পোর অথবা অ্যাপ্লানোস্পোরগুলো বের হয়ে আসে। অনুকূল পরিবেশে জুস্পোর বা অ্যাপ্লানোস্পোরগুলো অঙ্কুরিত হয়ে নতুন Ulothrix ফিলামেন্ট গঠন করে। Ulothrix এর জীবন চক্র Haplontic অর্থাৎ বহুকোষী গ্যামিটোফাইটিক জনুর সাথে এককোষী স্পোরোফাইটিক জনুর জনুক্রম ঘটে।

ব্যবহারিক- Ulothrix এর স্থায়ী স্লাইড পর্যবেক্ষণ করে শনাক্তকরণ ও অঙ্কন

পরীক্ষার নাম : Ulothrix এর স্থায়ী স্লাইড পর্যবেক্ষণ।

প্রয়োজনীয় উপকরণ :
Ulothrix এর তাজা নমুনা অথবা স্থায়ী স্লাইড, অণুবীক্ষণ যন্ত্র, ওয়াচ গ্লাস, গ্লিসারিন, কাচের স্লাইড, কাভার স্লিপ, নিডল, পানি, ব্যবহারিক সিট, পেন্সিল ইত্যাদি।

কর্মপদ্ধতি :
তাজা নমুনা সংগ্রহ (ওয়াচ গ্লাসে) করা সম্ভব হলে শিক্ষক কাচের স্লাইডে গ্লিসারিনে নমুনা স্থাপন করে তাতে কাভার স্লিপ দিয়ে অণুবীক্ষণ যন্ত্রে স্থাপন করে দিবে। শিক্ষার্থীদেরকে এটা পর্যবেক্ষণ করে খাতায় আঁকতে বলবে। তাজা নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব না হলে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে স্থায়ী স্লাইড কিনে নিবে। ব্যবহারিক ক্লাসে অণুবীক্ষণ যন্ত্রে স্থায়ী স্লাইড স্থাপন করে শিক্ষার্থীদেরকে পর্যবেক্ষণ করতে বল। শিক্ষার্থীগণ স্লাইড পর্যবেক্ষণ করে ব্যবহারিক সিটে পেন্সিল দিয়ে সঠিক চিহ্নিত চিত্র অঙ্কন করবে।

পর্যবেক্ষণ :
স্লাইডটি ভালভাবে পর্যবেক্ষণ কর। এতে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো দেখতে পাবে-
১। এর দেহ বহুকোষী, শাখাহীন, ফিলামেন্টাস এবং সবুজ।
২। প্রতিটি কোষে আংটি বা বেল্ট আকৃতির একটি ক্লোরোপ্লাস্ট এবং বহু পাইরিনয়েড আছে।
৩। অনেকগুলো কোষ একটির পর একটি সজ্জিত হয়ে ফিলামেন্টটি গঠিত হয়। এর কোষগুলো বেলনাকৃতির হবে।
৪। ফিলামেন্টের নিচের দিকে হোল্ডফাস্ট বিদ্যমান থাকে।
এগুলোই শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য।

সিদ্ধান্ত : উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো বিবেচনায় সংগ্রহকৃত নমুনাটি একটি সবুজ শৈবাল যার নাম Ulothrix ।

শিক্ষার্থীর কাজ নিজের খাতায় Ulothrix এর চিহ্নিত চিত্র এঁকে ব্যবহারিক ক্লাসে উপস্থাপন করবে

ছত্রাক:


ফানজাই (Fungi) এর বাংলা হলো ছত্রাক। ক্লোরোফিলবিহীন অসবুজ সমাঙ্গদেহী উদ্ভিদগুলোই ছত্রাক নামে পরিচিত। ছত্রাক সম্পর্কিত বিদ্যাকে মাইকোলজি বলা হয়। বিখ্যাত ছত্রাকবিদ সি. জে. অ্যালেক্সোপোলাস (১৯৬২) এর মতে নিউক্লিয়াসযুক্ত, স্পোর ধারণকারী, ক্লোরোফিলবিহীন জীবগোষ্ঠী, যারা অযৌন ও যৌন পঙক্রিয়ায় বংশবৃদ্ধি করে এবং যারা শাখান্বিত সূত্রাকৃতি, হেমিসেলুলোজ বা কাইটিন বা উভয় প্রকার পদার্থযুক্ত কোষ প্রাচীর দিয়ে পরিবেষ্টিত সেরূপ জীবগোষ্ঠীই ছত্রাক। আর্দ্রতা, উষ্ণতা, খাদ্যসমৃদ্ধ ছায়াযুক্ত বা অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশেই ছত্রাকের উপযুক্ত বাসস্থান। যথা- Saccharomyces, Penicillium, Agaricus, Mucor, Puccinia, Candida, Botrytis, Helminthosporium, Arcyria, Saprolegnia ইত্যাদি ছত্রাকের উদাহরণ।
ছত্রাকের অঙ্গজদেহ লম্বা সুতার ন্যায় নালিকা বা হাইফি (Hypae) দিয়ে গঠিত। হাইফিকে একবচনে হাইফা (Hypa) বলা হয়। এসব হাইফিগুলো প্রচুর শাখা প্রশাখাবিশিষ্ট হয়ে একত্রে অবস্থান করে একটি জটের সৃষ্টি করে। একে মাইসেলিয়াম বলা হয়। মাইসেলিয়ামকে বহুবচনে মাইসেলিয়া বলে।

ছত্রাকের বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ-
১। ছত্রাক অপুষ্পক উদ্ভিদ।
২। এরা ক্লোরোফিলবিহীন, অসবুজ এবং সালোকসংশ্লেষণে অক্ষম।
৩। এরা মৃতজীবী, পরজীবী বা মিথোজীবী হিসেবে বাস করে।
৪। এদের কোষে সুগঠিত নিউক্লিয়াস ও বিভিন্ন অঙ্গাণু থাকে।
৫। এদের কোষ প্রাচীর কাইটিন দিয়ে গঠিত।
৬। ছত্রাকের সঞ্চিত খাদ্য গ্লাইকোজেন বা চর্বি।
৭। এদের পরিবহনতন্ত্র বা ভাস্কুলার টিস্যু থাকে না।
৮। এদের জননাঙ্গ এককোষী।
৯। স্ত্রীজননাঙ্গে থাকা অবস্থায় জাইগোট বহুকোষী ভ্রূণে পরিণত হয় না।
১০। হ্যাপ্লয়েড স্পোর দিয়ে বংশবিস্তার হয় এবং
১১। জাইগোটে মায়োসিস ঘটে।

ছত্রাকের গঠন:
অধিকাংশ ছত্রাকই বহুকোষী। ছত্রাকের অঙ্গজদেহ সূত্রাকার, শাখান্বিত এবং আণুবীক্ষণিক। এদের সূত্রাকার শাখাকে একবচনে হাইফা এবং বহুবচনে হাইফি বলা হয়। এগুলো সরু, স্বচ্ছ এবং নলাকার। হাইফাগুলো প্রচুর শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট হয়ে পরস্পরের সাথে একত্রে অবস্থান করে একটি জটের সৃষ্টি করে। একে একবচনে মাইসেলিয়াম এবং বহুবচনে মাইসেলিয়া বলা হয়। ছত্রাকের হাইফাগুলো আবার দু’রকমের। যথা- কিছু কিছু ছত্রাকের হাইফাতে আড়াআড়ি প্রাচীর দেখা যায়। এদেরকে বহুবচনে সেপ্টা (Septa) এবং একবচনে সেপ্টাম (Septum) বলা হয়। যে সব হাইফাতে সেপ্টা উপস্থিত থাকে তাদেরকে মনে করা হয় একাধিক কোষ দিয়ে গঠিত এবং যে সব ক্ষেত্রে হাইফাতে কোন সেপ্টা থাকে না তাদেরকে মনে করা হয় এককোষী। যেহেতু সেপ্টাবিহীন ছত্রাকের দেহের গঠন কম জটিল সেহেতু একে নিম্নস্তরের ছত্রাক (Lower Fungi) বলা হয়। অপরদিকে সেপ্টাযুক্ত হাইফাবিশিষ্ট ছত্রাককে উচ্চস্তরের ছত্রাক (Higher Fungi) বলা হয়। ছত্রাকের কোষে এক বা একাধিক নিউক্লিয়াস থাকে। কোষে একাধিক নিউক্লিয়াস থাকলে তাকে সিনোসাইট (Coenocyte) বলা হয়। এ ধরনের ছত্রাককে সিনোসাইটিক ছত্রাক বলা হয়। পরজীবী ছত্রাক পোষকদেহ থেকে যে হাইফা দ্বারা খাদ্য শোষণ করে তাকে হস্টোরিয়াম (Hostorium) বলা হয়। উচ্চশ্রেণির কিছু ছত্রাকে মাইসেলিয়াম শক্ত রশির ন্যায় গঠন করে, একে রাইজোমর্ফ (Rhizomorph) বলা হয়। অনেক সময় মাইসেলিয়ামে পাশাপশি দুটি কোষের মধ্যে সংযোগ সাধনের উদ্দেশ্যে এদের প্রস্থ প্রাচীরের কাছে সেতুর ন্যায় একটি হাইফাল সংযোগ নল উৎপন্ন হয়। এ সংযোগ নলকে ক্ল্যাম্প যোজক বলা হয়। কিছু উদ্ভিদের সরু মূল বা মূলরোমের চারদিকে বা অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট ছত্রাক জালের ন্যায় আবৃত করে রাখে। এ ধরনের ছত্রাককে মাইকোরাইজাল (Mycorrhyzal) ছত্রাক বলা হয়।

ছত্রাকের জনন:
ছত্রাক সাধারণত (ক) অযৌন এবং (খ) যৌন উভয় উপায়ে বংশবৃদ্ধি সম্পন্ন করে। কিছু কিছু ছত্রাক প্রজাতির সমস্ত দেহটিই জনন কাজে অংশ নেয়। এ ধরনের ছত্রাকের দৈহিক ও জননাঙ্গের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না। এরূপ ছত্রাককে হলোকার্পিক ছত্রাক বলা হয়। যেমন- Synchytrium । আবার অধিকাংশ ছত্রাকের দেহের অংশবিশেষ থেকে জননাঙ্গের সৃষ্টি হয় কিন্তু অন্য অংশ স্বাভাবিক থাকে। এরূপ ছত্রাককে বলা হয় ইউকারপিক ছত্রাক। যেমন- Saprolegnia, Penicillium ।

(ক) অযৌন জনন:
এ প্রক্রিয়ায় দুটি গ্যামিটের যৌন মিলনের দরকার হয় না। ছত্রাকে অযৌন জনন প্রক্রিয়াটি নিম্নের কয়েকটি উপায়ে ঘটে থাকে-
১। খন্ডায়ন- বিভিন্ন প্রাকৃতিক বা বাহ্যিক কারণে ছত্রাকের দেহটি একাধিক খন্ডে বিভক্ত হয় এবং প্রতিটি খন্ড এক একটি স্বতন্ত্র ছত্রাকদেহে পরিণত হয়। যেমন- Rhizopus, Penicillium।
২। দ্বিভাজন- বিশেষ প্রক্রিয়ায় দৈহিক কোষটি দুটি অপত্য কোষে পরিণত হয় এবং প্রতিটি অপত্য কোষ এক একটি স্বতন্ত্র ছত্রাকদেহে পরিণত হয়। যেমন- Saccharomyces (Yeast)।
৩। কুঁড়ি উৎপাদন- কোন কোন ছত্রাকের দৈহিক অঙ্গ থেকে কুঁড়ি তৈরি হয় এবং কুঁড়িটি পৃক হয়ে এক একটি স্বতন্ত্র ছত্রাকদেহে পরিণত হয়। যেমন- Saccharomyces।
৪। স্পোর উৎপাদন- স্পোর উৎপাদন পঙক্রিয়াই হল ছত্রাকের প্রধান অযৌন জনন। ছত্রাকের স্পোর উৎপাদন অঙ্গকে স্পোরাঞ্জিয়াম বলা হয় (বহুবচনে স্পোরাঞ্জিয়া)। স্পোরাঞ্জিয়ামের অভ্যন্তরে একাধিক নিশ্চল অ্যাপ্লানোস্পোর অথবা সচল জুস্পোর বা স্পোরাঞ্জিওস্পোর উৎপন্ন হয়। আবার হাইফার মাথায়ও স্পোর উৎপন্ন হয়। যেমন- Penicillium । এরূপ স্পোরকে কনিডিয়া (Conidia) বলা হয়। পুরু আবরণ দ্বারা আবৃত স্পোরকে মাইডোস্পোর বলা হয়। যেমন- Mucor, Fusarium । প্রতিটি স্পোর উপযুক্ত পরিবেশে অঙ্কুরিত হয়ে স্বতন্ত্র ছত্রাকে পরিণত হয়।

(খ) যৌন জনন:
দুটি গ্যামিটের মিলনের মাধ্যমে যৌন জনন সম্পন্ন হয়। ছত্রাকের জননাঙ্গকে গ্যামিট্যাঞ্জিয়াম বলা হয় (বহুবচনে গ্যামিট্যাঞ্জিয়া)। গ্যামিট্যাঞ্জিয়ামে গ্যামিট উৎপাদন হয়। পুং (+) এবং স্ত্রী (-) গ্যামিট একই আকৃতির হলে তাকে আইসোগ্যামিট বলা হয়। আবার পুং (+) এবং স্ত্রী (-) গ্যামিট ভিন্ন আকৃতির হলে পুং গ্যামিট্যাঞ্জিয়ামকে অ্যান্থেরিডিয়াম এবং স্ত্রী গ্যামিট্যাঞ্জিয়ামকে ঊগোনিয়াম বলা হয়। ছত্রাকের যৌন জনন প্রধানত তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে দুটি জনন কোষের প্রোটোপ্লাজমের মিলন ঘটে, যাকে বলা হয় প্লাজমোগ্যামি। দ্বিতীয় ধাপে কোষের নিউক্লিয়াস দুটির মিলন ঘটে, যাকে বলা হয় ক্যারিওগ্যামি। ক্যারিওগ্যামির ফলে জাইগোট উৎপন্ন হয়। জাইগোট কোষটি ডিপ্লয়েড (2n)। তৃতীয় ধাপে জাইগোটে মায়োসিস বিভাজন হয়। এর ফলে ছত্রাকটি পুনরায় হ্যাপ্লয়েড (n) অবস্থাপ্রাপ্ত হয়। অ্যাসকোমাইকোটা বা স্যাক ফানজাইতে অ্যাসকাস নামক নলের ভেতরে ৪-৮টি অ্যাসকোস্পোর তৈরি হয়। ব্যাসিডিওমাইকোটা বা ক্লাব ফানজাইতে ব্যাসিডিওকার্পে সৃষ্ট ব্যাসিডিয়ামের মাথায় ব্যাসিডিওস্পোর উৎপন্ন হয়।

ছত্রাকের গুরুত্ব:
মানব জীবনে ছত্রাকের গুরুত্ব অপরিসীম। ছত্রাক আমাদের (ক) উপকার এবং (খ) অপকার দুটোই করে থাকে।

(ক) ছত্রাকের উপকারিতা :
ছত্রাক বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের উপকার করে। যেমন-
১। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি- বিভিন্ন ধরনের ছত্রাক এককভাবে ও ব্যাকটেরিয়ার সাথে যৌথভাবে মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষের দ্রুত পঁচন ঘটায়। বিভিন্ন ধরনের জৈব বস্তুর পচনের ফলে যে সকল পদার্থ তৈরি হয় সেগুলো মাটিতে মিশে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। ছত্রাক মাটিতে বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক বস্তুর ভারসাম্য রক্ষা করে এবং জৈব বস্তুর পঁচনের ফলে সৃষ্ট দুর্গন্ধ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করে। এজন্য মৃতজীবী ছত্রাককে ঝাড়–দার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২। শিল্পজাত দ্রব্য উৎপাদন
i. অ্যালকোহল প্রস্তুতে- ঈষ্ট কোষে জাইমেজ এনজাইম বিদ্যমান। ঈষ্ট কোষ হতে নিঃসৃত জাইমেজ এনজাইম গাঁজানো প্রক্রিয়ায় শর্করা থেকে অ্যালকোহল প্রস্তুতে ব্যবহৃত হয়। এ প্রক্রিয়ায় ইথাইল অ্যালকোহল, কার্বন ডাইঅক্সাইড ও শক্তি নির্গত হয়। ওষুধ শিল্প ও বিভিন্ন বিজ্ঞান গবেষণাগারে অ্যালকোহল ব্যবহৃত হয়।
ii. বিয়ার প্রস্তুতে- Saccharomyces cerevisiae প্রয়োগ করে বিয়ার প্রস্তুত করা হয়। আঙ্গুরের রস থেকে ওয়াইন এবং আপেলের রস থেকে সিডার প্রস্তুতেও ঈষ্ট ব্যবহৃত হয়। iii. রুটি শিল্পে- পাউরুটি তৈরিতে ঈষ্ট ব্যবহৃত হয়। ময়দার সাথে ঈষ্ট পাউডার মিশ্রণের ফলে, ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়ায় ঈষ্ট কার্বন ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন করে। কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস রুটি ফুলাতে সাহায্য করে। রুটি শিল্পকে আবার বেকারী (Bakery industry) শিল্প বলে।
iv. পনির উৎপাদনে- Penicillium camemberti এবং P. roqueforti এ দুটি প্রজাতি পনির উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। কোন কোন স্পোরের রং নীল হওয়ায় পনির নীল বর্ণ ধারণ করে। এদের তখন নীল পনির বলে আখ্যায়িত করা হয়।
v. জৈব অ্যাসিড তৈরিতে- Aspergillus এবং Penicillium এর বিভিন্ন প্রজাতি কয়েক প্রকার জৈব অ্যাসিড, যেমন সাইটি্রক অ্যাসিড, ফিউমারিক অ্যাসিড, অক্সালিক অ্যাসিড, ম্যালিক অ্যাসিড ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। অ্যান্টিবায়োটিক ও ওষুধ শিল্পে- Penicillium griseofulvum নামক প্রজাতি থেকে গ্রাইসিওফুলভিন নামক ওষুধ প্রস্তুত হয়। এ ওষুধ মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর দাদ ও কয়েক ধরনের ছত্রাকজনিত রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। আলেকজান্ডার ফ্লেমিং (১৯২৯) অ্যান্টিবায়োটিক ‘পেনিসিলিন’ (Penicillin)-এর উৎস Penicillium notatum থেকে প্রথমে পেনিসিলিন তৈরি করেন। এর উৎপাদন কম হওয়ায় পরবর্তীতে P. chrysogenum হতে উৎকৃষ্ট মানের এবং অধিক পরিমাণে পেনিসিলিন বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করা হয়।
খাদ্য হিসেবে ছত্রাক- ঈষ্টে বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন (যেমন- ভিটামিন-বি, ভিটামিন-বি২ ও ভিটামিন-সি) থাকায় ঈষ্ট পুষ্টিকর ও মূল্যবান খাদ্যরূপে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও Agaricus সহ আরও বেশ কিছু ছত্রাককে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
অনিষ্টকারী কীটপতঙ্গের জীবজ নিয়ন্ত্রণে- মাটিতে বসবাসকারী রোগ সৃষ্টির ছত্রাকসমূহকে দমন করতে বা জীবজ নিয়ন্ত্রণে কতিপয় ছত্রাক ব্যবহার করা হয়।
প্রোটিন উৎস হিসেবে- ঈষ্ট কোষ প্রোটিনসমৃদ্ধ। ঈষ্ট কোষের শুষ্ক ওজনের শতকরা ৩৭ ভাগ প্রোটিন থাকে। তাই খাদ্যে প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে ঈস্ট কোষ ব্যবহৃত হয়।

(খ) ছত্রাকের অপকারিতা: ছত্রাক বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের অপকার করে। যেমন-
খাদ্যদ্রব্য বিনষ্টকরণে- রান্না করা খাদ্যসামগ্রী বিশেষ করে মাছ, মাংস, নানা ধরনের সবজি, মুখ রোচক খাদ্য, জ্যাম-জেলি আচার ও চাটনি ইত্যাদি নষ্ট করে । আপেল, কমলা, আঙ্গুর, নাশপতি ইত্যাদি ফল Penicillium দিয়ে আক্রাš Í হয়ে দ্রুত পঁচে যায়। সব প্রকার লেবুর পঁচনের জন্য P. digitatum এবং P. italicum দায়ী।
নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বিনষ্টকরণে- পরিধেয় বস্ত্র যেমন চামড়ার জুতা, চামড়ার ব্যাগ, বই, কাগজ, চশমা, ক্যামেরা, লেন্স, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ইত্যাদি ছত্রাক দ্বারা নষ্ট হয়। বই, কাগজ, কাপড়, চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্যে Penicillium জন্মানোর ফলে দাগ পড়ে ও ব্যবহার অনুপযোগী হয়।

Agaricus:
Agaricus একটি মৃতজীবী ছত্রাক। এর সাধারণ নাম মাশরুম। এটি মানুষের কাছে ব্যাঙের ছাতা নামেও পরিচিত।

Agaricus এর শ্রেণিবিন্যাস:
Kingdom- Fungi,
Division- Basidiomycota,
Class- Basidiomycetes,
Order-Agaricales,
Family- Agaricaceae,
Genus- Agaricus|

Agaricus আবাসস্থল:
Agaricus ভেজা মাটিতে, মাঠে-ময়দানে, কাঠের উপরে, খড়ের গাঁদা, গোবর প্রভৃতি পঁচনশীল জৈব পদার্থের উপর জন্মায়। বৃষ্টির দিনে এরা অধিক পরিমাণে জন্মায়। অনেক সময় সবুজ ঘাসের লনে অমধৎরপঁং এর কোন কোন প্রজাতি দলবদ্ধভাবে একটি বৃত্তের আকারে অবস্থান করে। এ ধরনের বৃত্তকে পরিচক্র (Fairy ring) বলে।

Agaricus এর গঠন:
Agaricus -এর দেহটি দুটি অংশে বিভক্ত। যথা- (ক) দৈহিক অঙ্গ তথা মাইসেলিয়াম এবং (খ)জনন অংশ তথা ফ্রুটিং বডি। ব্যাসিডিয়োস্পোরের অঙ্কুরোদগমের ফলে সৃষ্ট প্রাথমিক মাইসেলিয়াম হতে অমধৎরপঁং এর অঙ্গজ মাইসেলিয়ামের সৃষ্টি হয়। মাইসেলিয়াম অধিক শাখা-প্রশাখা যুক্ত, আলগাভাবে জট পাকানো এবং ভেজা মাটি বা জৈব পদার্থের ভেতরে অবস্থিত। মাইসেলিয়াম সৃষ্টিকারী হাইফাগুলো প্রস্থ প্রাচীরযুক্ত। হাইফাগুলো সাদা বর্ণের এবং আবাসস্থল থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করে। হাইফার কোষগুলোতে অসংখ্য নিউক্লিয়াস, দানাদার সাইটোপ্লাজম, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভ্যাকুওল এবং সঞ্চিত খাদ্যরূপে তৈল বিন্দু থাকে। হাইফির মাইসেলিয়ামগুলো অনেক সময় ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে দড়ির ন্যায় গঠন সৃষ্টি করে, একে রাইজোমর্ফ বলা হয়।
Agaricus এর কতিপয় প্রজাতির মৃদগত মাইসেলিয়াম একটি কেন্দ্রীয় বিন্দু হতে ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে চারদিকে বিস্তার লাভ করতে থাকে। পরিণত অবস্থায় এ প্রকার মাইসেলিয়ামের হাইফাগুলোর অগ্রভাগ থেকে ব্যাসিডিওকার্প উৎপন্ন হয়ে মাটির উপরে উঠে আসে। উৎপন্ন ব্যাসিডিয়োকার্পগুলো একটি চক্রের ন্যায় দেখায় বলে একে পরিচক্র বা Fairy ring বলা হয়। Agaricus এর বায়বীয় ও দৃশ্যমান অংশটি ব্যাসিডিওকার্প নামে পরিচিত। সাধারণভাবে একে ফল-দেহ বা Fruiting body ও বলা হয়।

ব্যাসিডিওস্পোর
পরিণত অবস্থায় ব্যাসিডিয়োকার্পটি দু’টি অংশে বিভক্ত। যথা- নিচের বেলনাকার বৃন্ত সদৃশ অংশটির নাম স্টাইপ ও উপরের ছাতার ন্যায় অংশটির নাম পাইলিয়াস।
সুতার ন্যায় সরু এবং চওড়া ও স্ফীত এ দু’ধরনের হাইফা দিয়ে স্টাইপটি গঠিত। স্টাইপের নিচের দিকে ক্রমশঃ সরু হয়। স্টাইপের উপরের দিকে একটি আংটির ন্যায়, ভঙ্গুর ও সরু অংশ থাকে, একে বলয় (Annulus) বলা হয়। স্টাইপের অগ্রভাগে অবস্থিত ছাতার ন্যায় অংশটিকে পাইলিয়াস (Pileus) বলে। প্রকৃতপক্ষে এটি ব্যাসিডিয়োকার্পের একটি প্রসারিত অংশ। পরিষ্ফুটনের প্র ম অবস্থায় পাইলিয়াসের উপরিভাগ উত্তল (Convex) থাকে এবং পরিণত অবস্থায় চ্যাপ্টা হয়। পাইলিয়াসের উপরিতল পাতলা, শুষ্ক, মসৃণ, সাদা বা হালকা পিঙ্গল বর্ণের হয়, ব্যাসিডিয়োকার্পের এ অংশটিকে মাংসল অংশ বলে। পাইলিয়াসের কিনারা অখন্ড বা ঢেউযুক্ত থাকতে পারে। পাইলিয়াসের নিম্নতলে গোলাপী বা লোহিত পিঙ্গল বর্ণের পাতলা, পরস্পর হতে পৃক কতগুলো পাতের ন্যায় অংশ থাকে যাকে গিল (Gill) বলা হয়। গিলগুলো স্টাইপ ও পাইলিয়াসের সংযোগস্থল হতে উৎপন্ন হয়ে পাইলিয়াসের কিনারা পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে।

ব্যবহারিক- Agaricus এর ফ্রুটবডি শনাক্তকরণ

পরীক্ষার নাম: Agaricus এর ফ্রুটবডি শনাক্তকরণ।

প্রয়োজনীয় উপকরণ: Agaricus এর তাজা নমুনা অথবা শুকনো ফ্রুটবডির-স্লাইড, অণুবীক্ষণ যন্ত্র, ওয়াচ গ্লাস, গ্লিসারিন, কাচের স্লাইড, কাভার স্লিপ, নিডল, পানি, ব্যবহারিক সিট, পেন্সিল ইত্যাদি।

কর্মপদ্ধতি: মাঠ থেকে সদ্য তোলা তাজা নমুনা সংগ্রহ করে শিক্ষক শিক্ষার্থীদেরকে Agaricus এর বিভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষণের জন্য যোগান দিবেন। শিক্ষার্থীগণ নমুনাটি ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন অংশ চিহ্নিত করে Agaricus এর চিত্র অঙ্কন করবেন।

পর্যবেক্ষণ: নমুনাটি সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। এতে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো দেখতে পাবেন-
১। ফ্রুটবডি দুটি অংশে বিভক্ত। যথা- বৃন্তের ন্যায় স্টাইপ এবং স্টাইপের অগ্রভাগে ছাতার ন্যায় পাইলিয়াস।
২। স্টাইপের উপরের দিকে বলয় (Annulus) নামক একটি প্রশস্ত আংটির ন্যায় অংশ থাকে।
৩। পাইলিয়াসের উপরের পৃষ্ঠ মসৃণ, কোমল এবং কিছুটা উত্তলাকৃতির।
৪। পাইলিয়াসের নিচের দিকে অসংখ্য পাতার ন্যায় গিল থাকে। গিলগুলো ঝুলন্তভাবে অবস্থান করে। এগুলোই Agaricus এর ফ্রুটবডির শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য।

সিদ্ধান্ত: উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো বিবেচনায় সংগ্রহকৃত নমুনাটি একটি ছত্রাক যার বৈজ্ঞানিক নাম Agaricus ।

আলুর বিলম্বিত ধ্বসা রোগ গাছের পাতা, কান্ড, ফুল ইত্যাদি শুকিয়ে যাওয়াকে বলা হয় ধ্বসা রোগ (Blight)। আলু গাছে দু’ধরনের ব্লাইট দেখা যায়। যথা- (ক) বিলম্বিত ধ্বসা রোগ এবং (খ) আগাম ধ্বসা রোগ। বিলম্বিত ধ্বসা রোগের জন্য অনেক সময় ক্ষেতের সমস্ত ফসলই নষ্ট হয় । তাই একে অনেক সময় মড়ক রোগও বলা হয়। এ রোগ বিশ্বের সর্বত্রই পরিলক্ষিত হয়। ১৮৪৫ সালে আয়ারল্যান্ডে এ রোগ মারাত্মকভাবে দেখা দেয়ায় সে দেশে দুর্ভিক্ষ হয়। ফলে বহুলোক মারা যায় এবং বহুলোক দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমায়। আমাদের দেশে রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী, মুন্সিগঞ্জ ও ভোলায় আলুর চাষ খুব বেশি পরিমাণে হয়। এ সকল অঞ্চলে বিলম্বিত ধ্বসা রোগটি প্রতিবছর কম বেশি দেখা যায়। সাধারণত বপনের প্রায় দু’মাস পর এ রোগের আবির্ভাব হয় বলে এ রোগকে বিলম্বিত ধ্বসা রোগ বলা হয়।

আলু গাছের বিলম্বিত ধ্বসা রোগের কারণ: Phytophthora infestans নামক ছত্রাকের কারণে আলুর বিলম্বিত ধ্বসা রোগের সৃষ্টি হয়। এটি Phycomycetes শ্রেণীর ছত্রাক। ছত্রাকটির বৈশিষ্ট্য হলো- এ ছত্রাকের মাইসেলিয়ামগুলো সিনোসাইটিক, অধিক শাখান্বিত এবং স্বচ্ছ। পরিণত অবস্থায় আন্তঃকোষীয় মাইসেলিয়াম থেকে পত্ররন্ধ্র দিয়ে এবং লেন্টিসেল দিয়ে গুচ্ছাকারে শাখান্বিত কনিডিয়োফোর বের হয়। কনিডিয়োফোরের শাখায় লেবু আকৃতির এবং প্যাপিলাযুক্ত কনিডিয়া উৎপন্ন হয়। প্রতিটি কনিডিয়াম অনুকূল পরিবেশে দ্বি-ফ্ল্যাজেলাযুক্ত স্পোর তৈরি করে। স্পোরগুলো প্যাপিলা বিদীর্ণ করে বাইরে বেরিয়ে আসে। এ সময় ফ্ল্যাজেলা হারিয়ে বিশ্রাম দশায় উপনিত হয়। প্রতিটি স্পোর অঙ্কুরিত হয়ে বীজনল গঠন করে এবং পোষকদেহে প্রবেশ করে মাইসেলিয়াম উৎপন্ন করে।

আলু গাছের বিলম্বিত ধ্বসা রোগের লক্ষণ: আলুর বিলম্বিত ধ্বসা রোগের লক্ষণগুলো নিম্নরূপ-
১। প্র মে পাতার কিনারায় বা অগ্রভাগে বাদামী বা লালচে কালো রংয়ের দাগ দেখা দেয়।
২। পাতার নিম্নতলের পত্ররন্ধ্র দিয়ে কনিডিয়োফোর বের হয়। কনিডিয়োফোরের গুচ্ছগুলো সাদা সাদা চূর্ণরূপে থাকে। এগুলো প্যাথোজেনের উপস্থিতি প্রমাণ করে।
৩। রোগটি ক্রমান্বয়ে পাতা থেকে কান্ডে বিস্তার লাভ করে। ফলে কান্ডে পঁচন ধরে এবং সমস্ত গাছটি বিনষ্ট হয়ে মাটিতে ঢলে পড়ে।
৪। পাতা ও কান্ড বিনষ্ট হওয়ার ফলে কন্দ বা টিউবারগুলো আক্রান্ত হয়। এর ফলে স্ফীত কন্দ বা আলুগুলোতে গাঢ় বেগুনী বা কালচে দাগ দেখা যায়।
৫। রোগ বিস্তারের পর সমস্ত আলু পঁচে নষ্ট হয়।
৬। ছত্রাক আক্রমণ তীব্র হলে আলুক্ষেতে মরা ও পঁচা টিস্যুর বিশেষ দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়।

আলু গাছের বিলম্বিত ধ্বসা রোগের প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
১। রোগমুক্ত এলাকা থেকে শুষ্ক আলু সংগ্রহ করতে হবে।
২। বীজ আলু প্রখর রৌদ্রে অনেক দিন যাবত ভালভাবে শুকাতে হবে।
৩। রোগাক্রান্ত অঞ্চলে আলু গাছ ৬-১০ইঞ্চি লম্বা হলেই এতে বোঁর্দো মিশ্রণ নামক ছত্রাকবারক ছিটাতে হবে এবং পরবর্তীতে ২০-২৫দিন পরপর ছত্রাকবারকটি ছিটাতে হবে।
৪। আলু তোলার পর ক্ষেতে আক্রান্ত গাছের পরিত্যক্ত অংশসমূহ একত্রিত করে পুড়ে ফেলতে হবে।
৫। বীজ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করতে হবে।
৬। বীজ আলু হিমাগারে রাখার পূর্বে ছত্রাকবারক দ্বারা শোধন করতে হবে।
৭। ছত্রাক প্রতিরোধক্ষম জাত চাষ করতে হবে।
৮। জমি থেকে আলু ফসল তোলার পরপরই সকল পরিত্যক্ত আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
৯। একই জমিতে প্রতিবছর আলু চাষ না করে ১/২ বছর পরপর চাষ করলে রোগের বিস্তার কম হবে।
১০। চাষের ক্ষেত্রে স্থানীয় জাত নির্বাচন করা ভাল।

লাইকেন (Lichen): শৈবাল ও ছত্রাকের সহাবস্থান

অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের দুটি জীব নিজ নিজ প্রয়োজনে ঘনিষ্ঠভাবে একত্রে অবস্থান করে। এরা উভয়ে একে অপরের উপকার করে। তাদের এ অবস্থান ও সম্পর্ককে মিথোজীবীতা এবং জীব দুটিকে মিথোজীবী জীব বলা হয়। নির্দিষ্ট প্রজাতির শৈবাল (যেমন- এককোষী শৈবাল বা সায়ানোব্যাকটেরিয়া) এবং নির্দিষ্ট প্রজাতির ছত্রাক (যেমন- স্যাক বা ক্লাব ফানজাই) এর ঘনিষ্ঠ সহাবস্থান এবং পারস্পরিক সম্পর্কের কারণে এক বিশেষ প্রকৃতির থ্যালয়েড গঠন করে। যাকে লাইকেন বলা হয়। লাইকেন এর ছত্রাকটি থ্যালয়েড এর প্রধান অংশ গঠন করে। এটি শৈবালকে আশ্রয় দেয়। লাইকেনের মোট ভরের ৫-১০% ভর শৈবালের। শৈবাল থেকে উৎপাদিত খাদ্য খেয়ে ছত্রাক জীবন ধারণ করে। লাইকেন স্বয়ংসম্পূর্ণ, বিষমপৃষ্ঠ এবং অপুষ্পক উদ্ভিদ। বিভিন্ন গবেষণায় এ পর্যন্ত ১৭,০০০ লাইকেন প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে। লাইকেন গাছের বাকল, পাতা, ক্ষয়প্রাপ্ত গুঁড়ি, মাটি, দেয়াল, পাথর, পর্বতগাত্র ইত্যাদি বস্তুর উপর জন্মায়। তুন্দ্রা অঞ্চল, মরু অঞ্চল, নীরস পর্বতগাত্রসহ সমস্ত প্রতিকূল অবস্থানে এরা জন্মাতে পারে।

লাইকেনের প্রকারভেদ: প্রাকৃতিক পরিবেশে বিভিন্ন আকৃতির লাইকেন পাওয়া যায়। বাহ্যিক গঠনগতভাবে লাইকেন তিন প্রকার। যথা- (ক) ক্রাসটোজ লাইকেন, (খ) ফোলিয়োজ লাইকেন এবং (গ) ফ্রুটিকোজ লাইকেন।

(ক) ক্রাসটোজ লাইকেন- এরা চ্যাপ্টা, ক্ষুদ্রাকার এবং পোষক বস্তুর সাথে নিবিড়ভাবে লেগে থাকে। এরা পাহাড় পর্বত, প্রস্তর খন্ড, পুরাতন অট্টালিকা, উদ্ভিদের বাকল প্রভৃতি অবলম্বনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংলগড়ব থাকে। যেমন- Cryptothecia rubrocincta, Diploicia canescens।

(খ) ফোলিয়োজ লাইকেন- এ ধরনের লাইকেন দেখতে অনেকটা বিষমপৃষ্ঠ পাতার ন্যায়। এরা প্রশস্ত এবং এদের কিনারা খাঁজকাটা ও আন্দোলিত থাকে। এরা পাহাড় পর্বত, প্রস্তর খন্ড, পুরাতন অট্টালিকা, উদ্ভিদের বাকল প্রভৃতি অবলম্বনের গাত্রে জন্মায়। এ সকল লাইকেনের থ্যালাসের কেন্দ্রিয়াঞ্চল অবলম্বনের সাথে লেপ্টে থাকে কিন্তু এদের প্রান্তভাগ খোলা থাকে। যেমন- Flavoparmelia caperata, Parmotrema tinctorum ।

(গ) ফ্রুটিকোজ লাইকেন- অধিক শাখা প্রশাখাবিশিষ্ট এবং জটিল দেহের লাইকেনকে বলা হয় ফ্রুটিকোজ লাইকেন। এ ধরনের লাইকেন চ্যাপ্টা বা দন্ডের ন্যায়, কেবল গোড়ার অংশ নির্ভরশীল বস্তুর সাথে লেগে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরা অবলম্বনের গায়ে ঝুলন্তভাবে অবস্থান করে। যেমন- Cladonia leporina, Letharia Columbiana ।

লাইকেনে শৈবাল ও ছত্রাকের মিথোজীবী সম্পর্ক: এরা পরস্পরের উপকার করে থাকে। যেমন-

শৈবালের প্রাপ্ত উপকার
১। শৈবাল ছত্রাকের দেহে আশ্রয় গ্রহণ করে।
২। ছত্রাকের শারীরবৃত্তীয় কাজের ফলে সৃষ্ট কার্বন ডাইঅক্সাইড ও পানি শৈবাল সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় কাজে লাগায়।
৩। ছত্রাকের দেহে অবস্থানের কারণে শৈবালের দৈহিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

ছত্রাকের প্রাপ্ত উপকার
১। শারীরবৃত্তীয় কাজের ফলে উদ্ভূত বর্জ্য ও জলীয়বাষ্প দেহে সরানোর জন্য ছত্রাকের কোন প্রকার শক্তির অপচয় হয় না।
২। ছত্রাক নিজে দেহে আশ্রয় দানের বিনিময়ে শৈবাল কর্তৃক উৎপাদিত খাদ্য হস্টোরিয়ামের সাহায্যে গ্রহণ করে।

লাইকেনের গুরুত্ব: লাইকেনের উপকারী এবং অপকারী উভয় ভূমিকাই রয়েছে। যথা-

উপকারী ভূমিকা

জেরোসেরি- পাহাড় পর্বতের গাত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে লাইকেন ছাড়া অন্য কোন উদ্ভিদ জন্মায় না। সেখানে লাইকেনের মৃত দেহাবশেষ থেকে হিউমাস গঠিত হয়। উক্ত হিউমাস পাথরের সাথে মিশে মাটি তৈরি করে। সেখানে ধীরে ধীরে অন্যান্য উদ্ভিদ পর্যায়ক্রমে জন্মাতে শুরু করে। অর্থাৎ লাইকেনে জেরোসেরির সূচনা ঘটে।

পশুর খাদ্য- এগুলো বলগা হরিণ এবং গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তুন্দ্রা অঞ্চলে বরফাচ্ছাদিত মাটি অথবা পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী লাইকেনের ঘন আস্তরণ রেইনডিয়ার মস নামে পরিচিত।

কীটপতঙ্গের খাদ্য- কীটপতঙ্গের লার্ভার খাদ্য হিসেবে লাইকেন ব্যবহার করা হয়।

বিভিন্ন দ্রব্য উৎপাদন- রং, লিটমাস পেপার, ঔষধ, সুগন্ধি, ট্যানিন, অ্যালকোহল, ন্যাপথালিন, কর্পূর ইত্যাদি দ্রব্য লাইকেন থেকে উৎপাদন করা যায়।

মানুষের খাদ্য- অধিকাংশ লাইকেনে লাইকেনিন নামক কার্বোহাইড্রেটের উপস্থিতির কারণে মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নরওয়ে, সুইডেন ও আইসল্যান্ডের অধিবাসীরা Cetraria slandica নামক লাইকেনটি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

ঔষধ তৈরি- জন্ডিস, ডায়রিয়া, জলাতঙ্ক এবং নানাবিধ চর্ম রোগের ঔষধ তৈরিতে লাইকেন ব্যবহার করা হয়।

অপকারী ভূমিকা আশ্রয় দাতা উদ্ভিদের ক্ষতিসাধন- Cladonia, Amphiloma, Usnea প্রভৃতি লাইকেনের কোন কোন প্রজাতি তাদের আশ্রয়দাতা উদ্ভিদের ক্ষতি করে।

বিষাক্ত লাইকেন- বিষাক্ত লাইকেন ভক্ষণ করে মানুষ ও গবাদি পশুর মৃত্যু ঘটতে পারে।

অট্টালিকার ক্ষতিসাধন- পুরাতন অট্টালিকার গায়ে বসবাসকারী লাইকেনের ক্রিয়ার ফলে অট্টালিকার যথেষ্ট ক্ষতি হয়।

বিবিধ ক্ষতিসাধন- মার্বেল পাথরের তৈরি মূল্যবান ভাস্কর্য, স্মৃতিসৌধ, মিনার, মন্দির ইত্যাদিতে বসবাসকারী লাইকেন পাথরে ক্ষয় সাধন করে এবং সৌন্দর্য নষ্ট করে।



প্রধান শব্দভিত্তিক সারসংক্ষেপ

♦ কোষ : কোষ হলো জীবদেহের গঠন ও কাজের একক, যা স্বনির্ভর ও আত্মপ্রজননশীল, বৈষম্যভেদ্য পর্দা দিয়ে পরিবেষ্টিত অবস্থায় নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রোটোপ্লাজম নিয়ে গঠিত এবং পূর্বতন কোষ থেকে সৃষ্ট।