জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র

(দ্বাদশ শ্রেণি)

(HSC Biology 2nd Paper )


what image shows

আচরণ প্রাণীদের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ক্ষুদ্র এককোষী প্রাণী থেকে শুরু করে জটিল ও উন্নততর সব প্রাণীর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আচরণ দেখা যায়, যেমন- সম্পূর্ণ দেহের বা অংশ বিশেষের সঞ্চালন, দেহ ভঙ্গি, মুখের ভঙ্গি, বর্ণ পরিবর্তন, গন্ধ নির্গমন ইত্যাদি। এমনকি নিকটে অগ্রসরমান কোনো বিড়ালকে দেখা মাত্র কবুতরের আতঙ্কিত স্তম্ভিত প্রতিক্রিয়া, কোন নির্ধারিত এলাকায় দণ্ডায়মান পুরুষ এন্টিলোপের মালিকানা প্রকাশক অনড় অবস্থান এবং শিকারি প্রাণী পাশ দিয়ে অতিক্রম করার মুহূর্তে শিকারের নিশ্চুপ অবস্থানও আচরণের অংশবিশেষ। জীববিজ্ঞানের যে শাখায় প্রাণীর আচরণ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করা হয় তাকে আচরণবিদ্যা (Ethology) বলা হয়। Ethology শব্দটি দুটি গ্রিক শব্দ তথা ‘ethos’ (স্বভাব) ও ‘logos’ (জ্ঞান) এর সমন্বয়ে গঠিত প্রাণিবিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা। ইথোলজিতে আচরণ শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। উদ্দীপকের প্রতি প্রাণীর প্রতিক্রিয়া প্রদর্শনের নামই আচরণ। প্রখ্যাত আচরণবিদ ম্যানিং (Manning) মনে করেন, আচরণের মধ্যে সে সব প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত যার মাধ্যমে প্রাণী তার বাহ্য পরিবেশ এবং দেহের অভ্যন্তরের অবস্থা স¤পর্কে জ্ঞাত হয় এবং তার কাঙ্খিত চাহিদার প্রেক্ষিতে প্রতিক্রিয়া করে। বিভিন্ন প্রকৃতির আচরণ, প্রাণীর আচরণ সর্ম্পকিত বিভিন্ন তত্ত্ব নিয়ে এ ইউনিটে আলোচনা করা হয়েছে।

এ ইউনিটের পাঠসমূহ-
পাঠ ১২.১: আচরণের প্রকৃতি ও উদ্দীপনায় আচরণগত পরিবর্তন
পাঠ ১২.২: সহজাত আচরণ
পাঠ ১২.৩: শিখন আচরণ
পাঠ ১২.৪: কুকুরের লালার প্রতিবর্তি ক্রিয়ার উপর বিজ্ঞানী প্যাভলভের পরীক্ষণ কাজ
পাঠ ১২.৫: মৌমাছির সামাজিক সংগঠন এর আলোকে পরস্পরের প্রতিসহযোগিতা

পাঠ-১২.১ আচরণের প্রকৃতি ও উদ্দীপনায় আচরণগত পরিবর্তন




শিখনফল-
♦ প্রাণীর আচরণের প্রকৃতি সম্পর্কে বলতে পারবেন।
♦ উদ্দীপনার কারণে প্রাণীর আচরণগত পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে পারবেন।

♣ প্রধান শব্দ রাসায়নিক উদ্দীপক, শব্দ উদ্দীপক, দর্শন উদ্দীপক, স্পর্শ উদ্দীপক

আচরণের প্রকৃতি: প্রাণীর সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাণীর আচরণ অনুধাবন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণী আচরণের প্রকৃতি নিম্নরূপ:
♦ উদ্দীপকের প্রতি প্রাণীর সাড়া দেয়ার দৃশ্যমান কৌশল হলো আচরণ, যা সে পরিবেশে টিকে থাকার জন্য করে থাকে।
♦ এটি সাধারণত বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উদ্দীপকের প্রতি সমন্বিত প্রতিক্রিয়া যা নিম্ন উপায়ে সম্পন্ন হয়- গ্রাহক সঞ্চালক what image shows
♦ আচরণ প্রকাশের জন্য প্রেষণা প্রয়োজন, যেমন- ইচ্ছা বা আগ্রহ।
♦ প্রাণীর আচরণ অভিযোজনমূলক ও বিবর্তনমূলক। নিজ প্রয়োজনে বা পরিবেশে গ্রহণযোগ্যতা পাবার জন্য প্রাণী তার মূল আচরণকে পরিবর্তিত করে।
♦ নির্দিষ্ট প্রজাতির প্রাণী নির্দিষ্ট উদ্দীপকের প্রতি একই রকমের সাড়া দেয়।
♦ জন্মগত উপাদান (জিন) এবং বাহ্যিক পরিবেশ উভয়ই প্রাণীর আচরণকে প্রভাবিত করে ।
♦ মূলতঃ আচরণ দু’ধরনের, যথা- সহজাত আচরণ ও শিখন আচরণ। তবে সমাজবদ্ধ প্রাণীদের মধ্যে এ দু’ধরনের আচরণের সমন্বয়ে সামাজিক আচরণেরও বিকাশ ঘটে।

উদ্দীপনায় আচরণগত পরিবর্তন:
উদ্দীপনার কারণে প্রাণীদের মধ্যে বিভিন্ন রকমের আচরণগত পরিবর্তন দেখা যায়। বাহ্যিক পরিবেশের পরিবর্তন বা প্রাণিদেহের আভ্যন্তরস্থ শারীরবৃত্তীয় বা মনস্তাত্ত্বিক যেকোনো ধরনের পরিবর্তন উদ্দীপনা হিসেবে কাজ করে। যেমন, রেসাস বানর (Macaca mulatta) প্রজাতির সদস্যরা সাধারণভাবে পরস্পর থেকে একটু আলাদা থাকলেও প্রচণ্ড শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচার জন্য পরস্পর জড়াজড়ি করে অবস্থান করে। তাদের এ আচরণ দেহের উষ্ণতা বাড়াতে সহায়তা করে। বাহ্যিক পরিবেশের তাপমাত্রার পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্যই রেসাস বানর এরূপ আচরণ করে। এক্ষেত্রে তাপমাত্রা বাহ্যিক উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। আবার প্রজনন ঋতুতে পুরুষ কোলা ব্যাঙের যৌন হরমোন নিঃসৃত হয় এবং তার প্রভাবে পুরুষ ব্যাঙ স্ত্রী ব্যাঙকে আকর্ষণ করার জন্য স্বর থলিকে ফুলিয়ে উচ্চস্বরে ডাকতে থাকে। এক্ষেত্রে হরমোনের পরিবর্তন একটি আভ্যন্তরীণ উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। বাহ্যিক উদ্দীপকগুলোকে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে, যেমন- ভৌত উদ্দীপক (তাপ, চাপ, আলো, স্পর্শ, শব্দ, গন্ধ) ও রাসায়নিক উদ্দীপক। আবার আভ্যন্তরীণ উদ্দীপকগুলোকেও দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে, যেমন- রাসায়নিক উদ্দীপক ও স্নায়ুবিক উদ্দীপক। তবে যেকোনো ধরনের উদ্দীপকই প্রাণীর স্নায়ুতন্ত্র, অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি ও পেশিতন্ত্রের সমন্বয়ে আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। প্রাণীর অধিকাংশ উদ্দীপকই সুনির্দিষ্ট এবং এগুলো খুব দ্রুত আচরণের পরিবর্তন ঘটায়। what image shows

অধিকাংশ প্রাণী একাধিক ধরনের উদ্দীপকের প্রতি সাড়া দেয়। প্রাণী চার ধরনের উদ্দীপকের প্রতি সাড়া দিয়ে আচরণের পরিবর্তন ঘটায়। এগুলো হলো-

১। রাসায়নিক উদ্দীপক (Chemical stimuli): বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রাণীরা বায়ুতে বা পানিতে খুব অল্প পরিমাণে রাসায়নিক উদ্দীপকের নিঃসরণ ঘটায়। এগুলো প্রজাতি নির্দিষ্ট। প্রাণীর যৌন মিলন, সীমানা নির্ধারণ, গমন পথ চিহ্নিতকরণ, শাবক শনাক্তকরণ ইত্যাদি বিভিন্ন আচরণে রাসায়নিক উদ্দীপক ব্যবহৃত হয়। Sex pheromone একটি রাসায়নিক উদ্দীপক যা দ্বারা প্রাণী তার বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণ করে।

২। শব্দ উদ্দীপক (Sound stimuli): শব্দ প্রাণীর অন্যতম প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। এ উদ্দীপনায় প্রাণীর আচরণের দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। সাধারণত দূরে অবস্থানরত সদস্যের সাথে যোগাযোগ করার জন্য শব্দ উদ্দীপক ব্যবহৃত হয়। প্রাণীর যৌন মিলন, শিকারী হতে সতর্ক করা, স্বজাতি শনাক্তকরণ, খাদ্যের প্রাচুর্যের সংবাদ দেয়া ইত্যাদি বিভিন্ন আচরণে শব্দ উদ্দীপক ব্যবহৃত হয়।

৩। দর্শন উদ্দীপক (Visual stimuli): দেখতে সক্ষম প্রাণীর ক্ষেত্রে আলোক একটি উত্তম যোগাযোগ মাধ্যম। নিশাচর প্রাণীরা সাধারণ আলোতে দেখে না কিন্তু তারা আলোর অবলোহিত (infraed) তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের মাধ্যমে বিভিন্ন বস্তু শনাক্ত করে। মরুভূমির সাপ রাতের বেলায় এ পদ্ধতিতে উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট প্রাণী শিকার করে। গভীর সমুদ্রে বসবাসকারী অনেক মাছ এবং কিছু পতঙ্গের আলোক উৎপাদনকারী অঙ্গ আছে যা তাদের চলাচল, শিকার ধরা ও প্রজননের কাজে ব্যবহৃত হয়। অনেক প্রাণী যেমন- বানর, হাতি, শিম্পাঞ্জি প্রভৃতি তাদের অঙ্গভঙ্গি দ্বারা বিভিন্ন রকম আচরণ প্রদর্শন করে সমগোত্রীয় কিংবা অন্য প্রজাতির সদস্যদের আকর্ষণ করে। পাখি তার বাচ্চার হা করা মুখ দেখে দ্রুত সাড়া দিয়ে মুখে খাবার ফেলে।
what image shows

৪। স্পর্শ উদ্দীপক (Touch stimuli): প্রাণিজগতের বিভিন্ন প্রজাতিতে স্পর্শ উদ্দীপকের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। শারীরিক সংযোগের দ্বারা স্পর্শ উদ্দীপক প্রাণীর আচরণের পরিবর্তন ঘটায়। কিছু পতঙ্গভোজী স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং জেলি ফিশ স্পর্শ উদ্দীপক দ্বারা তাদের খাদ্য সংগ্রহ করে। অনেক পতঙ্গভোজী স্তন্যপায়ীর (যেমন-চিকা) তুণ্ডে এমন লোম থাকে যা দ্বারা এরা ০.১ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের খাদ্যকেও শনাক্ত করতে পারে। সামাজিক পতঙ্গ মৌমাছির কর্মীগুলো তরুণ মৌমাছির অ্যান্টিনার সংস্পর্শে অণুপ্রাণিত হয়ে খাবার দিতে উদ্বুদ্ধ হয়।

আচরণ ও বংশগতির সম্পর্ক
Sir Francis Galton (১৮২২-১৯১১) নামক একজন বিজ্ঞানী সর্ব প্রথম প্রাণীর আচরণ ও বংশগতির উপর বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা করেন। প্রাণীর আচরণ সম্পর্কিত বংশগতিবিদ্যা জীববিজ্ঞানের একটি নতুন শাখা যেখানে প্রাণীর আচরণে জিন ও পরিবেশের প্রভাব সম্পর্কে অধ্যয়ন করা হয়।

আচরণের জীবতাত্ত্বিক ভিত্তি (Biological basis of behaviour)

১। প্রাণীর আচরণ প্রজাতি নির্দিষ্ট (species specific)। যৌন আচরণে এ বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট। কোন একটি প্রজাতির প্রাণীতে যে ধরনের যৌন আচরণ দেখা যায় তার অতি নিকট সম্পর্কীয় প্রাণীতে সে ধরনের আচরণ দেখা যায় না। আচরণের পার্থক্য দ্বারা অনেক সিবলিং প্রজাতির (দুটি প্রজাতি দেখতে প্রায় একই রকম) মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা হয়। প্রাণীর আচরণের এ ধরনের বৈশিষ্ট্য উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত।

২। প্রাণীর আচরণ বংশ পরম্পরায় সঞ্চারিত হয়। প্রাণীর সকল সহজাত আচরণ হাজার বছর ধরে এক জনু (Generation) থেকে অন্য জনুতে অপরিবর্তিত অবস্থায় সঞ্চারিত হয়।

৩। প্রাণীর কোন অঙ্গ বা প্রক্রিয়ায় জৈবিক পরিবর্তন দ্বারা আচরণের পরিবর্তন ঘটে। যেমন- নিয়মিত ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে মানসিক রোগীর মস্তিষ্কে রসায়ন পরবর্তন করে বিকৃত আচরণকে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসা যায়।

৪। মানুষের কিছু আচরণ পরিবারের মধ্যে বংশ পরম্পরায় সঞ্চারিত হয়। যেমন, অনেক পরিবারের মানসিক রোগী ধারাবাহিকভাবে দেখা যায়।

৫। প্রাণীর প্রতিটি আচরণের একটি বিবর্তনিক ইতিহাস থাকে যার ফলে অনেক আচরণ নিকটতম কয়েকটি প্রজাতির মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। যেমন, জিনের গঠনের দিক থেকে শিম্পাঞ্জি মানুষের অত্যন্ত ঘনিষ্ট। মাত্র ২% জিন দ্বারা এরা মানুষ হতে আলাদা। এজন্য অনেক সামাজিক আচরণ যেমন- সন্তান বাৎসল্য, পরস্পরের সহযোগিতা, নের্তৃত্ব প্রভৃতিতে শিম্পাঞ্জি ও মানুষের মিল পাওয়া যায়।

জিন কিভাবে আচরণকে প্রভাবিত করে?
প্রাণীর আচরণ কোন একক জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। বিভিন্ন লোকাসে অবস্থিত একাধিক জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় বলে আচরণ প্রাণীর একটি জটিল বৈশিষ্ট্য। গবেষণায় দেখা গেছে একটি জিনের অতিমাত্রায় প্রকাশ ইঁদুরের শিখন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এধরনের জিনকে বিজ্ঞানীরা শিখন জিন (learning gene) বা স্মার্ট জিন (Smart gene) নাম দিয়েছেন। প্রাণীর জিন নির্ধারিত যেসব আচরণ ধারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদর্শিত হয় এবং নিজ প্রজাতির অন্য সদস্যকে না দেখে বা কারো কাছ থেকে না শিখেই প্রকাশিত হয় তাকে নির্ধারিত ক্রিয়া ধারা বা ফিক্সড অ্যাকশন প্যাটার্ন (fixed action pattern-FAP) বলে। এরূপ পরিস্থিতিতে একই বয়সের ও একই লিঙ্গের কোন প্রাণীকে স্বগোত্রীয় অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখলেও অজান্তেই এরূপ আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। প্রাণিজগতে আচরণের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যেখানে একই প্রজাতির সকল সদস্যের মধ্যে বিশেষ আচরণ প্রত্যক্ষ করা যায়। এ ধরনের আচরণ পূর্ব অভিজ্ঞতালব্ধ নয় কিংবা শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত নয়। এসব আচরণ নির্ধারিত ক্রিয়া সংশ্লিষ্ট বা FAP কেন্দ্রিক। FAP কেন্দ্রিক আচরণ জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় বলে এটি প্রাণীর জিনোমে পূর্বানুμমিত (Preprogrammed) অবস্থায় সংরক্ষিত থাকে। তাই এটি প্রজাতি নির্দিষ্ট যা প্রজাতির স্মৃতি (Species memory) হিসেবে এক জনু থেকে অন্য জনুতে সঞ্চারিত হয়।
what image shows

প্রাণীর যুগলবন্দি ও মৈথুন (courtship and mating), খাদ্যান্বেষণ (foraging), অভিপ্রয়ান (migration), বাসা তৈরি (nesting), খাদ্য মজুত (hoarding) গড়ে তোলা ইত্যাদি FAP আচরণের অন্তর্গত। প্রজনন ঋতুতে ময়ুরের পেখম মেলে নাচ তাকে কেউ শেখায়নি বা স্বগোত্রীয় কোন সদস্যকে দেখেও শিখেনি। বাবুই পাখির বাসা তৈরিতে, মাকড়শার জাল বুননের জন্য কিংবা মৌমাছির সামাজিক আচরণের জন্য কোন শিখনের প্রয়োজন হয় না। গ্রেল্যাগ হাঁস (greylag goose) মাটির অগভীরে গর্ত করে বাসা তৈরি করে। দৈবাৎ এ বাসা থেকে ডিম গড়িয়ে দূরে সরে গেলে প্রথমে চঞ্চুর সাথে ডিমকে স্পর্শ করে। এরপর চঞ্চুর ভেতরের তল দিয়ে ডিমকে ঠেলতে থাকে। অবশেষে চঞ্চু বাঁকা করে ধাপে ধাপে ডিমকে ঠেলতে ঠেলতে বাসায় স্থাপন করে। এগুলো সবই জিন নিয়ন্ত্রিত আচরণ যা প্রাণীর কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পূর্বানুক্রমিত থাকে।

শিক্ষার্থীর কাজ জিন কিভাবে আচরণকে প্রভাবিত করে তা একটি উদাহরণ দিয়ে ক্লাসে উপস্থাপন করুন।

সারসংক্ষেপ
প্রাণী চার ধরনের উদ্দীপকের প্রতি সাড়া দিয়ে আচরণের পরিবর্তন ঘটায়। এগুলো হলো- রাসায়নিক উদ্দীপক, শব্দ উদ্দীপক, দর্শন উদ্দীপক ও স্পর্শ উদ্দীপক।

পাঠোত্তর মূল্যায়ন-১২.১
বহু নির্বাচনি প্রশ্ন

১। কোন বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম প্রাণীর আচরণ ও বংশগতির উপর বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা করেন?
(ক) Karl Von Frisch
(খ) Niko Tinbergen
(গ) Sir Francis Galton
(ঘ) Konrad Lovenz

২। কোনটি দ্বারা প্রাণীর আচরণের নির্ধারিত ক্রিয়াধার নির্ধারিত হয়?
(ক) পরিবেশ
(খ) জিন
(গ) অভিজ্ঞতা
(ঘ) খাদ্য

৩। কোনটি প্রাণীর আচরণের বৈশিষ্ট্য নয়?
(ক) প্রাণীর আচরণ অভিযোজনিক।
(খ) প্রাণীর আচরণে সহজাত এবং শিখন উভয় ধরনের উপাদান থাকে।
(গ) জিনের গঠন দ্বারা প্রাণীর আচরণ প্রভাবিত হয় না।
(ঘ) বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উদ্দীপক সম্মিলিতভাবে কোন বিশেষ আচরণকে সক্রিয় করে।

পাঠ ১২.২: সহজাত আচরণ



শিখনফল-
♦ সহজাত আচরণ ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
♦ সহজাত আচরণের প্রকারভেদ আলোচনা করতে পারবেন।
♣ প্রধান শব্দ ট্যাক্সিস, প্রতিবর্তি ক্রিয়া

সহজাত আচরণ: প্রজাতির অর্ন্তভুক্ত প্রতিটি প্রাণী কোন রকম শিক্ষা বা পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই জৈবিক প্রয়োজন মেটাতে বা আত্মরক্ষার তাগিদে বংশ পরস্পরায় একইভাবে যেসব জন্মগত অপরিবর্তনীয় আচরণ প্রদর্শন করে তাকে সহজাত আচরণ বলে।

সহজাত আচরণের বৈশিষ্ট্য

১। সহজাত আচরণ বংশগত এবং জিন নিয়ন্ত্রিত। তাই প্রতিটি প্রজাতির জন্য এ আচরণ সুনির্দিষ্ট।

২। সহজাত আচরণ শেখার মাধ্যমে বা পূর্ব অভিজ্ঞতা দ্বারা আয়ত্ত করা যায় না।

৩। সহজাত আচরণ জন্মগত হলেও, প্রতিটি সহজাত আচরণ জন্মের সময় থেকে আত্মপ্রকাশ করে না। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে উপযুক্ত সময়ে তাদের বিকাশ ঘটে। যেমন- শিশুর স্তনপানের প্রবৃত্তি জন্মের সময় থেকে প্রকাশিত হলেও যুগলবন্দী বা মৈথুন প্রবৃত্তি জন্মের পরপরই আত্মপ্রকাশ করে না।

৪। সহজাত আচরণ একটি প্রজাতির অর্ন্তভুক্ত প্রতিটি প্রাণীর মধ্যেই দেখা যায় এবং তা বংশ পরম্পরায় একইভাবে আত্মপ্রকাশ করে। বাবুই পাখি অতীতে যেভাবে বাসা তৈরি করেছে, আজও তা সেভাবেই বাসা বেঁধে চলেছে।

৫। সহজাত আচরণ প্রাণীর কোন না কোন উদ্দেশ্যের সাধন করে, যদিও উদ্দেশ্যর ফলাফল সম্পর্কে প্রাণীর কোন পূর্ব ধারণা থাকে না।

৬। সহজাত আচরণ প্রাণীর জৈবিক প্রয়োজন মিটায় এবং আত্মরক্ষা, বংশ রক্ষা বা অন্যান্য কাজে সহায়তা দান করে।

৭। সহজাত আচরণের একটি নির্দিষ্ট পর¤পরা আছে। যেমন, ইলিশ মাছ ডিম ছাড়ার জন্য সমুদ্রের লোনা পানি থেকে নদীর স্বাদু পানিতে চলে আসে। আবার ডিম হতে পোনা হওয়ার পর এরা পুনরায় সমুদ্রে ফিরে যায়।

সহজাত আচরণের উদাহরণ: ট্যাক্সিস, প্রতিবর্তি ক্রিয়া, স্বভাবজাত আচরণ।
what image shows

ট্যাক্সিস
উদ্দীপকের নির্দেশ মোতাবেক যে ধরনের ওরিয়েন্টেশন ঘটে তাকে ট্যাক্সিস বলে। অর্থাৎ উদ্দীপকের উৎসের সাথে সম্পর্ক রেখে দেহ অক্ষের অবস্থানগত পরিবর্তনই ট্যাক্সিস। এটি অন্যতম সহজাত আচরণ এবং অভিযোজনযোগ্য। ট্যাক্সিস এর প্রধান শর্ত হলো প্রাণীর স্থান পরিবর্তন। অন্য কথায়, কোন বাহ্যিক উদ্দীপক দ্বারা প্রাণীর চলাচলের গতিকে প্রভাবিত বা ত্বরান্বিত করাই হলো ট্যাক্সিস। Herter (1927), Cellyot (1936), Tinbergen (1951) প্রমুখ প্রাণিবিদ প্রাণীর ট্যাক্সিস নিয়ে গবেষণা করেছেন।

ট্যাক্সিস এর প্রকারভেদ (Types of taxis): ট্যাক্সিস ধনাত্মক বা ঋনাত্মক হতে পারে। কোন্ উদ্দীপকের অভিমুখে গমনকে ধনাত্মক ট্যাক্সিস এবং বিপরীতমুখী গমনকে ঋণাত্মক বলে। উদ্দীপনার উৎসের উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীগণ ট্যাক্সিসকে নিম্নলিখিতভাবে ভাগ করেছেন-

১। ফটোট্যাক্সিস (Phototaxis): আলোক উদ্দীপকের প্রতি সাড়া দিয়ে প্রাণীর স্থানান্তরকে ফটোট্যাক্সিস বলে। আলোর উৎসের প্রতি আকর্ষণকে ধনাত্মক এবং বিকর্ষণকে ঋণাত্মক ফটোট্যাক্সিস বলে। যেমন- আলোর প্রতি উইপোকা ধনাত্মক এবং আরশোলা ঋনাত্মক ফটোট্যাক্সিস প্রদর্শন করে।

২। থার্মোট্যাক্সিস (Thermotaxis): তাপ উদ্দীপকের প্রতি সাড়া দিয়ে প্রাণীর যে স্থানান্তর ঘটে তাকে থার্মোট্যাক্সিস বলে। গ্রীষ্মকালে ছারপোকার আক্রমণ ধনাত্মক ও ব্যাঙের শীতনিদ্রা ঋনাত্মক থার্মোট্যাক্সিস।

৩। কেমোট্যাক্সিস (Chemotaxis): রাসায়নিক পদার্থের প্রতি সাড়া দিয়ে প্রাণীর গমনাগমনকে কেমোট্যাক্সিস বলে। যেমন- চিনির প্রতি পিঁপড়ার আকর্ষণ ধনাত্মক কেমোট্যাক্সিস।

৪। থিগমোট্যাক্সিস (Thigmotaxis): যখন প্রাণী তার চলার পথে স্পর্শ ইন্দ্রিয় দ্বারা স্থানান্তরে অনুপ্রাণিত হয় তখন তাকে থিগমোট্যাক্সিস বলে। এটি ধনাত্মক বা ঋণাত্মক হতে পারে।

৫। হাইড্রোট্যাক্সিস (Hydrotaxis): পানি যখন প্রাণীর চলাচলকে প্রভাবিত করে তখন তাকে হাইড্রোট্যাক্সিস বলে। কেঁচোর ভেজা মাটিতে বসবাস ধনাত্মক হাইড্রোট্যাক্সিস ।

৬। অ্যানিমোট্যাক্সিস (Anemotaxis): বায়ুপ্রবাহ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রাণীর চলাচলকে অ্যানিমোট্যাক্সিস বলে। বায়ুপ্রবাহের অনুকূলে পাখির উড্ডয়নকে ধনাত্মক এবং প্রতিকূলে উড্ডয়নকে ঋণাত্মক অ্যানিমোট্যাক্সিস বলে।

৭। রিওট্যাক্সিস (Rheotaxis): পানির স্রোতের প্রতি সাড়া দিয়ে প্রাণীর স্থানান্তরকে রিওট্যাক্সিস বলে। যেমন- কার্প জাতীয় মাছ প্রজননের সময় পানি স্রোতের বিপরীতে চলে ঋনাত্মক রিওট্যাক্সিস প্রদর্শন করে।

৮। জিওট্যাক্সিস (Geotaxis): মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রাণীর চলাচলকে জিওট্যাক্সিস বলে। খাদ্যের সন্ধানে বিভিন্ন পোকার গাছ বেয়ে উপরের দিকে উঠা এবং এদের পিউপার নিচের দিকে নামা যথাক্রমে ঋণাত্মক ও ধনাত্মক জিওট্যাক্সিস।

৯। গ্যালভানোট্যাক্সিস (Galvanotaxis): বিদ্যুৎপ্রবাহ দ্বারা উদ্দীপিত হয়ে প্রাণীর স্থানান্তরকে গ্যালভানোট্যাক্সিস বলে। যেমন- চিংড়িধারী কোন অ্যাকুরিয়ামে দূর্বল তড়িৎপ্রবাহ চালানো হলে সকল চিংড়ি অ্যাকুরিয়ামের ধনাত্মক (অ্যানোড) প্রান্তের দিকে ছুটতে থাকে।

১০। ফনোট্যাক্সিস (Phonotaxis): শব্দের প্রতি সাড়া প্রদান করে প্রাণীর চলাচলকে ফনোট্যাক্সিস বলে। পানিতে শব্দ সৃষ্টি করলে কিছু মাছ ধনাত্মক এবং কিছু মাছ ঋণাত্মক ফনোট্যাক্সিস প্রদর্শন করে। উদ্দীপক এবং গ্রাহক অঙ্গের সম্পর্কের উপর নিভর্র করে ট্যাক্সিকে নিম্নলিখিতভাবে বিভক্ত করা হয়েছে-

(ক) ট্রোপোট্যাক্সিস: দুই বা ততোধিক গ্রাহক অঙ্গ দ্বারা কোন একটি উদ্দীপকের উদ্দীপনা যুগপৎ গৃহীত হলে একই সময়ে সংঘটিত প্রতিক্রিয়া তুলনা করে যে ভারসাম্য মূলক সঞ্চালন ঘটে তাকে ট্রোপোট্যাক্সিস বলে। খাদ্যের ঘ্রাণবাহী পানি স্রোতের প্রতি Dugesia (Planaria) পজেটিভ ট্রোপোট্যাক্সিস প্রদর্শন করে।

(খ) ক্লিনোট্যাক্সিস: যখন পরপর কয়েকটি উদ্দিপকের তীব্রতা তুলনা করে ওরিয়েন্টেশনের ধারা নির্ধারিত হয় তখন তাকে ক্লিনোট্যাক্সিস বলে। শুয়োপোকার মাথা ক্রমান্বয়ে ডান ও বাম দিকে ঘুরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া।

(গ) টেলোট্যাক্সিস: উদ্দীপকের উৎস দুটি হলে এবং এরা একই পদ্ধতিতে ক্রিয়াশীল থাকলে একটি মাত্র উদ্দীপকের দিকে প্রাণীর ওরিয়েন্টেশন ঘটবে। সন্ন্যাসী কাঁকড়া (Hermit crab) উদ্দীপকের দুটি উৎসের যেকোন একটি অভিমুখে ওরিয়েন্টশন ঘটায়।

(ঘ) মেনোট্যাক্সিস: উদ্দীপকের ক্রিয়ার সাথে নির্দিষ্ট কৌণিক দূরত্ব বজায় রেখে প্রাণীর সাড়া প্রদান। পতঙ্গের আলোক দিক দর্শন প্রতিক্রিয়া এরূপ ওরিয়েন্টেশনের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

(ঙ) নেমোট্যাক্সিস: স্মৃতির উপর ভিত্তি করে যে ওরিয়েন্টেশন ঘটে তাকে নেমোট্যাক্সিস বলে। জলজশ্রুর স্মৃতি শক্তি বলে নিত্য একই পথ অনুসরণ করে বাসায় প্রত্যাবর্তন।

প্রতিবর্তি ক্রিয়া (Reflex action)
কোন আকস্মিক উদ্দীপনায় এক বিশেষ ধরনের স্বয়ংক্রিয় ও অনৈচ্ছিক আচরণকে প্রতিবর্তি ক্রিয়া বলে। জীবনের অবস্থার সাথে মোকাবেলা করার জন্য প্রাণী বিচার বিবেচনা না করে বাহ্য উদ্দীপকের ক্রিয়ার ফলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এ ধরনের ক্রিয়া মস্তিষ্ক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়ে স্নায়ুতন্ত্রের সুষুম্নাকাণ্ড (Spinal cord) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যেমন- গরম কিছু হাতে লাগলে সঙ্গে সঙ্গে হাত সরে আসা, চোখে কিছু পড়লে আপনা থেকেই চোখ বন্ধ হয়ে যাওয়া, পায়ে কাঁটা ফুটলে অতি ক্ষিপ্রতার সাথে পা সরিয়ে নেয়া ইত্যাদি।

প্রতিবর্তি ক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য
♦ এটি সম্পূর্ণ অনৈচ্ছিক ধরনের প্রতিক্রিয়া, এর পেছনে কোন পূর্ব পরিবল্পনা থাকে না।
♦ এটি সহজে সংশোধিত বা পরিবর্তিত হয় না; এক ধরনের উদ্দীপক এক ধরনের প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করে।
♦ প্রতিবর্তি ক্রিয়া সহজাত বা জন্মগত, শিক্ষালব্ধ নয়।
♦ এটি সহজ প্রকৃতির।
♦ প্রতিবর্তি ক্রিয়া খুব দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হয়; সংবেদনের সাথে সাথেই দৈহিক ক্রিয়া সম্পন্ন হয়। গরম জিনিস হঠাৎ আঙ্গুলে লাগামাত্র আমরা হাত সরিয়ে নেই। কারণ- গরম জিনিস আঙ্গুলে লাগামাত্র সেখানকার ত্বকে অবস্থিত সংবেদী স্নায়ুর ডেনড্রাইট জ্বালা যন্ত্রণার উদ্দীপনা গ্রহণ করে। এখানে আঙ্গুলের ত্বক সংগ্রাহক অঙ্গের কাজ করে। আঙ্গুলের ত্বক থেকে উদ্দীপনা সংবেদী স্নায়ুর মাধ্যমে মেরুরজ্জুর গ্রে ম্যাটার অবস্থিত সংবেদী স্নায়ুর অ্যাক্সন ও সংযোজক স্নায়ুর ডেনড্রাইটের মধ্যবর্তী সিন্যাপস এর মধ্য দিয়ে তড়িৎ রাসায়নিক শক্তিরূপে কর্মোদ্দীপনা ক্রিয়াজ স্নায়ুতে প্রবেশ করে এবং এর অ্যাক্সন কর্তৃক পরিবর্তিত হয়ে আঙ্গুলের পেশিতে পৌঁছায়। ফলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পেশি সংকুচিত হয় এবং সম্পূর্ণ অনৈচ্ছিকভাবে হাত সয়ে যায়।

প্রতিবতির্ ক্রিয়া সংঘটন প্রক্রিয়াঃ যে পথে প্রতিবর্তি ক্রিয়া সংঘটিত হয় তাকে প্রতিবর্তি চক্র বলে। প্রতিবর্তি চক্রের নিম্নলিখিত অংশগুলো থাকে-

সংগ্রাহক: এটি প্রতিবর্তি ক্রিয়ার জন্য উদ্দীপনা গ্রহণ করে। এর সাথে একটি সংবেদী স্নায়ু সংযুক্ত থাকে।

সংবেদী স্নায়ু : উদ্দীপকের মাধ্যমে এর ডেনড্রাইট উদ্দীপ্ত হলে সে তাড়না মেরুরজ্জুতে পরিবাহিত হয়।

সংযোজক স্নায়ু : মেরুরজ্জুর গ্রে ম্যাটার অংশে সংবেদী স্নায়ু ও ক্রিয়াজ স্নায়ুর মধ্যবর্তী স্থানে সংযোজক স্নায়ু অবস্থিত।

ক্রিয়াজ স্নায়ু : এর মাধ্যমে উদ্দীপনা কার্যকারক অঙ্গে (পেশি বা গ্রন্থি) পৌঁছায়। কার্যকারক: পেশি বা গ্রন্থি যেখানে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায়। প্রতিবর্তি ক্রিয়া মূলতঃ তিন ধরনের। যথা-

নিরপেক্ষ প্রতিবর্তি : বাহ্য উদ্দীপক প্রয়োগের সাথে সাথে প্রাণীদেহের স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে প্রতিক্রিয়া হয়। হঠাৎ উজ্জ্বল আলোতে চোখ বদ্ধ হয়ে যাওয়া।

সাপেক্ষ প্রতিবর্তি: শিখন বা অনুশীলন সাপেক্ষে বিকল্প উদ্দীপকের প্রতি প্রাণীর মূল উদ্দীপকের ন্যায় প্রতিক্রিয়া। উদাহরণ- প্যাভলভের পরীক্ষায় এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে।

ক্রমিক প্রতিবর্তি: একাধিক প্রতিবর্তি ক্রিয়া সমষ্টিগতভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। যেমন- ঝাঁঝালো বস্তুর গন্ধে হাঁচি আসা, হাঁচির ফলে চোখে পানি আসা। এগুলো একটি উদ্দীপকের ক্রমিক প্রতিক্রিয়া।

মানুষের কয়েকটি প্রতিবর্তি ক্রিয়া: চোখের উপযোজন, হাঁটুর ঝাঁকুনি, চোখের পিউপিলের সঞ্চালন, হাঁচি, কনুই ঝাকুনি, হাইম তোলা ইত্যাদি।

স্বভাবজাত আচরণের প্রকারভেদ : প্রাণীকূলের মাঝে বিভিন্ন রকমের স্বভাবজাত আচরণ পরিলক্ষিত হয়, যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

১। বিগ্রহ আচরণ: বিভিন্ন প্রজাতির মাঝে প্রজনন ঋতুতে জনন ক্ষেত্র নির্বাচনের সময় বিগ্রহ সৃষ্টি হতে দেখা যায়। গায়ক পাখি, তিন কাঁটা স্টিকল ব্যাক, এন্টিলোপ প্রভৃতি প্রাণীর প্রসঙ্গ এখানে উল্লেখ করা যায়।

২। যুগলবন্দী ও মৈথুন আচরণঃ এরূপ আচরণে যৌন মিলনের প্রথম পর্বে স্ত্রী ও পুরুষ পরস্পরকে আকর্ষণ করে। বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী বিভিন্ন ভাবে তাদের সঙ্গীদের আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। অনেক পুরুষ পাখি স্ত্রী পাখিকে আকৃষ্ট করার জন্য মৈথুন ডাক এর আশ্রয় নেয়। বসন্তকালে কোকিলের কুহু ডাক, রাতের বেলায় ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ইত্যাদি দূরবর্তী সঙ্গীকে আকর্ষণ করার ফন্দি।

৩। বাৎসল্য আচরণঃ সন্তান জন্মানোর আগে বা পরে বাচ্চার যতড়ব বা লালন পালনের জন্য পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ই যে আচরণ প্রদর্শন করে সেটাই বাৎসল্য আচরণ। মাছ, উভচর, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী ভিন্ন ভিন্ন ভাবে এই আচরণ প্রদর্শণ করে। যেমন- অধিকাংশ পাখির ক্ষেত্রে বাৎসল্য আচরণকে নিম্নলিখিত তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়ঃ
ক) বাসা তৈরি,
খ) ডিমে তা দেওয়া,
গ) ছানার প্রতি যত্নবান হওয়া।

৪। অভিপ্রয়ান আচরণঃ মাছ এবং পাখির ক্ষেত্রে অভিপ্রয়ান স্বভাব অতি স্পষ্ট ভাবে লক্ষ করা যায়। যেমন- ইলিশ মাছ ডিম ছাড়ার জন্য সমুদ্র হতে বহু দূর পথ অতিক্রম করে নদীর স্বাদু পানিতে অভিপ্রয়ান ঘটায়। আবার বিভিন্ন প্রজাতির পাখি সাইবেরিয়া অঞ্চল থেকে শীতকালে বাংলাদেশে অভিপ্রয়ান করে এবং শীতের শেষে সাইবেরিয়াতে ফিরে যায় ।

৫। খাদ্য অন্বেষণ আচরণঃ পাখি ও স্তন্যপাায়ী প্রাণীতে এ ধরনের আচরণ বেশী দেখা যায়। কোন একটি প্রাণী সব ধরনের খাদ্য খায় না বরং খাওয়ার ব্যাপারে প্রতিটি প্রাণীর একটি নির্দিষ্ট পছন্দ থাকে। বিজ্ঞানীরা প্রত্যক্ষ করেছেন- একই পরিবেশে বসবাস করা সত্ত্বেও ঘনিষ্ঠ স¤পর্কযুক্ত অনেক প্রজাতির খাদ্য ভিন্ন প্রকৃতির হতে পারে।

৬। পলায়ন প্রবৃত্তিঃ শিকারী প্রাণীর হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য অনেক জীবের মধ্যে পলায়ন প্রবৃত্তি দেখা যায়। যেমন বাজপাখিকে দেখামাত্র কাঠঠোকরা পাখি গাছের মধ্যে আত্মগোাপন করে এবং বাজপাখি সরে না যাওয়া পর্যন্ত নিশ্চুপ অবস্থায় থাকে। আবার কিছু কিছু প্রাণী (যেমন- অক্টোপাস) বর্ণের পরিবর্তন ঘটিয়ে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করে।

৭। নিদ্রামগ্ন আচরণঃ প্রতিকূল আবহাওয়ার হাত থেকে বাঁচার তাগিদে কোন কোন প্রাণী নিষ্ক্রিয় অবস্থার ভেতর দিয়ে কিছু সময় অতিবাহিত করে। যেমন অত্যধিক শীত হতে বাঁচার জন্য ব্যাঙ শীতনিদ্রায় গমন করে।

৮। সঞ্চয় স্বভাবঃ অনেক প্রাণী বিশেষ করে কীট পতঙ্গ (পিঁপড়া, মৌমাছি ইত্যাদি) ও ইঁদুর তাদের আবাসস্থলের সীমানায় বা অন্য কোন নিরাপদ স্থানে খাদ্য মজুত করে রাখে।

শিক্ষার্থীর কাজ বিভিন্ন ধরনের সহজাত আচরণ উদাহরণসহ খাতায় লিপিবদ্ধ করে ক্লাসে উপস্থাপন করুন।

সারসংক্ষেপ প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি প্রাণী কোন রকম শিক্ষা বা পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই জৈবিক প্রয়োজন মেটাতে বা আত্মরক্ষার তাগিদে বংশ পর¤পরায় একইভাবে যেসব জন্মগত অপরিবর্তনীয় আচরণ প্রদর্শন করে তাকে সহজাত আচরণ বলে। সহজাত আচরণের উদাহরণ: ট্যাক্সিস, প্রতিবর্তি ক্রিয়া, স্বভাবজাত আচরণ। উদ্দীপনার উৎসের উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীগণ ট্যাক্সিসকে ভাগ করেছেন-
১। ফটোট্যাক্সিস,
২। থার্মোট্যাক্সিস,
৩। কেমোট্যাক্সিস,
৪। থিগমোট্যাক্সিস,
৫। হাইড্রোট্যাক্সিস,
৬। অ্যানিমোট্যাক্সিস,
৭। রিওট্যাক্সিস,
৯। গ্যালভানোট্যাক্সিস,
১০। ফনোট্যাক্সিস।

প্রতিবর্তি ক্রিয়া
সংঘটন প্রক্রিয়া: যে পথে প্রতিবর্তি ক্রিয়া সংঘটিত হয় তাকে প্রতিবর্তি চক্র বলে। প্রতিবতির্ চক্রের নিম্নলিখিত অংশগুলো থাকে- সংগ্রাহক, সংবেদী স্নায়ু, সংযোজক স্নায়ু, ক্রিয়াজ স্নায়ু, কার্যকারক, প্রতিবর্তি ক্রিয়া মূলতঃ তিন ধরনের। যথা- নিরপেক্ষ প্রতিবর্তি, সাপেক্ষ প্রতিবর্তি, ক্রমিক প্রতিবর্তি।

পাঠোত্তর মূল্যায়ন-১২.২
বহু নির্বাচনি প্রশ্ন

১। পানির স্রোতের প্রতি সাড়া দিয়ে প্রাণীর স্থানান্তরকে কি বলে?
(ক) হাইড্রোট্যাক্সিস
(খ) রিওট্যাক্সিস
(গ) অ্যানিমোট্যাক্সিস
(ঘ) জিওট্যাক্সিস

২। উদ্দীপকের সাথে নির্দিষ্ট কৌণিক দূরত্বে প্রাণীর সাড়া প্রদানকে বলে-
(ক) মেনোট্যাক্সিস
(খ) নেমোট্যাক্সিস
(গ) টেলোট্যাক্সিস
(ঘ) ট্রোপোট্যাক্সিস

৩। পাখির বাসা তৈরি করা কি ধরনের আচরণ?
(ক) বাৎসল্য
(খ) বিগ্রহ
(গ) অভিপ্রয়াণ
(ঘ) যুগলবন্দিু মৈথুন



পাঠ-১২.৩ শিখন আচরণ



শিখনফল-
♦ শিখন সম্পর্কে বলতে পারবেন।
♦ শিখন আচরণ এর বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে পারবেন।
♦ শিখন আচরণের প্রকারভেদ আলোচনা করতে পারবেন।

♣ প্রধান শব্দ শিখন, অভ্যাসগত শিখন, সাপেক্ষণ শিখন, পরীক্ষালব্ধ শিখন, অনুকরণ শিখন

প্রতিটি প্রাণীই কতকগুলো সহজাত আচরণ এবং প্রতিবর্তি ক্রিয়ার ক্ষমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এসব জন্মগত সামর্থ্য পরিবর্তনশীল পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে চলার পক্ষে সবসময় পর্যাপ্ত নয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এবং পরিবর্তিত পরিমণ্ডলে সাফল্যের সাথে টিকে থাকার জন্য প্রায় প্রতিটি প্রাণীকেই নতুন কিছু আচরণ আয়ত্ত করতে হয়। অতীত অভিজ্ঞতাই প্রাণীকে নতুন কিছু আয়ত্ত করতে ও নতুন আচরণ প্রদর্শণ করতে সাহায্য করে। জন্মের পর থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত প্রাণীর অতীত অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের মাধ্যমে নতুন আচরণ আয়ত্ত করাকে শিখন বলা যেতে পারে।

শিখনের ঃ বিভিন্ন বিজ্ঞানী শিখনের ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন। যেমন- মার্কিন বিজ্ঞানী জে. এ. ম্যাকগোচ (McGoach) শিখনের সংজ্ঞাতে বলেছেন, “শিখন হলো অভ্যাসের ফলে ক্রিয়ার পরিবর্তন।” আবার ওয়াটসন (Watson)) ও বার্নার্ড (Bernard) এর মতে, “শিখন হলো আচরণের পরিবর্তন।” সি.টি. মর্গান (C.T. Morgan) ও আর. এ. কিং (R.A.King) ১৯৬৬ সালে শিখনের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা দিয়েছেন, “অতীত অভিজ্ঞতা বা অনুশীলনের ফলে আচরণের অপেক্ষাকৃত স্থায়ী পরিবর্তনকে শিখন বলা যায়।

শিখন আচরণ এর বৈশিষ্ট্য
১। এ আচরণ প্রদর্শনের জন্য অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়।
২। উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে নতুন সম্পর্ক স্থাপন হয়।
৩। শিখন সর্বদা অভিযোজনীয়। এটি সাধারণত উচ্চ শ্রেণির প্রাণীতে দেখা যায়।
৪। প্রজাতি নির্দিষ্ট নয়। একই প্রজাতির প্রাণীদের মাঝে ভিন্ন রকমের অথবা বিভিন্ন প্রজাতির মাঝে একই রকমের শিখন আচরণ পরিলক্ষিত হতে পারে।
৫। শিখন আচরণ সর্বদা পরিবর্তনশীল।
৬। বংশ পরম্পরায় প্রদর্শিত হয়না।
৭। এটি জটিল প্রকৃতির এবং শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত হয়।

শিখন আচরণ এর প্রকারভেদ বিজ্ঞানীদের মতে শিখন আচরণকে ছয়টি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। যথা-

১। অভ্যাসগত শিখন: প্রাণীর শিক্ষালাভের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো অভ্যাসগত আচরণ। কোন কোন প্রাণী পুনঃপুনঃ উদ্দীপনায় বার বার সাড়া প্রদান করে। কিন্তু যদি উদ্দীপনা বার বার দেয়া হতেই থাকে তবে সেই উদ্দীপনায় প্রাণী আর সাড়া দেয় না। যেমন- অভ্যাসগত আচরণের কারণে চামড়া শিল্পকারখানার শ্রমিকরা দুগর্ন্ধময় পরিবেশে কাজ করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে পরে।

২। সাপেক্ষণ শিখনঃ কোন উদ্দীপকের প্রতি শর্তাধীন সাড়া দেয়ার কারণে প্রাণী যে শিখন আচরণ অর্জন করে তাকে সাপেক্ষণ শিখন বলে। যেমন- খাবার দেয়ার সময় একটি নির্দিষ্ট শব্দ করে পোষা প্রাণীকে নিয়মিত খাবার দেয়া হলে, পরবর্তীতে খাবার না দিয়েও ঐ শব্দ করলে পোষা প্রাণীটি সাড়া প্রদান করে।

৩। পরীক্ষালব্ধ শিখনঃ ভুল সংশোধনের মাধ্যমে বা তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে প্রাণী যে শিক্ষালাভ করে তাকে পরীক্ষালব্ধ শিখন বলে। যেমন- ব্যাঙ যদি কখনো মৌমাছিকে মুখে নিয়ে গিলে ফেলার চেষ্টা করে মৌমাছিটি তখন ব্যাঙের মুখে হুল ফুটিয়ে দেয় এবং ব্যাঙ বুঝতে পারে যে মৌমাছিটি তার খাদ্য নয়। পরবর্তীতে মৌমাছি দেখলে ব্যাঙ আর তাকে খাওয়ার চেষ্টা করে না।

৪। অনুকরণ শিখনঃ সচরাচর প্রাণীর জীবনের কোন একটি নির্দিষ্ট সময়ে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিছু অভিজ্ঞতার আলোকে তার আচরণের যে সব হঠাৎ স্থায়ী পরিবর্তন হয় তাকে অনুকরণ শিখন বলে। যেমন- ডিম ফুটে বের হয়েই হাঁস-মুরগির বাচ্চারা অনুকরণ করে হাটতে শেখে।

৫। প্রচ্ছন্ন বা সুপ্ত শিখনঃ প্রাণীর মাঝে যখন কোন বৈশিষ্ট্য সুপ্তাবস্থায় থাকে এবং পরবর্তীতে পারিপার্শ্বিক কোন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সেই বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ হয় তখন তাকে প্রচ্ছন্ন বা সুপ্ত শিখন বলে। যেমন- পাখির বাসা বানানোর প্রবণতা তাদের মাঝে সুপ্তাবস্থায় থাকে কিন্তু প্রজনন কালে তা জাগ্রত হয়।

৬। অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখনঃ পরিস্থিতি হঠাৎ করে কোন সমাধান খুঁজে নেয়াই হলো অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখন। যেমন- জার্মান মনোবিজ্ঞানী Wolfgang Kohler (1920) শিম্পাঞ্জির ক্ষেত্রে অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখন আচরণ পরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় দেখেন যে, শিম্পাঞ্জির খাঁচায় কতগুলো কাঠের বাক্স এলোমেলো ভাবে রেখে ওই খাঁচায় শিম্পাঞ্জির নাগালের বাইরে কলা টানিয়ে রাখলে; শিম্পাঞ্জি তার নিজ বুদ্ধি খাটিয়ে বাক্সের উপর বাক্স রেখে তার উপরে দাড়িয়ে কলা পেড়ে খায়।

শিক্ষার্থীর কাজ বিভিন্ন ধরনের আচরণের উদাহরণসহ একটি ছক সহপাঠীদের সামনে উপস্থাপন করুন।

সারসংক্ষেপ
বিভিন্ন বিজ্ঞানী শিখনের ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন। যেমন- মার্কিন বিজ্ঞানী জে. এ. ম্যাকগোচ (McGoach) শিখনের সংজ্ঞাতে বলেছেন, “শিখন হলো অভ্যাসের ফলে ক্রিয়ার পরিবর্তন।” আবার ওয়াটসন (Watson) ও বার্নার্ড (Bernard) এর মতে, “শিখন হলো আচরণের পরিবর্তন।” সি.টি. মর্গান (C.T. Morgan) ও আর. এ. কিং (R.A.King) ১৯৬৬ সালে শিখনের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা দিয়েছেন, “অতীত অভিজ্ঞতা বা অনুশীলনের ফলে আচরণের অপেক্ষাকৃত স্থায়ী পরিবর্তনকে শিখন বলা যায়। বিজ্ঞানীদের মতে শিখন আচরণকে ছয়টি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে-
১। অভ্যাসগত শিখন,
২। সাপেক্ষণ শিখন,
৩। পরীক্ষালব্ধ শিখন,
৪। অনুকরণ শিখন,
৫। প্রচ্ছন্ন বা সুপ্ত শিখন,
৬। অন্তর্দৃষ্টিমূলক শিখন।

পাঠোত্তর মূল্যায়ন-১২.৩
বহু নির্বাচনি প্রশ্ন

১। নিম্নের কোনটি শিখন আচরণের বৈশিষ্ট্য নয়?
(ক) প্রজাতি নির্দিষ্ট
(খ) বংশ পরম্পরায় প্রদর্শিত হয় না
(গ) সর্বদা পরিবর্তনশীল
(ঘ) শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত হয়

২। নিচের কোনটি শিখন আচরণ?
(ক) অপত্য লালন
(খ) অভিপ্রয়ান
(গ) অনুকরণ
(ঘ) মাকড়শার জাল

৩। পাখির ডিম পাড়ার প্রবণতা সুপ্তাবস্থায় থাকে কিন্তু ডিম পাড়ার ক্রান্তিলগ্নে তা জাগ্রত হয়- এটি কোন ধরনের শিখন আচরণ?
(ক) সাপেক্ষণ শিখন
(খ) প্রচ্ছন্ন শিখন
(গ) পরীক্ষালব্ধ শিখন
(ঘ) অনুকরণ শিখন



পাঠ-১২.৪ কুকুরের লালার প্রতিবর্তি ক্রিয়ার উপর বিজ্ঞানী প্যাভলভের পরীক্ষণ কাজ



শিখনফল-
♦ কুকুরের লালার প্রতিবর্তি ক্রিয়ার উপর বিজ্ঞানী প্যাভলভের পরীক্ষণ কাজ বর্ণনা করতে পারবেন। প্রধান শব্দ সাপেক্ষ প্রতিবর্তি মতবাদ, প্যাভলভ চিরায়ত সাপেক্ষণ

সাপেক্ষ প্রতিবর্তি মতবাদ : রাশিয়ার শারীরতত্ত্ববিদ আইভান প্যাভলভের কুকুরের লালা নিঃসরণের পরীক্ষণ শিখন আচরণের এক বিস্ময়কর ঘটনা। আমরা জানি কুকুরের মুখে মাংসের টুকরা দিলে মুখ গহ্বরে লালা নিঃসৃত হয়। এটা একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু বিজ্ঞানী আইভান প্যাভলভ ক্ষুধার্ত কুকুরের মুখে মাংসের টুকরা দেওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ঘণ্টা বাজান। তিনি এভাবে ঘণ্টা বাজিয়ে সাথে সাথে এক টুকরা মাংস কুকুরকে দিতে থাকেন। এ কাজটি বার বার করতে থাকেন। এতে প্রতিবারই কুকুরের মুখে লালা নিঃসৃত হতে থাকে। তিনি প্রতিবারই যান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে লালা নিঃসরণের মাত্রা পরিমাপ করেন।

কাজটি বেশ কয়েকবার (অন্তত ১২ বার) পুনরাবৃত্তির পর হঠাৎ করে মাংসের টুকরা না দিয়ে তিনি কেবল ঘণ্টা বাজান। এ পর্যায়ে দেখা গেল, কেবল ঘণ্টাধ্বনির প্রতি প্রতিক্রিয়া স্বরূপ কুকুরটি লালা নিঃসরণ করলো। এরপর মাংসের টুকরা না দিয়ে প্যাভলভ যতবার শুধু ঘণ্টা বাজালেন ততোবার সাথে সাথে কুকুরের মুখ থেকে লালা নিঃসৃত হলো। অর্থাৎ ঘণ্টাধ্বনির সাথে কুকুরের লালা নিঃসরণের একটি সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। ঘণ্টাধ্বনি এবং মাংসের টুকরার যুগপৎ উপস্থাপনের ফলে এদের মধ্যে এক সংযোগ গড়ে উঠেছে। এ সংযোগ ব্যবস্থা কুকুরের মস্তিষ্ক স্নায়ুবিক সংযোগের মাধ্যমে কার্যরত। এরূপ মস্তিষ্কজাত সংযোগ ক্রিয়াকে প্যাভলভ চিরায়ত সাপেক্ষণ নামে আখ্যায়িত করেছেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, ঘণ্টাধ্বনি প্র মে একটি নিরপেক্ষ উদ্দীপক ছিল। কিন্তু ঘণ্টাধ্বনির সাথে মাংসের টুকরো কয়েকবার উপস্থাপনের ফলে কুকুরটি ঘণ্টাধ্বনির প্রতি লালা নিঃসরণ করতে শিখলো। এজন্য ঘণ্টাধ্বনিকে সাপেক্ষ উদ্দীপক এবং ঘণ্টাধ্বনির প্রতি লালা নিঃসরণের ঘটনাকে সাপেক্ষ প্রতিক্রিয়া বলে অভিহিত করেছেন। সুতরাং বলা যায় যে সাপেক্ষ উদ্দীপকের প্রতি প্রাণী যে প্রতিক্রিয়া করে তাই সাপেক্ষ প্রতিবর্তি ক্রিয়া বা সাপেক্ষণ। প্যাভলভের সাপেক্ষ প্রতিবর্তি ক্রিয়াকে দেখান যায়

শিক্ষার্থীর কাজ পোস্টার পেপারে কুকুরের লালা নিঃসরণের পরীক্ষাটির প্রবাহ চিত্র এঁকে উপস্থাপন করুন।

সারসংক্ষেপ
রাশিয়ার শারীরতত্ত্ববিদ আইভান প্যাভলভের কুকুরের লালা নিঃসরণের পরীক্ষণ শিখন আচরণের এক বিস্ময়কর ঘটনা। আমরা জানি কুকুরের মুখে মাংসের টুকরা দিলে মুখ গহ্বরে লালা নিঃসৃত হয়। এটা একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু বিজ্ঞানী আইভান প্যাভলভ ক্ষুধার্ত কুকুরের মুখে মাংসের টুকরা দেওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ঘণ্টা বাজান। তিনি এভাবে ঘণ্টা বাজিয়ে সাথে সাথে এক টুকরা মাংস কুকুরকে দিতে থাকেন। এ কাজটি বার বার করতে থাকেন। এতে প্রতিবারই কুকুরের মুখে লালা নিঃসৃত হতে থাকে। তিনি প্রতিবারই যান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে লালা নিঃসরণের মাত্রা পরিমাপ করেন।

পাঠোত্তর মূল্যায়ন-১২.৪
বহু নির্বাচনি প্রশ্ন

১। ঘণ্টা ধ্বনির প্রতি সাড়া দিয়ে কুকুরের লালা নিঃসরণের ঘটনাকে প্যাভলভ কি নামে অভিহিত করেছেন?
(ক) সাপেক্ষ উদ্দীপক
(খ) সাপেক্ষ প্রতিক্রিয়া
(গ) স্বাভাবিক উদ্দীপক
(ঘ) স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া

২। সাপেক্ষ প্রতিবর্তি মতবাদ কোন বিজ্ঞানী দিয়েছেন?
(ক) আইভান প্যাভলভ
(খ) ম্যাকগোচ
(গ) সি.টি. মর্গান
(ঘ) আরন কিং

৩। ক্ষুধার্ত প্রাণী অন্যকে খাবার খেতে দেখলে তার লালা ক্ষরণ হয়, এটি-
(ক) সহজাত আচরণ
(খ) সাপেক্ষ প্রতিবর্তি ক্রিয়া
(গ) অনপেক্ষ প্রতিবর্তি ক্রিয়া
(ঘ) শিখন আচরণ



পাঠ-১২.৫ মৌমাছির সামাজিক সংগঠন এর আলোকে পরস্পরের প্রতিসহযোগিতা



শিখনফল-
♦ মৌমাছির সামাজিক সংগঠন এর আলোকে পরস্পরের প্রতিসহযোগিতা ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
প্রধান শব্দ ওভিপজিটর, প্রোপোলিস, নেকটার, সুপার সিডিওর

একই প্রজাতিভুক্ত কিছু প্রাণী বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ কারণে বিশেষ শৃঙ্খলার সাথে একত্রে স্থায়ী ভাবে বসবাস করার ব্যবস্থাকে সমাজবদ্ধতা বলে। প্রাণিজগতের মধ্যে মৌমাছি, পিঁপড়া, বোলতা, উইপোকা, মাছ, পাখি ও প্রাইমেট স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রে সমাজবদ্ধতা দেখা যায়। তবে সামাজিক প্রাণী হিসেবে মৌমাছি আমাদের কাছে অধিক পরিচিত। কতক প্রজাতির প্রাণী সামাজিক আচরণের এক পর্যায়ে স্বজাতীয় অন্য সদস্যদের কল্যাণে নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এমনকি জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে থাকে। একই প্রজাতির অন্য সদস্যদের প্রতি প্রাণীর এরূপ আচরণকে পরস্পরের প্রতিসহমর্মিতা বলে। ফরাসি দার্শনিক August Comte (1851) সর্বপ্রথম Altruism শব্দটি ব্যবহার করেন। মৌমাছি Arthropoda পর্বের Hymenoptera বর্গের Apis গণভুক্ত প্রাণী। এদের বিস্তৃতি বিশ্বব্যাপী। তবে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন প্রজাতি পাওয়া যায়। বাংলাদেশে তিন প্রজাতির মৌমাছি পাওয়া যায়- যথা- Apis indica, Apis dorsata I Apis florea । মৌমাছি শুধু সামাজিক প্রাণী নয় বরং এরা চরমভাবে অ্যালট্রুইস্টিক। চাকের প্রতিটি সদস্য নিজের স্বার্থ না দেখে অন্য সদস্যদের কল্যাণে কাজ করে যায়। প্রতিটি সদস্য সমাজের জন্য নিবেদিত প্রাণ। এরা নিজের স্বার্থে কোন কাজ করে না। মৌমাছিরা সামাজিক রীতিনীতি কঠোরভাবে মেনে চলে। এদের ৫০,০০০ থেকে ১০০,০০০ সদস্য একত্রে কলোনি গঠন করে বাস করে। এদের বাসাকে মৌচাক বলে।

মৌমাছির জাত
মৌমাছির কলোনিতে তিন জাতের মৌমাছি থাকে। এরা হল- একটি রাণী, কয়েক হাজার কর্মী ও কয়েকশত পুরুষ। মৌমাছিদের শ্রমবণ্টন লক্ষ করা যায়। তিন ধরনের মৌমাছির দৈহিক গঠনে ভিন্নতা দেখা যায়। এদের এরূপ অবস্থাকে বহুরূপতা বলে।

রাণী মৌমাছি
গঠন: একটি মৌচাকে মাত্র একটি রাণী মৌমাছি থাকে। রাণী মৌমাছি আকারে অনেক বড়। এদের উদর বেশ প্রশস্ত। এদের ডানাগুলো ছোট এবং উদরের শেষ প্রান্ত μমশঃ সরু। এ সরু প্রান্তে বাঁকানো হুল থাকে যা রূপান্তরিত ওভিপজিটর। এদের প্রোবোসিস ও রেণুলি থাকে না, পদ ক্ষুদ্রাকৃতির, ম্যান্ডিবল বা চোয়াল তীক্ষ্ম, মোম ও মধু সৃষ্টি করতে পারে না, লালাগ্রন্থি নেই।

আচরণ: রাণী মৌমাছি অধিকাংশ সময় মৌচাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কেবল সঙ্গম উড্ডয়নের সময় মৌচাক থেকে বের হয়ে আসে। এরা জীবনে একবার কয়েকশত পুরুষের সাথে সঙ্গমে অংশগ্রহণ করে অসংখ্য রμাণু গ্রহণ করে যা সারা জীবন ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করে। রাণী সঙ্গম উড্ডয়নে ব্যর্থ হলে নতুন কলোনি সৃষ্টি হয় না বা পূর্বের কলোনি নষ্ট হয়। সঙ্গমের পর রাণী মৌমাছি প্রতিদিন প্রায় ১৫০০-২০০০ ডিম পাড়ে। সকল ডিম নিষিক্ত হয় না। নিষিক্ত ডিম থেকে স্ত্রী এবং অনিষিক্ত ডিম থেকে পুরুষ মৌমাছি সৃষ্টি হয়। রাণী মৌমাছি ৩-৫ বছর বাঁচে।

রাণীর উৎপত্তি: রাণী মরে গেলে কিংবা প্রজননে অক্ষম হলে কর্মীরা বিকাশরত লার্ভাকে বিশেষভাবে তৈরি রাজকীয় জেলি খাওয়ায়ে কলোনিতে ১৬ দিনের মধ্যে নতুন রাণী সৃষ্টি করে। এ ঘটনাকে সুপার সিডিওর বলে। নতুন রাণী বের হয়ে মৌচাকে বিকাশরত অন্যান্য রাণীদের হুল ফুটিয়ে হত্যা করে। একই সময়ে দুটি রাণী বের হলে এরা মরণ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধে জয়ী রাণী কলোনির সার্বিক দায়িত্বভার গ্রহণ করে।

রাণীর কাজ: রাণী মৌমাছি কলোনিতে একমাত্র প্রজননক্ষম স্ত্রী মৌমাছি। এরা ডিম পাড়ে এবং কলোনীর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে। জীবদ্দশায় একটি রাণী মৌমাছি প্রায় দেড় লক্ষ ডিম পাড়ে। রাণী মৌমাছি কলোনির স্বার্থে কঠোরভাবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে। এরা কখনোই কলোনি ত্যাগ করে না। এরা অবিরাম বাচ্চা উৎপাদন করে কলোনির আকৃতি সমৃদ্ধ করে। রাণী মৌমাছির মস্তক থেকে ক্ষরিত ফেরোমন মৌচাকের বিভিন্ন সদস্যদের সংঘবদ্ধ রাখতে সাহায্য করে।

পুরুষ মৌমাছি
গঠন: পুরুষ বা ড্রোন কলোনির প্রজননক্ষম পুরুষ মৌমাছি। কলোনিতে ৩০০-৩০০০ পর্যন্ত ড্রোন থাকে। এরা রাণী অপেক্ষা আকারে কিছুটা ছোট, প্রশস্ত দেহ, বৃহৎ চক্ষু, ক্ষুদ্রাকার তীক্ষ্ম চোয়ালবিশিষ্ট হয়ে থাকে। এদের মোমগ্রন্থি, মধু সংগ্রহকারী যন্ত্র ও হুল থাকে না কিংবা মুখোপাঙ্গ খাদ্য সংগ্রহের উপযোগী নয়।

আচরণ: এরা মৌচাকের অলস প্রকৃতির ও কোলাহল সৃষ্টিকারী সদস্য। এরা প্রতিরক্ষা বা খাদ্য সংগ্রহের কাজে অংশগ্রহণ করে না। এরা এমন অলস প্রকৃতির যে নিজের খাদ্য নিজে গ্রহণ করে না। কোন কারণে কর্মী মৌমাছি না খাওয়ালে এরা মারা যায়।

উৎপত্তি: অনিষিক্ত ডিম থেকে পার্থেনোজেনেসিস প্রক্রিয়ায় পুরুষ মৌমাছি সৃষ্টি হয়। তাই এরা হ্যাপ্লয়েড (n) প্রকৃতির হয়ে থাকে।

কাজ: পরিণত পতঙ্গে রূপান্তরিত হওয়ার ১০ দিন পর এরা রাণীকে নিষিক্ত করতে সক্ষম হয়। প্রায় ৫০০০ পুরুষ বৈবাহিক উড্ডয়নে অংশগ্রহণ করে। যৌনমিলন ছাড়া পুরুষ মৌমাছির অন্য কোন কাজ নেই বললেই চলে। এরা জীবনে কেবল একবার রাণী মৌমাছির সাথে যৌন মিলনের আকাঙ্খায় অপেক্ষা করে এবং মিলনের পর মৃত্যুবরণ করে। প্রজাতির বংশ রক্ষার্থে পুরুষের এরকম আত্মত্যাগ অ্যালট্রুইজমই প্রকাশ করে।

কর্মী মৌমাছি
গঠন: কর্মী মৌমাছি কলোনির মধ্যে সবচেয়ে ছোট আকারের মৌমাছি। এরা বন্ধ্যা স্ত্রী জাতীয় মৌমাছি। এরা কালো বা বাদামী বর্ণের হয়ে থাকে। এদের দেহ ও পা ঘন সন্নিবিষ্ট লোম বা ব্রিসল দ্বারা আবৃত থাকে। এদের মুখোপাঙ্গ চর্বণ ও লেহন উপযোগী। এদের উদরের শেষ প্রান্তে একটি হুল থাকে। এদের পশ্চাৎ বক্ষে বিদ্যমান পদে রেণু থলি ও রেণু চিরুণী থাকে। এদের উদরের অঙ্কীয় দিকে একটি মোমগ্রন্থি বিদ্যমান থাকে।

উৎপত্তি : একটি মৌচাকে কর্মী মৌমাছির সংখ্যা ৬০,০০০ থেকে ৮০,০০০ পর্যন্ত হয়ে থাকে। নিষিক্ত ডিম থেকে উৎপন্ন হলেও এরা জননে অক্ষম। যে সব লার্ভাকে শ্রমিক মৌমাছিরা মৌরুটি সরবরাহ করে তারা পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় কর্মী মৌমাছিতে পরিণত হয়। শ্রমিক মৌমাছির হাইপোফ্যারিঞ্জিয়াল গ্রন্থি থেকে ক্ষরিত পদার্থ, মধু ও নেকটারের সঙ্গে মিশে যে মিশ্র খাদ্য সৃষ্টি হয় তাকে মৌরুটি বা বি ব্রেড বলে। বৃদ্ধির সপ্তম দিন থেকে এরা মৌচাকের বাইরে আসতে সক্ষম হয়। কেবলমাত্র ২০ দিন বয়সের পরেই নেকটার ও রেণু সংগ্রহ করার জন্য এদের উড্ডয়ন শুরু হয়। এরা প্রায় ৬ সপ্তাহ বেঁচে থাকতে পারে।

আচরণ : এরা মূলত মৌচাকের পরিচ্ছন্নতা, বাচ্চার যত্ন নেয়া, খাদ্য অন্বেষণ ইত্যাদি কাজ সম্পন্ন করে। খাদ্য অন্বেষণকারী মৌমাছি মৌচাকের নিকটে দু’ধরনের নৃত্য (বৃত্তাকার নৃত্য ও ওয়াগটেল নৃত্য) প্রদর্শন করে অন্যান্য মৌমাছিদের খাদ্যের উৎস সম্পর্কে অবগত করে। বিজ্ঞানী কার্ল ভন ফ্রিস (Karl von Frisch) মৌমাছির নৃত্যের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে প্রথম আলোকপাত করেন। এজন্য এ বিজ্ঞানীকে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।

কাজ
♦ মৌচাক পাহারা দেয়া ও অনুপ্রবেশকারীকে আক্রমণ করা।
♦ ডানা সঞ্চালন দ্বারা বায়ুপ্রবাহ সৃষ্টি করে মৌচাকের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বজায় রাখা।
♦ রাণীর পরিচর্যা করা।
♦ ব্রুডের বিভিন্ন সদস্যদের যতড়ব নেয়া, খাদ্য প্রদান করা, মোম উৎপাদন ও চাক গঠন করা।
♦ খাদ্যের অনুসন্ধান ও অন্যান্য সদস্যদের কাছে তার অবস্থানগত সংকেত প্রদান করা।
♦ নেকটার, পানি, রেণু ইত্যাদির সাহায্যে মধু সৃষ্টি করা।
♦ পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্য কর্মী মৌমাছিকে হত্যা করা।

প্রোপোলিস উৎপাদন করা। প্রোপোলিস হলো রেজিন ও ব্যালসাম (৫০%), মোম (৩০%), তৈল (১০%) ও নেকটার (৫%) গঠিত এক ধরনের জৈব যৌগ যা উদ্ভিদ থেকে সংগৃহীত হয়। এগুলো মৌচাকের ফাটল ও ছিদ্র মেরামতের কাজে ব্যবহৃত হয়।

কর্মী মৌমাছির মধ্যে অ্যালট্রুইজম সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এরা আমৃত্যু কলোনির স্বার্থে কাজ করে। কলোনি শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে এরা শত্রুর দেহে হুল ফুটিয়ে প্রতিহত করার চেষ্টা করে। একটি কর্মী মৌমাছি জীবনে একবারই হুল ফুটাতে পারে এবং এরপর মারা যায়। অর্থাৎ এরা কলোনির স্বার্থে জীবন উৎসর্গ করে। এরা কোন ছোঁয়াচে জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে কিংবা কোন সংক্রমণ উপযোগী জীবাণু বহন করলে কলোনির স্বার্থে কলোনি ত্যাগ করে একাকী জীবন যাপন করে।

মৌমাছির ঝাঁক বাঁধা বা সোয়ার্মি (Swarming) : নতুন কলোনি সৃষ্টি করার লক্ষ্যে যে পদ্ধতিতে মৌমাছি প্রাকৃতিকভাবে প্রজাতির সংখ্যাকে বৃদ্ধি করার জন্য মৌচাক থেকে দলবদ্ধভাবে বেরিয়ে আসে তাকে ঝাঁক বাধা বলে। মৌমাছির ঝাঁক বাঁধার প্রধান শর্তগুলো হলো-
♦ যখন রাণী ডিম পাড়তে অসমর্থ্য হয় বা বন্ধ্যা হয়।
♦ যখন শ্রমিক মৌমাছির সংখ্যা অত্যাধিক হয়।
♦ যখন মৌচাকের বায়ু চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
♦ যখন অতিরিক্ত খাদ্যের প্রয়োজন হয়।
♦ যখন শত্রু বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রয়োজন পড়ে।

শিক্ষার্থীর কাজ একটি মৌচাকে তিন ধরনের মৌমাছি কি কি কাজ করে তা একটি তালিকার মাধ্যমে উপস্থাপন করুন।

সারসংক্ষেপ
মৌমাছির কলোনিতে তিন জাতের মৌমাছি থাকে। এরা হলো- একটি রাণী, কয়েক হাজার কর্মী ও কয়েকশত পুরুষ। মৌমাছিদের শ্রমবণ্টন লক্ষ করা যায়। তিন ধরনের মৌমাছির দেহিক গঠনে ভিন্নতা দেখা যায়। এদের এরূপ অবস্থাকে বহুরূপতা বলে।

পাঠোত্তর মূল্যায়ন-১২.৫
বহু নির্বাচনি প্রশ্ন
১। প্রাণীর ক্ষেত্রে অ্যালট্রুইজম হলো-
(ক) পরার্থপরতা
(খ) স্বার্থপরতা
(গ) অস্বাভাবিকতা
(ঘ) শ্রম বিভাজন

২। একটি মৌচাকে কত ধরনের মৌমাছি দেখা যায়?
(ক) ২ ধরনের
(খ) ৩ ধরনের
(গ) ৪ ধরনের
(ঘ) ৫ ধরনের

৩। মৌমাছির নৃত্যের গতি প্রকৃতি সম্পর্কে কোন বিজ্ঞানী প্রথম আলোকপাত করে নোবেল পুরস্কার পান?
(ক) Karl Von Frisch
(খ) Ivan Pavlov
(গ) Konrad Loranz
(ঘ) B.F. Skinnen

চূড়ান্ত মূল্যায়ন
বহু নির্বাচনি প্রশ্ন
প্রজাতির বিচিত্র ঘটনা সুদীপ্তকে আকৃষ্ট করে। পাখির বাসা তৈরি, মা পাখির বাচ্চাকে খাওয়ানো, দূর দূরান্ত থেকে অতিথি পাখির আগমন এ সবকিছু দেখে সুদীপ্ত অবাক হয়। কিভাবে ঘটনাগুলো ঘটে তা নিয়ে সে চিন্তা করে।
(ক) সহজাত আচরণ কী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়?
(খ) সহজাত আচরণ ও শিখন আচরণের মধ্যে দুটি পার্থক্য লিখুন।
(গ) উদ্দীপকের আলোকে উল্লিখিত আচরণটি ব্যাখ্যা করুন।
(ঘ) মৌমাছির সামাজিক আচরণ অ্যালট্রুইজম- বিশ্লেষণ করুন।

উত্তরমালা
পাঠোত্তর মূল্যায়ন- ১২.১ : ১. গ ২.খ ৩.গ
পাঠোত্তর মূল্যায়ন- ১২.২ : ১. খ ২.ক ৩.ক
পাঠোত্তর মূল্যায়ন- ১২.৩ : ১. ক ২.গ ৩.খ
পাঠোত্তর মূল্যায়ন- ১২.৪ : ১. খ ২.ক ৩.খ
পাঠোত্তর মূল্যায়ন- ১২.৫ : ১. ক ২.খ ৩.ক



what image shows

জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র

একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি

ড. মোহাম্মদ আবুল হাসান

গাজী সালাহউদ্দিন সিদ্দিকী