জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র

(দ্বাদশ শ্রেণি)

(HSC Biology 2nd Paper )


what image shows

প্রজনন জীবের একটি বৈশিষ্ট্য যার মাধ্যমে মাতা-পিতার বৈশিষ্ট্য পরবর্তী বংশধরে সঞ্চালিত হওয়ার মাধ্যমে জীব তার নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখে। একেই বংশগতি (Heredity) বলে। বিজ্ঞানের যে শাখায় জিনের গঠন, কার্যপদ্ধতি ও তার বংশানুক্রমিক সঞ্চালন পদ্ধতি ও ফলাফল নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হয় তাই জিনতত্ত্ব (Genetics)। আর জিন হলো বংশগতির মৌলিক একক যা বংশ পরম্পরায় সঞ্চারিত হয়ে বংশধারা ধরে রাখে। অপরদিকে প্রকৃতিতে যে মন্থর ও ধারাবাহিক পরিবর্তনের মাধ্যমে অতীতে উদ্ভূত কোনো সরল জীব হতে জটিল ও উন্নত জীবের আবির্ভাব ঘটে তাকে বিবর্তন (Evolution)) বলে। এ ইউনিটে জিনতত্ত্ব ও বিবর্তন সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

এ ইউনিটের পাঠসমূহ
পাঠ ১১.১: মেন্ডেলের বংশগতির সূত্রাবলি
পাঠ ১১.২: মেন্ডেলের প্রথম সূত্রের ব্যতিক্রমসমূহ (প্রথম সূত্র ১:২:১ ও ২:১)
পাঠ ১১.৩: মেন্ডেলের দ্বিতীয় সূত্রের ব্যতিμমসমূহ (দ্বিতীয় সূত্র ৯:৭ ও ১৩:৩)
পাঠ ১১.৪: লিঙ্গ নির্ধারণ কৌশল
পাঠ ১১.৫: মানুষের লিঙ্গ সংযুক্তি বৈশিষ্ট্য
পাঠ ১১.৬: মানুষের বংশগতিজনিত রোগসমূহ
পাঠ ১১.৭: সমালোচনাসহ বিবর্তনের মতবাদসমূহ

পাঠ-১১.১ মেন্ডেলের বংশগতির সূত্রাবলি

শিখনফল-
♦ মেন্ডেলিজম ও মেন্ডেলিয়ান বংশগতি সম্পর্কে বলতে পারবেন।
♦ জিনতত্ত্বে ব্যবহৃত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
♦ মেন্ডেলের বংশগতির প্রথম সূত্র উল্লেখ ও ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
♦ মেন্ডেলের বংশগতির দ্বিতীয় সূত্র উল্লেখ ও বিশ্লেষণ করতে পারবেন।

♦ প্রধান শব্দ জিনোটাইপ, ফিনোটাইপ, জিন, অ্যালিল

মেন্ডেলিজম ও মেন্ডেলিয়ান বংশগতি (Mendelian Inheritance)- গ্রেগর ইয়োহান মেন্ডেলই সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি বংশগতির নীতিসমূহ উদ্ভাবনে সমর্থ হন। মেন্ডেল ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে ২ রা জুলাই তৎকালীন অস্ট্রোহাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত সাইলেসিয়া (Silesia) অঞ্চলের হাইসেনডর্ফ (Heinzendorf- বর্তমানে চেক প্রজাতন্ত্রের অংশ) গ্রামের এক গরীব কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জার্মান ও চেক শ্রি বংশোদ্ভুত পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। অতঃপর মেন্ডেল প্রধানত আর্থিক কারণে ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়ার মোরাভিয়া অঞ্চলে ব্রন (Brun- বর্তমানে ব্রুনো= brno; চেক প্রজাতন্ত্র) নামক স্থানের অগাস্টিনিয়ান মঠে শিক্ষানবীশ হিসেব যোগদান করেন। চার বৎসর পর তিনি যাজক হন। ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে স্লেম (Znaim)) প্রিপারেটরী স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। অতঃপর ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৮৫৩ পর্যন্ত পড়াশুনা করে ব্রুনে ফিরে আসেন। ব্রুনে মডার্ন স্কুলে ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং ১২ বৎসর একজন সার্থক শিক্ষক হিসেবে সুনামের সাথে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ সাত বৎসর গবেষণা করেন।

স্কুলে শিক্ষকতা করার সময় মঠের বাগানে অবসর সময়ে মটরশুঁটি (Pisum sativum) উদ্ভিদ নিয়ে ১৮৫৭ থেকে গবেষণা শুরু করেন। সঙ্করায়ণ (Hybridization)) পরীক্ষার জন্য মটরশুঁটি উদ্ভিদকে নির্বাচন করেন। মটরশুঁটি উদ্ভিদ উভলিঙ্গী, স্বপরাগায়নের মাধ্যমে যৌন প্রজনন সম্পন্ন হয়। পুংস্তবক ও স্ত্রীস্তবককে ঘিরে দলমণ্ডল (corolla)) এমনভাবে সজ্জিত যে, পরনিষেকের (Cross fertilization) কোন সম্ভাবনা নেই। ফলে বিভিন্ন জাতের (variety) মটরশুঁটি উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্যগুলো খাঁটি বা বিশুদ্ধ অবস্থায় আছে। অত্যন্ত অল্প সময়ে এর জীবনচক্র সম্পন্ন হয় এবং স্বল্প শ্রম ও ব্যয়ে অধিক সংখ্যক অপত্য বংশ উৎপন্ন হয়। অপত্য বংশে কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের স্পষ্ট প্রকাশ পরীক্ষার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছিল। মেন্ডেল বিভিন্ন উৎস হতে ৩৪ ধরনের মটরশুঁটি উদ্ভিদের বীজ সংগ্রহ করে আশ্রমের বাগানে প্রায় এক বৎসর প্রত্যেক ধরনের বীজের বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর পরীক্ষায় ব্যবহৃত সাতটি চরিত্রের (trait) জন্য (কাণ্ডের দৈর্ঘ্য, ফুলের অবস্থান, ফুলের রং, ফলের বর্ণ, ফলের আকৃতি, বীজের বর্ণ এবং বীজের আকৃতি) একজোড়া করে বিপরীত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ১৪টি খাঁটি উদ্ভিদ নির্বাচন করেন। প্রতি জোড়া বৈশিষ্ট্য পরস্পর বিপরীত ধর্মী। মটরশুঁটি উদ্ভিদের নির্বাচিত বৈশিষ্ট্যের প্রতিটি একটি মাত্র জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। বৈশিষ্ট্য নির্বাচনের বিষয়ে মেন্ডেল অত্যন্ত সৌভাগ্যবান ছিলেন। কারণ জটিল বৈশিষ্ট্য নির্বাচন করলে মেন্ডেল বংশগতির অন্তর্নিহিত নীতিগুলো হয়তোবা আবিষ্কার করতে পারতেন না।

মেন্ডেল একটি যথাযথ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করে সঙ্করায়ন পরীক্ষা পরিচালনা করেন। অত্যন্ত সাবধানতার সাথে পরীক্ষণসমূহ নিয়ন্ত্রণ করেন এবং তিনি যে পরাগরেণু স্থানান্তর করেছেন তার দ্বারাই পরাগায়ন হয়েছে তা নিশ্চিত করেন। সঙ্করায়নকালে মেন্ডেল অপত্য অংশে একসাথে মাত্র একটি চরিত্র পর্যবেক্ষণ করেন এবং সম্পূর্ণ উপাত্ত (data) সংরক্ষণ করেন। অতঃপর পরিসংখ্যান (Statistics) এর প্রয়োগ দ্বারা এ উপাত্ত থেকেই লব্ধ ফলাফলের যুক্তিযুক্ত বিশ্লেষণপূর্বক এবং একটানা প্রায় এক দশকের নিরলস পরিশ্রম দ্বারা বংশগতির নিয়ম সম্পর্কে পার্টিকুলেট থিওরী (Particulate theory) উপস্থাপন করেন।
১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ফেব্রুয়ারী ও মার্চে সঙ্করায়ন ও বংশগতি সম্বন্ধে তাঁর গবেষণার বিবরণ ও ফলাফল ব্রুন ন্যাচারাল হিস্টরী সোসাইটির পরপর দুটি বৈজ্ঞানিক সভায় উপস্থাপন করেন। সোসাইটির বার্ষিক মুখপত্রেও গবেষণা পত্রটি প্রকাশিত হয়। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় তৎকালীন বিশ্বে কেউই ধর্মযাজক মেন্ডেল এর গবেষণা ফলাফলের গুরুত্ব উপলব্ধি করেননি। ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে মেন্ডেল মঠাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন এবং ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে ৬ই জানুয়ারী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জীবদ্দশায় তাঁর গবেষণা কর্মের জন্য তিনি কোন স্বীকৃতি লাভ করেননি।

মেন্ডেলের গবেষণাপত্র প্রকাশের ৩৫ বৎসর পর বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই হল্যান্ডের দ্য ভ্রিস (de Vries) , জার্মানির কার্ল করেন্স (Karl Correns) ও অস্ট্রিয়ার শেরমাক (Tscher Mak) পৃক পৃকভাবে গবেষণা করে মেন্ডেল এর ফলাফলকে সমর্থন করেন। বর্তমানে বিশ্বে মেন্ডেল এর আবিষ্কার অর্থাৎ পার্টিকুলেট থিওরী (particulate theory) একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পার্টিকুলেট থিওরী (particulate theory) তে বর্ণিত সুত্রগুলো জেনেটিক্সে মেন্ডেল এর সূত্র (Mendel’s Law) নামে অভিহিত। মেন্ডেল এর সূত্র অনুযায়ী জীবের বৈশিষ্ট্যসমূহ বংশগতিতে সঞ্চারণের যে ব্যাখ্যা দেয়া হয় তাকেই মেন্ডেলতত্ত্ব (Mendelism) বলে। মেন্ডেলতত্ত্ব আধুনিক জেনেটিক্স এর প্রধান ভিত্তি। একারণেই মেন্ডেলকে জেনেটিক্স এর জনক বলা হয়ে থাকে।

পার্টিকুলেট থিওরী ((particulate theory) বা মেন্ডেলতত্ত্ব (Mendelism) অনুযায়ী জীবে বংশগতির একক বিদ্যমান থাকে বা মিশ্রিত হয়না, শুধুমাত্র সুপ্ত থাকে। মেন্ডেলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মটরশুঁটি উদ্ভিদে প্রতিটি চরিত্রের (trait) জন্য (কাণ্ডের দৈর্ঘ্য, ফুলের অবস্থান, রং, ফলের বর্ণ, ফলের আকৃতি, বীজের বর্ণ এবং বীজের আকৃতি) এক জোড়া ফ্যাক্টর থাকে, যার একটি আসে পিতা থেকে এবং অপর একটি আসে মাতা থেকে। গ্যামিটে শুধু একটি একক উপস্থিত থাকে এবং পরবর্তী জনুতে সঞ্চারিত হয়। মেন্ডেল বর্ণিত পার্টিকল বা ফ্যাক্টর অবশ্যই জিন। আর একটি মাত্র জিন দ্বারা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত বৈশিষ্ট্য মেন্ডেলিয়ান বৈশিষ্ট্য (Mendelian trait) বলে এবং মেন্ডেলিয়ান বৈশিষ্ট্যর সঞ্চায়ণকে মেন্ডেলিয়ান বংশগতি (Mendelian inheritance) বলা হয়।

জেনেটিক্সে ব্যবহৃত কয়েকটি প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা
জিন (Gene)- W.L Johannsen (গ্রিক genes=born) ১৯০৯ খিস্টাব্দে জিন শব্দটি ব্যবহার করেন। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে মেন্ডেল এর অনুমানকৃত জীবের বৈশিষ্ট্য নির্ধারক বস্তুটি হলো এলিমেন্টিস বা ফ্যাক্টর (elementes or factor) যা পরবর্তীকালে জিন নামে অভিহিত হয়। জিন হচ্ছে বংশগতির মৌলিক একক (basic unit of heredity) এবং এরা বংশ পরম্পরায় সঞ্চারিত হয়ে বংশগতিধারা অব্যাহত রাখে। জিনকে সংজ্ঞায়িত করা যায় এভাবে- জিন হচ্ছে পলিপেপটাইড সংশ্লেষের জন্য সংকেত প্রদানকারী DNA অণুর অংশ বিশেষ (gene is a part of a DNA molecule code for polypeptide synthesis)।

লোকাস (Locus.Pl-Loci) - ক্রোমোসোমে একটি জিনের অবস্থানকে লোকাস বলে।

অ্যালিল (Allel), অ্যালিলোমর্ফ (Allelomorph): ক্রোমোসোমের একই লোকাসে অবস্থানকারী জিনগুলোকে পরস্পরের অ্যালিল বলা হয়। জিনগুলোর একত্রে অবস্থান করাকে অ্যালিলোমর্ফ বলে। মনে করি, মানুষে বাদামী চোখের রং এর জন্য দায়ী জিন B ও নীল চোখের রং এর জন্য দায়ী জিন b পরস্পরের অ্যালিল।

জিনোটাইপ (Genotype): জীবদেহের দৃশ্যমান অথবা সুপ্ত বেশিষ্ট্যগুলোর নিয়ন্ত্রক জিনসমূহের গঠনকে জিনোটাইপ বলে। মনেকরি, মটরশুঁটি গাছের লম্বা কাণ্ডের জন্য T জিন এবং বামন কাণ্ডের জন্য T জিন দায়ী। অতএব TT, tt, Tt যথাক্রমে বিশুদ্ধ লম্বা, বিশুদ্ধ বামন ও সঙ্কর (hrbrid) লম্বা মটরশুঁটি গাছের জিনোটাইপ।

ফিনোটাইপ (Phenotype)- জীবদেহের দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যসমূহকে ফিনোটাইপ বলে। ফিনোটাইপ প্রকৃতপক্ষে জিনোটাইপের জিনসমূহের বাহ্যিক প্রকাশ। যেমন- লম্বা ও বামন মটরশুঁটি গাছে উচ্চতা সম্পর্কিত বাহ্যিক প্রকাশগুলো যথাμমে TT বা Tt ও tt জিনোটাইপগুলোর ফিনোটাইপ।

হোমোজাইগাস (Homozygous) ও হেটারোজাইগাস (Heterozygous)- জীবে একটি বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী জিন জোড়া একই রকমের (উভয় জিনই প্রকট বা প্রচ্ছন্ন) হলে তাকে হোমোজাইগাস জীব বলে। জিন জোড়া ভিন্ন রকমের হলে সে জীবকে হেটারোজাইগাস জীব বলে। যেমন- বিশুদ্ধ লম্বা মটরশুঁটি গাছে একটি প্রকার দুটি প্রকট জিন (TT) থাকে। অতএব, এটি হোমোজাইগাস লম্বা। কিন্তু সঙ্কর লম্বা গাছে একটি প্রকট জিন ও একটি প্রচ্ছন্ন জিন থাকে। অতএব, তাকে হেটারোজাইগাস লম্বা (Tt) বলে।

প্রকট (Dominant) ও প্রচ্ছন্ন (Recessive)- এক জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীবে সঙ্করায়ন ঘটালে ১ম অপত্য বংশে সঙ্কর জীবে ঐ বৈশিষ্ট্য দুটির যেটি প্রকাশিত হয় তাকে প্রকট বৈশিষ্ট্য এবং যে বৈশিষ্ট্য সুপ্ত থাকে তাকে প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্য বলে। যেমন- বিশুদ্ধ লম্বা মটরশুঁটি গাছ ও বামন মটরশুঁটি গাছের প্রজননে ১ম অপত্য বংশে সকল গাছই লম্বা হয়। এক্ষেত্রে লম্বা বৈশিষ্ট্যকে প্রকট ও বামন বৈশিষ্ট্যকে প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্য বলে। প্রকট-প্রচ্ছন্ন জিনগুলো হোমোলোগাস ক্রোমোসোমের একই লোকাসে অবস্থান করে।

এক সঙ্কর (Monohybrid) ও দ্বিসঙ্কর (Dihybrid) ক্রস- যখন কোন ক্রসে মাত্র একজোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জিন বিবেচনা করা হয় তাকে এক সঙ্কর ক্রস বলে। যেমন- বিশুদ্ধ লম্বা মটরশুঁটি ও বামন মটরশুঁটি গাছের মধ্যে সংকরায়ন। অপরদিকে, যখন কোনো ক্রসে দুই জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জিন থাকে তখন তাকে দ্বিসঙ্কর ক্রস বলা হয়। উদাহরণ- মটরশুঁটিতে গোল-হলুদ বীজ সম্পন্ন গাছ ও কুঞ্চিত-সবুজ বীজ সম্পন্ন গাছের মধ্যে সংকরায়ন।

মেন্ডেলের বংশগতির প্রথম সূত্র
‘জীবের প্রতিটি বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি একক দায়ী থাকে যাকে ফ্যাক্টর (জিন) বলা হয় এবং ফ্যাক্টর বা জিনগুলো জোড়ায় জোড়ায় থাকে। সঙ্কর (hybrid) জীবে ফ্যাক্টর বা জিনগুলো মিশ্রিত না হয়ে পাশাপাশি অবস্থান করে এবং গ্যামিট উৎপাদনের সময় অপরিবর্তিত অবস্থায় পরস্পর থেকে পৃক হয়ে ভিন্ন ভিন্ন গ্যামিটে গমন করে’। একে পৃকীকরণ সূত্র বা মনোহাইব্রিড ক্রসের সূত্রও বলে।

উদাহরণঃ একটি বিশুদ্ধ কালো গিনিপিগের সাথে একটি বিশুদ্ধ সাদা গিনিপিগের ক্রস করলে সন্তান-সন্ততি কালো হয়। এ ক্রসে ব্যবহৃত পিতা-মাতাকে প্যারেন্টাল জেনারেসন (Parental generation, P1) এবং উৎপন্ন সন্তান-সন্ততিকে ১ম অপত্য বংশ (First filial generation) বা F1 বলে। আবার F1 সন্তান-সন্ততির মধ্যে ক্রস করলে ৩/৪ ভাগ কালো গিনিপিগ এবং ১/৪ ভাগ সাদা গিনিপিগের জন্ম হয়। উৎপন্ন সন্তান-সন্ততিকে ২য় অপত্য বংশ (Second filial generation) বা F2 বলে।

F1 বংশে সাদা গিনিপিগের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি এবং F2 বংশে সাদা গিনিপিগের নির্দিষ্ট আনুপাতিক হারে পুনরায় উপস্থিতি যথার্থই প্রমাণ করে যে, গিনিপিগে কালো ও সাদা বৈশিষ্ট্য প্রকাশের জন্য নিশ্চয়ই পৃক পৃক কোন ফ্যাক্টর বা জিন আছে এবং F1 বংশে সাদা বৈশিষ্ট্য নির্ধারক ফ্যাক্টর বিনষ্ট হয় নাই বরং বৈশিষ্ট্য নির্ধারক ফ্যাক্টরের পাশাপাশি সুপ্তভাবে উপস্থিতি আছে। তা না হলে F1 বংশের কালো গিনিপিগ থেকে F1 বংশে কালো গিনিপিগই জন্ম লাভ করতো। এ ধরনের মনোহাইব্রিড ক্রসে F1 বংশে প্রকাশিত বৈশিষ্ট্য প্রকট (dominant) এবং অপ্রকাশিত বা সুপ্ত বৈশিষ্ট্যকে প্রচ্ছন্ন (recessive) বৈশিষ্ট্য বলে।

মনোহাইব্রিড ক্রসটির পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, F1 বংশের প্রত্যেক গিনিপিগে কালো ও সাদা উভয় বৈশিষ্ট্য নির্ধারক ফ্যাক্টর বর্তমান এবং পিতা-মাতার গ্যামিটের মাধ্যমে নিষেকের ফলে একত্রিত হয়েছে। পরবর্তীতে F2 বংশের গিনিপিগে জন্মলাভের সময় F1 বংশে উপস্থিত কালো ও সাদা নির্ধারক ফ্যাক্টরদ্বয় গ্যামিট তৈরির মাধ্যমে পুনরায় পরস্পর থেকে পৃক হয়েছে এবং ৩: ১ ফিনোটাইপিক ও অনুপাত যথাক্রমে কালো ও সাদা গিনিপিগ উৎপন্ন করেছে।

মনোহাইব্রিড ক্রসের জিনতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা- গিনিপিগের গাত্রবর্ণ নির্ধারণের জন্য দুটি অ্যালিল থাকে। মনে করি, গিনিপিগের কালো রঙের জন্য B জিন দায়ী। অতএব, একটি বিশুদ্ধ বা হোমোজাইগাস কালো গিনিপিগের জিনোটাইপ BB (কারণ, দেহকোষে কমপক্ষে দুটি ক্রোমোসোম থাকে)। অনুরূপভাবে গিনিপিগের সাদা রঙের জন্য b জিন দায়ী। অতএব, বিশুদ্ধ সাদা গিনিপিগের জিনোটাইপ bb।

হোমোজাইগাস কালো (BB) এবং বিশুদ্ধ হোমোজাইগাস সাদা (bb) পিতা-মাতা (P1) প্রজননের পূর্বে গ্যামিট তৈরি করবে। ফলে কালো গিনিপিগের স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের গ্যামিটে B জিন এবং সাদা গিনিপিগের স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষ সকল গ্যামিটে b জিন থাকবে। এখন উপরিউক্ত কালো ও সাদা গিনিপিগের ক্রসে B এবং b জিন সম্পন্ন পুং ও স্ত্রী গ্যামিটের মিলনে জিনোটাইপ সম্পন্ন F1 বংশের জন্ম হবে] F1 বংশ ধরদের মধ্যে B এবং b উভয় অ্যালিল উপস্থিত থাকার কারণে এদের ফিনোটাইপ হবে হেটারোজাইগাস কালো। এখানে কালো রঙের জিন B প্রকট এবং সাদা রঙের জিন b প্রচ্ছন্ন। এ জিনদ্বয় হোমোলোগাস ক্রোমোসামের একই লোকাসে অবস্থান করবে।

F1 বংশের হেটারোজাইগাস কালো গিনিপিগ (Bb) পুনরায় প্রজননের জন্য গ্যামিট সৃষ্টি করবে এবং পুরুষ-স্ত্রী প্রত্যেক দুই প্রকার গ্যামিট তৈরি করবে। গ্যামিটের অর্ধেকে থাকবে B জিন এবং বাকি অর্ধেকে থাকবে b জিন। কারণ সঙ্কর (hybrid) গিনিপিগের B ও b জিন ভিন্ন ভিন্ন ক্রোমোসোমে অবস্থান করে এবং একই কোষে অবস্থান কালে মিশ্রিত হয় না বা বিনষ্ট হয় না। এখন B জিন বহনকারী পুং গ্যামিট B বা b জিন বহনকারী স্ত্রী গ্যামিটকে নিষিক্ত করতে পারে। অনুরূপভাবে ন জিন বহনকারী পুং গ্যামিট B বা b জিন বহনকারী স্ত্রী গ্যামিটকে নিষিক্ত করতে পারে। ফলে F2 বংশ ১ B B : ২ B b : ১ b b জিনোটাইপিক অনুপাতে যথাক্রমে হোমোজাইগাস কালো, হেটারোজাইগাস কালো এবং হোমোজাইগাস সাদা গিনিপিগ জন্ম লাভ করে। এদের ফিনোটাইপিক অনুপাত হয় ৩ কালো : ১ সাদা।

মেন্ডেল এর বংশগতির দ্বিতীয়সূত্র
‘দুই বা ততোধিক জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জীবে সঙ্করায়ন ঘটালে গ্যামিট সৃষ্টিকালে প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের ফ্যাক্টর বা জিন যুগলের স্বাধীন সঞ্চারণ বা বিন্যাস ঘটে এবং কোন একটি ফ্যাক্টর যুগলের সঞ্চারণ অন্য ফ্যাক্টর যুগলের উপর নির্ভরশীল নয়’। একে স্বাধীন সঞ্চারণ বা ডাইহাইব্রিড ক্রস সূত্রও বলে।

ব্যাখ্যা- মেন্ডেলের দ্বিতীয় সূত্র ব্যাখ্যার জন্য একটি ডাইহাইব্রিড ক্রস বর্ণনা করা হলো। দুই জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জীবের মধ্যে প্রজননকে ডাইহাইব্রিড ক্রস বলা হয়। গিনিপিগের কালো গাত্রবর্ণ সাদা গাত্রবর্ণের উপর প্রকট এবং অমসৃণ লোমের অবস্থা মসৃণের উপর প্রকট। বিশুদ্ধ কালো-অমসৃণ (black-rough) গিনিপিগের সাথে বিশুদ্ধ সাদা-মসৃণ (whitesmooth) গিনিপিগের ক্রস করলে F1 বংশের কালো-অমসৃণ পুরুষ ও স্ত্রী গিনিপিগের মধ্যে ক্রস করলে F2 বংশে নিম্নলিখিত অনুপাতে গিনিপিগ জন্মলাভ করে।

কালো-অমসৃণ : কালো-মসৃণ : সাদা-অমসৃণ : সাদা-মসৃণ = ৯:৩:৩:১

পর্যবেক্ষণঃ উপরিউক্ত ডাইহাইব্রিড ক্রসে দুটি বিষয় লক্ষণীয়ঃ ক) পিতামাতার অনুরূপ (কালো-অমসৃণ এবং সাদা-মসৃণ) গিনিপিগ ছাড়াও দুই ধরনের (কালো-মসৃণ এবং সাদা-অমসৃণ) নতুন গিনিপিগ জন্মলাভ করেছে।

খ) শুধু একজোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্যের (কালো-অমসৃণ এবং সাদা-মসৃণ) বংশগতিতে F1 বংশে মনোহাইব্রিড ক্রসের মতই ৩:১ অনুপাত বজায় থাকে। প্রতি ১৬টি গিনিপিগের মধ্যে ১২টি কালো এবং ৪টি সাদা অর্থাৎ কালো ও সাদা গিনিপিগের অনুপাত ৩:১। আবার প্রতি ১৬টি গিনিপিগের মধ্যে ১২টি অমসৃণ এবং ৪টি মসৃণ অর্থাৎ অমসৃণ ও মসৃণ গিনিপিগের অনুপাত ৩:১।

বিশ্লেষণঃ উপরের তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে এই তথ্যে উপনীত হওয়া যায় যে, কালো গাত্রবর্ণ ও সাদা গাত্রবর্ণ বৈশিষ্ট্য দুটির সঞ্চারণ অমসৃণ ও মসৃণ বৈশিষ্ট্য দুটির সঞ্চারণ অমসৃণ ও মসৃণ বৈশিষ্ট্য দুটির সঞ্চারণের সাথে সম্পর্কযুক্ত বা নির্ভরশীল নয়। যদি নির্ভরশীল হতো তাহলে কালো দেহ ও সাদা দেহ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কিংবা অমসৃণ দেহ ও মসৃণ দেহ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ৩:১ অনুপাত বজায় থাকতো না।

ডাইহাইব্রিড μসের জিনতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা- গিনিপিগের কালো গাত্র বৈশিষ্ট্যের জন্য জিন প্রতীক B এবং অমসৃণ বৈশিষ্ট্যের জন্য জিন প্রতীক R কল্পনা করলে একটি বিশুদ্ধ কালো-অমসৃণ গিনিপিগের জিনোটাইপ হবে BBRR । কারণ প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের জন্য একজোড়া জিন বর্তমান। অনুরূপভাবে সাদা গাত্রবর্ণ বৈশিষ্ট্যৈর জন্য জিন একক b এবং মসৃণ লোম বৈশিষ্ট্যের জন্য জিন একক r কল্পনা করলে একটি বিশুদ্ধ সাদা-মসৃণ গিনিপিগের জিনোটাইপ হবে bbrr ।

BBRR এবং bbrr পিতা-মাতা গিনিপিগদ্বয় প্রজননের পূর্বে গ্যামিট উৎপাদন করবে এবং প্রত্যেক গ্যামিটে যথাক্রমে BR এবং br জিন থাকবে। ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনে F1 বংশে উৎপন্ন সকল গিনিপিগের জিনোটাইপ হবে BbRr কিন্তু ফিনোটাইপ হবে কালো-অমসৃণ। এখানে B এবং R জিনের উপস্থিতিতে যথাক্রমে b এবং r জিন প্রচ্ছন্ন থাকে।

F1 বংশের হেটারোজাইগাস কালো-অমসৃণ (BbRr) গিনিপিগ পুনরায় প্রজননের পূর্বে মায়োসিসের মাধ্যমে গ্যামিট সৃষ্টি করবে এবং স্ত্রী-পুরুষ প্রত্যেক প্রায় সমান সংখ্যায় চার প্রকার, যথা- BR, Br, bR, br গ্যামিট উৎপন্ন করবে।

এখানে, F1 বংশের দুটি গিনিপিগের মধ্যে μস করলে এদের যেকোনো এক প্রকার পুংগ্যামিট চার প্রকারের স্ত্রী গ্যামিটের যেকোনো এক প্রকারের সাথে মিলিত হতে পারে। ফলে F1 বংশে ১৬ প্রকারের নিষেকের সম্ভাবনা থাকে। সম্ভাব্য নিষেক পানেট চেকার বোর্ডে (উদ্ভাবক জবমরহধষফ ঈ. চঁহহবঃ এর নাম অনুসারে) সন্নিবেশ করে প্রাপ্ত জিনোটাইপ ও ফিনোটাইপ অনুপাত উল্লেখ করা হলো

শিক্ষার্থীর কাজ মেন্ডেলের বংশগতির প্রথম ও দ্বিতীয় সূত্রের মধ্যকার পাঁচটি পার্থক্য একটি ছকে লিখে ক্লাসে উপস্থাপন করুন

সারসংক্ষেপ
জিন হচ্ছে পলিপেপটাইড সংশ্লেষের জন্য সংকেত প্রদানকারী উঘঅ অণুর অংশ বিশেষ। ক্রোমোসোমে একটি জিনের অবস্থানকে লোকাস বলে। ক্রোমোসোমের একই লোকাসে অবস্থানকারী জিনগুলোকে পরস্পরের অ্যালিল বলা হয়। জিনগুলোর একত্রে অবস্থান করাকে অ্যালিলোমর্ফ বলে। জীবদেহের দৃশ্যমান অথবা সুপ্ত বেশিষ্ট্যগুলোর নিয়ন্ত্রক জিনসমূহের গঠনকে জেনোটাইপ বলে। জীবদেহের দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যসমূহকে ফিনোটাইপ বলে। ফিনোটাইপ প্রকৃতপক্ষে জিনোটাইপের জিনসমূহের বাহ্যিক প্রকাশ। জীবে একটি বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী জিন জোড়া একই রকমের (উভয় জিনই প্রকট বা প্রচ্ছন্ন) হলে তাকে হোমোজাইগাস জীব বলে। জিন জোড়া ভিন্ন রকমের হলে সে জীবকে হেটারোজাইগাস জীব বলে। এক জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীবে সঙ্করায়ন ঘটালে ১ম অপত্য বংশে সঙ্কর জীবে ঐ বৈশিষ্ট্য দুটির যেটি প্রকাশিত হয় তাকে প্রকট বৈশিষ্ট্য এবং যে বৈশিষ্ট্য সুপ্ত থাকে তাকে প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্য বলে। যখন কোন ক্রমে মাত্র একজোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জিন বিবেচনা করা হয় তাকে এক সঙ্কর ক্রস বলে। যখন কোনো ক্রসে দুই জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জিন থাকে তখন তাকে দ্বিসঙ্কর ক্রস বলা হয়। মেন্ডেলের বংশগতির প্রথম সূত্রের ফিনোটাইপিক অনুপাত ৩:১ এবং দ্বিতীয় সূত্রের ফিনোটাইপিক অনুপাত ৯:৩:৩:১।

পাঠোত্তর মূল্যায়ন ১১.১
বহু নির্বাচনি প্রশ্ন

১। নিচের কোনটি মেন্ডেলের ২য় সূত্রের অনুপাত
ক. ৯:৩:৩:১
খ. ৯:৭
গ. ১৩:৩
ঘ. ৩:১

২। জিন
i. বংশগতির ধারক ও বাহক
ii. ডিএনএ এর অংশ
iii. প্রোটিন এর একক
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ. ii ও iii
ঘ. i ও, ii ও iii

৩। করিম দুটি কুমড়া গাছের ক্রস করালেন। এতে কুমড়া গাছের একটির দুটি জিন ভিন্ন রকমের। গাছটি কি ধরনের?
ক. হোমোজাইগাস
খ. হেটারোজাইগাস
গ. হোমোলোগাস
ঘ. নন-হোমোলোগাস







what image shows

জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র

একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি

ড. মোহাম্মদ আবুল হাসান

গাজী সালাহউদ্দিন সিদ্দিকী